|
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৩)আর বি মোরে |
প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়কাল ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক দিক থেকে টানাপোড়েনের সময়। অচ্ছুৎ আর সামাজিক বৈষম্যের শিকার শ্রেণিরা নিজেদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলছিল। শহরগুলিতে শ্রমিক ধর্মঘট, লড়াই-আন্দোলন চলছিল। রাজনৈতিক আন্দোলনের ঢেউ আমাদের উপরেও আছড়ে পড়তে লাগল। তিন-চার বছর বিরতির পরে আমি মাহাদের স্কুলে ফিরি। আর এই অল্প সময়েই দুনিয়াব্যাপী যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেছে বহু। অবশ্যাম্ভাবী নানান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মাহাদের স্কুলের অস্পৃশ্যতার কু-আচারে কোনো বদল আসেনি। |
[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ।
প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।
কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]
দ্বাদশ পর্বের পর... পয়সা কামাব ভেবে আমি বোম্বে-পুণে যাইনি। লক্ষ্য ছিল পড়াশোনা। আমার কষ্ট হত যে পড়াশোনাটা শেষ করতে পারলাম না। কীভাবে পড়াশোনাটা চালিয়ে নিয়ে যাব সেই ভাবনা আমাকে অস্থির করে তুলত। সে কারণেই পুণেতে যাই। কতই না বিপদ বাধালাম এই করতে গিয়ে। শেষে একটা নৈশ স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়তে লেগে যাই। কিন্তু আমার বোকামির জন্যেই মাঝপথে সেই সব ছেড়ে বোম্বে চলে আসি আর এখন সব ঘাট ঘুরে ফিরে সেই দাশগাঁও। দাশগাঁওতে আমার স্কুলের চাকরিটা ছিল ঠিকা চাকরি। যখন কাজটা ফুরোলো, আমি ভাবলাম ফের মাহাদের স্কুলে গিয়ে পড়ব। মাকে সেটা জানালাম। আই (মা) ভাবল কাজটা উচিৎ কাজ হবে।
যখন আমি খাড়কি আর পুণেতে থাকছিলাম, লাড়াওয়ালিতে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যায়। লাড়াওয়ালি আর তার আশেপাশের কিছু গ্রামে কলেরার মড়ক লাগে। শুধু লাড়াওয়ালিতেই কয়েকশো লোক মারা যায়। মাত্র দুইদিনের মধ্যে জনা তিরিশ লোক মরে। আমার দিদা, বড় মামা-মামি একই দিনে মারা যায়। শুধু ছোটো মামা রক্ষা পায় কোনোক্রমে। লাড়াওয়ালিতে এই দুর্ঘটনা ঘটবার পর থেকে মামার খেতখামার, গোরুমোষ দেখভাল করবার মতো লোক আর ঘরে ছিল না কেউ। কলেরার মড়ক খানিক শক্তি হারালে মায়ের পরামর্শ মতো মামা বিয়ে করে। সেই থেকে আমার মামা, মামি, মা, বোন একইসঙ্গে থাকতে শুরু করে। যখন আমি বোম্বে আর পুণে থেকে ফিরি তখন মাকে দাশগাঁওতেই পাই। তবে সদ্য দুই মাস হল মামার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বলে বোনকে নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরেছে। মামা মাঝেমধ্যেই দাশগাঁওতে এসে নিজের বোনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে লাড়াওয়ালিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করত। মা-ও কয়েকদিন ধরে সেখানে ফিরে যাবার কথাই মনে মনে ভাবছিল। আমার হঠাৎ প্রত্যাবর্তন সেই ভাবনা স্থগিত করে দেয়। তাই যখন আমি মাহাদের স্কুলে যাবার কথা বলি মা যেন মুখের কথাটা লুফে নেয়। আমি যখন বাবা মারা যাবার পরে মাহাদের স্কুলে পড়তাম তখন মা, বোনের সঙ্গে মামার ঘরেই থাকতাম। সেই সময় আমার দরকারেই লাড়াওয়ালিতে থাকতে হয়েছিল। এখন মামার প্রয়োজন আমাদের সঙ্গে থাকা। কারণ মায়ের স্নেহযত্ন অভিজ্ঞতার মূল্য ছিল মামার কাছে অনেক বেশি এখন। তাছাড়াও যেহেতু আমরা দাশগাঁওতে নিজেদের বাড়িখানা স্কুলকে ভাড়া দিয়েছিলাম, সেই ভাড়ার টাকাটাও মামার সংসারে এলে মামার কিছুটা সাশ্রয় হয়। যখন মাহাদের স্কুলে যাবার ব্যাপারটা পাকা কথা বলে নিলাম, তখন মা ওর ভাইয়ের সঙ্গে থাকবে বলে লাড়াওয়ালিতে রওনা দিল। আর আমি বড়োবাড়িতে থাকতে শুরু করি। আমার চাকরির ছয়মাস মেয়াদের মধ্যে দুই-তিন মাস তখন অতিক্রান্ত। আর কয়েকমাস মাত্র বাকি তখন। ঠিক সেই সময় আমি এক মস্ত সুযোগ পাই নিজের উন্নতির জন্যে। কিন্তু অজ্ঞানতার বশে আমি হেলায় সে সুযোগ হারাই।
ঘটনাটা এইভাবে ঘটল। আমি যে লোকের সাময়িক বদলি হিসাবে সামলে দিচ্ছিলাম শিক্ষকতার কাজটুকু সে জঙ্গলে ঠিকাদার হিসাবে মুনিষ জোগাড়ের কাজ করছিল। ওর সরকারি অনুমোদনের দরকার ছিল জঙ্গল কেটে কাঠ-লকড়ি বানিয়ে বেচবার জন্যে। আর এই অনুমোদন দেবার ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল ইউরোপীয় জঙ্গলরক্ষকের হাতে। একবার যখন এই জঙ্গলরক্ষক দাশগাঁও সফরে এসেছিল, এই ঠিকেদার আমাকে ওর কাছে নিয়ে যায়। আমি ইংরেজিতে এই শিলমোহরের ব্যাপারে কথা বলি ওনার সঙ্গে। পরে উনি আমার ব্যাপারে জানতে চান। আমাকে কথা দেন যে একজন শিক্ষানবিশ রেঞ্জার হিসাবে ফরেস্ট অফিসে আমায় নিয়োগপত্র দেবেন। উনি আমাকে পোলাদপুরের কাছে ওয়াদাতে একটা সেন্টারে ছয় মাস কাজ করতে বলেন। তারপরে আমাকে একটা কোর্স করতে আজমেরে পাঠাতেন। তারপর ওঁর কথা মতো আমি একজন সাধারণ ঘোড়ায় চাপা রেঞ্জার হতে পারতাম যার নিজস্ব অফিস আছে তেহসিলে আর চার রাউন্ড রক্ষী যার অধীনে কাজ করত। ‘যদি আমার কথায় তুমি রাজি থাকো, তাইলে কাল সকালে চলে আসো আমার কাছে। আমি তোমায় লিখিত নিয়োগপত্র দেব’।
সেই যুগে সিভিল সার্ভিসে রেঞ্জারের পদে নিয়োগ পাওয়া ছিল কোনো ভারতীয়ের পক্ষে দুর্লভ ব্যাপার। আমার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না-থাকা সত্ত্বেও আমায় চাকরিতে নিয়োগ করা হচ্ছিল। কারণ মাহার রেজিমেন্টে আমার আত্মীয়স্বজন ছিল। আর এই জঙ্গলরক্ষক মাহার ও অন্যান্য সেনা রেজিমেন্টের সঙ্গে সখ্য রেখে চলত। তাই এ-ছিল আমার কাছে এক বিরল সুযোগ। কিন্তু যখন বড়োবাড়ির লোকেরা আর আমার পাড়াপড়শিরা একসঙ্গে বসে রাত্তিরে সভা করে ঠিক করল যে এই কাজে আমার যোগদান করা