মানুষের মার্কস (পর্ব ৫)

জুলিয়ান বোরচার্ডট
মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার তুলনা করলে দেখা যাবে পরেরটি পরিমানের হিসাবে একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে এসে আগেরটিরই ধারাবাহিকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। যদি প্রক্রিয়াটি যদি সেই অবধি চলে যেখানে শ্রমশক্তির জন্য পুঁজি যে মূল্য পরিশোধ করেছে তা নিজের সঠিক সমতুল্য পরিমাণ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তবে এটি কেবল একটি মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া। কিন্তু যদি প্রক্রিয়াটি সেই সীমার বাইরেও অব্যাহত থাকে, তখনই তা উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

মুখবন্ধ
সাধারণ অর্থে যাকে পাঠকমহল বলে সেখানে তো বটেই, এমনকি মার্কসবাদীদের মধ্যেও মার্কসের লেখা ‘পুঁজি’-র কদর যতটা, সচেতন চর্চা তার তুলনায় কিছুটা কমই। রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় মার্কসের কলমে মানবসমাজের ইতিহাস, চিরায়ত সাহিত্য, সমকালীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আইনের বহুবিধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব যেমন ঐ বইটিকে যত্ন করে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি, তেমন না পড়ে ফেলে রাখার অজুহাতও। অনেকেই সে বাধা পেরিয়ে সকলের সুবিধার্থে মার্কসের লেখা’কে সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। কার্ল কাউটস্কি’র মতো মার্কসবাদী পণ্ডিত’ও সে কাজে হাত দিয়েছিলেন, পুঁজির প্রথম খণ্ডের সরল সংস্করণ (পিপল’স এডিশন অফ মার্কস’স ক্যাপিটাল) করতে গিয়ে তিনি এবং এক্সটাইন জার্মান ভাষায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখে ফেলেন। ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডকে একত্রে সরল ভাষায় করার কাজে তাদের দু হাজার পৃষ্ঠা প্রয়োজন বলে স্বীকার করে নেন। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই জার্মান লেখক জুলিয়ান বোরচার্ডট নিজেকে কুড়ি বছর সময় দিয়েছিলেন, তারই ফলশ্রুতি পিপল’স মার্কস। মূল বইটি ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি, ১৯২১ সালে তারই ইংরেজি অনুবাদ প্রকশিত হয় লন্ডন থেকে, অনুবাদ করেন স্টিফেন এল ট্রাস্ক। বাংলা ভাষান্তরের জন্য আমরা সেই ইংরেজি সংস্করণটিকেই ব্যবহার করছি।

চতুর্থ পর্বের পর...

পঞ্চম অধ্যায়

উদ্বৃত্ত মূল্য কীভাবে গড়ে ওঠে

শ্রম নিজেই শ্রমশক্তির ব্যবহার। বিক্রেতাকে দিয়ে কাজ করিয়ে শ্রমশক্তির ক্রেতা তার ভোগ করে। একজন পারদর্শী বিশেষজ্ঞের দৃষ্টি নিয়ে পুঁজিপতি নিজের নির্দিষ্ট ব্যবসার জন্যই সুতোর কারখানা, জুতোর কারখানা ইত্যাদি সবচেয়ে উপযুক্ত উৎপাদনের উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য জরুরী শ্রমশক্তিকে বেছে নিয়েছে এবং এখন সে শ্রমিককে দিয়ে তার শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদনের উপকরণকে ভোগ করায়।শ্রমশক্তি হিসাবে  বাজারে ঠিক যেমনটি পাওয়া যায় পুঁজিপতিকে ঠিক সেভাবেই তা গ্রহণ করতে হয়; এ কাজে সেই সমস্ত শ্রমকেও অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হয় যা তখনও পাওয়া যেত যখন পুঁজিপতির কোনও অস্তিত্বই ছিল না। পুঁজির অধীনে শ্রমের ফলে উৎপাদন পদ্ধতিতে যে রূপান্তর চলে তা আরও পরে হয়, তাই এ সম্পর্কে আমাদের আলোচনাও পরেই করা উচিত।

পুঁজিপতির কাছে বিক্রীত শ্রমশক্তির ভোগ হিসেবে বিবেচিত শ্রম-প্রক্রিয়া আমাদের সামনে দুটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। প্রথম, শ্রমিক পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কাজ সঠিকভাবে সম্পাদিত হচ্ছে কিনা, উৎপাদনের উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব নিশ্চিত করে পুঁজিপতি। অন্য কথায়, শ্রম-প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন বলে কিছুই নেই। দ্বিতীয়ত, পণ্যের মালিক শ্রমিক নয়- তা পুঁজিপতির সম্পত্তি। আমাদের অনুমান অনুসারে পুঁজিপতি যেহেতু ব্যবহৃত শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্যটুকু পরিশোধ করে দেয়, তাই ঐ শক্তি ব্যবহার করার অধিকার তারই। একইভাবে পণ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য অন্যান্য উপাদানগুলি অর্থাৎ উৎপাদনের উপকরণও পুঁজিপতিরই মালিকানাধীন থাকে। এসবের ফলস্বরূপ শ্রম-প্রক্রিয়া এমনভাবেই পরিচালিত হয় যে প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত সবটুকুই পুঁজিপতি কিনে নিয়েছে এবং এভাবেই উৎপাদিত পণ্যটি তার সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার-মূল্য গঠন করে— সুতো, বুট ইত্যাদি। বুট যদিও কিছুটা সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি, তবু উদাহরণ হিসাবে বলা চলে এক প্রকৃত প্রগতিশীল মানুষ হিসাবে পুঁজিপতি শুধুমাত্র বুটের জন্যই বুট তৈরি করে না। ব্যবহার-মূল্য উৎপাদিত হয় কেবলমাত্র একটি কারণেই এবং তা ততটুকুই কাজে লাগে, যতটুকু সেগুলির বিনিময়-মূল্য। পুঁজিপতির দুটি উদ্দেশ্য; প্রথমত, সে এমন এক ব্যবহার-মূল্য উৎপাদন করতে চায় যার একটি বিনিময়-মূল্য রয়েছে, অর্থাৎ বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত একটি পণ্য। দ্বিতীয়ত, সে এমন একটি পণ্য উৎপাদন করতে চায় যার মূল্য উৎপাদনের উপকরণ এবং শ্রমশক্তির মূল্যের চাইতে বেশি, যার জন্য সে বাজারে নিজের অর্থ অগ্রিম হিসাবে দিয়েছিল। তাই আসলে সে শুধু এক ব্যবহার-মূল্য নয়, মূল্য উৎপাদন করতে চায়; এবং শুধুমাত্র মূল্য নয়, উদ্বৃত্ত-মূল্যও তার উদ্দেশ্য।

আমরা জানি যে প্রতিটি পণ্যের মূল্য তার মধ্যে নিহিত শ্রমের পরিমাণ দ্বারা নির্ধারিত হয়। পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত শ্রম-প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত পণ্যের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। তাই সবার আগে মূর্ত শ্রমের হিসাব করতে হবে।

সুতোকে উদাহরণ ধরা যাক। সুতো উৎপাদনের জন্য প্রথমে উপযুক্ত কাঁচামাল প্রয়োজন, যেমন ১০ পাউন্ড তুলো। এ মুহূর্তে তুলোর মূল্য অনুসন্ধান করা অপ্রয়োজনীয়, কারণ আমরা ধরেই নিচ্ছি যে পুঁজিপতি প্রকৃত মূল্যেই তুলো কিনেছে, যেমন ১০ শিলিং। তুলোর ঐ মূল্যে তাকে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম ইতিমধ্যেই গড় সামাজিক শ্রম হিসাবে প্রকাশিত। আমরা আরও ধরে নেব যে তুলো উৎপাদনে ব্যবহৃত শ্রমের যন্ত্রপাতি যেমন টাকু (স্পিন্ডল) ইত্যাদি হল ২ শিলিং মূল্যের। যদি ১২ শিলিংয়ের সমতুল্য সোনা ২৪ কর্মঘণ্টা বা দুই কর্মদিবসের পণ্য হয়, তাহলে বলা যায় যে সুতোয় দুটি কর্মদিবস নিহিত রয়েছে।

তুলো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা সুতো উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টারই একটি অংশ, ফলে সুতো উৎপাদনের মধ্যেই তা অন্তর্ভুক্ত। টাকু (স্পিন্ডল) উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যার ক্ষয় ছাড়া তুলো কাটা যায় না। কিন্তু আমরা প্রথমেই ধরে নিয়েছি যে কেবলমাত্র সামাজিক উৎপাদনের অবস্থার অধীনে অপরিহার্য কাজের ঘণ্টাই ব্যয় করা হয়। এভাবে ১ পাউন্ড তুলো থেকে ১ পাউন্ড সুতো তৈরি করতে কেবল ১ পাউন্ড তুলোই ব্যবহার করা যাবে। টাকুর (স্পিন্ডল) ক্ষেত্রেও এমন যুক্তি প্রযোজ্য। যদি লোহার টাকুর পরিবর্তে সোনার টাকু ব্যবহারের জন্য পুঁজিপতির একান্ত ইচ্ছাও (ফ্যান্টাসি) থাকে, তবুও সুতোর মূল্যে কেবল সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রম অর্থাৎ লোহার টাকু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টাকেই গণনা করা হবে।

এরপর যে প্রশ্নটি আসে, সুতো কাটার কাজে শ্রমিক নিজে তুলোয় কতটা মূল্য যোগ করেন? আমরা ধরে নিচ্ছি যে সুতো কাটার কাজে ব্যবহৃত শ্রম হলো সরল, অদক্ষ শ্রম- এক নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থার গড় শ্রম। পরে দেখা যাবে  এমনকি এর ঠিক বিপরীত অনুমান করলেও প্রশ্নটি একই রয়ে যেত।

এখন এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে প্রদত্ত সামাজিক পরিস্থিতিতে সুতো কাটার কাজে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় যেন নষ্ট না হয়। যদি স্বাভাবিক উৎপাদনের পরিস্থিতিতে এক কাজের ঘণ্টায় ১/ পাউন্ড তুলো ১/পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত হয়, তবে কেবল সেই কর্মদিবসকেই ১২ ঘণ্টার দিন হিসাবে গণনা করা হবে যেখানে ১২ × ১/পাউন্ড তুলো ১২ × ১/পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত হয়। কারণ কেবল সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টাই মূল্য সৃষ্টিকারী হিসাবে গণনা করা হয়।

সুতো কাটার শ্রম, উপাদান হিসাবে তুলো এবং পণ্য হিসাবে সুতো — এ বিষয়টি পণ্যের মূল্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে অপ্রাসঙ্গিক। নিযুক্ত শ্রমিক যদি সুতোর কলের পরিবর্তে কয়লার খনিতে কাজ করত, তবে শ্রমের বস্তু, অর্থাৎ কয়লাটুকু প্রকৃতি সরবরাহ করত। একইভাবে খনি থেকে তোলা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কয়লা যেমন ১ মণ  একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শোষিত শ্রমেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

শ্রমশক্তিকে বিক্রি করার সময় ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এর দৈনিক মূল্য ৩ শিলিং এবং ঐ ৩ শিলিংয়ে ৬ কাজের ঘণ্টা নিহিত আছে— অর্থাৎ প্রতিদিন শ্রমিকের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় গড় পরিমাণ জীবনধারণের জন্য জরুরী উপকরণগুলির উৎপাদনে ৬ কাজের ঘণ্টা প্রয়োজন। এখন যদি সুতো কাটার শ্রমিক ১টি কাজের ঘণ্টায় ১/পাউন্ড তুলোকে ১/পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত করে, তাহলে ৬ কর্মঘণ্টায় সে ১০ পাউন্ড তুলোকে ১০ পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত করবে। সুতো কাটার প্রক্রিয়ায় তুলো এভাবেই ৬ কাজের ঘণ্টাটুকু শোষণ করে। এই কাজের ঘণ্টা ৩ শিলিং মূল্যের সোনার পরিমাণের দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করানো যায়। সুতরাং সুতো কাটার কারণে, তুলোর মূল্য ৩ শিলিং পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

এখন পণ্যের মোট মূল্য, অর্থাৎ ১০ পাউন্ড সুতোর দিকে তাকানো যাক। তাতে ২ / কর্মদিবস নিহিত আছে, যার মধ্যে ২ দিন তুলো ও যন্ত্রপাতিতে এবং বাকি অর্ধেক দিনটুকু সুতো কাটার প্রক্রিয়ায় শোষিত হয়েছে। একই পরিমাণ কাজের ঘণ্টাকে ১৫ শিলিং মূল্যের সোনার পরিমাণ দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করানো যায়। অতএব ১০ পাউন্ড সুতোর মূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মূল্য হবে ১৫ শিলিং এবং ১ পাউন্ড সুতোর মূল্য হবে ১ শিলিং ও ৬ পেন্স।

এবার পুঁজিপতির হতবাক হওয়ার পালা! পণ্যের মূল্য অগ্রিম হিসাবে প্রদত্ত পুঁজির সমান। অগ্রিম মূল্য লাভজনক হয়নি, কারণ তা উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপন্ন করেনি। ১০ পাউন্ড সুতোর মূল্য ১৫ শিলিং এবং তুলোর জন্য ১০ শিলিং, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির জন্য ২ শিলিং এবং শ্রমশক্তির জন্য ৩ শিলিং এভাবেই সেই ১৫ শিলিং ব্যয় করা হয়েছে ।

এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিপতি বলতে পারে যে আরও বেশি পয়সার উদ্দেশ্যেই সে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু নরকের পথ যে সু-উদ্দেশ্যেই সুপ্রশস্ত! উৎপাদন না করেও স্রেফ পয়সা কামানোর উদ্দেশ্যও তো তার থাকতে পারত। তাই এবার সে হুমকি দেয়, সে আর ধরা খাবে না। ভবিষ্যতে সে নিজে আর উৎপাদন করবে না, বাজার থেকেই গোটা গোটা পণ্য কিনে চালাবে। কিন্তু বাদবাকি পুঁজিপতি সকলেই যদি ঐ একই কাজ করে তবে বাজারে পণ্য মিলবে কোথায়? আর স্রেফ পয়সা তো আর কেউ খেতে পারবে না!

সে ভাবুক হয়ে ওঠে, এমন ত্যাগ স্বীকারের একটা মূল্যায়ন তো হওয়া উচিত। সে তো ঐ ১৫ শিলিং অপব্যয়ও করতে পারত। তেমন কিছু না করে সে উৎপাদনশীলভাবে বিনিয়োগ করেছে এবং সুতো তৈরি করেছে। কিন্তু ঠিক সেই কারণেই এখন মন্দ বিবেকের বদলে সে কিছুটা ভালো সুতোর অধিকারী হয়ে বসেছে। একথাও তো জানা যে যেখানে কিছুই পাওয়ার নেই সেখানে রাজাও নিজের অধিকার হারান। তার ঐ ত্যাগ যতই প্রশংসনীয় হোক না কেন, এর জন্য বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার মতো আর কিছু নেই। উৎপাদন-প্রক্রিয়ার ফলে প্রাপ্ত পণ্যের মূল্য সে প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করা বিভিন্ন মূল্যের মোট যোগফলের সমান হয়ে গেছে যে! এখন শান্তনা হিসাবে কেবল এটুকুই বলা উচিত যে সৎকাজই হল সৎকাজের পুরস্কার।

এরপর সে বিরক্ত হয়ে ওঠে। ঐ সুতো তো তার নিজের কোনো কাজে আসবে না। সে তা ওসব বিক্রির জন্যই উৎপাদন করেছে। তাই সে বিক্রি করতে পারে বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে ভবিষ্যতে কেবল নিজের ব্যবহারের জন্যই পণ্য উৎপাদন করতে পারে।

এই অবধি ভেবেই সে দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। যাকে বা যাদের সে কাজ দিয়েছে সেই শ্রমিক কি শুধু নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে একেবারে শূন্য থেকে একটি পণ্য তৈরি করতে পারত? পুঁজিপতি কি সেই সমস্ত উপকরণও সরবরাহ করেনি যেসবের মাধ্যমে শ্রমিক কাজ করতে পারে এবং সেভাবেই তার কাজ মূর্ত হয়ে উঠতে পারে? বিদ্যমান সমাজের বৃহত্তর অংশই তো এমনসব মানুষকে নিয়ে গঠিত যাদের কিছুই নেই। এমন অবস্থায় উৎপাদনের উপকরণগুলি যুগিয়ে দিয়ে (যেমন তুলো, টাকু ইত্যাদি) সে কি ঐ সমাজকে এক অমূল্য সেবার যোগান দেয়নি? এসবের পরেও শ্রমিককে তার জীবিকার উপকরণ সরবরাহ করাটা কি একরকম সেবা নয়? এ সমস্ত সেবার কিছুটা হলেও কি কোনও গণনায় আসবে না?

কিন্তু সে যা ভেবে দেখে না সেটি হল শ্রমিকও কি তাকে তুলো ও টাকুকে সুতোয় রূপান্তরিত করার সেবা দেয়নি? তাছাড়া এখানে সেবার তো কোনও প্রশ্নই নেই। এক ধরনের ব্যবহার-মূল্য দ্বারা উৎপাদিত দরকারী প্রভাব ব্যতীত আর কিছু তো সেবা বলতে বোঝায় না, সে পণ্য বা শ্রম যাই হোক না কেন। এখানে তো যা রয়েছে তা কেবল বিনিময়-মূল্যের প্রশ্ন। শ্রমিককে ৩ শিলিং মূল্য পরিশোধ করেছে পুঁজিপতি। তুলোয় যোগ করা ৩ শিলিং মূল্যের আকারে শ্রমিক তাকে ঐ একই মূল্য ফিরিয়ে দিয়েছে। মূল্যের বিনিময়ে মূল্য তো মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এইবার পুঁজিপতির টনক নড়ে ওঠে। এখনও সে টাকার অহংকারে ফুলে উঠছিল, এখন হঠাৎ শ্রমিকের মতো বিনম্র মনোভাব দেখায়। পুঁজিপতি কি নিজে কোনও কাজ করেনি? সুতো কাটার কাজে শ্রমিকদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের কাজ কি সে করেনি? এ ধরনের কাজ কি কোনও মূল্য উৎপন্ন করে না? এমন কথায় তার ফোরম্যান এমনকি ম্যানেজার অবধি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওঠে। হাসিমাখা মুখ আর বিরাট বাগাড়ম্বর সমেত ধোঁকা দিতে সে জানে। তাই সে ওসব যুক্তির কানাকড়িও পরোয়া করে না। মূল্য নির্মাণে তার কৃতিত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ছলনাগুলি সে রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপকের জন্যই ছেড়ে দেয় যাকে বিশেষভাবে এসব করার জন্যই বেতন দেওয়া হয়। পুঁজিপতি হিসাবে সে তার অফিসের বাইরে কখন কী বলে সে সম্পর্কে সবসময় চিন্তা করে না, কিন্তু ভেতরে সে সব খেয়াল রাখে।

বিষয়টি আরও খানিক গভীরে বিবেচনা করা যাক। শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য ৩ শিলিং ছিল, কারণ তাতে অর্ধেক দিনের শ্রম নিহিত ছিল। অর্থাৎ শ্রমশক্তির উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন জীবনধারণের জন্য যে সকল উপকরণ প্রয়োজন সেগুলির উৎপাদনে অর্ধেক কর্মদিবস খরচ হয়। কিন্তু শ্রমশক্তিতে নিহিত অতীতের শ্রম একদিকে যেমন জীবন্ত কাজ যা একে সক্রিয় রাখতে পারে বলে একই তেমনই অন্যদিকে এ দুটি পরস্পরের থেকে আলাদাও। ২৪ ঘণ্টার জন্য জীবিত রাখতে যে অর্ধেক দিনের কাজ প্রয়োজন এ সত্যটি কোনোভাবেই শ্রমিককে সারাদিন কাজ করা থেকে বিরত রাখে না। শ্রমশক্তির মূল্য এবং শ্রম-প্রক্রিয়ায় সে শক্তির ব্যবহার দুটি ভিন্ন বিষয়। শ্রমশক্তি কেনার সময় পুঁজিপতি ঐ মূল্যের পার্থক্য মাথায় রেখেছিল। পণ্যের জন্য দরকারী গুণটি অর্থাৎ সুতো বা বুট উৎপাদনের জন্য যে ক্ষমতা সেটি কেবল এক অপরিহার্য গৌণ শর্তটুকু হিসাবেই কার্যকর ছিল কারণ মূল্য সৃষ্টির জন্য উপযোগী রূপেই শ্রমের সম্পাদনা করতে হয়। যেটি আসলে নির্ণায়ক ছিল তা হল পণ্যের অদ্বিতীয় গুণ ব্যবহার-মূল্য যা মূল্যের একটি উৎস এবং নিজের চাইতে বেশি মূল্য যুক্ত। পুঁজিপতি এর থেকে সেটিরই প্রত্যাশা করেছিল। সে পণ্যের বিনিময় নিয়ন্ত্রণকারী চিরন্তন নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করেছে। কারণ এটি একটি সত্য যে অন্য যেকোনো পণ্যের বিক্রেতার মতো শ্রমশক্তির বিক্রেতাও আদায় হিসাবে পণ্যের বিনিময়-মূল্য পায় এবং ব্যবহার-মূল্যটুকু বিক্রি করে।

নিজের শ্রমশক্তির ব্যবহার-মূল্য অর্থাৎ শ্রম তার বিক্রেতার কাছে (অর্থাৎ শ্রমিকের কাছে) ততটাই কম থাকে যতটা তেল বিক্রেতার কাছে বিক্রিত তেলের বেলায় থাকে। পুঁজিপতি শ্রমশক্তির দৈনিক মূল্য পরিশোধ করেছে বলে সারাদিন মানে গোটা দিনের শ্রমই তার কেনার অন্তর্গত। পরিস্থিতি এমন যে শ্রমশক্তির দৈনিক জীবিকার খরচ কেবল অর্ধেক কর্মদিবস। ঐ শ্রমশক্তি সারাদিন সক্রিয় থাকতে পারে বলে শ্রমিকের একদিনের কর্মসংস্থান যে পরিমাণ মূল্য সৃষ্টি করে তা তার নিজের জন্য প্রাপ্য দৈনিক মূল্যের দ্বিগুণ। এহেন পরিস্থিতি ক্রেতার জন্য নিঃসন্দেহে ভাগ্যের বিষয়, অথচ এতে বিক্রেতার প্রতি কোনও অবিচার হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতির সুযোগ আগে থেকে উপলব্ধি করেছিল বলেই পুঁজিপতি উৎফুল্ল ছিল। তাই শ্রমিক কারখানায় কাজের সময় শ্রমিক ছয় ঘণ্টা কাজের প্রয়োজনীয় উৎপাদনের উপকরণ নয় বরং বারো ঘণ্টা কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও পায়। যদি ১০ পাউন্ড তুলো ৬ কাজের ঘণ্টা শোষণ করে এবং ১০ পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত হয় তবে ২০ পাউন্ড তুলো ১২ কাজের ঘণ্টা শোষণ করবে এবং ২০ পাউন্ড সুতোয় রূপান্তরিত হবে।

এই লম্বা শ্রম-প্রক্রিয়ার ফলে উৎপাদিত পণ্যটিকে বিবেচনা করা যাক। ২০ পাউন্ড সুতোয় এখন পাঁচটি কর্মদিবস মূর্ত হয়েছে। চার দিন শোষিত হয়েছে তুলো ও টাকুর ক্ষতিতে এবং এক দিন শোষণ করেছে সুতো কাটার প্রক্রিয়া। পাঁচটি কর্মদিবসের মূল্য সোনায় প্রকাশিত হলে হয় ৩০ শিলিং। অতএব ২০ পাউন্ড সুতোর মূল্য ৩০ শিলিং। এখনও প্রতি পাউন্ড ১ শিলিং ৬ পেন্স মূল্যে বিক্রি হয়।

কিন্তু প্রক্রিয়া শুরুর আগে পণ্যসমূহের মোট মূল্য ছিল ২৭ শিলিং, প্রক্রিয়ার শেষে সুতোর মূল্য ৩০ শিলিং। পণ্যের মূল্য তার উৎপাদনের জন্য অগ্রিম প্রদত্ত মূল্যের চেয়ে একের নয় (/) অংশ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২৭ শিলিং রূপান্তরিত হয়েছে ৩০ শিলিংয়ে। অর্জিত উদ্বৃত্ত-মূল্যের পরিমাণ তিন শিলিং।

এবার তাহলে উদ্বৃত্ত গঠনের কৌশল সফল হয়েছে। সমস্ত শর্ত পূরণ করার পাশাপাশি পণ্য বিনিময়ের আইনকে লঙ্ঘন না করেই সমান মূল্যের বিনিময়ে সমান মূল্য দেওয়া হয়েছে। তুলো, টাকু এবং শ্রমশক্তির ক্রেতা হিসেবে পুঁজিপতি প্রতিটি পণ্যের মূল্য পরিশোধ করেছে। সে যা করেছে তা অন্য যেকোনো পণ্যের ক্রেতাই করে থাকে। সে কিনে নেওয়া পণ্যের ব্যবহার-মূল্যটি ভোগ করেছে। শ্রমশক্তির ভোগ থেকে ৩০ শিলিং মূল্যের ২০ পাউন্ড সুতো উৎপন্ন হয়েছে। পুঁজিপতি এখন বাজারে ফিরে আসে এবং পণ্য কেনার পর বিক্রি করে। প্রতি পাউন্ড সুতো সে ১ শিলিং ৬ পেন্সে বিক্রি করে, এক ফার্ডিংও বেশি বা কম নয়। তবুও সে যা খরচ করেছিল তার চাইতে বাজার থেকে ৩ শিলিং বেশিই পায়।

মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সঙ্গে উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ার তুলনা করলে দেখা যাবে পরেরটি পরিমানের হিসাবে একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে এসে আগেরটিরই ধারাবাহিকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। যদি প্রক্রিয়াটি যদি সেই অবধি চলে যেখানে শ্রমশক্তির জন্য পুঁজি যে মূল্য পরিশোধ করেছে তা নিজের সঠিক সমতুল্য পরিমাণ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, তবে এটি কেবল একটি মূল্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া। কিন্তু যদি প্রক্রিয়াটি সেই সীমার বাইরেও অব্যাহত থাকে, তখনই তা উদ্বৃত্ত-মূল্য সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

কিন্তু ব্যবহার মূল্য উৎপাদনের জন্য যতটুকু সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় সময়ের দরকার নিযুক্ত শ্রমও ঠিক ততটাই পরিমাণ মূল্য সৃষ্টি করে। ঐ শ্রমশক্তিকে আবশ্যকরূপে স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যয় করতে হবে। যদি সুতো কাটার জন্য সাধারণভাবে ব্যবহৃত যন্ত্র হয় স্বয়ংক্রিয় মিউল, তবে কাজের জন্য শ্রমিককে চরকা ও চাকা দেওয়া চলবে না। স্বাভাবিক কাজের জন্য ব্যবহৃত মানের তুলোর পরিবর্তে যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে এমন নিকৃষ্ট তুলো দেওয়া চলে না। উভয় ক্ষেত্রেই সে ১ পাউন্ড সুতো উৎপাদনের জন্য সামাজিকভাবে যতটা প্রয়োজনীয় তার চাইতে বেশি কাজের ঘণ্টা কাজ করিয়ে নিতে পারত; কিন্তু ঐ অতিরিক্ত সময় কোনও মূল্য বা অর্থ উৎপন্ন করত না।

তাছাড়া প্রযোজ্য শ্রমশক্তিকেও স্বাভাবিক মাত্রার হতে হবে। উৎপাদনের যে নির্দিষ্ট শাখায় একে ব্যয় করা হবে, সে কাজের জন্য উপযুক্ত সাধারণ গড় পরিমাণ দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুতি থাকতে হবে। যেকোনও নির্দিষ্ট সময়ে ঐ নির্দিষ্ট কাজের জন্য সমাজে প্রচলিত পরিশ্রমের তীব্রতার গড় মাত্রাতেই ঐ শ্রমশক্তিকে ব্যয় করতে হবে। শ্রমিকরা যাতে এক মুহূর্তের জন্যও নিষ্ক্রিয় না থাকে সে বিষয়ের মতোই একে নিশ্চিত করতেও পুঁজিপতি একইরকম সতর্ক থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সে ঐ শ্রমশক্তি কিনেছে, তার অধিকারের বিষয়ে সে অটল। সে নিজেকে ঠকতে দেবে না। কাঁচামাল ও উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জামও ভুলভাবে ব্যবহার করা চলবে না, কারণ যে কাঁচামাল বা সরঞ্জাম নষ্ট হবে তা আসলে অকার্যকর শ্রমের ব্যয় এবং তা উৎপাদিত পণ্যের মূল্যে গণনা করা হয় না বা তার মূল্যে যুক্ত হয় না।

উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদনে পুঁজিপতি যে শ্রম কিনেছে তা সরল, অদক্ষ ও সাধারণ মানের শ্রম নাকি আরও জটিল উচ্চ স্তরের কোনও শ্রম তা অপ্রাসঙ্গিক। উচ্চস্তরের ও আরও জটিল শ্রম হল এমন শ্রমশক্তির প্রকাশ যার বিকাশে আরও বেশি খরচ হয়েছে, যার উৎপাদনে বেশি কাজের ঘণ্টা ব্যয় হয়েছে আর তাই এতে অদক্ষ শ্রমশক্তির চাইতে বেশি মূল্য রয়েছে। এ শক্তি বেশি মূল্যের হওয়ায় এটি উচ্চশ্রেণীর শ্রমে ব্যয় হবে আর তাই একই সময়ের জন্য কাজে লেগেও অদক্ষ শ্রমের চাইতে আনুপাতিকভাবে বেশি মূল্যের মধ্যে মূর্ত হবে। কিন্তু দক্ষতার ক্ষেত্রে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন সুতো কাটার শ্রমিক ও অলংকার নির্মাণকারী শ্রমিকের মধ্যে অলংকার নির্মাণে শ্রমের যে অংশ দ্বারা সে কেবল তার নিজের শ্রমশক্তির মূল্যই প্রতিস্থাপন করে, এটিও গুণগতভাবে শ্রমের সেই অতিরিক্ত অংশ থেকে কোনওভাবেই আলাদা নয় যার দ্বারা সকল শ্রমিকই আসলে উদ্বৃত্ত-মূল্যই সৃষ্টি করে

(পুঁজি, ১ম খণ্ড থেকে সংকলিত)

মূল ইংরেজি, জুলিয়ান বোরচার্ডট
বাংলা ভাষান্তর – সৌভিক ঘোষ


প্রকাশের তারিখ: ০৯-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org