সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নারীবাদ ও শ্রেণিচেতনা (২)
অর্চনা প্রসাদ
পার্টি এক নতুন ধরনের পরিবার গড়ে তোলার জন্য কমিউনগুলি তৈরি করেছিল। যে পরিবারের লক্ষ্য হবে নারী কর্মীদের একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়া, এবং এমন এক মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা তাদের স্বাধীনতা চর্চা করতে পারবেন। কর্মীদের মধ্যে সাধারণ রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এক বন্ধন। যদিও এ কথাও সত্যি যে কমিউনের ভিতরও কমিউনিস্ট নারীদের লিঙ্গের ভিত্তিতে শ্রমের প্রচলিত বন্টনের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে। বৃহত্তর আন্দোলন, এবং মতাদর্শ নারীদের নিজেদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর একটি মঞ্চ দিয়েছিল (লুম্বা ২০১৯)। এর সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত দর্শন জড়িয়ে ছিল, যা কমিউনের “নতুন নীতিবোধ”-কে বুর্জোয়া নীতিবোধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল।

৬ মার্চ ২০২৩ তারিখে মার্কসবাদী পথ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রথম পর্বের পর…
দ্বিতীয় পর্ব
২
কমিউনিস্ট আন্দোলনের গোড়ার ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে, অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পিতৃতন্ত্র-বিরোধী সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এই কাজে একদিকে যেমন ইন্টারন্যাশানাল সোশালিস্ট উইমেন’স কনফারেন্স-এর সংহতির প্রভাব ছিল, তেমনই অন্যদিকে ছিল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশানাল-এর মহিলা নেতাদের জোরালো স্বরেরও প্রভাব। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই মহিলা নেতা, ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীরা নারী শ্রমিকের উপর পুঁজিবাদের প্রভাবের বিশ্লেষণ করাকালীন শ্রেণিচেতনার বিকাশের গুরুত্বকে মাথায় রাখার কথা বলেছেন। প্রথম ইন্টারন্যাশানাল সোশালিস্ট উইমেন’স কনফারেন্স (১৯০৭)-এ আলেকজান্দ্রা কোলনতাই-এর কথায়—
“গোটা বুর্জোয়া পৃথিবী শুনেছিল… তবে ক্ষুব্ধ হয়েছিল বেশিরভাগ সময়েই মহিলা প্রলেতারিয়েতদের দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে। যত পুরুষদের কথা ক্রান্তিকারীই হোক, যত ‘উন্মত্ত’ সিদ্ধান্তই তারা নিয়ে থাকুক না কেন, বুর্জোয়ারা বরাবর এই বলে নিজেদের সান্ত্বনা দিয়েছে যে, তাদের কাছে ইচ্ছামতো ব্যবহার করার মতো পরীক্ষিত কোন না কোনো পদ্ধতি আছে: নারী শ্রমিক দিয়ে ক্ষিপ্ত পুরুষদের প্রতিস্থাপন করে প্রতিরোধকে ভাঙতে হবে । আর এখন নতুন এক বিস্ময়: গোটা পৃথিবী থেকে শ্রমিক শ্রেণির নারী প্রতিনিধিরা জড়ো হচ্ছেন তাঁদের সংঘবদ্ধ প্রয়াস দিয়ে নতুন হাতিয়ার গড়তে, যা দিয়ে তাঁরা, প্রলেতারিয়েতের প্রতি আক্রমণাত্মক এই পৃথিবীর সঙ্গে লড়বেন। এই নারীদের স্পর্ধা সব সম্ভাব্য সীমাকে ছাপিয়ে গেছে; বিগত দিনের নীরব দাসেরা, শ্রমজীবী শ্রেণির মুক্তির লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে আজকের সাহসী সংগ্রামীতে।” (কোলনতাই, ১৯০৭)।
উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যেকার ঐক্যকে শ্রমজীবী শ্রেণির লড়াই আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিষয় হিসাবে দেখা হচ্ছে। আরো উপলব্ধি করা হয় যে, কমিউনিস্ট পার্টি যদি গৃহস্থালীর মধ্যে নারীর দাসত্বের বিরুদ্ধে নিজেই মতাদর্শগত অবস্থান গ্রহণ করে, তাহলেই কেবলমাত্র এই ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ‘কমিউনিস্ট নারীরা’ স্পষ্টত নিজেদের অন্যান্য নারীবাদী গোষ্ঠীর থেকে আলাদা করেছিল। যে গোষ্ঠীগুলি নির্দিষ্টভাবে কেবল নারীদের রাজনৈতিক, এবং আর্থিক অধিকার নিয়ে লড়ছে। ক্লারা জেটকিন ১৯২২ সালে লেখেন, কমিউনিস্টদের নারীদের মধ্যে দুটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা উচিত– প্রথম, নারীদের মতাদর্শগত, এবং সাংগঠনিকভাবে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক অনুসারে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, এবং দ্বিতীয়, সাধারণ নারীদের প্রলেতারিয়েতের সকল সংগ্রামে যোগদান করাতে হবে। তিনি আরো বলেন—
একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে— কমিউনিস্ট কাজকে নারীদের মধ্যে যত দৃঢ়ভাবেই মতাদর্শগতভাবে এবং জৈবিকভাবে যুক্ত করার দরকার হোক, আমাদের এই কাজগুলি সম্পন্ন করতে বিশেষ সংগঠন প্রয়োজন হবে। অবশ্যই নারীদের মধ্যে কমিউনিস্ট কাজ কেবল নারীদের কাজ হবে না, বরং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রতিটি দেশের সমগ্রের কাজ হবে। কিন্তু যদি আমরা এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই, তাহলে নারীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ, সুষ্ঠুভাবে পদ্ধতি মেনে, ও লক্ষ্যে স্থির থেকে এই কাজ করার জন্য, ও বহাল রাখার জন্য পার্টি কমিটিগুলিকে সর্বত্র উপস্থিত থাকতে হবে। (জেটকিন ১৯২২)
এভাবেই জেটকিন অন্যান্য নারীবাদীদের থেকে ভিন্ন, ওঁকে পুঁজিবাদ-বিরোধী, সমতার সমাজের বৃহত্তর সংগ্রামে নেতা, ও আন্দোলনকারী হিসাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, সর্বক্ষেত্রের শ্রমজীবী মানুষের সর্ব বৃহৎ ঐক্য গড়তে সর্বস্তরের কমিউনিস্ট নেতা, কর্মীদের পিতৃতন্ত্র-বিরোধী মতাদর্শের সঙ্গেও যুক্ত হতে হবে। সেজন্য, প্রতিটি ক্ষেত্রের নারীদের কাছে আবেদন করতে হবে, ভেঙে ফেলতে হবে প্রতিটি বাধা।
উপরে যে প্রেক্ষিতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেহেতু তার বিকাশ ঘটেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার সময় থেকে, সেহেতু এতে তেমন বিস্মিত হওয়ার নেই যে, এ-জাতীয় চিন্তা গোড়ার দিকের কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক অনুশীলনকে সমৃদ্ধ করে। যদিও এর কোনো লিখিত দলিল নেই। জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ছাতার তলায় কাজ করাকালীন কমিউনিস্টরা শ্রমিকদের সংগঠিত করার উচ্চাশার কথা উচ্চারণ করেন, এবং তেমন উদ্যোগও করেন। প্রথমদিকের ধর্মঘটগুলিতে ভারতের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নারী শ্রমিকদের সক্রিয় যোগদানও বিভিন্ন শ্রেণি সংগঠন ও গণসংগঠনে মহিলাদের কমিটি গড়ে ওঠার কারণে ছিল। চারের দশকের গোড়ার দিকে শ্রমজীবী মানুষের পরিবারগুলির সঙ্গে সংযোগস্থাপনে সুবিধা হয়। এইগুলির মধ্যে ছিল- মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি (বাংলা), সেলফ ডিফেন্স লীগ (পাঞ্জাব), মহিলা সঙ্ঘমস (অন্ধ্রপ্রদেশ, ও মহারাষ্ট্র), অল কেরালা উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশান, এবং এরকম অন্যান্য ছোটো ছোটো সংগঠন; এরা কাজ করত ছাত্রীদের নিয়ে। প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে, বসতি অঞ্চলে, এমনকী যে যে অঞ্চলে মহিলারা প্রথাগত জাতীয়তাবাদের দ্বারা প্রভাবিত, সেইসব অঞ্চলেও কমিউনিস্টদের প্রভাব বিস্তারের ভিত ও সহায়ক শক্তি ছিল এই সংগঠনগুলি। কমিউনিস্ট নারীরা মহিলাদের মধ্যে কাজ তো করছিলই, অন্যান্য শ্রমজীবীদের সঙ্গেও কাজ করছিল। বাংলার মহিলা আত্মরক্ষা বাহিনীর সদস্য, বাণী দাশগুপ্তের একটি সাক্ষাৎকারের বলেন:
[সেইসব দিনগুলিতে আমাদের ঘর থেকে ডেকে বাইরে আনার সাহস ছিল কমিউনিস্ট পার্টির, বলার সাহস ছিল— যারা কাজ করতে পারেন না, ঘরে থাকেন, তাঁরা বেরিয়ে আসুন। একটি নির্ভরযোগ্য স্থান খুঁজে বার করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা মহিলাদের সক্ষম করতে কমিটি সদস্যপদ সাত গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে এগুলি আঞ্চলিক মহিলা আত্মরক্ষা বাহিনী সম্পর্কিত, যে সমিতি আরো বেশি বেশি করে মহিলাদের যোগদানের জন্য একটি প্রস্তুতি কমিটির মতো করে কাজ করে। কমিউনগুলি আমাদের বাঁচিয়েছিল। আমি একথা কোনোদিন ভুলব না যে, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ভিত গড়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। (মারিক ২০১৩, পৃ: ১১১)]
পার্টি এক নতুন ধরনের পরিবার গড়ে তোলার জন্য কমিউনগুলি তৈরি করেছিল। যে পরিবারের লক্ষ্য হবে নারী কর্মীদের একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়া, এবং এমন এক মুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা তাদের স্বাধীনতা চর্চা করতে পারবেন। কর্মীদের মধ্যে সাধারণ রাজনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল এক বন্ধন। যদিও এ কথাও সত্যি যে কমিউনের ভিতরও কমিউনিস্ট নারীদের লিঙ্গের ভিত্তিতে শ্রমের প্রচলিত বন্টনের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে। বৃহত্তর আন্দোলন, এবং মতাদর্শ নারীদের নিজেদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর একটি মঞ্চ দিয়েছিল (লুম্বা ২০১৯)। এর সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত দর্শন জড়িয়ে ছিল, যা কমিউনের “নতুন নীতিবোধ”-কে বুর্জোয়া নীতিবোধের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল। সুন্দরাইয়ার ব্যাখ্যায়— পার্টি কমিটিগুলি ‘নারী ও পুরুষের সমানতা, তাঁদের নিজেদের সঙ্গী নির্বাচন করার অধিকার, বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার, পুনরায় বিবাহের অধিকারের নীতির দ্বারা চালিত হত… মানুষের আন্দোলনের বিকাশে, এবং সামাজিক সম্পর্কের বিকাশে এই নীতির অবদান ছিল’ (সুন্দরাইয়া ১৯৭২, পৃ। ২৬৩)। কমিউন জীবনে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু থাকবে না, এবং সন্তানপালনের, অভিভাকত্বের দায়িত্ব সকলের একটি সাধারণ দায়িত্ব হবে— এই নীতি ছিল কমিউনের “নতুন নীতিবোধ” দ্বারা চালিত। শিশুর প্রতি যৌথ দায়িত্বের এই নীতির দ্বারা এভাবেই মাতৃত্বের ধারণা এক তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল। এই বিষয়টি আলেকজান্দ্রা কোলনতাই রাশিয়ার প্রেক্ষিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন:
যে নারী শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন, তাঁকে বুঝতে হবে, মালিকানার পুরানো মেজাজ আর নেই, যা বলত “এরা আমার সন্তান, আমার মাতৃত্বের সবরকম যত্ন, স্নেহ দিয়ে এদের প্রাপ্য। ওরা তোমার সন্তান, আমার দায়িত্ব নয়, এবং ওরা অভুক্ত থাকলে, শীতে কষ্ট পেলে আমার কিছু আসে যায় না – অন্যের সন্তানের জন্য আমার কোনো সময় নেই।“ শ্রমিক মায়ের নিজের ও অপরের মধ্যে তফাত করা শিখলে চলবে না। তাঁকে মনে রাখতে হবে, এখানে যে শিশুরা আছে তারা আমাদের শিশু, রাশিয়ার শ্রমিকদের শিশু (কোলনতাই, ১৯৭৭)।
বহু মানুষ এ কথা লিখেছেন যে, উপরে লেখা এই বোঝাপড়া কমিউনে প্রতিফলিত হয়েছিল, এবং কমিউনিস্ট নারীদের শ্রেণি সংগ্রামে যোগদানের প্রশ্নে সাহায্য করেছিল। এ প্রসঙ্গে একটি চর্চিত উদাহরণ হল, ঊষাতাই ডাঙ্গে (কমিউনিস্ট পার্টির অতি পরিচিত একজন ট্রেড ইউনিয়নিস্ট) ১৯২৯ সালের মে মাসে তাঁর কন্যা রোজা-র জন্ম দেন, এবং সে সময়ে চলতে থাকা বম্বে মিল (১৯২৯) ধর্মঘটের প্রয়োজনে মাতৃত্বকালীন বিরতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন। তিনি জানান, সে সময়ে তাঁর কন্যাকে দেখাশোনা করেছিলেন অন্যান্য ধর্মঘটী মায়েরা, এবং সেজন্যই তাঁর কন্যার প্রাপ্তি হয়েছিল বহু মা, এবং এক বৃহত্তর পরিবারের (লুম্বা ২০১৯, পৃ। ১৬৬)। এই উদাহরণগুলি দেখিয়েছে যে, কমিউনিস্ট অনুশীলনের ইপ্সিত ফলাফলের জন্যই ঐতিহ্যবাহী পরিবারের বেড়ি ভাঙা হয়, এবং এই লক্ষ্য পূরণ না-করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বুনিয়াদ গড়া যাবে না। এই কৌশলের আংশিক সাফল্যের প্রমাণ রয়েছে সেই বাস্তবতায় যা দেখিয়েছে যে, ঐতিহ্যবাহী পরিবারের কাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, বহু কমিউনিস্ট মহিলার আন্দোলনের বুনিয়াদে পরিণত হয়েছে।
দেখা গেছে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শ্রেণি সংগ্রামে উদীয়মান মহিলাদের নেতৃত্বের মধ্যে মহিলাদের নিজেদের জীবনের বাধাগুলিকে অতিক্রম করার ক্ষমতাই শ্রেণি সংগঠন গড়ে তোলে। যেমন, ১৯২৯ সামে বম্বে মিল ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেওয়া ঊষাতাই ডাঙ্গে, এবং ত্রিভাঙ্কুর লেবার অ্যাসোসিয়েশান-এর সাধারণ ধর্মঘটের নেতা সি. ও. পোন্নাম্মা, আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় যোগাদানের কারণে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধাকে অন্যতম প্রধান দাবি হিসাবে রেখেছিলেন (বেলায়ুধন ১৯৮৩)। মহিলাদের নেতৃত্বদানের ক্ষমতার পূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল কিংবদন্তী নেতা অহল্যা রঙ্গনেকারের মতো উজ্জ্বল নিদর্শনে। তিনি ছিলেন মুম্বইয়ের মহিলা