উচিৎ না তখন আমি ছাড়া মাত্র দুয়েকজন ছিলাম সেই মতের বিপক্ষে। ওরা সবাই বলল যে এ-হল বনরক্ষকের পদে চাকরি, আমি গুমখুন হয়ে গেলেও কেউ টের পাবে না। আসলে বাকিরা এটা মেনে নিতে পারছিল না যে আমি এত ভালো একটা চাকরি জোটাতে সক্ষম হয়েছি। ওরা আমায় টেনে নামিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলতে দুইবার ভাববে না, অথচ পরে ভাব দেখাবে এমন যে তার পিছনে ওদের কোনো হাত ছিল না। ব্রিটিশরাজ থাকা সত্ত্বেও আমাদের জাতের লোকেদের আর্মি ছাড়া আর কোনো সরকারি চাকরি জুটত না। মায় হাবিলদারের চাকরিও দেওয়া হত না আমাদের। বনবিভাগের সাধারণ রক্ষীর পদেও আমাদের মধ্যে থেকে নিয়োগ করা হত না। এইসব ভেবেচিন্তে আমার এই চাকরিতে যোগ দেওয়া উচিৎ হবে না। এমনটাই মত ছিল সকলের। কেউ কেউ বলল, ‘হলই বা এটা সোনার ছুরি-তাই বলে কারো হৃদয়ে ছুরিকাঘাত করা কি ঠিক হবে?’ একদিকে পরিবারের তরফে এমন বাধা ছিল, আরেকদিকে আমার মধ্যে ছিল আরও অনেকদূর পড়াশোনা করবার ব্যাকুল চাহিদা। তাই আমি এই সুন্দর সুযোগটাকে হাতছাড়া করতে দ্বিধা করলাম না।
যদি আমি চাকরিটায় যোগ দিতাম, বোম্বে প্রেসিডেন্সিতে সরকারি সিভিল সার্ভিসের চাকরিতে রেঞ্জারের মতন উঁচু পদে আসীন হতে পারা প্রথম অচ্ছুৎ হিসাবে যথেষ্ট সাড়া ফেলতে পারতাম। পরে আমি ডিভিশনাল অফিসার-ও হতে পারতাম, কিন্তু এমনটা ঘটল না। তবে জীবনের এই পর্বেই আমার বাকি জীবনের দিশা ঠিক হয়ে গেল। এই সময়েই সরকারি চাকরির হাতকড়া পরানো আয়েশি জীবনকে ছেড়েছুঁড়ে এমন এক জীবনের দিকে আমি পা বাড়ালাম যেখানে আমার শ্রেণি, আমার জনগণের মুক্তির লড়াইতে সামনের সারিতে থাকা শুরু করলাম। আমি সারাজীবন ধরেই এই লড়াইতে অংশ নিয়ে ন্যায়ের পথে থাকতে পেরে পরম গর্ব অনুভব করেছি।
আমার সাময়িক চুক্তির চাকরির মেয়াদ যখন ফুরালো, আমি শিক্ষক থেকে ফের ছাত্র বনে গেলাম। মাহাদের ইংরেজি স্কুলে আরও একবার আমার নাম নথিভুক্ত করি। আমার জীবনের আরও একবার বাঁক পরিবর্তন হল এর মাধ্যমে।
ছাত্র, রাখাল, খেতমজুর, মজদুর, কুলি, মুটে, মার্কামারিয়ে, বাক্সবন্দিকারী, কেরানি, শিক্ষক, এইসব ধাপ পেরিয়ে ফের একজন ছাত্র বনলাম; আমার পেশাগত জীবনে ক্রমিক বদলগুলি এভাবেই ঘটল। শৈশব থেকেই আমি রকমারি অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে, অধ্যাত্মবাদী দিক থেকে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভর্তি বলা চলে। ধর্মগ্রন্থ পাঠ, ঈশ্বরের আরাধনা, কুণ্ডলীবিচার, উপোস, একতারি আর মৃদঙ্গ সহযোগে ভজন গাওয়া, বিয়ের গান গাওয়া, গৌরি উৎসবে গান গাওয়া, রূপকথার গল্প বলা, কীর্তন, তামাশা, নাটকে অভিনয় করা, আমার কাছে এগুলো ছিল নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনা। তাই আবার যখন মাহাদের স্কুলে ভর্তি হলাম ছাত্র হিসাবে, আমার জ্ঞানের ভাঁড়ার তখন খালি ছিল না মোটেই।
প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়কাল ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক দিক থেকে টানাপোড়েনের সময়। অচ্ছুৎ আর সামাজিক বৈষম্যের শিকার শ্রেণিরা নিজেদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলছিল। শহরগুলিতে শ্রমিক ধর্মঘট, লড়াই-আন্দোলন চলছিল। রাজনৈতিক আন্দোলনের ঢেউ আমাদের উপরেও আছড়ে পড়তে লাগল। তিন-চার বছর বিরতির পরে আমি মাহাদের স্কুলে ফিরি। আর এই অল্প সময়েই দুনিয়াব্যাপী যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে গেছে বহু। অবশ্যাম্ভাবী নানান পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মাহাদের স্কুলের অস্পৃশ্যতার কু-আচারে কোনো বদল আসেনি।
আগেকার ক্লাসরুমেই আমার ক্লাস হচ্ছিল। আগেও যেভাবে আমাকে আলাদা বসানো হত, এখনও সেই ধারাই চলছিল। ১৯১৪-১৫ সালে আমাকে নিয়ে আর অস্পৃশ্যতার অবিচার সম্পর্কে খবরের কাগজগুলিতে লেখালেখি হতে শুরু হয়। অস্পৃশ্যতা রদ করবার সংগ্রামে এ ছিল এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। শয়ে শয়ে বছর ধরে ভারতে অস্পৃশ্যতা মেনে চলে আসা হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু এটা অন্যায়, একধরনের নিপীড়ন, এক রকমের দাসত্ব, অস্পৃশ্যদের শত্রুরা বরাবর যত্ন নিয়ে এসেছে যাতে এ-নিয়ে লোকসমাজে তেমন আলোচনা না-হয় প্রকাশ্যে, চেপে যাওয়া যায়। ষাট বচ্ছর আগে যখন প্রথমবার সংবাদপত্রে প্রকাশ পেল যে আমার মতো অসংখ্য ছোটো ছোটো ছেলেরাও স্কুলের গণ্ডিতে প্রবেশ করতে পারছে না অস্পৃশ্যতার কারণে, তাদের স্কুলে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না স্রেফ অচ্ছুৎ হবার জন্যে, তখন থেকে অস্পৃশ্যতার সামাজিক অবিচারের বিষয়টি ভদ্রমহোদয়দের আলাপ-আলোচনার মধ্যে এল। কেউ কেউ তর্কের খাতিরে বলতে পারে সেই সময়ে অস্পৃশ্যতা নিয়ে যে খুল্লমখুল্লা আলোচনা হয়েছে তার ফলেই পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে বাবাসাহেব আম্বেদকরের নেতৃত্বে অচ্ছুৎদের স্বাভিমান, আত্মপরিচয় ও মুক্তির জন্যে ঐতিহাসিক আন্দোলনের ডাক দেবার মতো জমি তৈরি করা গিয়েছিল।
মানুষ মানুষকেই দাস বানিয়েছে। মানুষই মানুষকে অচ্ছুৎ বানিয়েছে। মানুষই মানুষকে শোষণ-নিপীড়ন করেছে। মানুষই মানুষকে উপনিবেশের শাসনে বেঁধেছে। যারা দাস বনেছে তাদেরকে তো নিশ্চিতভাবেই দাসত্বের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এই কারণেই বিদ্রোহ পরম কর্তব্য। যাদেরকে অচ্ছুৎ ঘোষণা করা হয়েছে তাদের অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ঘোরতর লড়াই করা বাঞ্ছনীয়। দরকার আপসহীন বিদ্রোহের। যারা শোষিত, নিপীড়িত তাদের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা দায়িত্ব। যারা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তাদের