প্রতিবাদী স্পর্ধার ফাঁসে বাঁকা শিরদাঁড়ার ফোঁস

পার্থ প্রতিম বিশ্বাস
বিজেপি আদর্শগত ভাবেই মহিলাদের সমানাধিকারের বিরুদ্ধে। তাই মনুবাদে বিশ্বাসী দলের প্রধানমন্ত্রী মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন মণিপুরের মতো নৃশংস নারী ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাতেও। সেই কারণেই বিলকিস বানোর ধর্ষকেরা আদালতের রায়ের পরেও জেল থেকে মুক্তি পায় গুজরাটের ডবল ইঞ্জিন সরকারের ষড়যন্ত্রে। সেই কারণেই মহিলা ক্রীড়াবিদদের যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত সাংসদ ব্রিজভূষণ সসম্মানে বহাল থাকে নিজ পদে। সেই দিক থেকে দেখলে হাসখালি অথবা হাতরাস, কিংবা উন্নাও অথবা কামদুনির ক্ষেত্রে– প্রশাসনের মধ্যে ফারাক, সূচ এবং চালুনির ফারাকের মতোই।

এক অদ্ভুত অধ্যায়ের সাক্ষী হচ্ছে রাজ্যের মানুষ প্রতিদিন। আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসক খুনের বিচার চেয়ে আন্দোলনের ঢেউ উপচে পড়ছে শহর-শহরতলি থেকে গ্রাম বাংলার পাড়ায় পাড়ায়। রাজনীতির রঙের ছোঁয়া এড়িয়েই আমজনতার ক্রোধের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ ছড়িয়ে পড়ছে। ‘রাত দখল’ থেকে পথ দখল করে চলেছে আবাল বৃদ্ধ বনিতার দল। আর হাতে হাত বাঁধা মানুষের বাঁধন দেখে কাঁপন ধরছে শাসকের অন্তরেও। প্রশাসনের পুলিশ বাহিনীর স্পাইনাল কর্ডে বইতে শুরু করেছে ঠাণ্ডা কনকনে ভাব! রাত জাগা প্রতিবাদী ডাক্তারদের স্পর্ধায় হার মেনেছে পুলিশ। রাজ্যের রাজধানীর নগরপালের সামনে আলোচনার টেবিলে কঙ্কালের মেরুদণ্ড বসিয়ে রেখে তাঁরা দাবি করেছে স্বয়ং নগরপালের পদত্যাগ। শোনা গেছে সেই আলোচনায় ডাক্তারদের প্রশ্নের উত্তরে ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের’ বড়ো কর্তা জানিয়েছেন যে গত এক মাস ধরে চলা শহরের উথালপাথাল পরিবেশেও তিনি তাঁর নিজের কাজে খুশি। কিন্তু নির্যাতিতার পরিবার-সহ গোটা রাজ্যের অখুশি মানুষ যখন পুলিশ প্রশাসনের ভুমিকায় ক্ষোভে যন্ত্রণায় ফুটছে, তখনও যদি পুলিশ কমিশনার স্বস্তিতে থাকেন তাহলে একমাত্র এই যুক্তিতেই সেই বেআক্কেলে কমিশনারের চেয়ার খোয়ানো উচিত। একই কারণে খোয়ানো উচিত রাজ্যের পুলিশমন্ত্রীর চেয়ার এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চেয়ার। কারণ প্রশ্নটা রাজনৈতিক সততার, প্রশ্নটা প্রশাসনিক নৈতিকতার।

রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বাক্যবন্ধ আপাত দৃষ্টিতে অ-রাজনৈতিক এক সাধারণ দাবি মনে হলেও তার আড়ালে নিহিত রয়েছে নির্যাতিতার বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে যাবতীয় রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলি। সরকারি ব্যবস্থায় তদন্তে কালবিলম্বের সাথে সাথে মানুষের ক্ষোভের বহর বাড়ছে। সাথে বাড়ছে ন্যায্য বিচার দ্রুত পাওয়ার জেদ। মানুষ অভিজ্ঞতার বিনিময়ে বুঝেছে যে সুবিচারের লক্ষ্যে প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকরী তদন্ত। কিন্তু ঘটনার প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজ অবধি পুলিশ প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকা এই তদন্তের সত্য অন্বেষণের পরিবর্তে সত্য অবরুদ্ধ করে চলেছে। নির্ভেজাল এক হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর কুশীলবেরা আজও অধরা। জনসমক্ষে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলে চলেছেন দোষীদের ফাঁসির সাজা। অথচ তাঁর নেতৃত্বে চলা রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন অহোরাত্র দোষীদের ফাঁসিতে ঝোলানোর যাবতীয় প্রমান লোপাটে ব্যাস্ত।

এমন হত্যার ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত হয়েছে সেই হাসপাতালেরই অভিযুক্ত চিকিৎসকদের দিয়ে, নির্যাতিতার দেহ যুদ্ধকালীন পুলিসি তৎপরতায় দাহ করানো হয়েছে পরিবারের সম্মতি ব্যতিরেকেই। তদন্তের স্বার্থে খুনের স্থান সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। অথচ পুলিশ কর্তারা নিয়মিত সাংবাদিক সম্মেলন করে অসত্য এবং অর্ধসত্য তথ্য পরিবেশন করে চলেছেন। এমনকি অভিযুক্ত আরজি করের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ হাসপাতালের ডেপুটি সুপার স্বাস্থ্য দপ্তর এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে করলেও প্রশাসন কোনও সদর্থক ভূমিকা পালন করেনি। উপরন্তু সেই অভিযোগের মাসুল হিসাবে তাঁকে বদলি করা হয়েছে কলকাতা থেকে নবাবের জেলা মুর্শিদাবাদে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও চাকরি প্রার্থী পড়ুয়ারা এমন হুইসেলব্লোয়ার-এর ভূমিকা পালন করলেও সরকারের শিক্ষাদপ্তর সেই দুর্নীতি ধরতে যেমন নিঃস্পৃহ ছিল, ঠিক তেমনটাই হয়েছে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে দুর্নীতি ধরার প্রশ্নে। কার্যত হাসপাতালে সন্দীপ, প্রাথমিক শিক্ষায় মানিক এবং উচ্চশিক্ষায় সুবিরেশবাবুদের মতো মানুষেরা মাফিয়াদের মতো করে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা কায়েম করে দুর্নীতি চক্র গড়ে তুলেছিলেন। ফলে আজ হাসপাতালে মধ্যরাতে কর্মরতা এক চিকিৎসকের মৃত্যু এক মামুলি খুন, না-কি এক প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ সেই প্রশ্নটাই এখন মানুষের মনে গেঁথে বসেছে।

ইতোমধ্যে এই আন্দোলনের দখলদারি কায়েমের চেষ্টা শুরু হয়েছে পদ্মফুল শিবিরে। রাজ্যে এতকাল খুন ধর্ষণ হলেই কেন্দ্র বনাম রাজ্যের নারী সুরক্ষা কমিশনের চেনা ছকের তর্জায় আসল ঘটনা হারিয়ে যেত ঘাসফুল বনাম পদ্মফুলের আবর্তে। কিন্তু প্রতিবাদের নামে এই নিম্ন রুচির সার্কাস দেখতে দেখতে ক্লান্ত মানুষ এবার প্রতিবাদের ভিন্ন পথ ভিন্ন ধারা বেছে নিয়েছে রাজনীতির চেনা ছকের বাইরে। এমন অবস্থায় মাঠের বাইরে দাঁড়ানো ম্যাচ রেফারির হাল হওয়া রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ভোটের অঙ্কে থাবা বসাতে খেলোয়াড় সেজে আন্দোলনের মাঠে নেমেছে। ছদ্মনামে নবান্ন অভিযানের মেকি ডাক কিংবা দলীয় ব্যানারে বাংলা বনধের ডাক কার্যত হয়ে উঠেছে তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির পথ। সেটা বুঝেই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে বিজেপির বিভাজন তৈরির পথে পা মাড়ায়নি রাজ্যের মানুষ। ফলে এই বনধ কিংবা নবান্ন অভিযানকে কেন্দ্র করে আবার যে বাইনারি রচনার চেষ্টা হচ্ছিল সংবাদমাধ্যমে সেটাও ভেস্তে গেছে। বিজেপি আদর্শগতভাবেই মহিলাদের সমানাধিকারের বিরুদ্ধে। তাই মনুবাদে বিশ্বাসী দলের প্রধানমন্ত্রী মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন মণিপুরের মতো নৃশংস নারী ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাতেও। সেই কারণেই বিলকিস বানোর ধর্ষকেরা আদালতের রায়ের পরেও জেল থেকে মুক্তি পায় গুজরাটের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের ষড়যন্ত্রে। সেই কারণেই মহিলা ক্রীড়াবিদেদের যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত সাংসদ ব্রিজভূষন সসম্মানে বহাল থাকে নিজ পদে। সেই দিক থেকে দেখলে হাসখালি অথবা হাতরাস, কিংবা উন্নাও অথবা কামদুনির ক্ষেত্রে– প্রশাসনের মধ্যে ফারাক, সূচ এবং চালুনির ফারাকের মতোই।

ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় খুন-ধর্ষণের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন আইন ‘অপরাজিতা’ পাশ করেছে রাজ্য বিধানসভায়। কার্যত আরজি কর কাণ্ডে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা আড়াল করে জনরোষ প্রশমিত করার কৌশল হিসাবেই আনা হয়েছে এই নতুন আইন। এমন নয় যে তৃণমূলের আমলে ভয়াবহ খুন কিংবা ধর্ষণের ঘটনা এই প্রথম। কার্যত কামদুনির হাড় হিম করা খুন-ধর্ষণ, কিংবা হাসখালির খুন দেখেও নির্বিকার ছিল সরকার। এমনকি কামদুনির আন্দোলনকে বিরোধী চক্রান্ত কিংবা হাসখালির ঘটনাকে ‘লাভ অ্যাফেয়ার্স’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে এই ডামাডোলের বাজারে রাজ্য সরকার নতুন আইন এনে প্রমাণ করতে চাইছে উপযুক্ত আইন থাকার কারণেই যেন এই তদন্ত কিংবা সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। কিন্তু দেশের চালু আইনেই ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও বিভিন্ন অপরাধে প্রশাসনিক গাফিলতি, অনীহা এবং পেশাদারিত্বের অভাবে দোষীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। রাজ্যের কামদুনি ধর্ষণ মামলাতেও নিম্ন আদালতে ফাঁসির সাজা পাওয়া আসামিদের উচ্চ আদালতে বেকসুর খালাস কিংবা সাজা হ্রাস হয়েছে পুলিসি তদন্তের গাফিলতির কারণেই। আর সেই গাফিলতি যে ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক কারণেই সেটা বোঝা যায় অভিযুক্তদের সাথে শাসক ঘনিষ্ঠতার সুত্র ধরেই। 

বিচার বিলম্বিত কিংবা উপেক্ষিত হয় আইনের অভাবে নয়, আইন প্রয়োগে সরকারি সদিচ্ছার অভাবেই। জলাভূমি ভরাট কিংবা বেআইনি বাড়ি নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের-পর-দিন পুকুর বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণে শহর ছেয়ে গেছে? এক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগে কিংবা দুর্নীতি রোধে শাসকের অনীহা। আর এই অনীহার মূল কারণ সেই দুর্নীতির বাস্তুতন্ত্র জুড়ে আছে শাসকদলের নেতা কর্মীরাই। ফলে দুর্নীতির ফাঁস মুক্ত হতে মুখ্যমন্ত্রী দলের কর্মীদের ফোঁস করার বার্তা দিয়েছেন।

আমজনতার প্রতিদিনের আন্দোলনের মেজাজে মাননীয়া টের পেয়েছেন যে আরজি করের প্রতিবাদ আর কেবল এক ডাক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় আটকে নেই বরং সেই পুঞ্জীভূত মানুষের  ক্ষোভ দ্রুত সরকারের প্রতি অনাস্থায় রুপান্তরিত হচ্ছে। বিশেষত এই প্রতিবাদী আন্দোলনে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা এই আন্দোলনকে ভিন্ন মাত্রায় যুক্ত করেছে এবং নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে। আর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে শাসকের। ফলে এযাবৎ রাজ্যের শাসক দল সরকারি প্রকল্পের বৃহত্তম উপভোক্তা হিসাবে যে নারী শক্তিকে ‘মহিলা ভোটার’ বানাতে চেয়েছিল, এবার তাঁরাই ভেস্তে দিয়েছে শাসকের চেনা সমীকরণের ছক প্রতিবাদের প্রবল ঢেউয়ে। এটাই এই সময়ের বড়ো প্রাপ্তি।

আরও পড়ুন:
অভয়ারা কোনদিনও মরেনি, অভয়ারা মৃত্যুহীন!
কুস্তির রিঙ ছাপিয়ে বীনেশ ফোগতের প্রসারিত রণক্ষেত্র
পশ্চিম বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থায় তৃণমূলের গুন্ডামি: আরজি কর হিমশৈলের চূড়ামাত্র
দহনে বড় বিষ, দহনে বড় জ্বালা


প্রকাশের তারিখ: ০৬-সেপ্টেম্বর-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org