|
মানুষের মার্কস (পর্ব ২)জুলিয়ান বোরচার্ডট |
বিশেষ এক রহস্যজনক সুবিধার কারণে কোনও পণ্যের প্রকৃত মূল্য ৫ পাউন্ড হলেও বিক্রেতা তাকে ৫ পাউন্ড ও ১০ শিলিং-এ বিক্রি করতে সক্ষম হলেন। এর অর্থ হবে ওই পণ্য ১০% অতিরিক্ত দামে বিক্রি হল। এতে বিক্রেতা পণ্যের মূল্যের উপর ১০% মুনাফা করলেন। কিন্তু বিক্রেতা হওয়ার পর সেই একই ব্যক্তি পুনরায় ক্রেতা হয়ে উঠবেন। তখন তিনি ওই পণ্যের অন্য মালিকের মুখোমুখি হলে দ্বিতীয় বিক্রেতা একইরকম সুবিধা ভোগ করবেন। অর্থাৎ, তিনিও পণ্যটি ১০% বেশি দামেই বিক্রি করবেন। ফলে বিক্রেতা হিসাবে ১০ শিলিং মুনাফা করলেও একই ব্যক্তি ক্রেতা হিসাবে ১০ শিলিংই হারালেন। বাস্তবে এমন প্রক্রিয়ার মূল কথা হলস যে কোনও পণ্যের বেচাকেনার সময়ই এক মালিক আরেক মালিককে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় ১০% বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে। অথচ প্রতিবারই মনে হচ্ছে যেন পণ্য প্রকৃত মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে। |
মুখবন্ধ ২য় অধ্যায় যে কোনও পণ্য উৎপাদনের জন্যই পুঁজিপতি (মালিক)-কে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। আলোচনার সুবিধার্থে ধরা যাক সেই পরিমাণ হল ৫ পাউন্ড। কাঁচামাল ও অন্যান্য সামগ্রীর দাম, মজুরি, কারখানার কাঠামো, বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও মেশিনের ক্ষয় বাবদ খরচ ইত্যাদি, অর্থাৎ পণ্যের উৎপাদনী ব্যয় ঐ পরিমাণে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরও ধরা হল, বিক্রির সময় সেই পণ্যের দাম ৫ পাউন্ড ১০ শিলিং। এবার বিক্রয়মূল্যকে পণ্যের প্রকৃত মূল্য বলে মেনে নেওয়ার অর্থ হবে — উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও ঐ বাড়তি ১০ শিলিং মূল্যের কোনও শিকড় নেই বা এমন কোনও সূত্র নেই যাকে ওর ভিত্তি হিসাবে গণ্য করা চলে। পণ্য উৎপাদনের গোটা প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যাবতীয় কিছুর জন্য পুঁজিপতি (মালিক)-র খরচ যদি ৫ পাউন্ডই হয়, তবে এই অতিরিক্ত মূল্যের কোনও ভিত্তি থাকে না। যার কোনও ভিত্তি নেই অথচ সে নির্মিত হচ্ছে, এমন কিছু মানবিক যুক্তিবোধে টেকে না। সে জন্যই দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনীতিবিদরা বলে এসেছেন, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পণ্যের মূল্য কখনও বাড়ে না। পণ্য উৎপাদনের পূর্বে বিভিন্ন সামগ্রীর মোট মূল্য এবং উৎপাদনের শেষে পুঁজিপতির মালিকানাধীন পণ্যের মূল্য সমান হয়। আমাদের হিসাব মতো তাহলে উৎপাদনের আগে ও পরে মূল্য ওই এক, অর্থাৎ ৫ পাউন্ড। তা হলে বিক্রির সময় মালিকের নির্ধারিত দামে ওই ১০ শিলিং উদ্বৃত্ত মূল্যের ভিত্তি কি? কেনাবেচার সময় বিক্রেতা থেকে খরিদ্দারের হাতে যাওয়া পর্যন্ত কোথাও মূল্যে কোনওরকম ফেরবদল হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তেমনটা ঘটলে পুনরায় ভিত্তিহীন কোনও কিছুর সৃষ্টিতে সম্মতি জানাতে হয়। এ সমস্যার সমাধানে দুটি পথ রয়েছে। একপক্ষের মত হল, ক্রেতার জন্য পণ্যের মুল্য সবসময়ই বিক্রেতার তুলনায় বেশি। উদ্বৃত্ত মূল্যের ব্যাখ্যায় এমন যুক্তি ক্রেতার চাহিদাকে ভিত্তি করে নির্মিত, বিক্রেতার বেলায় এমন কোনও চাহিদা না থাকার অজুহাত দেখিয়ে এহেন যুক্তি নিজেকে আরও গুছিয়ে পেশ করে। দ্বিতীয়পক্ষের বক্তব্য হল, পণ্যের মূল্য আর দাম একেবারেই আলাদা বিষয়। বেচাকেনার সময় উদ্বৃত্ত মূল্যের সমতুল্য কোনও পণ্য ব্যতিরেকেই খরিদ্দারকে বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য খরিদ করতে হয়। ‘বাণিজ্য ও সরকার’ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে ১৭৭৬ সালে ফরাসি অর্থনীতিবিদ কনডিলাক একটি প্রবন্ধ লেখেন। সে লেখায় উল্লেখ রয়েছে- পণ্য বিনিময়ের সময় সমান মূল্যের মধ্যে আদানপ্রদান ঘটে বলে ধরে নেওয়াটা আসলে একটি ভ্রান্ত ধারণা। এর বিপরীতটিই সত্য। বিনিময়ের ক্ষেত্রে দুতরফ থেকেই যে মূল্য দেওয়া হয় তা প্রকৃত মূল্যের চাইতে কম অর্থাৎ দুদিক থেকেই যা পাওয়া হয় তার চাইতে কিছুটা বেশিই দেওয়া চলে। যদি প্রকৃত মূল্যের নিরিখে বিনিময় চলতে তাহলে হয় কারোরই মুনাফা বলে কিছু থাকবে না। আর নয়তো দুতরফেই একই হারে মুনাফা হবে। কেন এমনটা ঘটে? কারণ পণ্যের মূল্য প্রকৃত অর্থে মানুষের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে। কোনও একজনের জন্য একটি পণ্যের প্রতি যে চাহিদা অন্যের জন্য তা আলাদা, বেশি কিংবা কম। নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী কোনও পণ্যের অধিকার পেতে আমরা এমন এক বা একাধিক পণ্যকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে এড়িয়ে যাই যেগুলি আমাদের বিবেচনায় মূল্যহীন। আসলে আমরা যা করি তা হল, নিজেদের চাহিদা অনুসারে বেশি মুল্যের অধিকার পেতে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের অধিকারটি ছেড়ে দেওয়া। এ হল পাটিগণিতীয় যুক্তির এক অপূর্ব উদাহরণ! দু’জন ব্যক্তি যখন নিজেদের মধ্যে কোনওকিছু আদান-প্রদান করে তখন কি তাদের প্রত্যেকেই অপরজনকে নিজের প্রাপ্যের চাইতে বেশি কিছু দেয়? তেমন কিছু হলে বলতে হবে যদি আমি দর্জির থেকে এক পাউন্ডের বিনিময়ে একটি কোট কিনি, তবে যতক্ষণ ঐ কোট দর্জির কাছে থাকে ততক্ষণ তা এক পাউন্ডের চাইতে কম মূল্যের পণ্য। কিন্তু আমার কাছে আসার পরই কোটের মূল্য এক পাউন্ডে পৌঁছে যায়! যদি একে অস্থায়ী যুক্তি হিসাবেও স্বীকৃতি দিই যে, কোনও পণ্যের মূল্য আসলে নির্ভর করে খরিদ্দারের চাহিদার উপর (ওই মূল্য ব্যবহারিক নাকি বিনিময়ের নিমিত্ত সেই বিভ্রান্তি নিয়ে পরে আলোচনা হবে) তাহলেও এমন যুক্তিতে কোনও সমাধান হয় না। কারণ ক্রেতার জন্য ঐ কোট টাকার অংকের তুলনার বেশি মূল্যবান হলে বিক্রেতার জন্যও টাকার পরিমাণ কোটের চাইতে বেশি মূল্যবান হবে। এবার এ সমস্যার আরেকটি