শ্রমিক সংঘের প্রথম সারির সংগঠক। চারের দশকে ওয়ারলি আদিবাসিদের বীর সংগ্রামে গোদাবরী পারুলেকরের নেতৃত্ব ছিল এরকমই আরেকটি নিদর্শন। গোদাবরী পারুলেকর সারা ভারত কিষাণ সভার সভাপতি হয়েছিলেন। একই রকম উদাহরণ ছিল— চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মতো জঙ্গী সংগ্রামে কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতাদের নেতৃত্ব, বা তেভাগা আন্দোলনের সময়ে নাচোলে (পূর্ববঙ্গ) সাঁওতালদের বিদ্রোহে ইলা মিত্রের নেতৃত্ব (পাঞ্জাবি ২০১৭)। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে কৃষক-শ্রমিক নারীরা যে পথে প্রভাবিত করেছিল, এই নিদর্শনগুলি সেই পথকেই তুলে ধরেছে।
এক্ষেত্রে লক্ষনীয় হল, পিতৃতন্ত্র বিরোধী সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নটি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়নি। যেমন, অন্ধ্র মহাসভা-র (তেলেঙ্গানা সংগ্রামের অগ্রদূত) যুববয়সী মেয়েরা নারীশিক্ষা, ও বাল্যবিবাহ রোধের জন্য প্রচার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করে (সুন্দরাইয়া ১৯৭২)। একই ধারা লক্ষ করা যায় আলেপ্পিতেও- এখানে ছেলে-মেয়ে যৌথভাবে জাতপাতের বাধা ভাঙার প্রচারে, ও পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ-বিরোধী প্রচারে যোগদান করে (বেলায়ুধন ১৯৮৩)। পিতৃতন্ত্র-বিরোধী সামাজিক সংস্কার ছাড়াও মহিলারা নিজেদের জমিদারের রক্ষিতাদের মুক্ত করার কাজে সংগঠিত করেন। বিরোধিতা করেন ধর্ষন, অপহরণের মতো যৌন-হিংসার। যেখানে যেখানে সহযোদ্ধাদের, নারীদের সুরক্ষা দিতে নারীরা বাহিনী গঠন করেছে, তার প্রায় সবকটি জঙ্গী সংগ্রামের সাক্ষী থেকেছে, তাদের নথিভুক্ত করেছে এই নিদর্শনগুলি। কিছু ক্ষেত্রে নারীরা নিজেরা জমিদারের জমি, জঙ্গল দখল করার মতো আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেমনটা দেখা গিয়েছে, ওয়ারলি সংগ্রামে (বেলায়ুধন ১৯৮৩, সুন্দরাইয়া ১৯৭২, প্রসাদ ২০১৭)। এভাবে নারী কমরেডরা বিবিধ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত থেকেছেন, যা কমিউনিস্ট আন্দোলনে পিতৃতন্ত্র-বিরোধী দিকটিকে তাঁদের নিজেদের দ্বারা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রটির বিস্তার ঘটায়।
তথ্যসূত্র-
আর্মস্ট্রং, ই. ২০১৩, জেন্ডার অ্যান্ড নিওলিবারালিজম: দি অল ইন্ডিয়া ডেমক্রেটিক উইমেন'স অ্যাসোসিয়েশান অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন পলিটিক্স. দিল্লি: তুলিকা বুকস্।
ভট্টাচার্য, টি. ২০১৭. সোশাল রিপ্রোডাকশান থিওরি: রিম্যাপিং ক্লাস, রিসেন্ট্রিং ওপপ্রেশন, প্লুটো প্রেস।
দেবিকা, জে. ২০১৬. "দ্য কুদুম্বশ্রী ওম্যান" অ্যান্ড দ্য কেরালা মডেল ওম্যান: ওম্যান অ্যান্ড পলিটিক্স ইন কনটেম্পোরারি কেরালা। ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ জেন্ডার স্টাডিস, ভলিউম ২৩, নং ৩, পৃ. ৩৯৩-৪১৪।
২০১৮, 'রিফর্মার ম্যান, ফিমেনিস্ট ম্যান: দি এন্ড অফ অ্যান এরা ইন কেরালা'. ইন মেন অ্যান্ড ফেমিনিজম ইন ইন্ডিয়া, সম্পাদনা— আর. চৌধুরী ও জেড. এ. বসেত। লন্ডন: রাউলেজ।ফেডেরিচি, এস. ২০০৪। ক্যালিব্যান অ্যান্ড দ্য উইচ: উইমেন, দি বডি অ্যান্ড প্রিমিটিভ অ্যাক্যুমুলেশান. অটোনোমিডিয়া।
