সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
এক দলিত কমিউনিস্টের স্মৃতিকথা (পর্ব-১২)
আর বি মোরে
বোম্বে পৌঁছে আমি তিলকের শবযাত্রায় পা মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকতে পারলাম। তবুও আমি আমার নিজের জীবনের উন্মুখতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। সর্দার গৃহ থেকে ফ্যামিলি লাইন্স খুবই কাছে। এই ফ্যামিলি লাইন্সেই আমি বোম্বে থাকাকালীন অতটা সময় কাটিয়েছিলাম। আর সর্দার গৃহ থেকে শবযাত্রা শুরু হল। আমার ট্রেন থেকে প্রথম আক্কার কাছে গিয়ে পুণে থেকে জমিয়ে আনা পয়সা আর স্কুল শংসাপত্র জমা করে দেওয়াটাই ছিল সমীচীন। কিন্তু এটুকু করা আমার ধকে কুলালো না।

[কমরেড রামচন্দ্র বাবাজি মোরে (১৯০৩-১৯৭২)। দেখতেন একটা নীল আকাশ ও লাল সূর্যের স্বপ্ন। তাঁর মেমোরিজ অব আ দলিত কমিউনিস্ট (২০১৯) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে। Dalit Va Communist Chalvalicha Sashakta Duva: Comrade R.B. More [A Powerful Link between Dalit and Communist Movement: Comrade R.B. More] শিরোনামে বইটি ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। মূল মারাঠি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন বন্দনা সোলানকর। সঙ্গে রয়েছে অনুপমা রাওয়ের অসামান্য ভূমিকা। বইটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে আছে কমরেড মোরের আত্মকথা, যা আসলে ১৯০৩-২৭ এই সময়ের কথা। তারপরের অংশে রয়েছে তাঁর পুত্র সত্যেন্দ্র মোরের লেখা বাবার জীবনী। দেবরাজ দেবনাথ ইংরাজি থেকেই বাংলা করছেন। ফলত এটি অনুবাদের অনুবাদ।
প্রশ্ন হল কেন এই স্মৃতিকথা অনুবাদের পরিকল্পনা। যেখানে কমরেড মোরের অসমাপ্ত স্মৃতিকথায় জীবনের সামান্য কিছুদিনের কথাই রয়েছে। আসলে এই সময়ে ভারতের রাষ্ট্র চালাচ্ছে আরএসএস পরিচালিত বিজেপি। যাদের হাতে সংবিধান আক্রান্ত, আক্রান্ত ভারতের বহুত্ববাদী স্বর। দিনকয়েক আগেই সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আম্বেদকর বিষয়ে মন্তব্য আমাদের সকলেই জানা। এ-পরিস্থিতিতে কমরেড মোরের জীবন-কথা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। কোন অপমান ও পীড়নের মধ্যে একজন দলিত বেঁচে থাকেন, কেমন সে-কাহিনি তাই রয়েছে এ-বইয়ে আর যে-কথা বিস্মৃত হলে প্রকৃত ভারতের খোঁজ অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে।
কমরেড মোরে ছিলেন দলিত আন্দোলনের সংগ্রামী কর্মী; বাবাসাহেব আম্বেদকরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা। কিন্তু কিছুকাল পরে বোম্বের কাপড়-শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সংযোগ এবং কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে আলাপচারিতা তাঁকে প্রণোদিত করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অংশীদার হতে। কমরেড সতেন্দ্র মোরের সাক্ষ্য জানান দিচ্ছে যে, ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম পড়েন কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। যা পালটে দেয় জীবনের গতিপথ। অনুভব করেন শোষণ-মুক্তি, দলিতদের