দিক পর্যালোচনা করা যাক। যদি অনুমান করে নেওয়া হয় যে সাধারণভাবে সমস্ত পণ্যই নিজের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়, তাহলে তখনকার পরিণতি আরও আশ্চর্যজনক হবে। ধরা যাক, বিশেষ এক রহস্যজনক সুবিধার কারণে কোনও পণ্যের প্রকৃত মূল্য ৫ পাউন্ড হলেও বিক্রেতা তাকে ৫ পাউন্ড ও ১০ শিলিং-এ বিক্রি করতে সক্ষম হলেন। এর অর্থ হবে ওই পণ্য ১০% অতিরিক্ত দামে বিক্রি হল। এতে বিক্রেতা পণ্যের মূল্যের উপর ১০% মুনাফা করলেন। কিন্তু বিক্রেতা হওয়ার পর সেই একই ব্যক্তি পুনরায় ক্রেতা হয়ে উঠবেন। তখন তিনি ওই পণ্যের অন্য মালিকের মুখোমুখি হলে দ্বিতীয় বিক্রেতা একইরকম সুবিধা ভোগ করবেন। অর্থাৎ, তিনিও পণ্যটি ১০% বেশি দামেই বিক্রি করবেন। ফলে বিক্রেতা হিসাবে ১০ শিলিং মুনাফা করলেও একই ব্যক্তি ক্রেতা হিসাবে ১০ শিলিংই হারালেন। বাস্তবে এমন প্রক্রিয়ার মূল কথা হলস যে কোনও পণ্যের বেচাকেনার সময়ই এক মালিক আরেক মালিককে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় ১০% বেশি দামে বিক্রি করে চলেছে। অথচ প্রতিবারই মনে হচ্ছে যেন পণ্য প্রকৃত মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে। এতে বিনিময়ের প্রত্যেক পর্যায়ে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে অথচ বিনিময়ের সময় প্রকৃত মূল্যের সম্পর্কটি অপরিবর্তিত থাকছে। এবার ঠিক এর বিপরীতটা ধরা যাক। অর্থাৎ ধরা যাক যে, একমাত্র ক্রেতারই ঐ বিশেষ সুবিধা রয়েছে যাতে সে পণ্যকে প্রকৃত মূল্যের চাইতে কম দামে খরিদ করতে পারে। এক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেওয়ারও দরকার পড়ে না যে ওই ক্রেতাও পরে বিক্রেতার ভূমিকা নেবে। ক্রেতা হওয়ার আগেও সে বিক্রেতাই ছিল। ইতিমধ্যেই বিক্রেতা হিসাবে সে ১০% ক্ষতি স্বীকার করেছে, এবার ক্রেতা হয়ে ১০% মুনাফা করল। এভাবে সবকিছু একই রয়ে যায়, প্রকৃত অর্থে মুনাফা বা ক্ষতি কোনওটাই হয় না। এমন আলোচনায় কেউ কেউ আপত্তি জানাতে পারেন। তারা বলবেন, একবার ক্ষতি আরেকবার মুনাফার বিষয়টি শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই ঘটে যারা ক্রেতা ও বিক্রেতা দুইই। কিন্তু এমনও তো অনেকে রয়েছেন যাদের বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। এ যুক্তিতে কারা বিভ্রান্ত হবেন? যারা বিশ্বাস করবেন যে, মূল্যবৃদ্ধি কেবলমাত্র দাম বাড়লে তবেই ঘটে অথবা যখন বিক্রেতা পণ্যকে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য কোনও বিশেষ অধিকার পায়। এমন যুক্তিতে তাদেরই গুলিয়ে যায় যারা ধরে নেয় যে, এমন একটি শ্রেণি আছে যারা শুধুই খরিদ্দার, যারা কখনও কিছু বিক্রি করে না- অর্থাৎ যারা শুধুই ভোগ করে চলে এবং কিছুই উৎপাদন করে না। কিন্তু এমন কোনও শ্রেণি যারা শুধুই খরিদ্দার- তাকে মেনে নেওয়ার অর্থ হবে পণ্যের প্রকৃত মালিকদের থেকে কোনওরকম বিনিময় ব্যতীত অনেকটা পবিত্র দান হিসাবে পণ্যের