সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মানুষের মার্কস (পর্ব ১)
জুলিয়ান বোরচার্ডট
১৮৬৭ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ‘পুঁজি’র প্রথম খণ্ড ছেপে বেরোয়। জার্মান ভাষায় হাজারখানেক কপিই ছাপা হয়েছিল। মার্কসের কথায় সেই বই ‘আজ অবধি বুর্জোয়াদের মাথা লক্ষ্য করে ছোঁড়া সবচাইতে বড় মিসাইল’। বইয়ের প্রতিটি পাতার প্রুফ দেখেছিলেন মার্কস নিজেই। সেকাজ শেষ হয়েছিল ১ আগস্ট, রাত দুটোয়। শেষ করেই এঙ্গেলসকে চিঠি লিখতে বসলেন- ‘শেষ পাতার প্রুফ দেখা এই সবে মিটল। অতএব, প্রথম খণ্ডটি ছাপা হচ্ছে… এ কাজ শেষ করার জন্য যদি সত্যিই কাউকে ধন্যবাদ দিতে হয় তবে তা একান্তই তোমার প্রাপ্য, আর কারোর না।’ পুঁজি এক অর্থে মার্কসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। মানবিক জীবনীশক্তির অপূর্ব ও সর্বোচ্চ ব্যবহার করেই একে লেখা।

মুখবন্ধ
প্রকৃতি বিজ্ঞান যেভাবে ‘কেন এমন হয়?’- এই বুনিয়াদি প্রশ্নকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখে প্রথমে গ্যালিলিও, পরে নিউটনীয় বলবিদ্যার পরিসর পেরিয়ে কোয়ান্টাম মেক্যানিক্সের স্তরে উন্নীত হয়েছে, ঠিক সেভাবেই ‘সমান সুযোগের সমাজব্যবস্থা’র পক্ষে যুক্তিসঙ্গত রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের অন্যান্য ধারাসমূহ সময়োপযোগী কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর মাটি ছাড়িয়ে মহাকাশে পাড়ি দেবার কিংবা বস্তুকে ভাঙতে ভাঙতে আণবিক জগতে প্রবেশ করার পরেও যেমন প্রকৃতি বিজ্ঞানের মূল প্রশ্ন ‘কেন এমন হয়?’- রয়ে গেছে তেমনই যেকোনও সমাজবিজ্ঞানের মূল সমস্যা আজও ‘কেন এমন হল?’-কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। প্রকৃতি-বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের মিল এবং অমিলের জায়গা এটাই। ‘কেন এমন হল’- ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্ন করার হিম্মত দেখিয়েছিলেন কার্ল মার্কস। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথেই ধারণাসম্মত জ্ঞান এবং বিজ্ঞান-যুক্তি-প্রতিযুক্তিসম্মত জ্ঞানের যথাযথ সংশ্লেষে নির্মিত হল ইতিহাসের বিজ্ঞান- ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। পুঁজি গ্রন্থের সার কথা যদি হয় ‘উদ্বৃত্তের নির্মাণ ও তার অধিকার সম্পর্কে ধারণা’ তবে সেই উপলব্ধির সবচেয়ে উপযোগী প্রয়োগ হল ইতিহাসের সত্যকে প্রকাশ করায়। মার্কস সে কাজের শুরু করেছেন, সেই ধারা মেনেই আমাদের এগোতে হয়।
১৮৬৭ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ‘পুঁজি’র প্রথম খণ্ড ছেপে বেরোয়। জার্মান ভাষায় হাজারখানেক কপিই ছাপা হয়েছিল। মার্কসের কথায় সেই বই ‘আজ অবধি বুর্জোয়াদের মাথা লক্ষ্য করে ছোঁড়া সবচাইতে বড় মিসাইল’। বইয়ের প্রতিটি পাতার প্রুফ দেখেছিলেন মার্কস নিজেই। সেকাজ শেষ হয়েছিল ১ আগস্ট, রাত দুটোয়। শেষ করেই এঙ্গেলসকে চিঠি লিখতে বসলেন- ‘শেষ পাতার প্রুফ দেখা এই সবে মিটল। অতএব, প্রথম খণ্ডটি ছাপা হচ্ছে… এ কাজ শেষ করার জন্য যদি সত্যিই কাউকে ধন্যবাদ দিতে হয় তবে তা একান্তই তোমার প্রাপ্য, আর কারোর না।’ পুঁজি এক অর্থে মার্কসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। মানবিক জীবনীশক্তির অপূর্ব ও সর্বোচ্চ ব্যবহার করেই একে লেখা। এমন কাজের শেষেও মার্কস ভোলেননি, তাঁর কাজ শুধুই তাঁর কৃতিত্ব না। জেনি’র প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, বাকি সবই এঙ্গেলসের জন্য। ফ্রেডরিক ছিলেন তাঁর সেই বন্ধু ও সহযোদ্ধা যিনি তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বদা যেকোনও ত্যাগ করতে তৈরি ছিলেন। তাই পুঁজি শুধু চলতি সমাজব্যবস্থার আকর সমালোচনাই নয়, মার্কসকে উপলব্ধি করতেও শেষ অবধি ওটাই ক্যাপিটাল।
সাধারণ অর্থে যাকে পাঠকমহল বলে সেখানে তো বটেই, এমনকি মার্কসবাদীদের মধ্যেও মার্কসের লেখা ‘পুঁজি’-র কদর যতটা, সচেতন চর্চা তার তুলনায় কিছুটা কমই। রাজনৈতিক অর্থনীতি আলোচনায় মার্কসের কলমে মানবসমাজের ইতিহাস, চিরায়ত সাহিত্য, সমকালীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আইনের বহুবিধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব যেমন ঐ বইটিকে যত্ন করে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি, তেমন না পড়ে ফেলে রাখার অজুহাতও। অনেকেই সে বাধা পেরিয়ে সকলের সুবিধার্থে মার্কসের লেখাকে সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। কার্ল কাউটস্কি-র মতো মার্কসবাদী পণ্ডিতও সে কাজে হাত দিয়েছিলেন, পুঁজির প্রথম খণ্ডের সরল সংস্করণ (পিপল’স এডিশন অফ মার্কস’স ক্যাপিটাল) করতে গিয়ে তিনি এবং এক্সটাইন জার্মান ভাষায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখে ফেলেন। ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডকে একত্রে সরল ভাষায় করার কাজে তাদের দুই হাজার পৃষ্ঠা প্রয়োজন বলে স্বীকার করে নেন। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই জার্মান লেখক জুলিয়ান বোরচার্ডট নিজেকে কুড়ি বছর সময় দিয়েছিলেন, তারই ফলশ্রুতি পিপল’স মার্কস। মূল বইটি ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি, ১৯২১ সালে তারই ইংরেজি অনুবাদ প্রকশিত হয় লন্ডন থেকে, অনুবাদ করেন স্টিফেন এল ট্রাস্ক। বাংলা ভাষান্তরের জন্য আমরা সেই ইংরেজি সংস্করণটিকেই ব্যবহার করছি।
১ম অধ্যায়
পণ্য, দাম ও মুনাফা
রাজনৈতিক অর্থনীতি হল মানবসমাজে অর্থনৈতিক সরবরাহ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি বিষয়, এই সরবরাহ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত পণ্যসমূহ মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ঐ প্রক্রিয়া একান্তরূপেই পণ্য বেচা-কেনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এ ব্যবস্থায় পণ্যের খরিদ্দার হয় পণ্যের মালিক, খরিদের সময় ব্যবহৃত অর্থ খরিদ্দারের আয়ের অংশবিশেষ। আয়ের বিভিন্ন প্রকার থাকলেও একে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা চলে।
ক) বছর শেষে পুঁজিপতির হাতে বিনিয়োগকৃত পুঁজি যে মুনাফা এনে দেয়।