লাঞ্ছনা-পীড়ন মুক্তি সর্বপরি মানব-মুক্তির এটাই পথ। সমাজও বিপ্লব না-হলে অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্তি নেই। এরপর থেকেই শ্রেণি-শোষণ এবং জাত-শোষণ উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। কমরেড সত্যেন্দ্র লেখা থেকে আমরা জানতে পারি কী অমানুষিক দারিদ্র্য, কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে জাত ও শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে গেছেন মানুষকে। উজ্জ্বল ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যে-বালকটিকে স্কুল জীবনে উচ্চবর্ণের শিক্ষক ও বন্ধুদের থেকে শুনতে হত “আমাকে ছুঁইয়ে দিবি না।” ছুঁতে হবে বলে শিক্ষকরা শরীরবিদ্যা ও আঁকার ক্লাস থেকে যে-বালককে বের করে দিত। সে-যোদ্ধার আত্মকথা ছুঁয়ে অপমানে সমান হওয়া অধিকার অর্জন করি আমরা। কমরেড মোরের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। দীর্ঘজীবী হোক শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ শোষণ মুক্তির লড়াই।— মার্কসবাদী পথ]
আমার খাড়কিবাসের সময় জীবনের আরেকখানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কিছু বন্ধু মিলে ভজনের দল বানায়। এক মন্দিরের কার্মকর্তা দত্তা উৎসবে এই ভজনের দলকে গাইতে ডাকে। কথামতো তালমৃদঙ্গ সহযোগে এই ভজনের দলে সেখানে যথাসময়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু দলটাকে মন্দিরের বাইরে বসিয়ে গাইতে বলা হয়। দলের কিছু ছেলে-ছোকরার কাছে এইটা অপমানজনক ঠেকে। বাকি ভজনের দলগুলোর থেকে কোনও ভাবেই খাটো না-হয়েও বাকিদের মতন মন্দিরের ভিতরে সকলের মাঝে ভিড়ে গিয়ে কেন ওরা গাইতে পারবে না! পরদিন অস্ত্রাগারে আমার সঙ্গে ওরা সলা করে। একজন পরামর্শ দেয় যাতে আমি সত্যপ্রকাশ-এ এ-নিয়ে লিখি। আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাই। এ-কথা বলে রাখা ভালো যে আমার জীবনে তখনও অবধি আমি সত্যপ্রকাশ বা অন্য কোনও সংবাদপত্র চোখে দেখিনি। আমার মনে আছে আমার জোয়ান বন্ধুরা এই দলখানার নাম রেখেছিল ‘দত্তা প্রাসাধিক ভজন মণ্ডল’। বন্ধুদের কথা মতো আমি খবরখানা সহজ মারাঠিতে লিখে সংবাদপত্রকে দিই। এক হপ্তার মধ্যেই খবরখানা সত্যপ্রকাশ–এ ছেপে বের হয়, ‘ঘামারে’ উপশিরোনাম সহ। আমার বন্ধুরা সেই সংখ্যাটা কিনে এক কপি আমায় দেয়। জীবনে প্রথমবার যখন নিজের লেখা ছাপা অক্ষরে দেখলাম, পাগলের মতো বারবার পড়তে থাকলাম লেখাটা। অস্পৃশ্যতার অন্যায় নিয়ে লেখা এই নিবন্ধ ছিল সাংবাদিকতার দুনিয়ায় আমার প্রথম পা-রাখা। ১৯২০-র প্রথমার্ধে ঘটনাটা ঘটে। সত্যপ্রকাশ ছিল সত্যশোধক আন্দোলনের মুখপত্র। পরে আমি সত্যশোধক আন্দোলনের অন্যান্য সংবাদপত্রও পড়ি। গুলামগিরি (মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলের ‘দাসত্ব’) আর দশাবতার প্রদীপিকা-র মতো আন্দোলনের সাহিত্য সম্পর্কেও জানা-বোঝা তৈরি করি।১৩