অধিকার একজনের থেকে আরেকজনের হাতে চলে আসছে। এর সাথে আরও ধরে নিতে হবে যে, এমনটা ঘটছে হয় আইনি অধিকারের জোরে আর নয়তো কোনও অনৈতিক কৌশলে। ওই প্রকার খরিদ্দার শ্রেণিকে যদি প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হয়, তবে তার মানে দাঁড়াবে বিনামূল্যে দেওয়া অর্থের একটা অংশকে প্রতারণার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। একে আংশিক ক্ষতিপূরণের কৌশল বলা যায়। এরও উদাহরণ মেলে, প্রাচীনকালে এশিয়া মাইনরের শহরগুলি থেকে প্রতি বছর রোমকে কর বাবদ অর্থ দিতে হত। সেই অর্থ দিয়েই রোম তাদের থেকে বিভিন্ন পণ্য খরিদ করত— তাও আবার বেশি দামে। এমন বাণিজ্যের ফলে এশিয়ার মানুষজনের থেকে জোরপূর্বক আদায় করা সম্পদের কিছু পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে নিতে পারলেও, শেষমেশ তারাও প্রতারিতই হতো। কারণ অমন কায়দায় বিনিময়ের আগে কিংবা পরে পণ্যের দাম আদতে তাদের নিজেদেরই টাকায় মেটানো হচ্ছিল। এভাবে কোনও দিনও সম্পদের বৃদ্ধি ঘটে না, উদ্বৃত্ত মূল্যও তৈরি হয় না। মালিক বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করতে পারে- একে কিন্তু আমরা অস্বীকার করছি না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় নির্দিষ্ট কোনও পণ্যের মালিক (ধরা যাক ‘ক’) যদি যথেষ্ট চতুর হয় তবে সে ‘খ’ বা ‘গ’-কে (এরাও অন্যান্য পণ্যের মালিক) ঠকাতে পারে। এমনও হতে পারে যে যাবতীয় প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ‘খ’ ও ‘গ’ ওই ক্ষতির প্রতিশোধ নিতে অক্ষম। ধরা যাক ‘ক’ নিজের পণ্য বিক্রির সময় ‘খ’-কে ২ পাউন্ড দাম ধার্য করেছে এবং তার বিনিময়ে ‘খ’-এর থেকে ২ পাউন্ড ১০ শিলিং মূল্যের পণ্য সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ ‘ক’ নিজের ২ পাউন্ড-কে ২ পাউন্ড ১০ শিলিং-এ রূপান্তরিত করেছে। একে অন্যভাবে বলা যায়, কম পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ‘ক’ বেশি পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে। বিষয়টা আরও কিছুটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যাক। বিনিময়ের আগে ‘ক’-এর কাছে ছিল ২ পাউন্ড মূল্যের এবং ‘খ’-এর কাছে ছিল ২ পাউন্ড ১০ শিলিং মূল্যের পণ্য। বিনিময়ের আগে এ দুটি পণ্যের মোট মূল্য ৪ পাউন্ড ১০ শিলিং। বিনিময়ের পরেও মোট মূল্য সেই ৪ পাউন্ড ১০ শিলিং-ই থাকে। বিনিময়ের ফলে বাজারে চলমান মূল্যের মোট পরিমাণে এতটুকুও বৃদ্ধি ঘটেনি। কেবলমাত্র বিনিময়ের আগে ‘ক’ ও ‘খ’-এর মধ্যে মোট মূল্যের যে বিভাজন ছিল তা উল্টে গেছে। বিনিময়ের ভান না করে ‘ক’ যদি সরাসরি ‘খ’-এর কাছ থেকে ১০ শিলিং চুরি করত তাহলেও ঐ পরিবর্তন ঠিক একই রকম হত। স্পষ্টই বোঝা যায়, পণ্যের মূল্যের মোট পরিমাণ শুধুমাত্র বিতরণের পদ্ধতি বদলে দিয়ে বাড়ানো যায় না। ঠিক যেমন এক টুকরো সোনার মুদ্রার বিনিময়ে যদি কোনও ইহুদি ১৮শ শতকের একটি তামার মুদ্রা