খ) জমির মালিক নিজের মালিকানাধীন জমির ভাড়া বাবদ যা পায়।
এবং গ) স্বাভাবিক কর্মক্ষম অবস্থায় নিজের শ্রমশক্তি ব্যবহার করে শ্রমিক মজুরি হিসাবে যতটুকু পায়।
এইভাবে পুঁজিপতির জন্য পুঁজি, জমির মালিকের জন্য জমি এবং শ্রমশক্তি অথবা শ্রমিকের নিজের গতর তার জন্য— আলাদা আলাদা তিনটি আয়ের উৎস হিসেবে দেখা দেয়। এই তিন উৎস থেকে যথাক্রমে মুনাফা, ভাড়া ও মজুরি আসে। এ সমস্ত আয় দেখতে অনেকটা তিনটি গাছ থেকে পাওয়া তিনটি ফলের মতো, যেগুলি কখনও শুকিয়ে যায় না। প্রতিবছরই ফল ভোগ করা চলে। ঐ তিনটি গাছই সমাজের তিনটি শ্রেণির বার্ষিক আয়ের উৎস: পুঁজিপতি শ্রেণি, জমিদার শ্রেণি এবং শ্রমজীবী শ্রেণি। যে সম্পদ সমস্ত আয়ের উৎস, তা তিনটি ভিন্ন এবং স্বাধীন উৎস থেকে আসছে বলেই মনে হয়: যথা, পুঁজি, জমি বাবদ ভাড়া ও শ্রম।
কিন্তু অর্থনৈতিক পণ্যসম্ভারের যোগানে প্রত্যেক শ্রেণির আয়ের পরিমাণই যে একমাত্র নির্ধারক উপাদান এমন নয়। ঐ সকল পণ্যের দামও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক উপাদান হিসেবে কাজ করে; আর দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়— এ প্রশ্নটি তাই অর্থনীতিবিদদের জন্য সর্বদাই এক গভীর অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম দর্শনে প্রশ্নটি খুব একটা জটিল কিছু নাও মনে হতে পারে। যদি আমরা সার্বিক শিল্পোৎপাদনের মধ্যে থেকে কোনও একটি উৎপাদিত পণ্যকে বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যাবে যে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে উৎপাদকের দ্বারা পরিচালিত নির্দিষ্ট শিল্পক্ষেত্রে চলতি মুনাফার হারটি যোগ করেই পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। অতএব, পণ্যের দামটি নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর-
১) উৎপাদন ব্যয়,
এবং
২) মুনাফার পরিমাণ।
কোনও একটি নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনের জন্য উৎপাদক যাবতীয় যা কিছু খরচ করেন, তাকেই তিনি উৎপাদন ব্যয় হিসেবে গণ্য করেন। এ ব্যয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে প্রথমত কাঁচামাল ও অন্যান্য সহায়ক উপাদানের জন্য খরচ (যেমন তুলো, কয়লা ইত্যাদি); আরও থাকে যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম এবং কারখানা নির্মাণের জন্য ব্যয়। দ্বিতীয়ত, এতে অন্তর্ভুক্ত হয় জমি বাবদ ভাড়া (কারখানার জমি); এবং তৃতীয়ত, শ্রমিকদের দেয় মজুরি।
এভাবে, কোনও এক উৎপাদকের উৎপাদন ব্যয়কে আমরা প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করতে পারি-
১) উৎপাদনের উপকরণ (যেমন কাঁচামাল, উৎপাদনে সহায়ক উপাদানসমূহ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম এবং কারখানার কাঠামো);
২) জমি বাবদ ভাড়া (কারখানা মালিকের নিজস্ব জমির উপর নির্মিত হলেও ভাড়ার হিসাব ধরে নেওয়া হয়);
৩) মজুরি।
