Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বিশ্বজয়, অতঃ কিম!

বিহঙ্গ দূত
সম্প্রতি ওড়িশা হকি খেলায় অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। মহিলা হকি দলে জ্যোতি ছত্রী খুবই পরিচিত নাম। রাজমিস্ত্রীর মেয়ে জ্যোতিকে সপরিবারে রাঁচি থেকে রাউরকেল্লা চলে আসতে হয় শুধু খেলার সুব্যবস্থা পাওয়ার জন্য। পানাপোশের হস্টেল থেকে স্টেডিয়াম অব্দি যেতেন পায়ে হেঁটে। একটা নিম্নবিত্ত পরিবারকে আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু দাঁওয়ে লাগিয়ে দিতে হয় মেয়েদের স্পোর্টস কেরিয়ার তৈরি করতে গিয়ে।
world cup but then

২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের দলগত ইভেন্ট আর্চারি চলছে। নেদারল্যাণ্ড বনাম ভারতের হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে ভজন কাউর অনবদ্য পারফর্ম করছেন। কিন্তু শেষ সেটে অঙ্কিতা চার মেরে বসলেন। অলিম্পকের মতো আসরে যেখানে সাত স্কোর করলেই খেলা হাতের বাইরে চলে যায় সেখানে একেবারে চার! ম্যাচ ওখানেই শেষ। শুরু হল ট্রোল। তীরন্দাজি নিয়ে প্রতিবারই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকে এবং শূন্য হাতে ফিরতে হয় কিন্তু এবার সেই শূন্য হাতে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল ওই চার স্কোর করাটা। সোশাল মিডিয়ায় জোড়াপাঁঠা বলি হল। দীপিকা কুমারীর সঙ্গে অঙ্কিতা ভকত। অঙ্কিতা বাংলার মেয়ে বলে কিছুটা বেশি আবেগ নিয়ে আমরা যারা দেখতে বসেছিলাম তাদের মনমেজাজও চটকে গেল। খেলার ময়দানে প্রত্যাশা থাকলে গালাগালিও থাকবেই। একে বেশহেলদি কালচারবলেই ধরা হয়। অঙ্কিতারা সে অর্থে গাল খাচ্ছেন মানে তাদের খেলা লোকে দেখছে। প্রত্যাশা করছে। কিন্তু গালাগালির মাত্রাটা সেইদিন খেলোয়াড়ি বিষয়ে ছিল না। লাখো লাখো নেটিজেন অঙ্কিতাকে তার সঠিক জায়গাটা চিনিয়ে দিতে নেমেছিলেন। সেটা রান্নাঘর!

তার ঠিক দুইদিন আগে এই নেটিজেনরা মনু ভাকরকেহামারি লেড়কিহিসাবে ক্লেইম করেছেন। শুভেচ্ছায় ভরিয়েছেন। দুইদিন পরে এই নেটিজেনের একাংশ ভিনেশকে নিয়ে কেঁদে ভাসাবেন (একাংশ জান্তব উল্লাসও করবেন)। মাঝখানে একজন ব্যর্থ তীরন্দাজকে তারা সঠিক জায়গাটি চিনিয়ে দিলেন কেবলমাত্র।

অঙ্কিতার কথা মনে পড়ছিল দুহাজার পঁচিশের দুসরা নভেম্বর ইণ্ডিয়ার উইমেন্স ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ের দিনে। হরমনপ্রীতরা যখন ট্রফি তুলছেন তখন অঙ্কিতা কী করছিলেন? স্পনসর খুঁজছিলেন? অঙ্কিতার বাবা কোলকাতার একজন দুধওয়ালা। নিঃসীম দারিদ্রের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে অঙ্কিতাকে দুয়ারে দুয়ারে কিটস ভিক্ষা করতে হয়েছিল। শোনা যায় কলকাতার এক স্বনামধন্য নেতার বাড়ির সামনে গোটাদিন ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন একটা কম্পাউণ্ড আর্চারির ধনুক জোগাড় করার জন্য। সাহায্য আসেনি। সেই অঙ্কিতা যখন ঝাড়খণ্ডের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে চলে গিয়েছিলেন তখন বাংলার ক্রীড়াজগত বেশ বিষোদগার করেছিল মনে আছে। যাই হোক, অঙ্কিতার আসল জায়গা বাংলা নয়, ঝাড়খণ্ডও নয়। তার আসল জায়গা চিনিয়ে দিয়েছিলেন নেটিজেনরাই। তা রান্নাঘর!

এই দুর্ভাগ্যের বোঝা যে কত প্রবল তা বোঝার ভার যাকে নিতে হয় সে জানে। ভারতবর্ষে মেয়েদের খেলাধুলায় প্রাথমিক বাধা তিনটি।

১) ছেলেবেলায় স্ব স্ব ক্ষেত্রে কোচিং-এর ব্যবস্থা অতীব নিম্নমানের এবং অবহেলাময়। মেয়েদের গ্রাউন্ড স্পোর্টস কোনওদিনই প্রায়োরিটি পায় না। ছেলেদের কোচিং করানোর পাশাপাশি একটু দেখিয়ে দিলেম গোছের মেন্টালিটি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়।

২) শুনলে একটু অবাক হবেন যে মেয়েদের স্পোর্টস কিটসের দাম অপেক্ষাকৃত বেশি। কেননা তার চাহিদা কম।

৩) পাড়াপড়শির ফিসফাস, আত্মীয় স্বজনের চোখ-রাঙানি এগুলোর কথা ছেড়ে দিন। মূল ধাক্কা আসে বাড়ির ভেতর থেকে। তা হলমেয়েলি গড়ননষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়।

এর বাইরে আরও হাজারটা বিষয়কে সামনে আনা যায় কিন্তু এ তিনটেকেই কেন আনলাম তা একটু বিশদে বলার অপেক্ষা রাখে। প্রথম পয়েন্টের সঙ্গে একটি মেয়ের কেরিয়ার যুক্ত। সে যে বিশেষ প্রশিক্ষণ পেতে চাইছে তা দেওয়ার ব্যাপারে অবহেলা থাকলে প্রথম থেকেই তার নিজের প্রতি এক্সপেক্টেশন কমতে থাকে। বাংলা একদা মহিলাদের খো খো আর কবাডি খেলায় চ্যাম্পিয়ন টিম ছিল। সেই টিমের বেশ কয়েকজন আমার বন্ধু ছিল। তাদের মূল প্রত্যাশা ন্যাশানাল বা ইন্টারন্যাশানালে পার্টিসিপেট করা ছিল না। ছিল একটি সরকারি চাকরি জোটানো। যখন পাড়ার চিন্টু, মন্টু, বল্টুরা রাস্তায় বল পিটিয়ে কেউ সৌরভ কেউ বা বাইচুং হওয়ার স্বপ্ন দেখে তখন জেলাস্তরের সম্ভাবনাময় মহিলা কবাডি প্লেয়ারটি তার নিজের অবস্থান খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে। এর কারণ এই প্রাথমিক অবহেলা।

📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ

দ্বিতীয় বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক চাপ। ভারতে মহিলা ক্রীড়াবিদদরা যে সেক্টর থেকে উঠে আসেন তা মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত অংশের। মধ্যবিত্তের ছুঁৎমার্গ আর কম রিস্ক নেওয়ার প্রবণতার দরুনই এই সেক্টর এখনওবাড়ির মেয়ে-দের এই প্রফেশনে আসাটাকে খুব ভালো চোখে দেখে না। এখন এই অংশের মানুষজনকে যদি প্রাথমিক ক্ষেত্রেই গাদাখানেক অর্থনৈতিক চাপ নিতে হয় তাহলে অঙ্কুরেই আশা ভরসা বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মেয়েদের কোচিং সেন্টারও অপ্রতুল। সম্প্রতি ওড়িশা হকি খেলায় অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। মহিলা হকি দলে জ্যোতি ছত্রী খুবই পরিচিত নাম। রাজমিস্ত্রীর মেয়ে জ্যোতিকে সপরিবারে রাঁচি থেকে রাউরকেল্লা চলে আসতে হয় শুধু খেলার সুব্যবস্থা পাওয়ার জন্য। পানাপোশের হস্টেল থেকে স্টেডিয়াম অব্দি যেতেন পায়ে হেঁটে। একটা নিম্নবিত্ত পরিবারকে আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু দাঁওয়ে লাগিয়ে দিতে হয় মেয়েদের স্পোর্টস কেরিয়ার তৈরি করতে গিয়ে। 


তৃতীয় বিষয় নিয়ে কী আর বলব? এ নিয়ে হাজারো কথা আপনারা ইতিমধ্যেই পড়ে-শুনে ফেলেছেন। একটি মেয়ের মেয়ে হিসাবে আত্মপ্রকাশের দিন থেকেই প্রথাগত চক্ষে ওয়ার্ক সেক্টর সীমিত হতে থাকে। খেলোয়াড়ি চেহারাকে নারীসৌষ্ঠবের পরিপন্থী মনে করেন অধিকাংশ পরিবার। আজ ঝুলন যদি বিশ্ববন্দিত খেলোয়াড় না হয়ে গৃহবধূ হয়ে থাকতেন তাহলে তার পরিচয় কি শুধুঢ্যাঙা মেয়েহয়েই থাকত? ক্রিকেটে ওপেন আর্ম অ্যাকশনে ফাস্ট বোলিং করতে না করা, সাঁতারে ব্রেস্ট স্ট্রোক না করতে বলা এগুলো অত্যন্ত কমন প্র্যাকটিস। কেন? এতে মেয়েলি গড়ন নষ্ট হয়। খেলতে গিয়ে বিয়ে আটকে যাবে এ ভয় বাবা, মায়ের অন্তঃকরণে বাসা বেঁধে থাকে।

এই হল, পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে এই বিশ্বজয় আমাদের, এ কথা বলার যোগ্যতা কীভাবে অর্জন করব তা জানা নেই। আমাদের মেয়েদের জয় বলার মধ্যে যে আত্মশ্লাঘা অনুভব করা যায় তাও এখানে পাওয়ার জো নেই। শত বৈষম্যে ঘেরা ভারতবর্ষেক্রিকেট ইজ এভ্রিওয়ানস গেমদাবী রাখা হরমনপ্রীতরা কোন দিক থেকেআমাদেরমেয়ে হলেন? ২০২৫-র খাদ‍্য সূচকে ভারতের স্থান ১২৩ দেশের মধ্যে ১০২। এই পরিসংখ্যান পুরুষ ক্রিকেট দলের জন্য প্রযোজ্য না হলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে এখনও সমহারে প্রযোজ্য। কেননা উপরেই লিখেছি মেয়েদের ক্রিকেটের সাপ্লাই লাইন এখনও নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসে। অধুনা উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগের মাধ্যমে আয়ের সুযোগবৃদ্ধি বা বার্ষিক পে স্ট্রাকচারের বেশ কিছুটা পরিবর্তনের সুবিধা একদম ক্রিমি লেয়ারই পাচ্ছেন। সাপ্লাই লাইনের ইতরবিশেষ পরিবর্তন  দেখা যাচ্ছে না। আমার বক্তব্য যতটা না ক্রিকেট সম্পর্কে প্রযোজ্য তার চেয়ে অন্য খেলায় মেয়েদের অবস্থান নিয়ে হয়তো বেশি প্রযোজ্য। কেননা মেয়েদের ক্রিকেটে পুঁজির বিকাশ অন্যভাবে মধ্যবিত্তকে প্রলুব্ধ করা শুরু করেছে।