বিক্রি করে তখনও সে দেশের মূল্যবান ধাতুর মোট পরিমাণ কিছুতেই বাড়াতে পারে না। কোনও দেশেই পুঁজিপতি শ্রেণি সমষ্টিগতভাবে নিজেদেরই ঠকাতে পারে না। সুতরাং বিষয়টিকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে যেভাবেই দেখি না কেন ফলাফল একই থাকে। সমান বা অসমান মূল্যের পণ্যের মধ্যে আদান-প্রদানে কোনও উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি হয় না। পণ্য বিপণন বা আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় নিজে থেকে কোনও নতুন মূল্য সৃষ্টি করে না। তাহলে কোনও একটি পণ্য বিক্রির পর মূল্যের যে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়, তাকে কোনও ভাবেই ওই বিক্রয় থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলা চলে না। এই মূল্যবৃদ্ধিকে পণ্যের দাম ও তার প্রকৃত মূল্যের মধ্যে পার্থক্যের ফল হিসাবেও ব্যাখ্যা করা যায় না। দামের সঙ্গে মূল্যের অমিল যদি সত্যিই ঘটে থাকে তবে সেই দামকে প্রকৃত মূল্যের স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ এমন ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনাজনিত কোনও ত্রুটি হিসাবেই বাদ দিতে হবে যাতে বিষয়টি আমাদের বিভ্রান্ত করতে না পারে। এমন প্রক্রিয়া কেবলমাত্র তাত্ত্বিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাজারদরে নিয়মিত যেরকম ওঠানামা চলে, সেগুলি একে অন্যকে ভারসাম্যহীন না করে ধীরে ধীরে পরস্পরকে বাতিল করে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি গড় দাম নির্ধারণ করে। ঐ দাম মূলত ওঠানামার প্রক্রিয়ায় অন্তর্নিহিত নির্ধারক নীতিকেই প্রকাশ করে। দীর্ঘমেয়াদি যে কোনও বাণিজ্যিক উদ্যোগে ব্যবসায়ী বা পুঁজিপতির জন্য দিকনির্দেশ করে ওই গড় দাম। সফল ব্যবসায়ী মাত্রই জানেন এক দীর্ঘ সময়কে একসাথে বিচার করলে বাস্তবে যাবতীয় পণ্যই গড় দামে বিক্রি হয়, না বেশি-না কম। আর তাই মুনাফার উৎস অর্থাৎ উদ্বৃত্ত মূল্যের সৃষ্টি অবশ্যই এমন একটি ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করতে হয় যেখানে ধরে নেওয়া হবে যাবতীয় পণ্য প্রকৃত মূল্যেই বিক্রি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকেই উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তিকে বিশ্লেষণ করা উচিত। পণ্যটি প্রস্তুত হওয়ার মুহূর্তেই, প্রথম বিক্রেতার হাত ছাড়া হওয়ার পূর্বেই সেটির মূল্য ঠিক সেই পরিমাণ হওয়া উচিত যা শেষ ক্রেতা অবধি দাম বাবদ পরিশোধ করবে। অর্থাৎ পণ্যের মূল্য অবশ্যই পণ্য প্রস্তুতকারকের উৎপাদন খরচের চাইতে বেশি হতে হবে। পণ্য উৎপাদনের সময়ই তার মধ্যে একটি নতুন মূল্য সৃষ্টি হতে হবে। এ যুক্তিই আমাদের উপলব্ধি করায়- পণ্যের মূল্য কীভাবে সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষান্তরঃ সৌভিক ঘোষ প্রকাশের তারিখ: ২০-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |