|
নারীবাদ ও শ্রেণিচেতনা (৩)অর্চনা প্রসাদ |
ভারতে গোড়ার দিকে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে চলা আন্দোলন সংগ্রাম পিতৃতন্ত্রের দাঁতনখগুলি উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। থানে-র লগ্নগড়ি আন্দোলন হল এর অন্যতম উপযুক্ত উদাহরণ। বিদগ্ধজনেরা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, উচ্চবর্ণ বা জাতের দ্বারা ঘটা লগ্নগড়ি প্রথা ছিল শ্রেণি ভিত্তিক শোষণের মধ্যে কুৎসিততম ধরন; এই প্রথায় কৃষকেরা নিজের বিবাহের সময়ে দেনাগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের স্ত্রীরা দাসী হিসাবে গচ্ছিত থাকতেন। জমিদারের বাসস্থানে প্রবেশ করে এই মহিলাদের মুক্ত করা ছিল এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। গত শতকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ছিল এটি। এই আন্দোলন এমন এক অন্যায় সামাজিক প্রথাকে ধ্বংস করেছিল, যেখানে শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিটি ছিল পিতৃতন্ত্র (প্রসাদ, ২০১৭, পৃ. ২৭)। শ্রেণি সম্পর্কের মধ্যে পিতৃতন্ত্রের গেঁথে থাকার ব্যাখ্যা গোদাবরী পারুলেকর-ও দিয়েছিলেন; তিনি লেখেন,.... |
২০ মার্চ ২০২৩ তারিখে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দ্বিতীয় পর্বের পর… তৃতীয় পর্ব পূর্বের আলোচনার সূত্রে একটি যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন উঠে আসে: যে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লক্ষ্য সমাজ পরিবর্তন, এবং সম্পদের পুনর্বন্টন, তা কি মৌলিক চরিত্রে পুঁজিবাদ-বিরোধী? মারিয়া মাইস তাঁর সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করেছেন: শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনকে আমাদের আর পরিবার-কেন্দ্রিক সমস্যা হিসাবে দেখা উচিত নয়, বরং এটি গোটা সমাজের একটি গঠনগত সমস্যা। পুরুষ ও নারীর শ্রমের যে বিভাজন, ও তার চলন প্রচলিত উৎপাদন সম্পর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশকে গড়ে তোলে – একটি নির্দিষ্ট সময়কাল ও সমাজে শ্রেণি সম্পর্ক এবং বৃহত্তর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজনে শ্রেণি সম্পর্ক। এই বিশ্লেষণে পিতৃতন্ত্র হল এমন একটি সামাজিক বিষয় যা শ্রেণি শোষণের সম্পর্কের ভিতরেই নিহিত থাকে; এমন এক বাস্তব যার কথা এঙ্গেলস এবং মার্কস নিজেদের লেখায় যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এঙ্গেলস-এর ব্যাখ্যায়, পুঁজিবাদ পূর্ববর্তী সময়কালে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণের ধরন পিতৃতন্ত্রের চরিত্র গঠন করে। ভারতে গোড়ার দিকে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে চলা আন্দোলন সংগ্রাম পিতৃতন্ত্রের দাঁতনখগুলি উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। থানে-র লগ্নগড়ি আন্দোলন হল এর অন্যতম উপযুক্ত উদাহরণ। বিদগ্ধজনেরা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, উচ্চবর্ণ বা জাতের দ্বারা ঘটা লগ্নগড়ি প্রথা ছিল শ্রেণি ভিত্তিক শোষণের মধ্যে কুৎসিততম ধরন; এই প্রথায় কৃষকেরা নিজের বিবাহের সময়ে দেনাগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের স্ত্রীরা দাসী হিসাবে গচ্ছিত থাকতেন। জমিদারের বাসস্থানে প্রবেশ করে এই মহিলাদের মুক্ত করা ছিল এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য। গত শতকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ছিল এটি। এই আন্দোলন এমন এক অন্যায় সামাজিক প্রথাকে ধ্বংস করেছিল, যেখানে শ্রেণি সংগ্রামের ভিত্তিটি ছিল পিতৃতন্ত্র (প্রসাদ, ২০১৭, পৃ. ২৭)। শ্রেণি সম্পর্কের মধ্যে পিতৃতন্ত্রের গেঁথে থাকার ব্যাখ্যা গোদাবরী পারুলেকর-ও দিয়েছিলেন; তিনি লেখেন, জমির মালিকেরা তাদের ভাড়াটিয়াদের ও তাদের কাছে দেনাগ্রস্ত দাসদের স্ত্রীদের নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করত। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে এই নারীদের যখন ইচ্ছা তখন ভোগ করার বংশগত অধিকার আছে তাদের। তাদের জন্য কাজ করা মহিলাদের প্রতি অশালীন মন্তব্য করা, স্পর্শ করা, চিমটি কাটা, ধাক্কা দেওয়া, এবং কোনো একপাশে নিয়ে গিয়ে তাদের যৌন নিপীড়ন করাও ছিল খুব সাধারণ ঘটনা। জমির মালিক, ও জঙ্গলের ঠিকাদারেরা সর্বক্ষণই নিজেদের যৌনকামনা নিবৃত্ত করতে এই নারীদের ব্যবহার করত। ফলত, জমির মালিক ও আদিবাসী নারীদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাওয়া এতটাই ব্যাপক হারে ঘটত যে এদের সন্তানদের একটি বিশেষ নামকরণ হয়েছিল। ওয়াটলা, একটি বিশেষ জাত। কেবল অ-হিন্দু জমির মালিক নয়, হিন্দু জমির মালিকও এই ওয়াটলা জাতটিতে তাদের অবদান রেখেছিল। (পারুলেকর ১৯৭৫; পৃ. ৪৭)। এই ব্যাখ্যার সবচেয়ে আশ্চর্য দিকটি হল, শ্রেণি শোষণ কেমন করে নতুন একটি জাত তৈরি করছে, তা এই ব্যাখ্যা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ, জাতের প্রশ্নে পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোটির রূপান্তর আসলে শ্রেণি শোষণের ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। এমন অনেক দৃষ্টান্তও রয়েছে যেখানে পিতৃতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শ্রেণি দমনের আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বস্তুত প্রলেতারিয়েত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, ঘরে ও বাইরে, নারী সবচেয়ে শোষিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে মার্কসীয় লেখাপত্রে নারী প্রসঙ্গটি ‘শ্রম’ প্রসঙ্গের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকেছে (কোলনতাই [১৯৪৬]; ফেডেরিচি ২০০৪) বুর্জোয়া রাষ্ট্র যখন নৃশংসভাবে কোনো প্রতিরোধকে দমন করার চেষ্টা করেছে তখন শ্রেণি ও পিতৃতন্ত্রের সম্পর্ককে কার্যকর হতে দেখা যায়। ধর্ষন এবং নারীর বিরুদ্ধে হিংসাকে প্রতিরোধ দমনের কৌশল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে; নারী আন্দোলনকারীরা বিদ্রোহ করেছেন, এবং শ্রেণি রাষ্ট্রের দমনপীড়নকে সাহসের সঙ্গে প্রতিহত করেছেন। সুন্দরাইয়ার দেওয়া এমনই এক উদাহরণ হল: গর্লা গ্রামে এক ১৫ বছর বয়সীকে মেয়েকে আটক করে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে লোকটি পালাচ্ছে সে কে? (লোকটি একজন গুরুত্বপূর্ণ কমরেড ছিলেন, এবং মেয়েটির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন)। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় যে, তিনি তার স্বামী। পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ তার কথা বিশ্বাস করেনি। তাকে মারধোর করে, ধর্ষন করে। তবু সেই মেয়েটি একটিও গোপন তথ্য ফাঁস করে না, এবং নিজের বলা কথায় অটল থাকে (সুন্দরাইয়া ১৯৭২, পৃ. ২৫৫)। এরকমই আরেকটি নিদর্শন আছে, ইলা মিত্রের স্মৃতিচারণে, ওঁর কারাবাসের দিনগুলির কথা— সেখানে বারবার তাঁকে মনে নিয়মিত করানো হত যে তিনি একজন সাঁওতাল, এবং একজন মহিলা (পাঞ্জাবি ২০১৭, পৃ. ২০০-০১)। অজস্র ঘটনা রয়েছে গত শতকের চারের দশকের মাঝামাঝিতে ওয়ারলি আন্দোলনের সময়ে, যখন মহিলারা আত্মরক্ষা বাহিনী গঠন করে পুলিশের হাত থেকে পুরুষ কর্মীদের রক্ষা করছে। পুরুষ কর্মীরা দিনের বেলায় গ্রেপ্তারি এড়াতে, পুলিশের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতেন, এবং সে সময়ে মহিলা কর্মীরা পুলিশের সঙ্গে যুঝতেন, অত্যাচারের সম্মুখীন হতেন। পুলিশের গতিবিধি গোপনে পুরুষ কর্মীদের জানাতেন, একইসঙ্গে পুলিশকে বিভ্রান্ত করতেন। সবচেয়ে বড়ো কথা তাঁরা পুলিশ এবং জমির মালিক, উভয়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধেই লড়তেন (প্রসাদ ২০১৭, পৃ. ৩৭)। শ্রেণি শোষণের লিঙ্গায়ন পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে প্রায়ই পুনর্গঠন করত, এবং প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রেণি শোষণের চরিত্রকে প্রভাবিত করত। নারীবাদের সমালোচক, যাঁরা কমিউনিস্টদের মুক্তির দর্শনকে পিতৃতান্ত্রিক হিসাবে চিহ্নিত করেন, তাঁরা ইতিহাসের উপরোক্ত ভাষ্যের (পাঞ্জাবি ২০১৭, পৃ. ২০০-০১) মর্মার্থকে উপেক্ষা করেন। ‘ব্যক্তিগত’, ‘রাজনৈতিক’ হতে থাকার কারণে, এবং কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে চলা সংগ্রামের ফলে ‘প্রকাশ্য’ ও ‘ব্যক্তিগত’-র মাঝের ছেদরেখা অস্পষ্ট হতে থাকার কারণেই যে নারী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে তা প্রমাণিত। এর ফলে, বৃহত্তর ক্ষেত্রে সংগ্রাম বহাল রেখেও নারীরা নিজেদের ক্ষেত্র বিস্তার করতে, এবং সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। কমিউনিস্ট নারীদের আত্মজীবনী সেই সব শেকলের কথা জানায় যা তাঁদের পরানো হয়েছিল তখন, যখন তাঁরা কমিউনিস্ট হয়ে উঠছিলেন, প্রথাগত পরিবার ভেঙে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছিলেন। এসব ক্ষেত্রে কমিউন, ও আন্দোলনই তাঁদের পরিবার হয়ে উঠেছিল, এবং তাঁদের “স্বাধীন” পরিচিতি, ও জায়গা রাখার অবকাশ দেয় (মারিক ২০১৩)। গত শতাব্দীর চারের দশক থেকে অল ইন্ডিয়া উইমেন’স কনফারেন্স-এ, ও ১৯৫৩ সালে ন্যাশানাল ফেডারেশান অফ ইন্ডিয়ান উইমেন গঠনের সময়ে কমিউনিস্ট নারীদের সক্রিয় যোগদান নারী আন্দোলনে কমিউনিস্টদের বাড়তে থাকা প্রভাবকে নির্দেশ করে। এই ঘটনাক্রম মহিলাদের বাড়তে থাকা দাবিকে (বিশেষত, সমান মজুরি, শিশুর লালনপালন, মাতৃত্বকালীন সুযোগসুবিধা) শ্রেণি সংগ্রামের বৃহত্তর কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নে পার্টি নেতৃত্বের উপরও চাপ সৃষ্টি করতে থাকে (আর্মস্ট্রং ২০১৩, পৃ ৩০-৩৪)। মহিলাদের পৃথক ফ্রন্ট এই কাজগুলি করতে থাকে। যদিও এর থেকে কখনোই এ কথা প্রমাণ হয় না যে, কমিউনিস্ট সংগঠনে এ নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কমিউনিস্ট তাত্ত্বিকদের সমসাময়িক মার্ক্সীয় তত্ত্বের উপাদানগুলির সাহায্যে উল্লম্ব অনুক্রম (যেমন শ্রেণি), এবং অনুভূমিক বিন্যাসে থাকা উপাদানগুলির (যেমন পিতৃতন্ত্র, জাত) দ্বান্দ্বিক আন্তঃক্রিয়াকে দেখতে হবে। এখানেই, শ্রেণির গঠনকে লিঙ্গায়িত করতে থাকা সার্বিক বৈষম্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য সামাজিক পুনরুৎপাদনের ধারণাকে ফের আবিষ্কার করার দরকার পড়ে। কিন্তু এই জনপ্রিয় সমসাময়িক ইন্টারসেকশানালিটি-র তত্ত্ব এই সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ এটি পিতৃতন্ত্রকে সামাজিক উৎপাদনের পরিধির বাইরের বিষয় হিসাবে দেখে [ইন্টারসেকশানালিটি তত্ত্বের জন্য জন ২০১৪]। অপরদিকে মার্কসবাদী তত্ত্বের সমসাময়িক বিকাশ এই সম্পর্ককে আরো জটিল পদ্ধতিতে নানা পথ আবিষ্কার করার উপকরণ দেয়। কারণ মার্কসবাদী তত্ত্বের এই বিকাশ পিতৃতন্ত্রকে ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর মাঝের ছেদরেখার উপর রাখে (ভোগেল ২০১৩; ভট্টাচার্য ২০১৭)। শ্রেণির গঠন ও পুনরুৎপাদন পিতৃতন্ত্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা প্রভাবিত হয় যে যে পথে, সেই পথগুলিতে আরো স্পষ্টতা আনতে পারে এই রেখাগুলির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের বিকাশ। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রামকে আরো দৃঢ় করতে ‘স্বতন্ত্র’ ও ‘সমাজতান্ত্রিক/মার্কসবাদী’ নারীবাদীদের মধ্যেকার পার্থক্যকে মিটিয়ে দিতে পারার সামর্থ্য রাখে এই জাতীয় বিশ্লেষণ, চর্চা। তথ্যসূত্র- প্রথম প্রকাশ: Marxist, XXXVI, 1, January-March 2020
প্রকাশের তারিখ: ২৭-মার্চ-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |