সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
দুনিয়ার যত মনভাঙা দল একমত হয় যদি
সর্বজয়া ভট্টাচার্য
সাধারণ ভাবে একটা কথা ধরে নেওয়া হয় যে মেয়েরা লেখেন মেয়েদের কথা নিয়ে। হ্যাঁ। ঠিকই। মেয়েরা মেয়েদের কথাই লেখেন। তাঁদের সুখ-দুঃখ, শ্রম-বিশ্রাম, ঘর-দুনিয়া-সংসার – এসব নিয়েই লেখেন মেয়েরা। কিন্তু পুরুষরা লেখেন আরো গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে – যেমন জীবন দর্শন। কিন্তু কেই বা ঠিক করে দিল আমাদের দৈনন্দিনতা, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দর্শন নেই? কে সিদ্ধান্ত নিল যে আমাদের জীবন রাজনৈতিক নয়? একথাই বা কোথায় বলা আছে যে জীবন দর্শন নিয়ে লিখলে সে লেখার ভার আছে, আর সংসার নিয়ে লিখলে সেই গদ্য লঘু? কিছু জিনিসকে সমাজের সমস্যা না বলে ‘মেয়েদের সমস্যা’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার কাজ পিতৃতন্ত্রের বড় প্রিয়।

মনে পড়ে, তখন আমার বয়স তেরো বা চোদ্দ হবে, বইয়ের তাক থেকে নামিয়ে নিচ্ছি সবুজ মলাটের একটা বই, অদ্ভুত নাম তার – The God of Small Things। তখনও লেখিকার বিষয়ে কিছু জানি না, বইটির ব্যাপারেও কিছু জানি না। জানি না যে অশালীনতার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। জানি না তাঁর রাজনীতির কথা। পাতা উলটে পড়ছি প্রথম বাক্য – “May in Ayemenem is a hot, brooding month।” সেই যে আয়েমেনেম আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল, আজও মে মাস পড়লে প্রথমেই মনে পড়ে God of Small Things-এর কথা। মনে পড়ে এস্থা, রাহেল, আম্মু। মনে পড়ে সোফি মোল, যে কিনা জিজ্ঞেস করেছিল, বুড়ো পাখির দল কোথায় গিয়ে মরে। মনে পড়ে একটা মথের কথা, যার ঠাণ্ডা পা আমিও কখনও-সখনও টের পেয়েছি বুকের ভিতরে। মনে পড়ে ভেলুথাকে। একবার পরিচয় হলে, কেই বা তাকে ভুলে যেতে পারে? যে নদী আমি কখনও দেখিনি, সেই নদীর কথাও মনে পড়ে।
শেষ থেকে শুরু হয়ে মাঝখানে শেষ হওয়া এই আশ্চর্য উপন্যাস অরুন্ধতী রায়ের আত্মজীবনী কিনা এই নিয়ে বহুদিন ধরে জল্পনা চলেছে পাঠক মহলে। আম্মু কি তাহলে অরুন্ধতীর মা? তিনিই রাহেল? ভেলুথা তাহলে কে? তাঁর বাবা কি সত্যিই আসামের চা বাগানে, চা নয়, অন্য এক তরল পান করে তিলে তিলে ক্ষয় করছেন নিজের জীবন? কত ভাগ সত্যি আর কত ভাগ কল্পনা? কতটা স্মৃতি আর কতটা মনগড়া?
কী অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আমাদের। আসলে যাঁকে কোনো খোপের মধ্যে ঠিক ফেলা যাচ্ছে না, যাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব বেশি জানা যাচ্ছে না, অথচ যিনি প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করেছেন, তাঁকে নিয়ে আমরা কিছু লিখতে পারব না? বলতে পারব না? শুধু উপন্যাস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার পাঠক আমরা নই। আমাদের হাত নিশপিশ করে তার স্রষ্টার চরিত্রকে কাটাছেঁড়া করতে। বিশেষ করে যখন তিনি মহিলা। বিশেষ করে যখন তিনি কলম তুলছেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে। জাতপাতের বিরুদ্ধে। এবং করেওছি আমরা। তাই অরুন্ধতীর লেখা প্রসঙ্গে ‘যাহা ব্যক্তিগত তাহা রাজনৈতিক’ আপ্তবাক্যের কাছে ফিরে যেতে আমরা বাধ্য। অরুন্ধতী আমাদের বাধ্য করেন তাঁর লেখনির মাধ্যমে। আমরা নিজেদের বাধ্য করি আমাদের ঘৃণ্য কৌতূহলের কারণে।
*****
Mother Mary আমার হাতে এসে পৌঁছল কতকটা আচমকা। কাগজের মোড়ক খুলে বইটা দেখে হঠাৎ চমকে উঠলাম। কে পাঠাল? সে জানল কী করে যে এই দুদিন আগেই বইয়ের দোকানে অনেক কষ্টে লোভ সামলেছি। ভেবেছি, দাম কমুক, তারপর কিনব। তারপর স্মৃতির মধ্যেই কী যেন নড়ে উঠল। দেখলাম, নিজেই তাকে আনিয়েছি। প্রকাশিত হওয়ার আগেই বইটি অর্ডার দেওয়া ছিল।
হাতে পাওয়ার পর দু-তিন দিন কেটে গেল। পড়লাম না। ইচ্ছে করেই পড়লাম না। পড়লাম না কারণ ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না সদ্য মাতৃহারা আমি এই বই কী ভাবে পড়ব। কিন্তু তারপর মনে হল, এই স্মৃতিকথা পড়ার যদি কোনও আদর্শ সময় থাকে, তাহলে তা এখনই।
স্মৃতি সততই সুখের নয় তা আমরা সবাই জানি। আজ অব্দি এমন কোনও স্মৃতিকথা পড়িনি যাতে দুঃখ নেই, রাগ নেই, অভিমান-বিরক্তি-শোক নেই। উনিশ শতক এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে লেখা মেয়েদের স্মৃতিকথায় খুব বেশি করে উঠে এসেছে পরিবারের কথা, ঘরে এবং বাইরে মেয়েদের অবস্থানের কথা। ভারতে নারী শিক্ষা প্রচলনের ফল হিসেবে লিখিত এবং সাধারণত লেখার বহু বছর পরে প্রকাশিত এই বইগুলির আজ ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই নিয়ে গবেষণামূলক কাজও হয়েছে অনেক। এখনও হচ্ছে। এই শিক্ষিত মহিলামহলের বাইরে সেই সময়ের আরও কত কন্ঠস্বর আমাদের কান অব্দি পৌঁছনোর সুযোগই পায়নি। তাও এরই মধ্যে হঠাৎ পাওয়া যায় কোনও দলিত মহিলার স্মৃতিকথা। যেমন, মহারাষ্ট্রের বেবী কাম্বলে বা তামিল নাডুর বামার লেখা। পুরুষ শাসিত এবং পুরুষ শোষিত মূলস্রোতের বাইরে যাঁদের রাখার চেষ্টা চালানো হয়েছে প্রাণপণ, স্রোতের বিপরীতে তাঁদের জোরালো হাত মুঠো তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে, রেখে গেছে পদে পদে অন্য এক ইতিহাসের সন্ধান। এই আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথার অনেকগুলিই ভারতের অনেক পাঠকের কাছে এসে পৌঁছেছে অনুবাদের সুবাদে। মেয়েদের প্রথম কলম ধরা থেকে আজ অব্দি প্রকাশিত আত্মজীবনী অথবা স্মৃতিকথার সংখ্যা গোনা কঠিন কাজ। তবে একথা মনে রাখা দরকার, মেয়েরা যখন প্রথম নিজেদের কলমে নিজেদের কথা লিখতে শুরু করলেন, তখন সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এক পুরুষ-প্রধান ধারায় পা রাখলেন তাঁরা। তাঁদের জীবন, তাঁদের স্মৃতি যে লিপিবদ্ধ করার যোগ্য, একথা প্রতিষ্ঠা করতেও লড়াই করতে হয়েছে মেয়েদের। তারপরেও তাঁদের লেখাকে তেমন গুরুত্ব হয়তো দেওয়া হয়নি। গবেষণার ফলে কিছুটা গুরুত্ব পেয়েছেন যেমন রাসসুন্দরী দেবী। উচ্চ বর্ণের তিনি। বিনোদিনী কিন্তু আমার কথা-এ তাঁর নামের পর ‘দেবী’ নয়, লিখছেন ‘দাসী’। কিন্তু কতজন মানুষ রাসসুন্দরীর কথা জানেন? জানানোর দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কি সেই কাজ করেছেন? স্কুলের সিলেবাসে আলাদা করে জোর দেওয়া হয়েছে মেয়েদের লেখার ওপর? সাত-আট বছর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি কলেজে পড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম স্নাতক স্তরের ইংরেজি সিলেবাসে মহিলাদের উপস্থিতি নগণ্য। দু’জন মোটে ঠাঁই পেয়েছেন। সিলেবাস কমিটিতে কারা বসেন? কতজন মহিলা? তাঁদের মতামতকে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া হয়? আদৌ কি নিজেদের মত প্রকাশের মতো পরিবেশ সেখানে আছে?
