সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংলাপে মেয়েরা (পর্ব ২)
উর্বা চৌধুরী
“গরীব ঘরে মেয়েদের রোজগার করতে হয়। আমার ঘরের গার্জেনটা তো ঠিক নয়, নেশাভাং করে! আমি তো একাই রোজগার করে দুই ছেলে মানুষ করছি।” সাঁইথিয়া ব্লকের আদিবাসী গ্রামের ৪০ বছর বয়সী মণিকা মহলির কথা। মণিকা তাঁর প্রাথমিক পেশায় খেতমজুর আর গৌণ পেশা বাবদ তিনি ঝুড়ি বোনেন। এই গৌণ পেশা তাঁর জনগোষ্ঠীর আদি পেশা, যদিও পড়তি। সাধারণভাবে জীবিকার কথা হচ্ছিল না, কথা হচ্ছিল “মেয়েদের কি রোজগার করা দরকার, না কি না করলেও চলে?” বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতির ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে হওয়া পাইলট সমীক্ষার ভিত্তি যেহেতু নারীদের জীবনে সাক্ষরতা, সচেতনতা ও সক্ষমতার তাৎপর্যের নানা দিক, সেহেতু প্রশ্নসূচিতে নারীদের উপার্জন ও আর্থিক স্বাবলম্বিতার প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে সংলাপের এক অপরিহার্য উপাদান।

প্রথম পর্বের পর. ..
নিবন্ধের এই দ্বিতীয় পর্ব আলোচনা করবে, সমীক্ষার উত্তরদাতারা ঘরের কাজ, বাইরের কাজ ও রোজগার প্রসঙ্গে কী বললেন তা নিয়ে।
মূলত মেয়েদের বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কাজ করে উপার্জন করার সঙ্গে যে তাঁদের সচেতনতা ও সক্ষমতার দিকগুলি জড়িয়ে থাকে, তা অস্বীকার করা যায় না। সেই আঙ্গিক থেকেই কথোপকথন শুরু হয়। তবে এক্ষেত্রে যে মতামত পাওয়া গেল, তার মধ্যে বেশিরভাগই নারীদের ব্যক্তিগত “বিকাশ”, “সক্ষমতা” বা “স্বাধীনতা” কেন্দ্রিক নয়। তাঁদের মতে নারীদের কাজ করা দরকার, কারণ তা সংসারের আর্থিক সুরাহা করবে। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয়ে আমরা দৃষ্টিপাত করতে পারি– ভারতে মায় এ রাজ্যে আর্থিক অনটনে থাকা পরিবারের সংখ্যা বিপুল, অথচ পশ্চিমবঙ্গে নারীদের মোট শ্রমবাহিনীতে যোগদান ৩৫.৫ শতাংশ আর ভারতে ৩৫.৬ শতাংশ (পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৩-২৪)। ফলে বোঝা যাচ্ছে যে, ব্যক্তিগত সক্ষমতা, বিকাশ হোক বা সংসারের আর্থিক সুরাহা– নারীর আর্থিক কাজকর্মে যোগদান করার ক্ষেত্রে কট্টর প্রকৃতির কিছু বাধা থাকছে। সে বাধা সামাজিকও বটে এবং শ্রেণিগতও বটে। এই বাস্তবতাকে অন্য এক দিক থেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে উক্ত পিএলএফএস প্রতিবেদনের আরেক তথ্য। জানা যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গের গোটা নারী কর্মীবাহিনীর মধ্যে পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত উপার্জনহীন সহায়ক নারীকর্মীরা বিরাট শতাংশ দখল করেছে। ২০২৩-২৪ সালে এই পরিসংখ্যান ২০.২ শতাংশ। এই কর্মীবাহিনীকে কেমন দেখতে– “ঘরের কারখানায় তো কাজ করি, আমার আর কী রোজগার?” বিস্ময় প্রকাশ করেন এক উত্তরদাতা। এই “ঘরের কারখানা”, “স্বামীর দোকান”, “পারিবারিক জমিতে চাষের কাজ”-এ কর্মী হিসাবে যুক্ত থাকার ছবি বেশ চেনা। ফলে নারীরা যে এ রাজ্যে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে দেখা যাচ্ছে যে, এই প্রেক্ষাপটে যা নারীকে “পেশাদারিত্বের সক্ষমতা” দিচ্ছে; তা তাকে “আর্থিক সক্ষমতা” দিচ্ছে না। এ রাজ্যে পুরুষদের ক্ষেত্রে এইরকম “কর্মী বাহিনীর” শতাংশের বিচারে হার মাত্র ৫.৭ (২০২৩-২৪)। দেশের গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্টে পারিবারিক আর্থিক কার্যকলাপে “স্বনিযুক্ত” এই নারীদের খাটনির অবদান থাকলেও বা এদের উল্লেখযোগ্য শতাংশ এ দেশের “বেকারত্বের হার”কে কমিয়ে দেখালেও এঁরা কেউ হাতে “মজুরি” বাবদ কোনও অর্থ পান না।
সমিতির পাইলট সমীক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর যোগদানের আঁক কষে অর্থনীতির হিসাব পেশ করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়নি– বরং সমীক্ষার মাধ্যমে জানার চেষ্টা ছিল, নারীরা এ সমাজের সদস্য হিসাবে সমাজের নানা কর্মযজ্ঞে যোগদান করার, সমাজের সম্পদ-পরিকাঠামো ও অধিকারের সদ্ব্যবহার, চর্চা করার প্রশ্নে কতটা “সক্ষম”। কারণ সমিতির কাজের লক্ষ্য সাক্ষরতা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সচেতনতা ও সক্ষমতা বিকাশও বটে।
“স্বামী যদি বিপদে পড়ে, বউকেই তো দেখতে হবে।” মতামত দেন পশ্চিম মেদিনীপুরের ছাব্বিশ বছরের রেজিনা। আবার কোন্নগরের দিপালী বলেন “মেয়েদের নিজের বলতে কি কিছু আছে? তার উপর সবসময় ছেলেদের কাছে বন্দি থাকতে ভালো লাগে না। মেয়েদের নিজের জন্য কাজ করে রোজগার করা উচিত।” গ্রাম-শহরের নারীদের সঙ্গে মেয়েদের রোজগার করা নিয়ে চলতে থাকা সংলাপের মাধ্যমে একটি অভিজ্ঞতা বেশ পোক্ত হতে থাকে– মেয়েদের রোজগার করার উপযোগিতা জীবিকা নির্বাহ আর আর্থিক স্বাবলম্বনের মিশ্রণ। এঁদের কেউ কেউ মনে করছেন যে, মেয়েদের রোজগার কেবলই সংসারের টানাটানি ঘোচাতে বা কেবলই ব্যক্তি-নারীর একান্ত আর্থিক স্বাধীনতার জন্য নয়। তবে যে কথা কেবল দু-একজনের মুখে শোনা গেল, তা হল– নারীর বুদ্ধিগত ও সামাজিক বিকাশের কথা, বিশ্লেষণধর্মী চৈতন্যের বিকাশের সঙ্গে লেখাপড়া ও ঘরের বাইরে বেরিয়ে পেশাদার হয়ে ওঠার যোগের কথা। “মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে বাইরে গিয়ে কাজ তো করবেই!”– এ কথা শোনা গেল আঠারো বছর বয়সী এক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা-প্রার্থীর মুখে। লেখাপড়া শেখা ও পেশাদার হয়ে ওঠার মধ্যে যে আত্মপ্রকাশের সুযোগ ও সন্তোষ, তার ধারণা লুকিয়ে থাকে এই মেয়েটির কথায়। আবার এঁদের কথা থেকে জানা যায় যে; পেশাদারিত্বের মর্যাদার সঙ্গে কর্মস্থলের পরিবেশ, শোষণহীন কাজ, যোগ্য মজুরি, সমকাজে সম-পারিশ্রমিক– এই বিষয়গুলিও জড়িয়ে থাকে। “মজুরি খুব কম, যা খাটি তার ঠিকঠিক দাম তো পাই-ই না, যা দেয় তাতে সংসারও চালাতে পারি না” আদিবাসী খেতমজুরের এই কথা নানাজনের সংলাপে ধরা পড়ে গোটা সমীক্ষা জুড়ে। সমীক্ষায় যোগ দেওয়া প্রায় সব নারীকর্মীর বক্তব্য– তাঁরা শ্রমের যথাযোগ্য মজুরি পান না। আবার খেতমজুর নারীদের মুখে শোনা গেল কর্মদিবসের ঘাটতির কথা, অর্থাৎ অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের কথা। “মেয়েরা খেটে তো খাবে, কিন্তু খাটবে কোথায়? চাষের কাজে গোটা বছরে ১৫ থেকে ২০ দিন কাজ হয়, ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে! এই যে ঝুড়ি বুনি, এ তো বেচে কোনও লাভ নাই! সারাবছর কাজ পাব তবে না খেটে খাব!” বলেন এক আদিবাসী খেতমজুর।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় নারী-পুরুষের মজুরির তফাতের কথাও। ২০২৩-২৪-এর পিএলএফএস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে বেতন ও দৈনিক মজুরিপ্রাপকদের মধ্যে নারীরা পুরুষদের থেকে পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
বিশ্ব লিঙ্গ অসাম্য সূচক ২০২৪-এর (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স রিপোর্ট ২০২৪) প্রতিবেদন জানাচ্ছে, শ্রমবাহিনীতে যোগদানে লিঙ্গগত অসাম্যে ভারত ১৪৬টি দেশের মধ্যে ১৩৪তম এবং সমকাজে সম-মজুরির প্রশ্নে লিঙ্গগত অসাম্যে ১২০তম স্থানে রয়েছে।
পেশা-জীবিকা-আয় নিয়ে আলোচনার সঙ্গে খুব গুরুতরভাবে জড়িয়ে থাকে “নারী সারাদিন করে কী?” প্রশ্নটি। লেখাপড়া ও পেশায় যোগাদানের ক্ষেত্রে এতটাই পিছিয়ে থাকে বলেই কি তার ব্যস্ততা বাবদ পড়ে থাকে ঘরের কাজ? না কি লেখাপড়া, বাইরে রোজগারের কাজের পরেও তার জন্য বাড়তি ব্যস্ততা বাবদ পড়ে থাকে সেই ঘরের কাজই? সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে ২১১টি গ্রামীণ পরিবারগুলির মধ্যে মাত্র ৪৫টি পরিবারের পুরুষেরা ঘরের কাজে নারীদের সহায়তা করছেন। বাকি ৯৫টি পরিবারে উত্তরদাতা নারী ঘরের বাইরে রোজগারের কাজেও যোগ দিচ্ছেন আবার ঘরের কাজও করছেন সম্পূর্ণ একা হাতে, কোনও পুরুষ সদস্যের সাহায্য ছাড়াই। শহরাঞ্চলে এই চিত্র খানিক উন্নত। সেখানে ৬১টি পরিবারের মধ্যে ৩৩টি পরিবারে নারী সদস্যের সঙ্গে ঘরের কাজে পুরুষেরাও যোগ দিচ্ছেন, ২০জন কর্মরত নারী ঘরের কাজ করছেন পুরুষ সদস্যের সাহায্য ছাড়া। অর্থাৎ কি না ঘরের কাজে পুরুষদের যোগদান অত্যন্ত কম। বাইরে কাজ করার কারণে পুরুষদের এই কম যোগদান– এমন কারণ প্রদর্শন করা হলেও; সেটি আদতে কারণ নয়, অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। “পুরুষ নারীর সমান সমান ঘরের কাজ করা উচিত”... “ঘরের ব্যাটাছেলেদের বললেও কাজ করবে না”… “ঘরের কাজ আবার করবে কী, নেশা করে পড়ে থাকে তো!”… “পুরুষমানুষ কেন ঘরের কাজ করবে? সে তো বাইরে খাটে!”… “আমারে স্বামী খেতে দেয়, পরতে দেয়, তাকে ঘরের কাজ আমি করতে দেব কেন?” … “ঘরের কাজ হলেও ভারি কাজ, মাল টানার কাজ পুরুষদেরই করা উচিত”– এইসব সংলাপ শোনা যায় গ্রাম-শহরের সমীক্ষাটি জুড়ে। তবে রকমারি সংলাপের শেষে দেখা যাচ্ছে যে, বেশিরভাগ নারী উত্তরদাতাই খুব উদার মনে পুরুষের ঘরের ভিতরের এই অনায়াস জীবনযাত্রাকে সম্মানের চোখে দেখেন না! প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এদেশে ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীরা ঘরের কাজ ও পরিবারের সদস্যদের জন্য সেবাকাজে গড়ে দৈনিক সময় ব্যয় করেন ৪৪৫ মিনিট বা প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টা সেখানে পুরুষরা ব্যয় করেন ১৬০ মিনিট বা আড়াই ঘন্টার কিছু বেশি (টাইম ইউজ ইন ইন্ডিয়া– ২০২৪, জানুয়ারি–ডিসেম্বর ২০২৪; রিপোর্ট, স্ট্যাটিস্টিক্স অ্যান্ড প্রোগ্র্যাম ইমপ্লিমেন্টেশান মন্ত্রক, ভারত সরকার)।
সমীক্ষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ চলে ঘরের কাজ ও মজুরি প্রসঙ্গে। “আমার ঘরের কাজ, কেন মজুরি নেব?” থেকে শুরু করে “আমার ঘর, আমারে কে দেবে মজুরি?” অবধি বিস্তৃত সংলাপ বুঝিয়ে দেয়– সমাজের নির্মাণ নারীকে পরিবারে অধস্তন বানিয়ে বা বিনাযুদ্ধে অধস্তন হয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারছে ঠিকই; তবে নারীর নিজস্ব যুক্তিবোধ ও মর্যাদাবোধ দ্বারা চালিত ব্যক্তিত্ব তার এই অধস্তন দশাকে বিনা-দ্বন্দ্বে মেনে নেয় না। বেশিরভাগ নারী উত্তরদাতাই ঘরের কাজের মজুরি-প্রাপক হতে চেয়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যকে আক্ষরিক অর্থে “কর্তা” হিসাবে দেখতে চান না, বারবার বলেন “আমার ঘর, আমার ঘরের কাজ, কীসের মজুরি?” তবে হ্যাঁ, উদয়াস্ত ঘরের কাজ করা ও নানাজনের ফাইফরমাশ খাটা নারীরা মায় “পারিবারিক উদ্যোগে যুক্ত উপার্জনহীন সহায়ক নারীকর্মী”রা “হাতখরচা”র অর্থের প্রত্যাশাটুকু করেন।
রোজগার প্রসঙ্গে আলোচনার শেষ অঙ্কে, এ কথা উপেক্ষা করা চলে না যে, মজুরি বৃদ্ধির কথা বলা মেয়েরা, কর্মসংস্থান ও কর্মদিবস বৃদ্ধির কথা বলা মেয়েরা, ঘরের কাজে পুরুষের সহযোগ প্রত্যাশা করা মেয়েরা, ঘরের আর্থিক উদ্যোগে গতরের খাটনি “ফ্রি-তে” দেওয়া মেয়েরা সমীক্ষার সংলাপে কথার পিঠে কথা গাঁথতে গাঁথতে জানান, সরকার যদি মেয়েদের জন্য কোনও ভাতা ধার্য করে তবে সেই ভাতার টাকা মেয়েদের নিজেদের হকের টাকা, পরের টাকা নয়।
প্রকাশের তারিখ: ২৯-মে-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