আলেগাঁওকার স্কুলে আমি চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হই। ওই স্কুলে ওরা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ না-বলে ‘ফর্ম’ বলত শ্রেণিগুলোকে। মাহাদে আমি দ্বিতীয় শ্রেণি পাস করে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলেও, তৃতীয় শ্রেণি থেকে আর এগোতে পারিনি। খাড়কির স্কুল যখন তাই শংসাপত্রের দিকে অত লক্ষ না-করে প্রবেশিকার মাধ্যমে আমাকে সরাসরি চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি নেয় তখন খানিক আশ্বস্ত হই। পড়াশোনার টানে আমি পুণে এসেছিলাম। কিন্তু সেখানে আমাকে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় পড়তে হয়। অনুকূল পরিবেশ ছাড়া পড়াশোনা আর চাকরি একসঙ্গে করা যায় না। আবিতকারের বাড়িতে, কালিবাইয়ের ছত্রছায়ায় আমি হয়তো পড়া আর কাজ একসঙ্গে চালাতে পারতাম, কিন্তু সবাইকে লুকিয়ে চলতে গিয়ে আমি ক্রমে দিশেহারা হয়ে যাই। কাটা ঘুড়ির মতো আমি হাওয়ায় দিগভ্রান্ত হয়ে উড়তে লাগলাম। কোনও খুঁটি ছিল না। আমার মায়ের কথা, পরিজনের কথা মনে পড়তে লাগল। পুণে আর খাড়কিতে যেন আমি এক ভিনগ্রহে বেঁচে আছি।
লোনাভালাতে আমার এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় ছিল। উনি ওখানে বৌ-বাচ্চা নিয়ে থাকতেন। রেলওয়ে মালবিভাগের একজন কেরানি ছিলেন। আমি মনস্থির করলাম যে ওঁর কাছে যাব। বাড়ির লোকের খবরাখবর জানব। লোনাভালায় একবার গিয়ে আমি দূর থেকে দেখে নিলাম উনি কোথায় থাকেন, কোথায় কাজ করেন। পরের বারে আমি ওঁর দরজায় খটখট করি। তখনও উনি কাজ থেকে ফেরেননি। ওঁর স্ত্রী ছিলেন ঘরে। উনি আমায় চিনতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, ‘কোথায় ছিলি এদ্দিন? তোর চিন্তায় তোর মায়ের তো যায়-যায় অবস্থা’। উনি তারপর হাতমুখ ধুয়ে কিছু খেতে বসতে বলেন। আমি বললাম যে বাড়ির কর্তা এলেই আমি খেতে বসব। উনি আমায় বোঝান, ‘ওঁর আসতে দেরি হবে। আর যদি মদ খেয়ে ঢোকে তাইলে তোর কপালে শনি নাচছে। তারচেয়ে এখনই পেটটা ভরে খেয়ে নে দিকি’। আমি খাবার খেয়ে নিয়ে হাত ধুয়ে ওঁর সঙ্গে আলাপ জমালাম। বাড়ির খবরাখবর জানতে লাগলাম। ‘আই আর পিথুবাই ভালো আছে। তোর মায়ের শরীরও ভালো আছে। কিন্তু তোর কথা সারাক্ষণ ওর মুখে লেগে থাকে। খালি কান্নাকাটি করে। আমি তো এই সেদিন ফিরলাম দাশগাঁও থেকে’।
কথা চলাকালীন ঘরে ঢুকলেন শিরকাভালে মোরে। ওই বলিষ্ঠ চেহারার অবসরপ্রাপ্ত সেনাজওয়ানকে দেখে কয়েক পল আমি যেন কুঁকড়ে গেলাম। রামিবাই বলল, ‘দ্যাখো। আমাদের রামচন্দ্র দেখা দিয়েছে’। উনি খুশি প্রকাশ করলেন। রাতের খাবার খেয়ে আমায় নিজের পাশে বসিয়ে জানতে চাইলেন আমি কেমন আছি। আমি বললাম যে আমি অস্ত্রাগারে কাজ করছি দিনের বেলায় আর রাতের বেলা স্কুলে যাচ্ছি। উনি আমায় জানান যে বোম্বেতে আমার চেনাপরিচিতদের থেকে উনি শুনেছিলেন যে আমি কোনও সাধুর দলের সঙ্গে ভেগে গিয়েছি। উনি বিশ্বাসী ছিলেন এমন শিক্ষিত ছেলে কখনওই ওই ভণ্ডামির ফাঁদে পা দেবে না। ‘তাইলে আমি ঠিকই প্রমাণিত হলাম। এখন ঘুমাতে যা, সকালে উঠে বাকি কথা হবে’। উনি রামিবাইকে বললেন আমার শোবার বিছানা সাজিয়ে দিতে। রাতের মতো সবাই বিশ্রামে গেল।
বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্র মাথায় হাজার একটা ভাবনা খেলে গেল। ঘর ছেড়ে এতদিন আছি, তা-ও পয়সা জমাতে পারিনি এখনও। আমি যদি ওদের সঙ্গে সকালে থাকি ফের, তাইলে নানান প্রশ্নে আমায় ছিঁড়ে খাবে সকলে। তাই আমি ঠিক করি যে আমার ওখান থেকে চলে যাওয়াটাই শ্রেয়। এই ভেবেই আমি ঘুমাতে যাই। ভোর চারটেয় উঠি। দরজার খিলটা নিঃশব্দে খুলে বাইরে বেরিয়ে আসি এমনভাবে যাতে কেউ টের না পায়। নিকটতম রেলস্টেশনে পৌঁছে আমি পুণে যাবার ট্রেন ধরে খাড়কিতে নেমে যাই। তারপর আগের মতই কাজে যেতে লাগি। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে শিরকাভালে দাশগাঁওতে আমার বাড়িতে চিঠি লিখে জানিয়ে দেবে যে আমি এখানে আছি। আমি ঠিক করি দাশগাঁও বা বোম্বের কেউ এখানে এসে আমায় তুলে নিয়ে যাবার থেকে ভালো হবে আমিই যদি আগেভাগে নিজে থেকে দাশগাঁও যাই। সেইভাবেই আমি প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। দিওয়ালির সময় যাওয়াটাই ঠিক দেখাবে। দেওয়ালি হতে আর মাত্র দুই মাস বাকি ছিল। আমি ধরে ধরে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো মিটিয়ে দিতে শুরু করি মাইনে হাতে পাওয়া মাত্রেই। সব ধার মেটাই। স্কুলের ফিজ জমা করে আলেগাঁওকার স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণির শংসাপত্র নিয়ে নিই। কিছু পয়সা হাতে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এই ভাবনা থেকে আমি নতুন জামাকাপড় কেনা বন্ধ করে দিই।
ঠিক সেই সময়েই একখানা জরুরি খবর পেলাম: লোকমান্য তিলক মারা গেছেন। আরও খবর জানতে আমি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আলেগাঁওকার স্কুলে যাই। ওখানে আমাদের জানানো হয় যারা লোকমান্য তিলকের শবযাত্রায় অংশ নিতে চায় তাদের জন্যে বিশেষ ট্রেনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। আমি নিজেকে নিজে পুছি [জিজ্ঞেস করি] তখন— ভেবেছিলাম দেওয়ালিতে যাব বাড়িতে। কিন্তু তার তো অনেক দেরি। দেওয়ালি অবধি অপেক্ষা করেই আলাদা কী হবে? যখন স্থির করেছি যে যাব, তখন গেলেই হয় এখনি। তাছাড়া, এমন মহান ভারতীয় নেতার শেষযাত্রায় পা-মেলাবার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিৎ হবে না। এটাকে বোম্বে ফিরবার এক কাকতালীয় শুভ মহরৎ বলা যেতে পারে আমার জন্যে। তাইলে বেরিয়েই পড়ি— জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে আমি পুণে স্টেশনে বিশেষ কামরায় উঠে বসি। পুণে আর খাড়কিতে আমার সাময়িক ঠিকানাটা এভাবেই মুছে গেল আর বোম্বে ফেরার মাধ্যমে আমি আমার জীবনের পরের অধ্যায়ে পা রাখলাম।
বোম্বে পৌঁছে আমি তিলকের শবযাত্রায় পা মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকতে পারলাম। তবুও আমি আমার নিজের জীবনের উন্মুখতা, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না। সর্দার গৃহ থেকে ফ্যামিলি লাইন্স খুবই কাছে। এই ফ্যামিলি লাইন্সেই আমি বোম্বে থাকাকালীন অতটা সময় কাটিয়েছিলাম। আর সর্দার গৃহ থেকে শবযাত্রা শুরু হল। আমার ট্রেন থেকে প্রথম আক্কার কাছে গিয়ে পুণে থেকে জমিয়ে আনা পয়সা আর স্কুল শংসাপত্র জমা করে দেওয়াটাই ছিল সমীচীন। কিন্তু এটুকু করা আমার ধকে কুলালো না। অন্তত শবযাত্রাটা মিটে গেলে আমার কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করাটা প্রয়োজনীয় ছিল। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন জীবনের এক অমোঘ শিক্ষার কথা। কোনও মানুষের মাথার ঠিক না-থাকলে তার অধঃপতন হতে সময় লাগে না। শবযাত্রাটা মিটে যাওয়া মাত্র আমার হঠাৎ নাটক দেখবার খেয়াল চাপলো। আমার মাথায় এই ভাবনাটা এলোই না যে আমি সদ্য বোম্বে এলাম আর অন্তত আমার আত্মীয়দের সঙ্গে একবার দেখা করে নেওয়াটা আবশ্যিক; নাটক তো আমি যখন ইচ্ছে দেখতে পারব। নাটক দেখার ভূত মাথায় চাপতেই আমার পা নিজে থেকেই আমায় হাঁটিয়ে নিয়ে গেল রঙ্গমঞ্চের দিকে। নাটক শুরু হতে যেহেতু বেশি দেরি ছিল না, আমি রাত্তিরের খাবারের কথাটা বেমালুম ভুলে গেলাম। চা-পাউরুটি খেয়ে কোনওরকমে থিয়েটারে সিটটা বাগাতে পারলাম। রাত ৯টায় শুরু হয়ে নাটক শেষ হল মাঝরাত পেরিয়ে। আমি তারপর বোরি বন্দর অবধি হেঁটে গেলাম আর রাত দেড়টা নাগাদ ভাটিয়া গার্ডেন্সে বসলাম। ওই বাগানে কেউ কেউ ঘুমোচ্ছিল, কেউ বেঞ্চে বসেছিল, কেউ ইতস্তত পায়চারি করছিল। আমি ঠিক করলাম রাতটুকু বেঞ্চে বসেই কাটিয়ে দেব। এত রাতে আত্মীয়-স্বজনের ঘুম ভাঙানোটা ঠিক হবে না। রাত তিনটে নাগাদ ঘুমে চোখ মুদে এলো আমার। আমি কোট, টুপি খুলে ভাঁজ করে বালিশের মতন মাথার তলায় দিয়ে দ্রুত অঘোরে ঘুমোতে লাগলাম। সাড়ে পাঁচটায় যখন ঘুমটা ভাঙল, দেখি কেউ আমার সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। আমার জামা আর ধুতি ছাড়া বাকি সব চুরি গিয়েছে। আমার খ্যাপাটেপনা আমাকে বড়ো বিপদের দিকে ঠেলে দিল, এর মাশুল আমাকেই গুনতে হল। আমি কড়াই থেকে সোজা গনগনে উনুনে গিয়ে পড়লাম, সম্পূর্ণ নিজের দোষে।
যেহেতু বোম্বে আমি প্রথম দেখছি না, তাই আমি নিশ্চিত জানতাম এর থেকে আমি নিজেকে উদ্ধার করতে পারব। তাই কী হল না-হল তা নিয়ে আজগুবি না-ভেবে আমি সোজা বন্দরে চলে এলাম। আমি এক নিরক্ষর তত্ত্বাবধায়ককে পাকড়াও করলাম। ওর মর্জিমতো পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওর হয়ে ডকের কুলিদের নাম লিখে দিতে রাজি হলাম। আমি ধুতিখানা লুঙ্গির মতন বেঁধে পরলাম। এখন এই লুঙ্গি আর জামাই ছিল আমার পরনের একমাত্র সহায় আর রাত্তিরের আস্তানা ছিল ওই বাগান যেখানে আমার সব খোয়া গিয়েছে। আমার দিনের বেলা কাটত বন্দরে, রাত্তির কাটত বাগানে। ওই বাগানে যারা চুরি করে দিন গুজরান করত তাদের সঙ্গে আমার সখ্য হল। আর লোকেও আমাকে ওদেরই একজন হিসাবে চিনত। সে-যুগে কেউ বন্দরে দুই পাইসে একটা ভাকারি আর তরমুজ খেতে পারত। আর জাহাজে এক আনা-য় ভরপেট খেতে পারত। রাতের বেলা আমি নাচ-গানের জায়গায় ঘুরে বেড়াতাম, ভিড়ে যেতাম তাদের মধ্যে। এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতাম। তারপর কাকভোরে উঠে ডকে চলে যেতাম দিনমজুরির কাজ খুঁজতে। আমি সরকারি পায়খানা ব্যবহার করতাম। কাছাকাছি জলের কল খোলা পেলে স্নান করে নিতাম। ওই ট্যাপের জলেই জামাকাপড় কাচতাম আর যতক্ষণ না তা শুকাচ্ছে কৌপীন পরেই জনসমক্ষে কলের ধারে বসে থাকতাম। যেদিন কাজ জুটত, সেদিন সন্ধ্যের সময় মজুরিটা পেতাম হাতে। সেই টাকা থেকেই কাছাকাছি রেস্তোরাঁতে গিয়ে ডাল, রুটি, সবজি আর ভাত খেতাম, কখনও সখনও খেতাম খাসির মাংস। তবে খেয়াল রাখতে হত সকালের প্রাতঃরাশের জন্যে পয়সা যাতে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। কখনও কখনও টানা চারদিনও কাজ জুটত না। তখন আমার খাওয়া জুটত না একেবারেই। যেটুকু জুটত তা-ও ডকের বন্ধুদের দৌলতে। আমার বন্ধুরাও ছিল আমারই মতন। আমরা একে অপরের পাশে থাকতাম বন্ধুর মতো, পরিজনের মতো।
একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। আমি আর আমার এক বন্ধু দুই দিন ধরে অভুক্ত আছি। আমরা একটা ছক পাকাই। ঠিক করি একখানা রেস্তোরাঁয় যাব। পেটভরে খাব। একজন খাবার অর্ডার করবে। খাওয়া শেষ হয়ে গেলে যে অর্ডার করবে সে পান খাবার বাহানায় বাইরে বেরিয়ে ধাঁ হয়ে যাবে। আরেকজন তার ফিরে আসবার অপেক্ষায় আছে এমন ভান করে টেবিলে বসে থাকবে। কিছুক্ষণ পরে সে-ও বেরিয়ে যাবে। রেস্তোরাঁ মালিক যদি বাধা দেয় তখন ওকে বলা হবে: ‘আমি তো অর্ডার করিনি খাবার, যে করেছে তাকে গিয়ে ধরুন। আমরা ভেবেছিলাম রেস্তোরাঁ মালিক এ-চালাকিটা ধরতে পারবে না আর আমরা মুফতে কিছু খেতে পারব। একদিন পেটের জ্বালা আর সইতে না-পেরে এই নকশা অনুযায়ী চলে যাই একখানা রেস্তোরাঁয়। পেট ভরে খাই। খাওয়ার শেষে যে-বন্ধু অর্ডার দিয়েছিল সে সুযোগ বুঝে কেটে পড়ল। আর আমি পড়ে রইলাম একা। খানিক বাদে আমি যখন বেরতে যাচ্ছি তখন মালিক আমার কাছে পয়সা চাইল খাবারের। আমি বলি, ‘আমি অর্ডার করিনি খাবার’। উনি বললেন, ‘খাবার যেই অর্ডার করুক, তুই এখানে খেয়েছিস যখন পয়সা তোকে মেটাতেই হবে’। আমি বলি, ‘আমার কাছে কানাকড়িও নেই এখন। কাল মিটিয়ে দেব বাকি টাকা’। উনি ধমকিয়ে বলেন যে আমায় পুলিশে ধরিয়ে দেবেন। আমিও তেড়ে বলি, ‘যা ইচ্ছে করুন’। উনি তখন বলেন, ‘পুলিশ তো আর আমার পয়সা মেটাতে পারবে না। তুই জামাকাপড় খুলে রেখে যা আমার কাছে। কাল যখন পয়সা মেটাবি তখন ফেরত পাবি’। অনেক তক্কাতক্কির পরে রাত একটার সময় যখন আমি হোটেল ছেড়ে বেরাই তখন আমার পরনে শুধু একখানা ল্যাঙোট। সারারাত কাঁপতে কাঁপতে কাটিয়েছিলাম ঠাণ্ডায়। সকালে উঠে জাহাজের খোল থেকে মাল খালাস করবার কাজে লেগে পড়ি। টানা পাঁচদিন জাহাজে থেকে সেই অবস্থাতেই মাল খালাসের কাজ করলাম আর ষষ্ঠ দিনে হাতে মজুরি নিয়ে জাহাজ থেকে নামি। সেই রেস্তোরাঁয় গিয়ে আমি বাকি টাকা মিটিয়ে সেখানে বন্ধকি থাকা পোশাক ছাড়িয়ে নিই আর ওগুলো গায়ে চাপিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। বোম্বে শহরে একখানা ল্যাঙোট পরে আর জাহাজে ঘুমিয়ে আমি ছয়দিন কোনওরকমে কাটাই আমি। নিজের বেঅকুবির জন্যেই নিজের হতশ্রী দশা করে ফেলি আমি। এই ছিল আমার সারাজীবনের শ্রেষ্ঠ ভোগান্তি। এর থেকে বোঝা যায় চঞ্চল মানুষের কী বিপদ বাঁধতে পারে! এর পর থেকে রাতের নাচাগানা বন্ধ করে দিই আমি, ভাটিয়া বাগানে থাকার পাটও চুকিয়ে দিই।