গত এক দশকে ইংরেজিতে লিখিত এবং প্রকাশিত ভারতীয় নারীদের স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর সংখ্যা বোধহয় খুব বেশি নয়। ইয়াশিকা দত্তের Coming Out as Dalit (2019)-এর কথা মনে পড়ছে সদ্য পড়েছি বলে। এছাড়াও আছে সুজাথা গিডলার Ants Among Elephants: An Untouchable Family and the Making of Modern India (২০১৭), মায়া শানবাগ ল্যাং-এর What We Carry (২০২০, মা ও মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে), শান্তা গোখলের One Foot on the Ground: A Life Told Through the Body (২০১৯)। স্বীকার করে নিচ্ছি, এই তালিকার প্রতিটি বই আমি নিজেও পড়িনি। এছাড়াও অনেকের লেখা অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু সেই নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরেকটি প্রবন্ধ লিখে ফেলতে হবে।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
সাধারণ ভাবে একটা কথা ধরে নেওয়া হয় যে মেয়েরা লেখেন মেয়েদের কথা নিয়ে। হ্যাঁ। ঠিকই। মেয়েরা মেয়েদের কথাই লেখেন। তাঁদের সুখ-দুঃখ, শ্রম-বিশ্রাম, ঘর-দুনিয়া-সংসার – এসব নিয়েই লেখেন মেয়েরা। কিন্তু পুরুষরা লেখেন আরো গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে – যেমন জীবন দর্শন। কিন্তু কেই বা ঠিক করে দিল আমাদের দৈনন্দিনতা, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দর্শন নেই? কে সিদ্ধান্ত নিল যে আমাদের জীবন রাজনৈতিক নয়? একথাই বা কোথায় বলা আছে যে জীবন দর্শন নিয়ে লিখলে সে লেখার ভার আছে, আর সংসার নিয়ে লিখলে সেই গদ্য লঘু? কিছু জিনিসকে সমাজের সমস্যা না বলে ‘মেয়েদের সমস্যা’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার কাজ পিতৃতন্ত্রের বড় প্রিয়। তাতে নিজের ঘাড় থেকে নানাবিধ দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে তা স্বচ্ছন্দে চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারে মেয়েদেরই ওপর। তাসের দেশ-এর দহলা পণ্ডিত যখন বিপ্লবী হরতনীকে বলছেন, “তুমি নারী, রক্ষা করবে শান্তি; আমরা পুরুষ রক্ষা করব কৃষ্টি,” তার যোগ্য জবাব আসে হরতনীর থেকে। সে বলে, “অনেকদিন তোমরা আমাদের ভুলিয়েছ, পণ্ডিত। আর নয়। তোমাদের শান্তিরসে হিম হয়ে জমে গেছে আমাদের রক্ত, আর ভুলিয়ো না।”
এই ভুলিয়ে দেওয়া, ভুলে যাওয়া, ভুলে থাকার বিরুদ্ধে মেয়েরা বলে চলেন বা লিখে চলেন তাঁদের কাহিনি। সেই ভুলে না যাওয়ার, ভুলে না থাকার, ভোলাতে না পারা, ভুলতে না দেওয়ার প্রয়াসই আমরা দেখি অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথায়।
*****
আমি যখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী, তখন আমাদের একবার রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল নিজের মা-কে নিয়ে। আমাদের স্কুলে তখন নম্বর দেওয়ার চল ছিল না। রচনার শেষে লেখা হতো ‘ভালো,’ ‘খুব ভালো,’ যদি তেমন ভালো না হয়, তাহলে ‘আরো ভালো হতে পারত’ – এই ধরনের মন্তব্য। জীবনে প্রথম এবং শেষ বার রচনার খাতায় মাকে নিয়ে এই লেখার তলায় আমাদের ক্লাস টিচার লিখেছিলেন ‘অপূর্ব।’ সেই খাতা আমার মা সযত্নে আলমারিতে তুলে রেখেছিলেন। খাতাটা হাতের কাছে নেই, আর ঠিক মনেও পড়ছে না কী লিখেছিলাম। কিন্তু মনে পড়ছে, প্রথম দিকে মায়ের পরিচয়, মা কী করেন ইত্যাদি লেখার পরে মায়ের সম্পর্কে আমার অনুভূতির কথা লিখেছিলাম। হয়তো সেই কারণেই ওই ভালো, খুব ভালো ইত্যাদি ধাপ পেরিয়ে প্রশংসিত হয়েছিল রচনাটি।
আমার মা উত্তর কলকাতার একটি কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। মফস্বলে বড় হওয়া মেয়ে প্রথম কলকাতায় আসেন কলেজে পড়ার সময়, অবশ্য সপরিবারে। আমার দাদুও অধ্যাপক ছিলেন, সরকারি পদ বলে বদলির চাকরি ছিল। শেষে প্রেসিডেন্সিতে এসে থিতু হন। মায়ের ছিল ভোরবেলার কলেজ। তাই মা যখন বেরোতেন, আমি তখন গভীর ঘুমে। আবার মা যখন ফিরতেন, আমি তখন স্কুলে। বিকেলবেলার আগে আমার মায়ের সঙ্গে দেখা হতো না। পরে, আমি নিজে যখন স্কুলের গন্ডী পেরোলাম, এমন দিনও গেছে যখন আমার সঙ্গে মায়ের দেখাই হয়নি। আমি কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে মা শুয়ে পড়েছেন, ভোরবেলা উঠতে হবে বলে। আর মা যখন বেরিয়েছেন, আমার তখন মাঝরাত।
মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব সহজ ছিল না। আমার মনে হতো, মা যেরকম চাইছেন, আমি ঠিক তেমনটা নই। মনে হতো মা আমাকে বুঝতে পারেন না। মা-ও নিশ্চয়ই বুঝতেন সে কথা। আর তাতে না বোঝার কষ্টও পেতেন নিশ্চয়ই। মায়ের সঙ্গে গল্পের থেকে ঝগড়া করেছি বেশি। আদরের চেয়ে শাসন পেয়েছি বেশি। মায়ের সঙ্গে খেলিনি কখনও। কখনও মাকে দেখতে না পেয়ে কান্না পায়নি ছোটবেলায়।
একটু বড় হয়ে যখন আক্কেল গজালো, তখন আরও গভীর ভাবে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, এখনও করি – আমি কি মাতৃত্বের কোনও চেনা, অর্থাৎ কিনা পিতৃতন্ত্রের চেনানো ধাঁচে মাকে দেখতে চাইতাম? আর সেই ধাঁচার সঙ্গে মা ঠিক খাপ খেত না বলেই কি আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ত নানা জটিলতা? নাকি, মেয়েকে যে ভাবে দেখতে চাইতেন মা, পিতৃতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত সেই আদল আমার মধ্যে তিনি খুঁজে পেতেন না? নাকি দুটোই? নাকি কোনওটাই নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর নিজের মনের ভেতর কোথাও আছে নিশ্চয়ই। ভারি বেদনাদায়ক খননকার্য ছাড়া সেই উত্তর তুলে আনা সম্ভব নয়। এই প্রবন্ধের শব্দসীমার মধ্যে তো নয়ই। মাকে নিয়ে, আমার আর মায়ের সম্পর্ক নিয়ে আপাত অপ্রাসঙ্গিক এই কথাগুলো বলে ফেললাম শুধু এটুকু বলার জন্য যে ‘মা’ আর ‘মেয়ে’র আদপে কোনও ধাঁচা থাকতে পারে না। অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথা আমাদের এই চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোকে প্রশ্ন করতে বলবে, ঝেড়ে ফেলতে বলবে, ভেঙে ফেলতে বলবে।
*****
স্মৃতিকথার নামে আছে ব্রিটেনের বিখ্যাত গানের দল বীট্লসের একটি লাইন। গানের নাম ‘Let it be।’ গানটি কী ভাবে লেখা হয়েছিল সেই নিয়ে দুটি গল্প আছে। তার মধ্যে একটি হলো, গানের রচয়িতা, পল ম্যাকার্টনি, স্বপ্নে তাঁর মা-কে দেখেছিলেন। দেখেছিলেন মা দাঁড়িয়ে তাকে বলছেন ‘Let it be।’ ম্যাকার্টনির মায়ের নাম মেরী।
মেরী রায় একজন প্রবাদপ্রতিম শিক্ষাবিদ। সিরিয়ান খ্রিশ্চিয়ান সমাজে বাবার সম্পত্তিতে বিবাহিত মেয়েদের অধিকার ছিল না। সেই কত বছর আগে তিনি এই আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। শুধু লড়াই করেননি। জিতেছিলেন। আইন বদলানো হয়েছিল। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছিলেন ইস্কুল। নিজের শক্ত হাতে সেই ইস্কুল চালিয়েছিলেন বহু বছর। মদ্যপ স্বামীকে ছেড়ে এসে একা দায়িত্ব নিয়েছিলেন দুই ছেলে-মেয়ের।
