লোকে বলে ড্রাইভিংটা ছেলেদের কাজ

শম্পা নন্দী
এখন এত কোম্পানি এসে গেছে যে, ওদের মধ্যে কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেছে। কে কত কম ভাড়ায় কাস্টমারকে গাড়ি দেবে! এখানেও দেখা যাচ্ছে ১০-১৫ টাকা রেটে ফেয়ার দিচ্ছে কিলোমিটার অনুযায়ী। যেটা আমাদের একদমই পোশাচ্ছে না। যেখানে নন এসি মিনিমাম ২৫ টাকার নিচে হয় না আর, এসি ৩০ টাকার নিচে হওয়ার কথা না— সেখানে আমরা প্রায় ১০-১৫ টাকা করে কম পাচ্ছি কিলোমিটার পিছু। যখন পিক টাইম থাকে— একদম সকাল ৯টা থেকে ১১টা আর সন্ধ্যায় ৬টা থেকে ৭:৩০-৮টা অবধি তাও কিছুটা ভালো রেটে ভাড়া দেয়। কিন্তু তখন তো জ্যামেই আমাদের সময়টা চলে যাচ্ছে। মানে অফিস টাইমেও যে আমাদের খুব একটা পড়তা হচ্ছে তা নয়।

আমার নিজের গাড়ি আমি যখন যেখানে ইচ্ছে চালাতে পারি। আমি ওলা উবের চালাচ্ছি, হয়ে গেল প্রায় ৬ বছর। ফার্স্ট লকডাউনে যখন গাড়ি বুক করেছিলাম তখন গাড়ি পাইনি। তারপর লকডাউন ওঠার পরে গাড়ি পেয়েছি। সেই থেকেই আমি ক্যাব চালাচ্ছি। এর আগে বিভিন্ন রকম কাজ করেছি। প্রথম যখন আমার কাজের দরকার ছিল। তখন মার্কেট সার্ভে করেছি। কম সময়ের জন্য। তখন আমার মেয়ে অনেক ছোটো ছিল। দেড় বছর বয়স। ওকে ঘরে রেখেই আমাকে কাজ করতে হত। সেই সময় আট-দশ ঘণ্টা কাজ করার মতো অবস্থা ছিল না আমার। মার্কেট সার্ভের কাজ তিন-চার বছর করার পর আমি নিজে একটা বিজনেস শুরু করি। ওই জামা কাপড়ের বিজনেস। বাড়িতেই করতাম। এই বিজনেস করতে করতে অনেক বাকি পড়ে যাচ্ছিল। তারপর আস্তে আস্তে এই ড্রাইভিং লাইনে আসি। এখন ওসব বিজনেস বন্ধ। শুধু গাড়ি চালাই। আমার বাড়িতে আপাতত আমি আর আমার মেয়েই থাকি। আমি সেপারেট। মেয়ে কলেজে ভর্তি হল হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে। এখন ওর ফার্স্ট ইয়ার। 

একটা সময় গেছিল অনেক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে। বেঁচে থাকাটাই তখন কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশে মেয়েকে বড়ো করা, পারিপার্শ্বিক চাপ সামলে একটা কাজ করার খুবই চেষ্টা করতাম। আমার দিদি একদিন পেপারে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিল। গাড়ি চালানোর ট্রেনিং। এখানেই সেন্টারটা। মেয়েদের গাড়ির ট্রেনিং দেয়। দিদিই আমাকে এই ট্রেনিং নেওয়ার কথা বলে। চারপাশের নানান সমস্যা কাটিয়ে আমি আর আমার মেয়ে তখন পুরোপুরি একা। শুনেছিলাম ওরা প্রাইভেটে জবও দেয় ট্রেনিং-র পর। তো এই ট্রেনিংটা নিলাম সেন্টারে গিয়ে। ট্রেনিং নিতে নিতেই শুনেছিলাম ওরা একটা পিঙ্ক ক্যাব বার করতে চলেছে কলকাতায়, যেটা মেয়েরা চালাবে। ২০১৯-এ প্রথম ক্যাব বেরল। আমি ক্যাব বুক করলাম তখন। ক্যাব পেতে নানান রকম সমস্যা হচ্ছিল। অ্যাড্রেস, টাইটেলের। এই সমস্যাগুলোর জন্য ক্যাব পেতে সময় লাগছিল। ২০১৯-এ আর পেলাম না। ২০২০ সালে সমস্ত কিছু হল। গাড়ি পেতে পেতে লকডাউন। 

কাজে যাওয়াটা এখন নিজের ওপর। আমরা আমাদের মতো কাজ করতে পারি। তবে এখন আমাদের মোটামুটি আট-নয় ঘণ্টা কাজ না-করলে চলে না। বাজার এখন এতটাই খারাপ হয়ে গেছে। আগে শীতকালটায় ভালো বাজার থাকত। এবছর তো শীতকালেও বাজার খারাপ যাচ্ছে। এই অ্যাপ ক্যাবের লাইন এখন ফাটকা কারবারির মতো হয়ে যাচ্ছে। যার যেদিন লাগছে তো লাগছে। লাগলে হয়তো দেড় হাজার, দু-হাজার হল। নয়তো, সাতশো আটশো। বড়ো জোর হাজার। এর মধ্যেই আমাদের সব কিছু করতে হয়। তেল বলুন, পেপার খরচা। মেন্টেনেন্স তো আছেই আলাদা। এসব মিটিয়েই সংসারের খরচ আবার। একটা করতে গেলে আরেকটা এডজ্যাস্ট করতে হচ্ছে। এখন এভাবেই চলছে। অ্যাপ ক্যাবের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়। আমি এড়িয়ে চলি। এই লাইনে সেফটিটা বড়ো ব্যাপার। সবাই বলে এটা ছেলেদের কাজ। বেশিরভাগ লোক ড্রাইভিংটা ছেলেদের কাজই বলে। তবে এখানে যদি বিপদের কথা বলা যায় তাহলে ছেলেদের বিপদটাই বেশি। তারা রাত বিরাতে যেখানে ইচ্ছে চলে যাচ্ছে। অনেক ঘটনাই আমরা জানি। বছর দুয়েক আগে দূরে নিয়ে গিয়ে গাড়ি চুরির ঘটনাও ঘটছিল খুব। তবে আমি রাত আটটার পরে আর অ্যাপ-ক্যাব চালাই না। যদি পার্সোনাল বুকিং থাকে, চেনা পরিচিত কেউ বুকিং করে সেক্ষেত্রেই আমি রাতে কাজ করি। আর তাছাড়া পুজোর সময়েই শুধু রাতে কাজ করি। তবে, ইদানীং আটটার পরে বাজারও সেভাবে থাকে না আর অ্যাপ ক্যাবে।

সরকারের তরফ থেকে পিঙ্ক ক্যাবের জন্য কোনও সুবিধা পাই না। আগে ২০% কমিশন কাটত। তারপর সেটা বাড়তে বাড়তে ৪০% কখনও ৪৫% ও কেটে নিচ্ছিল। এর জন্য খুবই সমস্যা হচ্ছিল আমাদের। ইনড্রাইভার অ্যাপের ক্ষেত্রে আগে টাকা দিতে হয়। ১৭১ টাকার পাস কিনলে তবেই সারাদিন গাড়ি চালানো যায়। এখানে একটা ভাড়া পেলাম, না অনেকগুলো ম্যাটার করে না। ওই টাকাটা তো দিতেই হবে। বাজার ভালো না-থাকলে ওই টাকাটাও ওঠে না। এখন এত কোম্পানি এসে গেছে যে, ওদের মধ্যে কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেছে। কে কত কম ভাড়ায় কাস্টমারকে গাড়ি দেবে! এখানেও দেখা যাচ্ছে ১০-১৫ টাকা রেটে ফেয়ার দিচ্ছে কিলোমিটার অনুযায়ী। যেটা আমাদের একদমই পোশাচ্ছে না। যেখানে নন এসি মিনিমাম ২৫ টাকার নিচে হয় না আর, এসি ৩০ টাকার নিচে হওয়ার কথা না— সেখানে আমরা প্রায় ১০-১৫ টাকা করে কম পাচ্ছি কিলোমিটার পিছু। যখন পিক টাইম থাকে— একদম সকাল ৯টা থেকে ১১টা আর সন্ধ্যায় ৬টা থেকে ৭:৩০-৮টা অবধি তাও কিছুটা ভালো রেটে ভাড়া দেয়। কিন্তু তখন তো জ্যামেই আমাদের সময়টা চলে যাচ্ছে। মানে অফিস টাইমেও যে আমাদের খুব একটা পড়তা হচ্ছে তা নয়। আমরা এসব নিয়ে ইউনিয়নের তরফে অনেকবার কথা বলতে গেছি কিন্তু সরকার তো আর আমাদের কথা শুনছে না। সাধারণ মানুষের কথাই শুনছে না আর আমরা তো ড্রাইভার আমাদের ক্ষেত্রেও সেম! যখন আন্দোলন করছি তখন দুদিন হয়তো ভাড়া বাড়ছে, তিনদিনের দিন আবার কোম্পানি কোম্পানির মতো চলছে। এই ব্যাপারে সরকার যদি একটু দায়িত্ব নিয়ে হস্তক্ষেপ করে, ড্রাইভারদের ওপর কোম্পানিগুলোর জুলুম বন্ধ করতে চেষ্টা করে তাহলে কোম্পানিগুলোরও তো এসব করার থাকে না। যখন টেবিলের নিচ দিয়ে লেনদেন হয়ে যায় তখন সরকার চুপ থাকে। আর দুরবস্থা দিনে দিনে আমাদের বেড়েই যাচ্ছে। 

রাস্তায় বেরলে পুলিশ যখন ইচ্ছা কেস দিয়ে দিচ্ছে। গাড়ি ধরে কেস দিতে পারছে না ইদানীং কারণ আমদের সাথে কথাবার্তা বলতে হচ্ছে, সবসময় পেড়ে ওঠে না। তো ওরা এখন অনলাইনে কেস দিচ্ছে। রাজা এস. সি. মল্লিক রোডের ওপরে এটা বেশি হচ্ছে। আমাদের তো প্যাসেঞ্জার যেখানে বুক করবেন সেখান থেকেই প্যাসেঞ্জারকে তুলতে হয়। দেখা যাচ্ছে প্যাসেঞ্জার তুলে গাড়ি নিয়ে একটু এগোতেই কেস ঢুকে যাচ্ছে ফোনে। ৫০০ টাকা। প্যাসেঞ্জার বসিয়ে ফিরে এসে আর কথা বলাও সম্ভব হয় না।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

লোন করেই গাড়ি কেনা আমার। সেসব এখন শোধ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু যা উপার্জন করি গাড়ি চালিয়ে, তা দিয়ে সব সময় ঠিক মতো চালাতে পারি না। মেয়ের পড়াশুনার খরচও বেড়েছে। ধার দেনা তো হয়েই যায়। ছোটোখাটো লোন তাই নিতে হয়। এই ধরুন গাড়ি ঠিক করতে ৩০-৪০ হাজার টাকা লেগে যায়। এই টাকা কার থেকেই বা ধার নেব তাই লোন করতেই হয়। সময় মতো ইএমআই দেওয়ার চাপটাও থাকছে। চালিয়ে নিতে হচ্ছে অ্যাডজাস্ট করে।

আমি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে পারিনি। পারিবারিক সমস্যার কারণেই হল না। গ্রামেগঞ্জে যেমন আছে শহরের দিকেও এমন কথার চল আছে, ‘মেয়ে হয়ে জন্মেছে আর এত পড়াশুনা করে কী হবে? বিয়ে দিয়ে দাও!’ এভাবেই আর পড়াশুনাটা করতে পারিনি। বিয়ে হয়ে গেল। আমার যে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল তেমনটা না। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াব তারপর বিয়ে-থা করব এমনই ভাবনা ছিল আমার। গ্রামের দিকেও সম্বন্ধ দেখা চলছিল। আমার একটা ভয় ছিল যে, গ্রামের দিকে মেয়েদের পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। পালিয়ে আসার সুযোগও পাব না। যদি এই অঞ্চলে শহরের মধ্যে বিয়ে হয় তাহলে বোধহয় এমন জিনিস হয়তো বা হবে না। যেহেতু আমার এখানেই জন্ম, এখানেই বড়ো হয়েছি। কিন্তু যার সাথে আমার বিয়ে হল সে তো ছাড়ল না। এমনও দিন গেছে, ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে মনে হয়েছে এই বুঝি আমার শেষ রাত। তবে, মেয়ে হওয়ার পর থেকেই লড়াইটা আমার শুরু হয়। মেয়ে হওয়ার পরে ভেবেছিলাম টর্চারটা কমবে। কিন্তু তা হল না। যেখানে ড্রাইভিংয়ের ট্রেনিংটা নিয়েছিলাম সেখান থেকেই লিগাল অ্যাডভাইসও পাই। যাই হোক, নতুন ক্যাব যখন নিই সে-সময়েই অনেক লড়াইয়ের পর অবশেষে আমাদের সেপারেশন হয়ে যায়। এখন ওখানেই টিন দেওয়া খোলামেলা একটা ঘরে কোনওরকমে থাকি। পারমিশনও দিচ্ছে না যে আমি নিজের জন্য নতুন কিছু করে নিতে পারব! জল বন্ধ করে দেওয়া, কারেন্ট কেটে দেওয়ার মতো অত্যাচারও মাঝে মাঝে সহ্য করে নিতে হয়। গাড়ি চালানো শেখার সময়েও বাধা পেতে হয়েছে আমাকে শ্বশুরবাড়ির থেকে। এই গোটা লড়াইয়ে আমি পাশে পেয়েছি শুধু আমার দিদিকেই। আর এখন শুধু মেয়েটার কথাই ভাবি। আমার তো আর শখ আহ্লাদ হল না। মেয়েটার অন্তত হোক। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। পছন্দ মতো নিজের জীবন বেছে নিক।

[শম্পা নন্দী পেশায় অ্যাপ-ক্যাব ড্রাইভার। বয়স ৪০। থাকেন যাদবপুরের বিজয়গড় অঞ্চলে। গত ছবছর ধরেই তিনি এই পেশার সাথে যুক্ত। কলকাতা শহরে তাঁর মতো অন্তত ২০জন মহিলা আছেন যাঁরা অ্যাপ-ক্যাব চালান। কেউ চালান নিজের কেনা গাড়ি। আবার কেউ কেউ ভাড়া করা গাড়িই চালান। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীদের বুকিংর ভিত্তিতে তাঁরা গাড়ি নিয়ে ছোটেন শহরের নানা প্রান্তে। এই যাত্রায় তাদের নানান অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। সামাল দিতে হয় নানা জুলুম। তা কখনও ক্যাব সংস্থা থেকে তো কখনও সরকারের তরফে। অ্যাপ-ক্যাব চালকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি দীর্ঘ দিনের। এসি ক্যাবে কিলোমিটার প্রতি ৩০ টাকা এবং নন এসি ক্যাবে কিলোমিটার প্রতি ২৫ টাকা ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তাঁরা করছেন। শহরে পুলিশি জুলুম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সরকারি নীতির নানান আছিলায় তাদের পড়তে হচ্ছে সমস্যার মধ্যে। নতুন ট্রাফিক আইন অনুযায়ী অ্যাপের মাধ্যমে জরিমানা না-মেটালে হবে না পারমিট রিনিউ, সিএফ বা গাড়ির ইনসিওরেন্স। কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন পরিবহণ আইনের ফলে ট্রাফিক জরিমানার পরিমাণ বেড়েছে। আমাদের রাজ্যে তা চালু হওয়ার পরে ড্রাইভারদের মধ্যে অসন্তোষ তীব্র হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন রাজ্যের অ্যাপ-ক্যাব ড্রাইভাররা। ক্যাব সংস্থাগুলির কমিশনের হার কমানোর কথাও বলেছে ক্যাব ড্রাইভারদের ইউনিয়ন। নিরাপদ সড়ক এবং রাতে কাজ করার ক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি করেছেন ক্যাব ড্রাইভাররা। ক্যাব সংস্থার খামখেয়ালি নীতির বিরুদ্ধে সরকারি হস্তক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রণের কথা উঠে আসছে তাদের দাবিদাওয়া থেকে।] 

অনুলিখন ও ছবি - শমীক মণ্ডল               

🔍︎পড়ুন আমাদের কথা: 
নিজের ইচ্ছেয় কে যেতে চায়?
আমার গ্রামের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করুক
জমিতে কাজের সঙ্গেই গেয়ে চলেছি ভাওয়াইয়া
ক’বছর বাদে না থাকবে তাঁত, না থাকবে তাঁতি                               


প্রকাশের তারিখ: ১৪-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org