এ কথা আলাদা করে বলে দিতে হয় না যে ভারতবর্ষে ক্রিকেটাররা শুধু পারফর্মার নন। তারা সেলিব্রিটি। তারা ইনফ্লুয়েন্সার। পুরুষ ও মহিলা ক্রিকেট টীম উভয়েই এই সারসত্য খুব ভালো করে বুঝে নিয়েছে। আপনারা লক্ষ্য করবেন তাদের ইনস্টা পেজ। সেখানকার কন্টেন্ট কোনও অংশে প্রথাগত ইনফ্লুয়েন্সারদের তুলনায় কম ঝকমকে নয়। ফ্যাশন গুডস, লাইফস্টাইল, মাঝে মাঝে ট্রাভেল ব্লগ, বিজ্ঞাপন এই সবকিছু দিয়ে সাজানো তাদের পেজ। বিরাটের ইনস্টা ফলোয়ারের তুলনায় বিশ্বে মাত্র দুইজন স্পোর্টস স্টারের ফলোয়ার বেশি। তারা মেসি ও রোনাল্ডো। মেয়ে ক্রিকেটারদের এই সুবিশাল জনপ্রিয়তা না থাকলেও তারা পিছিয়ে নেই। স্মৃতি, জেমাইমা বা হার্লিনরা ইনস্টায় বিপুল ফলোয়ার আর্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। খুব সুচিন্তিতভাবে স্মৃতিকে গ্ল্যামার আইকন করে তোলা হয়েছে। এই ঝকমকে বাজারের টান অমোঘ মধ্যবিত্তের কাছে। তারা আকৃষ্ট হচ্ছে মহিলা ক্রিকেটের প্রতি। এতে সরকারি বদান্যতা কতদূর পাওয়া যাবে সেটা বিষয় নয়। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে আপনাকে শুধুই ক্রিকেটার বা ফুটবলার বা অভিনেতা হলে হবে না। হয়ে উঠতে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উইশ ফুলফিলমেন্টের অংশ। তা এরা হয়ে উঠতে পারছেন। কিন্তু এইভাবে উইমেন্স স্পোর্টসের কতদূর অগ্রগতি হবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকে যায়। শত যোজন দূরে রয়েছেন দীপিকা, অঙ্কিতা, জ্যোতিরা। যেখানে বাজারের বদান্যতা দেখাচ্ছে না সেখানেই এই হতশ্রী দশা বেরিয়ে পড়ে। তবু এই জয় ঐতিহাসিক কেননা তা অন্তত বাজারি ক্ষেত্রকেও আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে আর সবথেকে বড় কথা সম্ভ্রম জাগিয়েছে উইমেন্স স্পোর্টসের প্রতি। এর আগে আসমুদ্র হিমাচল সিন্ধু বা মেরি কমকে নিয়ে মাতোয়ারা হয়েছিল। কিন্তু এরা বড় দূরের মানুষ। ভারতের মতো দেশে এদের জয়গুলো হিমালয় সদৃশ। এতটাই বেমানান যে ছুঁয়ে দেখতে ভয় লাগে। একে তো টিমগেমের আকর্ষণ ভারতবর্ষের সর্বদা বেশি তদুপরি এদের স্ব স্ব ক্ষেত্র ভারতবর্ষে তেমন জনপ্রিয় নয়। তবু সিন্ধু, সাক্ষী বা ভিনেশ যে নিজেদের স্পোর্টসের ক্ষেত্রে আইকন হয়ে উঠতে পেরেছেন তা তৎপরবর্তী সাপ্লাই লাইন দেখলে বোঝা যায়। উইমেন্স ক্রিকেটে এই আলো হাতে চলা আঁধারের যাত্রীদের অন্যতম ছিলেন মিতালি ও ঝুলন। এরাই ইণ্ডিয়ান উইমেন্স ক্রিকেটের এযাবৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ পোস্টার গার্ল। এদের প্রবাদপ্রতিম সাফল্য আজকের হরমনপ্রীতদের উজ্জ্বল করেছে। আশা রাখি একদিন তা শতফুলে বিকশিত হবে।


প্রকাশের তারিখ: ১১-নভেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লিঙ্গ রাজনীতি বিভাগে প্রকাশিত ৩৮ টি নিবন্ধ
১৮-এপ্রিল-২০২৬

০৯-মার্চ-২০২৬

১১-নভেম্বর-২০২৫

২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৫

৩০-মে-২০২৫

২৯-মে-২০২৫

২৮-মে-২০২৫

৩১-মার্চ-২০২৫

২৮-মার্চ-২০২৫