মেরী রায়ের এই পরিচয়ের সঙ্গে অরুন্ধতীর লেখায় আসে মা হিসেবে তাঁর পরিচয়ের কথা। সেই লেখা অরুন্ধতী লিখছেন একজন মেয়ের দৃষ্টি থেকে। লিখছেন লেখিকার দৃষ্টি থেকেও। বইয়ের উৎসর্গ পাতায় রয়েছে মেরীর নাম, যিনি কখনওই বলেননি – ‘Let it be’। 
এই স্মৃতিকথাও শুরু হয় শেষ দিয়ে। মেরী রায় মারা গেছেন। অরুন্ধতী কেরলে ফিরছেন। এবং ভাবছেন, “I have seen and written about such sorrow, such systemic deprivation, such unmitigated wickedness, such diverse iterations of hell, that I can only count myself among the most fortunate. I have thought of my own life as a footnote to the things that really matter. Never tragic, often hilarious. Or perhaps this is the lie I tell myself. Maybe I pitched my tent where the wind blows strongest hoping it would blow my heart clean out of my body. Perhaps what I am about to write is a betrayal of my younger self to the person I have become…।”
এই যে দ্বিধা, নিজের মনের সঙ্গে নিজের এই যে লড়াই, এবং কলম দিয়ে এই যে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো – মায়ের মেয়ে হওয়ার অভিজ্ঞতারই তো অংশ তা। নিজের স্মৃতি নিয়ে লিখতে গিয়ে, নিজের মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে, এবং নিজেকে নিয়ে লিখতে গিয়ে যদি কোথাও হাত না কেঁপে যায়, সেটাই তো আশ্চর্য। অদ্ভুত তীক্ষ্ণ যে সততা ছড়িয়ে আছে এই স্মৃতিকথার মধ্যে তা আমাদের কাছে ধরা দেয় বইয়ের শুরুতেই – এই অনিশ্চয়তার মধ্যে।
অরুন্ধতীর আমাদের কাছে অনুরোধ, বইটি পড়ুন উপন্যাস হিসেবে। কারণ স্মৃতি যে কোথায় শেষ হয়, বাস্তব যে কোথায় শুরু হয়, তা আমরা জানি না। আর অরুন্ধতী বলছেন, সব কিছু জানারই বা কী দরকার? অরুন্ধতী বলেছেন বলে নয়, পৃথিবীর অনেক উপন্যাসই যে ভাবে আমাদের কয়েদ করে রাখে, আমাদের সময় কেড়ে নেয়, অরুন্ধতীর এই স্মৃতি-উপন্যাসও তাই করে। চোখে ঘুম জড়িয়ে এলেও মনে হয়, আরও এক পাতা। আরও এক পাতা অন্তত পড়ে নিই। রুদ্ধশ্বাস শব্দটি ব্যবহার করি আমরা সহজেই, কিন্তু এই বই পড়ার বিভিন্ন সময়ে, যখন সে আমাদের বাধ্য করে কিছুক্ষণের জন্য তাকে নামিয়েও রাখতে, তখন যে দীর্ঘশ্বাস অজান্তেই আমাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, তা মনে করিয়ে দেয় যে এতক্ষণ সত্যিই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিইনি।
বইয়ের জ্যাকেটে অরুন্ধতীর দুটি ছবি আছে – একটি সামনে – সেটি অল্প বয়সের। আরেকটি পেছনে – সেটি এখনকার। যেন বই বন্ধ করে আমরাও অরুন্ধতীর জীবনের কিছুটা পথ হাঁটলাম তাঁর সাথে। এই পথ হাঁটা শেষ হলে, আমরা যেন তাঁকে আর কোনও কাল্পনিক কাঠগড়ায় দাঁড় না করাই। মেয়ে হিসেবে তো নয়ই। কিন্তু লেখিকা হিসেবেও নয়। কারণ তিনি নিজেই বলেছেন, “Perhaps even more than a daughter mourning the passing of her mother, I mourn her as a writer who has lost her most enthralling subject. In these pages, my mother, my gangster, shall live. She was my shelter and my storm।” শোকগ্রস্ত লেখিকাকে এটুকু ছাড় না হয় দিলাম আমরা।
প্রকাশের তারিখ: ০৯-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