জন, ম্যারি ই. ২০১৩। 'দি প্রবলেম অফ উইমেন'স লেবার: সাম অটোবায়োগ্রাফিকাল পার্সপেকটিভস'। ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ জেন্ডার স্টাডিস, ভলিউম ২০, নং ২, পৃ. ১৭৭-২১২।
২০১৪, 'ফেমিনিস্ট ভোক্যাবুলারিজ ইন টাইম অ্যান্ড স্পেস: পার্সপেকটিভস ফ্রম ইন্ডিয়া'। ইকোনমিক অ্যান্ড পোলিটিকাল উইকলি, ভলিউম ৪৯, নং ২ (মে ৩১), পৃ. ১২১-১৩০।
২০১৭, 'দি ওম্যান কোয়েশ্চেন: রিফ্লেকশানস অন মার্কসিজম অ্যান্ড ফেমিনিজম'। ইকোনমিক অ্যান্ড পোলিটিকাল উইকলি, ভলিউম ৫২, নং ৫০ (ডিসেম্বর ১৬)।
কোলনতাই, এ. (১৯২০) ১৯৭৭। কমিউনিজম অ্যান্ড দি ফ্যামিলি। সিলেক্টেড ওয়ার্কস অফ অ্যালেকজান্দ্রা কোলনতাই থেকে পুনর্মুদ্রিত প্যামফ্লেট - ভাষান্তর অ্যালান হল্ট. লন্ডন: অ্যালান ও বাসবি।
১৯০৭, স্পীচ টু দি সেকেন্ড কমিউনিস্ট ওম্যান'স ইন্টারন্যাশনাল, হেল্ড অ্যাজ পার্ট অফ সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল, স্টুটগার্ট, জার্মানি। মার্কসিস্টস.ওআরজি থেকে গৃহীত।
(১৯৪৬) ২০১৭। দি সোভিয়েত ওম্যান অ্যান্ড আদার এসেস। পার্বতী মেনন-এর ভূমিকাসহ। দিল্লি লেফ্টওয়ার্ড।
ক্রেডার, এল. ১৯৭৪। দি এথনোলজিকাল নোটবুকস্ অফ কার্ল মার্কস; নেদারল্যান্ডস: ভ্যান গোরকাম।
লুম্বা, এ. ২০১৯। রিভলিউশানারি ডিসায়াস্: উইমেন, কমিউনিজম অ্যান্ড ফেমিনিজম ইন ইন্ডিয়া। লন্ডন: রাউলেজ।
মারিক, এস. ২০১৩। 'ব্রেকিং থ্রু আ ডাবল্ ইনভিজিবিলিটি'। ক্রিটিকাল এশিয়ান স্টাডিজ, ভলিউম ৪৫, নং ১, পৃ. ৭৯-১১৮।
মার্কস, কে. ১৮৪৫। জার্মান ইডিওলজি।
মেনন, এন. ২০১২। সিইং লাইক আ ফেমিনিস্ট। দিল্লি: জুবান।
মাইস, এম. ১৯৮৬। পেট্রিয়ার্কি অ্যান্ড দি অ্যাক্যুমুলেশান অফ ক্যাপিটাল অন আ ওয়ার্ল্ড স্কেল। লন্ডন: জেড বুকস্।
পাঞ্জাবি, কে. ২০১৭। আনক্লেইমড হারভেস্ট: ওরাল হিস্ট্রি অফ তেভাগা উইমেন'স মুভমেন্ট। দিল্লি: জুবান।
পারুলেকর, জি. ১৯৭৫। আদিবাসিস রিভোল্ট: দি স্টোরি অফ ওয়ারলি পেসেন্ট ইন স্ট্রাগল। ন্যাশানাল বুক এজেন্সি।
প্রসাদ, এ. ২০১৬। 'আদিবাসি উইমেন, অ্যাগ্রেরিয়ান চেঞ্জ অ্যান্ড ফর্মস অফ লেবার ইন নিওলিবারাল ইন্ডিয়া'। অ্যাগ্রেরিয়ান সাউথ: জার্নাল অফ পোলিটিকাল ইকোনমি, ভলিউম ৫, নং ১, পৃ. ২০-৪৯।
২০১৭, দি রেড ফ্ল্যাগ অফ দি ওয়ারলিস: হিস্ট্রি অফ অ্যান অনগোইং স্ট্রাগল। দিল্লি: লেফ্টওয়ার্ড বুকস্।
সুন্দারাইয়া, পি. ১৯৭২। তেলেঙ্গানা পিপল'স্ আর্মড স্ট্রাগল। দিল্লি: পিপল'স পাবলিশিং হাউজ।
ভেলায়ুধান, এম. ১৯৮৩। 'উইমেন ওয়ার্কারস অ্যান্ড ক্লাস স্ট্রাগলস ইন আলেপ্পি, ১৯৩৮ - ১৯৫০'। সোশাল সায়েন্টিস্ট, ভলিউম ১১, নং ১২ (ডিসেম্বর), পৃ. ৪৭-৫৮।
ভোগেল, এল. ২০১৩। মার্কসিজম অ্যান্ড দ্য ওপপ্রেশান অফ উইমেন: টুওয়ার্ডস আ ইউনিটারি থিওরি। রেভ. এড. লন্ডন: ব্রিল।
জেটকিন, সি. ১৯২২। অ্যাড্রেস টু দ্য ফোর্থ কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স। মার্কসিস্টস.ওআরজি থেকে গৃহীত।
প্রথম প্রকাশ: Marxist, XXXVI, 1, January-March 2020
ভাষান্তর: উর্বা চৌধুরী
প্রকাশের তারিখ: ২০-মার্চ-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