আমার মনে পড়ে যায় বোম্বে ফেরা ইস্তক কীসের ঘোরে যেন আমি ভুল করে থিয়েটার দেখতে চলে যাই বাড়ির আত্মীয়স্বজনের কাছে না-গিয়ে আর সেই থেকে লেগে রয়েছে আমার দুর্ভোগ। আমি সঙ্কল্প নিই যে এর থেকে বেরিয়ে আসব। হাবিজাবি জিনিসের পিছনে আমি আর পয়সা খরচ করব না; যে-সব বন্ধুরা নিজেরা সর্বনাশের পথে তাদের সঙ্গে আর আমি পয়সা ওড়াব না। যত দ্রুত পারি পয়সা জমিয়ে আগে একখানা জ্যাকেট, টুপি আর চপ্পল কিনে আমি আমার পরিজনদের কাছে গিয়ে থাকা শুরু করব। আমার নতুন রুটিনে দিনের বেলা জাহাজে বা বন্দরে কাটাতাম কাজের মধ্যে আর রাতের বেলা কাছাকাছি ফুটপাতে ঘুমাতাম। যখন বেশ কিছুটা পয়সা জমালাম আমি একদিন জামাকাপড় কিনে সেলুনের গিয়ে চুলদাড়ি কাটালাম। তারপর হামামখানার সরকারি স্নানাগারে গিয়ে নিজেকে ভালোমতন ঘষেমেজে সাফসুতরা করে নিলাম নতুন জামা গায়ে চাপাবার আগে। তারপর পারেলের সিমেন্ট চালানিবাসী আমার আত্মীয়ের কাছে গেলাম প্রথম। এতদিন পরে আমায় দেখে উনি খুশিতে ডগমগ। রাতে খাবার খেয়ে ওখানেই ঘুম লাগালাম। সকালে উঠে কয়েক জনম পরে গরম জলে স্নান করতে পারলাম। তারপর সকালের নাস্তা সেরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম আম্বেদকর সাহেবের সঙ্গে দেখা করবার আশায়।১৪ তদ্দিনে অবশ্য তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। আমি ওঁর বড়োদাদা বলরামদাদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরামর্শ চাই যে আমার পড়াশোনার ব্যাপারে কীভাবে এগোনো উচিৎ হবে। এই প্রথম আমি ওঁর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলি। উনি পরম স্নেহভরে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেন আর কয়েকদিন বাদে আবার আসতে বলেন। এই দু-তিন দিন আমি ওই আত্মীয়ের বাড়িতেই ছিলাম। আমি বলরামদাদার সঙ্গে আরও একবার দেখা করি। উনি আমায় জানান যে এখনি ঝটপট কিছু ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। তবে কিছুদিন বাদে ব্যাপারটা নিয়ে তিনি মাথা ঘামাবেন। পরের দিন আমি বোম্বের সেই জায়গায় গেলাম যেখান থেকে আমি বোম্বে ছেড়ে পালাই। আমি ফিরে আসি ক্রফোর্ড বাজারের কাছে ফ্যামিলি লাইনসে। সেখান থেকে আমি দাশগাঁওতে থামে এমন একখানা জাহাজে আমি চেপে বসি।
মা ভাবল আমার পুনর্জন্ম হয়েছে যেন। একমাত্র বোন তখন সাত বছরের। আমার অনুপস্থিতিতে ওকে আমার এক সহপাঠীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মতো ওর বিয়েটাও ছিল পুতুলদের বিয়ে দেবার মতো। আমার বিয়েতে ও উপস্থিত ছিল, কিন্তু ওর বিয়েতে আমি থাকতে পারিনি। এটা আমার মায়ের কাছে অত্যন্ত বেদনার ছিল। এতদিন পরে যখন দুই ভাইবোনকে একসঙ্গে দেখল, মা আবেগে আত্মহারা হয়ে গেল। দু-চোখ উপচে বইছিল খুশির কান্না। বোন যেন মায়েরই প্রতিরূপ। মাকে কাঁদতে দেখে সেও কাঁদতে লাগে আর এসব দেখে আমিও চোখের জল সামলাতে পারলাম না। ওখানে উপস্থিত বাকি আত্মীয়রা মাকে সান্ত্বনা দেয়। আমার কুশল জানতে চায়। আমার প্রত্যাবর্তনের কাহিনি সেই সময়ে ঘরে ঘরে ঝড় তোলে। কারণ তার আগেকার কয়েক পুরুষ অবধি গ্রাম থেকে বহু লোক আমার মতো উবে গেলেও, একজনকেও পাওয়া যায় না যে ফিরে এসেছে। আমি সেখানে কীভাবে ফিরে এলাম বহাল তবিয়তে? এখান থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে আমার গ্রাম কিম্বা আশেপাশের গ্রাম থেকে প্রায়ই কেউ-না-কেউ পালিয়ে যায় গ্রাম ছেড়ে। এই পরিগমন কী অস্পৃশ্যতার জাঁতাকল থেকে নিষ্কৃতি পাবার রাস্তা ছিল তাদের কাছে?
যখন আমি দাশগাঁও ফিরি, দেখি আমার বাড়ি এখন পুরোদস্তুর স্কুল। একটা মাহার স্কুল আমাদের বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। আমার মা বড়োবাড়ির পাশে একটা ছোটো ঝুপড়িতে থাকছে। নিজের খাটুনির পয়সাতেই। আমার বাবার মাসতুতো ভাই ছিল ওই স্কুলের এক শিক্ষক। সে তো ঘরভাড়াটুকু মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করত না। যখন আমি ফিরি তখন দেখি এই শিক্ষক ধরমতার-মহাবালেশ্বর রোডের উপরে তালেগাঁও গ্রামের বনের কাঠ কাটার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। আমি চলে আসায় ওর একটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। স্কুল বিভাগের ডেপুটি ইন্সপেক্টরের সঙ্গে ও একবার কথা বলে নিয়ে আমাকে দাশগাঁওয়ের স্কুলে ওর অস্থায়ী বদলি শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করে দেয়। এর থেকে দুটো জিনিস হল। প্রথমত বনের ঠিকাদার হিসাবে ও নিজের কাজ বিনা বাধায় করবার সুযোগ পেল। দ্বিতীয়ত আমি নিজের বাড়িতেই স্কুলের শিক্ষক বনে গেলাম। আমার তো সবটা মিলে আনন্দে ভেসে গেল। একে তো আমি সুস্থ শরীরে এতদিন পরে বাড়ি ফিরে এসেছি। তারপর আবার স্কুল শিক্ষকতার চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছি নিজের ঘরেই। মা ভাবল বঞ্চনার দিন বুঝি শেষ। কিন্তু মায়ের ভাবনা ভুল ছিল। কারণ আমি এক মিথ্যা মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছিলাম বড়োবাড়ির মানুষদের ছলের শিকার হয়ে। এই মায়া কাটিয়ে বেরবার মতো কলিজার জোর আমার হয়ে উঠছিল না। ওরা যেমনভাবে আমায় চালাত, আমি যেন সেই ভাবেই চলতাম। আমার নিজের মায়ের চেয়েও ওদের শাসন বেশি মানতে হত আমায়। আমার মাইনেটুকু ওদের হাতেই দিয়ে দিতাম। তবে ঘরভাড়ার টাকাটা ওদের না-দিয়ে মাকে দিতে শুরু করি। ওরা এ নিয়ে নাক সিঁটকালো ঠিকই, কিন্তু ওতে আমি আমল দিলাম না। আমি ঘরভাড়া হিসাবে তিন টাকা করে প্রতি মাসে আর রোজ ঘর ঝাড়পোঁছের জন্যে মাসে দু-টাকা করে মাকে দিতে থাকি। এ-বাদেও আমি আমার মাইনে থেকে মায়ের জন্যে টুকটাক খরচা করতে থাকি যা পারি। সেকালে একটাকায় এক মণ চাল কেনা কোনও ব্যাপার ছিল না। বাকি জিনিসপত্রও ছিল সস্তা। মায়ের কিছুটা কষ্ট লাঘব হল এইসবে। এখন থেকে আমার শিক্ষকতার চাকরি থাকুক ছাই না-থাকুক, মাস গেলে পাঁচ টাকা করে মায়ের ভাঁড়ারে ঢুকত ঠিক। দাশগাঁও ফিরে মায়ের জন্যে অন্তত এইটুকু আমি করতে পারি।
টীকা
১৩ সত্যশোদক সমাজ (সত্যানুসন্ধানী সমাজ) স্থাপিত হয় ১৮৭৩ সালে জোতিরাও গোবিন্দরাও ফুলে (১৮২৭-১৮৯১) ও ওঁর অনুগামীদের দ্বারা। জাতপাত আর ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জোরদার বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এই সমাজ। এঁরা দলিত ও অব্রাহ্মণদের নিয়ে বৃহত্তর জোট গড়তে চাইছিলেন। খেতমজুর, চাষি, ভদ্রলোকেরা এই জোটে যাতে সামিল হন তা ছিল লক্ষ্য এঁদের। এই জোট ছিল ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়ে। এই সমাজ প্রতিদিনের কাজের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদী রীতিনীতি ও প্রশাসনে ওদের আধিপত্যের বিরুদ্ধ-সংস্কৃতি নির্মাণে সক্রিয় ছিল। ১৮৭৩ সালে লেখা ফুলের বিখ্যাত বই গুলামগিরি (‘দাসত্ব’)-তে উনি জাতিগত শোষণ ও অতলান্তিক দুনিয়ার ক্রীতদাস প্রথার মধ্যে তুলনা টানেন।
১৪ সত্যেন্দ্র মোরের জীবনী থেকে জানা যায় যে পারেলের পয়বাওয়াদিতে সিমেন্ট চালায় বি.আর. আম্বেদকর থাকতেন। দোতলায় উপরে উঠে ছিল ওঁর ঘর।
অনুবাদ ও টীকা- দেবরাজ দেবনাথ
প্রকাশের তারিখ: ৩১-মে-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