এই তিন ভাগের (উৎপাদনের উপকরণ, জমি বাবদ ভাড়া ও মজুরি) আরও গভীর বিশ্লেষণ করলে আমরা কিছু অপ্রত্যাশিত জটিলতার সম্মুখীন হই। সবার প্রথমে মজুরির বিষয়টি বিবেচনা করা যাক। মজুরি যদি বেশি হয়, তাহলে উৎপাদনের মোট ব্যয় এবং তার ফলস্বরূপ উৎপাদিত পণ্যের দামও বেশি হবে; আবার মজুরি কম হলে, উৎপাদন ব্যয় ও উৎপাদিত পণ্যের দাম কম হবে। কিন্তু প্রশ্ন হল মজুরির হার কীভাবে নির্ধারিত হয়? শ্রমশক্তি নিজেকে বাজারে এনে হাজির করেছে এমন এক অবস্থার কথা ধরে নেওয়া যাক। শ্রমশক্তির এই যে চাহিদা তা কোথা থেকে আসে? ঐ চাহিদা আসে পুঁজিপতি (মালিক)-র কাছ থেকেই, যিনি নিজের ব্যবসার জন্য শ্রমিক খুঁজছেন। তাই বাজারে শ্রমশক্তির চাহিদা উচ্চ থাকলে অর্থাৎ শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেলে বোঝা যায় যে পুঁজির বৃদ্ধি ঘটেছে। তাহলে কী কী নিয়ে পুঁজি গঠিত হয়? গঠিত হয় অর্থ ও পণ্য দ্বারা। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দেখা যাবে অর্থ নিজেও এক ধরনের পণ্য (এ প্রসঙ্গে পরে আমরা বিশদে আলোচনা করব), আর তাই সহজ কথায় বলা চলে— পুঁজি কেবলমাত্র পণ্য দিয়েই গঠিত হয়। ঐ সমস্ত পণ্যের মূল্য যত বেশি, পুঁজির পরিমাণও তত বেশি; ফলে তার উৎপাদনে জরুরি শ্রমশক্তির চাহিদাও ততটাই বেশি হয়। এই পরিস্থিতি প্রত্যক্ষরূপে মজুরির হারে এবং পরোক্ষরূপে উৎপাদিত পণ্যের চূড়ান্ত দামের উপর প্রভাব দেখায়। দেখা যাক— যে সমস্ত পণ্য পুঁজি গঠন করে, সেগুলির মূল্য বা দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়? ঐ মূল্য (বা দাম) নির্ধারিত হয় তাদের উৎপাদনে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, তার উপর ভিত্তি করে। আর সেই উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে পুনরায় মজুরি হিসাব করতে হয়! পণ্যের দাম নির্ধারণের এমন তত্ত্ব অনুযায়ী লম্বা হিসাবের শেষে দেখা যায় মজুরির হার নির্ধারিত হচ্ছে মজুরির হার এবং পণ্যের দাম নির্ধারিত হচ্ছে পণ্যেরই মূল্য দ্বারা!
এর বিকল্প হিসাবে কখনও যুক্তি হাজির করা হয় এই বলে যে মজুরি নির্ধারিত হয় শ্রমিকের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দামের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু ঐ খাদ্যসামগ্রীও তো পণ্যই এবং তাদের দামও আংশিকভাবে নির্ধারিত হয় মজুরির দ্বারাই। ফলে এমন ব্যখ্যার ভ্রান্তিটি সহজেই স্পষ্ট হয়।
উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিতীয় উপাদান হল উৎপাদনের উপকরণ। বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই বলা যায় তুলো, যন্ত্রপাতি, কয়লা ইত্যাদি সমস্তই হল পণ্য এবং এদের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা প্রযোজ্য যেমনটি শ্রমিকের খাদ্য বা মালিকের বুনিয়াদি পণ্য বা পুঁজির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
এভাবে যখনই দাম ব্যাখ্যা করার জন্য উৎপাদন ব্যয়ের ধারণার আশ্রয় নেওয়া হয়, তখনই দেখা যায় প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়েছে। এ পথে এগোলে মূলত এমন এক ফলাফলে গিয়ে থামতে হয় যেখানে পণ্যের দাম নির্ধারিত হচ্ছে পণ্যেরই দাম ব্যবহার করে!
দাম হিসাব করার সময় উৎপাদকরা সাধারণত যেটা করেন তা হল উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে মুনাফার চলতি হারকে যোগ করে নেওয়া। এমন পদ্ধতির সুবাদে মনে হয় যাবতীয় জটিলতা যেন দূর হয়ে গেল। কারণ এ হিসাবে যে হারে মুনাফা যোগ করা হয় ঐ শতকরা হার (বা মুনাফার হার) আসলে সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রে চলতি হার, আর তাই ঐ হারের পরিমাণ উৎপাদকদের জানা থাকে। অবশ্য কখনও কখনও বিশেষ কোনও পরিস্থিতিতে কোনও নির্দিষ্ট উৎপাদক ঐ চলতি হারের চেয়ে বেশি বা কম হারেও মুনাফার হিসাব করতে পারেন। তবে গড় হিসাবে দেখা যায় কোনও একটি নির্দিষ্ট শিল্পক্ষেত্রে মুনাফার হার সমস্ত মালিকের মোটামুটি একই রকম হয়। অর্থাৎ প্রতিটি শিল্পোৎপাদনে মুনাফার একটি গড় বা সাধারণ হার বিদ্যমান থাকে।
এখানেই শেষ না, আরও কিছু কথা রয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতার ফলে শিল্পোৎপাদনের বিভিন্ন শাখার মুনাফার হারে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি হয়ে যায়। এর আর অন্য কোনও ব্যাখ্যা নেই, শিল্পোৎপাদনের কোনও একটি শাখায় যদি অস্বাভাবিক হারে বাড়তি মুনাফা হতে থাকে তাহলে অন্যান্য যেসকল শাখা তুলনামূলকভাবে কম লাভজনক সেখান থেকে পুঁজি স্থানান্তরিত হয়ে লাভজনক শাখায় বিনিয়োগ হতে শুরু করে। অথবা যে নতুন পুঁজি ক্রমাগত গড়ে উঠছে এবং যা সর্বদাই লাভজনক বিনিয়োগের সন্ধানে রয়েছে সেটিও অধিক মুনাফাযুক্ত ঐ নির্দিষ্ট শাখাগুলিকেই প্রাধান্য দিতে শুরু করে। এর ফলে ঐ সমস্ত লাভজনক শিল্পে উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তখন ঐ অতিরিক্ত পণ্য বিক্রি করার জন্য পণ্যের দাম কমাতে হয়, আর তেমনটা ঘটার ফলে মুনাফাও কমে যায়। অন্যদিকে শিল্পোৎপাদনের কোনও একটি শাখায় মুনাফা রীতিমত কম হতে থাকে তখন ঠিক এর বিপরীত পরিস্থিতি দেখা যায়। ঐ শাখা থেকে যত দ্রুত সম্ভব পুঁজি সরে যেতে শুরু করে; যার ফলে উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায়। ঐ উৎপাদন হ্রাসের কারণে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে নির্দিষ্ট পণ্যের দাম ও মুনাফা পুনরায় বাড়তে থাকে। শিল্পোৎপাদনের যাবতীয় শাখায় মুনাফার হারের মধ্যে বাজারের প্রতিযোগিতা এভাবেই এক ভারসাম্য স্থাপন করার প্রবণতা তৈরি করে। আমরা একে গড় মুনাফার একটি সাধারণ হার বলতে পারি, যদিও ঐ হার উৎপাদনের সকল শাখায় একই থাকে না, তবুও কমবেশি কাছাকাছি রয়েছে বলে ধরা যায়। অবশ্য শিল্পোৎপাদনের কোনও একটি নির্দিষ্ট শাখার ভিতরে যেভাবে মুনাফার হারে সমতা দেখা যায়, তা যাবতীয় উৎপাদনের বেলায় একইমাত্রায় খাটে না। এর কারণ উৎপাদনের কাজে সামগ্রিক ব্যয়, যন্ত্রপাতির ক্ষয়, যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ধরন ইত্যাদি একেক শাখায় একেক রকম হয়। এই সকল পার্থক্যের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য কোনও কোনও ক্ষেত্রে মুনাফার মোট পরিমাণ— অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয়ের উপর যত শতাংশ মুনাফা উৎপাদক (মালিক) হিসাব করেন তা অন্যান্য শাখার তুলনায় অনেক বেশি বা কম হতে পারে। এ ধরনের পার্থক্য মুনাফার প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করে দেয়। তবে উৎপাদনের বিভিন্ন শাখার ভিন্ন ভিন্ন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরেও, সমস্ত ক্ষেত্রেই মোট মুনাফার হার প্রায় কাছাকাছি বা একই রয়ে যায়।
মুনাফার হারের একটি সাধারণ গড় থাকায় কোনও একটি নির্দিষ্ট শিল্পোৎপাদনে কতটা পরিমাণ মুনাফা অর্জিত হবে তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ঐ উদ্যোগে বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমাণের উপর। আগেই বলা হয়েছে— একটি কারখানায় বন্দুক তৈরি হচ্ছে না কি সুতির মোজা তা একেবারে গুরুত্বহীন নয়, কারণ মুনাফার পরিমাণ উৎপাদনের ধরণের নিরিখে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। ঐ মুনাফা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জটিলতার উপরেও নির্ভর করে। তবে এসমস্ত পার্থক্য সাধারণ গড় মুনাফার হারের সঙ্গে তুলনামূলক বিবেচনায় খুবই সামান্য প্রভাব দেখায়। ধরা যাক, গড় মুনাফার সাধারণ হার ১০ শতাংশ, তাহলে এটুকু স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, দশ লক্ষ পাউন্ড পুঁজি থেকে যে পরিমাণ মুনাফা আসবে, তা এক লক্ষ পাউন্ড পুঁজি থেকে প্রাপ্ত মুনাফার তুলনায় ১০ গুণ বেশি হবে। (এই আলোচনা করার সময় ধরে নেওয়া হয়েছে ব্যবসার কার্যক্রম যথাযথভাবেই পরিচালিত হচ্ছে, ব্যক্তিগত উদ্যোগের ইতিহাসে যে সমস্ত সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাগুলো ঘটতে পারে সেসবের প্রসঙ্গ আমরা ঐ হিসাব থেকে বাদ রাখছি।)
একথাও মনে রাখতে হবে যে মুনাফা কেবলমাত্র সেই সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দ্বারাই অর্জিত হয় না, যারা পণ্য উৎপাদন করে। সেই সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও মুনাফা অর্জন করে যারা উৎপাদক ও ক্রেতার মাঝে নিছক মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করে। অর্থাৎ যারা ক্রেতার সামনে পণ্য বিক্রির বন্দোবস্ত করে। ব্যাংক, পরিবহন সংস্থাসমূহ, বিভিন্ন ফরওয়ার্ডিং এজেন্টরা, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ – এরাও মুনাফা করে। এধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও যদি ধরে নেওয়া হয় যে, তাদের ব্যবসা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই পরিচালিত হচ্ছে তখনও দেখা যাবে মুনাফা নির্ধারিত হচ্ছে বিনিয়োগকৃত পুঁজির পরিমাণের উপর ভিত্তি করেই। এ সকল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে যারা যুক্ত তারা মনে করেন পুঁজি থেকেই মুনাফা উৎপন্ন হয়, মুনাফা হওয়ার বিষয়টি যেন একধরণের স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। এদের ধারণা অনুযায়ী উপযুক্ত যত্ন নিলে, পুঁজি গাছের মতোই ফল দেয়। এদের বিবেচনায় মুনাফা পুঁজির মধ্যেকার এক অন্তর্নিহিত ও স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য না, এ হল পুঁজিপতির উদ্যোগের ফলাফল। আলোচনার শুরু থেকেই আমরা বারংবার পূর্বসিদ্ধান্ত করেছি যে, আলোচ্য ব্যবসাটি দক্ষতার সঙ্গেই পরিচালিত হচ্ছে। মালিকের ব্যক্তিগত দক্ষতার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। যে কোনও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসায় মালিকের অদক্ষতার সুবাদে মুনাফার হার সহজেই বাজারের সাধারণ গড় হারের চাইতে নিচে নেমে যেতে পারে, আবার একজন দক্ষ মালিক ঐ মুনাফার হারকে বাজার চলতি সাধারণ গড় হারের উপরে তুলতেও সক্ষম হতে পারেন।
বাংলা ভাষান্তর: সৌভিক ঘোষ
প্রকাশের তারিখ: ০৫-মে-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