লড়াই-বিদ্রোহ চাই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে। বাস্তব এটাই যে আম্বেদকরের নেতৃত্বেই মাহাদে অস্পৃশ্যতার কুপ্রথার বিরুদ্ধে অচ্ছুৎদের প্রকৃত সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা জরুরি যে ১৮৬৪ সালে ব্রিটিশরা দেশের মধ্যে স্বশাসিত কিছু সংস্থার প্রবর্তন করবার পরে, অচ্ছুৎদের প্রতিনিধি হিসাবে গোপাল বাবা ওয়ালাঙ্কার ১৮৮৪ সালে মাহাদের পুরসভায় সদস্য মনোনীত হন। এর মাধ্যমে আন্দাজ করা সম্ভব মাহাদের গুরুত্ব কতখানি ছিল সারা ভারতজুড়ে লক্ষ কোটি অচ্ছুৎদের মুক্তিসংগ্রামের মূল রণভূমি হওয়ার ক্ষেত্রে।
আগেও উল্লেখ করেছি আমি মাহাদের স্কুলে দ্বিতীয়বারের জন্যে ছাত্র হিসাবে ভর্তি হলাম, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি এখন ভর্তি। এতদিনে আমি জেনেছি মানুষের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন হয়, বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমস্যা, তাদের সমাধান, ধর্মীয়, সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ভিন্নতা কেমন হতে পারে তার সম্পর্কে প্রাথমিক জানা-বোঝা আমার তদ্দিনে তৈরি হয়েছে। আমি অস্পৃশ্যতার রোগ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলাম। এবারে আমি মাহাদের স্কুলে, বাজারে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতাম। অতীতের কুণ্ঠাবোধ বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট ছিল না। আমাকে যে প্রশ্নই করা হোক না কেন আমি সাধ্য মতো তার মুতোর জবাব দিতে শিখে গেছিলাম। যখন প্রথম মাহাদে স্কুলে ভর্তি হই, বাজারে একখানা রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছিল আমি ও আমার মতো গ্রাম থেকে আসা মাহার ও নিচু জাতের লোকেদের পানীয় জলের সমস্যা সমাধানের জন্যে। আমি যখন ফিরে এলাম, দেখলাম রেস্তোরাঁ বহাল তবিয়তে চালু আছে। বর্ষায় আগে বন্ধ থাকত, কেবল শুখা মরশুমেই খোলা হত ওখানা। এছাড়াও অচ্ছুৎদের বসতি থেকে এই রেস্তোরাঁ অনেক দূরে ছিল বলে রাতে কেউ থাকত না এখানে। কিন্তু ইদানিং খরিদ্দারের সংখ্যা বাড়ছিল। আশেপাশে প্রচুর সংখ্যায় অবসরপ্রাপ্ত সেনারা এসে বসতি গাড়ছিল। যুদ্ধাবসানের পরে ১১১তম মাহার রেজিমেন্ট রাতারাতি তুলে দেবার দরুণ এই ঘটনা ঘটে। চাকরিহারা এই সেনারা এখন চাষাবাদ বা দিনমজুরি করে দিন গুজরান করছিল। নিজেদের সেনাজীবন আর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ওদের দুঃসাহসী ও দুর্দম করেছিল। আমার মারাঠি আর ইংরেজির জ্ঞান, আমার বিভিন্ন বিষয়ে জানা-বোঝার গভীরতা, সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্যে আমার হৃদয়ের সহানুভূতিপ্রবণতার কারণে বহু দেশগাঁও থেকে রেস্তোরাঁয় আসা জ্ঞানীগুণীজনেরা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করত, শ্রদ্ধা করত। আমি অজস্র তথ্য জানতে পারতাম। মাহাদের কাছাকাছি গ্রামের লোকেদের কিছুজন তো রোজই সেখানে এসে বসে থাকত। ভোর থেকে সন্ধ্যারাত অবধি দোকানখানা লোকে লোকারণ্য থাকত। সর্বক্ষণ কোনো-না-কোনো বিষয়ে সেখানে আলোচনার তুফান উঠত। আমি রোজ লাড়াওয়ালি থেকে মাহাদ এলে রোজ সকালে প্রাতঃরাশের পরে দোকানে আড্ডা দিতাম। তারপরে, আঁকা ও শারীরশিক্ষার ক্লাসে যখন স্কুল আমাকে ছুটি দিত আমার ছোঁয়া এড়ানোর জন্যে, আমি আবার রেস্তোরাঁতে চলে আসতাম। স্কুল ছুটির পরে আবারও আমি আসতাম। বলা চলে দিনের বেশির ভাগ সময় আমি সেখানেই কাটাতাম।
এই কালপর্বে আমি নানান তথ্য জানতে পারতাম ভিন গাঁয়ের লোকেদের মুখ থেকে, শুধুমাত্র দোকানে বসে থেকে। মাহাদের চারিপাশের ষাট মাইল এলাকার খবরাখবরের ছোট্ট তথ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই রেস্তোরাঁ। রাইগড়, প্রতাপগড় আর উপত্যকার গ্রামগুলিও এর আওতায় পড়ে যেত। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতাম এই বৃত্তের মধ্যেকার লোকেদের একে অপরের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক। মাহারদের সঙ্গে অন্যান্য জাতের সম্পর্কে সমতার বোধ আছে কিনা। নাকি অন্যান্য জাতিরা মাহারদের নিচু চোখে আজ্ঞাবহ হিসাবে দেখে। আমি জানতে পারি গ্রামগুলিতে মাহারেরা সংখ্যায় কম হলেও, অন্যান্য জাতের মানুষদের কাছে ওরা মাথা ঝোঁকাত না। অস্পৃশ্যতার কু-প্রথার কারণে, অচ্ছুৎ আর বর্ণ হিন্দুরা একে অপরকে সচরাচর এড়িয়েই চলত। কিন্তু একে অপরের প্রতি প্রখর ঘৃণাবোধ ছিল না। যখন শিকারে বেরত, বল্লম আর কুঠার হাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বেরত ওরা সকলে। এইরকম মুহূর্তগুলিতে ওরা জাতপাত ছোঁয়াছুঁয়ি মানত না। এই সব গ্রামেই সব জাত থেকেই প্রচুর সংখ্যায় গরিব চাষি ছিল। গ্রামে পেট চালাবার মতো যথেষ্ট উপার্জন ওরা করে উঠতে পারত না। তাই পাল বেঁধে সকলকে শহরে যেতে হত। গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে গেলে অন্তত এমন একজনকে পাওয়া যাবে যে হয় সেনাতে যোগ দিয়েছে কিম্বা শহরের কোনো মিলে কাজ করছে। যেহেতু অচ্ছুৎ আর অন্যান্য জাতের লোকেদের জীবনের দুর্দশায় এত মিল, ওরা নিজেদের মধ্যেও এক ঐক্য অনুভব করত। হাতেগোনা উঁচু জাতের ধনীদের রক্ষণশীল চিন্তার কারণেই গ্রামের গরিব বর্ণহিন্দুরা অচ্ছুৎদের মনুষ্যেতর হিসাবে দেখত। যখন এই বাস্তবতাটা উপলব্ধি করলাম তখন আমার চেতনা জড়তা মুক্ত হল। মাহাদের রেস্তোরাঁর দৌলতে আমি সেই এলাকার মাহারদের যাবতীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানি। তাদের বৈশিষ্ট্য, ভালো-মন্দ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মাটির প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেম সম্পর্কে অবগত হই। এই সংগঠিত সম্প্রদায় মহারাষ্ট্রের বুকে এক ব্যাপক শক্তি। এদের ক্ষমতা আছে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনবার। এটা আমি বুঝি। শুরু করি স্থানীয় ইস্যু নিয়ে এই সম্প্রদায়কে সচেতন করার চেষ্টা। অচ্ছুৎদের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে মাহাদ যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করেছে তার গোড়াপত্তন এই ছোট্ট রেস্তোরাঁর আড্ডাখানা থেকে। ছাভদার হ্রদ আন্দোলনের প্রথম অনুরণন এখানেই অনুভূত হয়। আম্বেদকরের মহৎ কাজের শুরুয়াতও এইখান থেকেই।১৫
ভারতে জাতপাতভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা আর তার সূত্র ধরে অস্পৃশ্যতার রোগ প্রকট হবার পরে যে সকল হিন্দু মুসলমান শাসক ক্ষমতাসীন হয়েছেন সকলেই অচ্ছুৎদের দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধেছেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা এই হেন হিন্দু মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে ক্ষমতার হস্তান্তর নিজেদের কাছে করেন। ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতব্যাপী নিজেদের রাজ। নিজেরাই ভারতের জনগণকে একচ্ছত্র শাসন-শোষণ-বঞ্চনার অধিকার করায়ত্ত করেন। বাকি সমস্ত অংশের জনগণের পাশাপাশি ওরা অচ্ছুৎদেরও শোষণ করতে ছাড়ত না। যদিও অচ্ছুৎদের ‘নিপীড়িত জাতি’-র তকমা দিয়ে ভারতীয় রাজনৈতিক পরিসরে ওদের একটা স্থান পাকা করে দেন ব্রিটিশ সরকার। হিন্দু-মুসলিম রাজন্যবর্গও হিন্দু-মুসলিম প্রজাদের সঙ্গে দাসের মতোই দুচ্ছাই ব্যবহার করত। তবে ওদের আমলেও অচ্ছুৎদের হিন্দু-মুসলিম সাধারণ মানুষের সমান মর্যাদা ছিল না সমাজে। ওদের কাছে হিন্দু আর মুসলিমে বিভক্ত ছিল সমাজ। কিন্তু ব্রিটিশেরা, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতেই, অচ্ছুৎদের হিন্দু মুসলিমের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্তরে সমাজের তৃতীয় অংশ হিসাবে তুলে আনলেন। মন্টেগু-চেমসফোর্ড চুক্তির সময়ে অচ্ছুৎরা নিপীড়িত জাতির মর্যাদা পায়। পরবর্তীকালের আইনসংস্কারে ওরা তপশীলি জাতিভুক্ত হয়। এখনও শিক্ষা ও কাজের জগতে অচ্ছুৎরা যে সংরক্ষণ বা ছাড়ের সুযোগ-সুবিধা পায় তারা তা পায় তপশীলি জাতি হিসাবে। এটাই আদত বাস্তবতা। এর আগে ওরা মানুষ হিসাবে কোনো মৌলিক অধিকার ভোগ করতে পারত না।
টীকা
[১৫] ছাভদার হ্রদ আন্দোলন ছিল মাহাদের ছাভদার বাধের জল সকলের পানের জন্যে খুলে দেবার দাবি নিয়ে আম্বেদকরের নেতৃত্বে সংগঠিত ১৯২৭ সালের মার্চ মাসে ঘটা প্রথম সত্যাগ্রহ। দাবি ছিল ১৯২৩এ এস কে বোলে কর্তৃক প্রণীত আইনের আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ করতে হবে। এই আইনের মাধ্যমে দলিতেরা জনজলবণ্টনের আওতায় আসে সরকারিভাবে।
অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ প্রকাশের তারিখ: ২২-জুন-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |