Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পশ্চিম বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থায় তৃণমূলের গুন্ডামি: আরজি কর হিমশৈলের চূড়ামাত্র

অপর্ণা ভট্টাচার্য
আখতার আলি বলেন,‘স্বাস্থ্য বিভাগ, অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো এবং রাজ্য ভিজিল্যান্স কমিশনকে যথেষ্ট প্রমাণ সরবরাহ করা সত্ত্বেও, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে, আমাকে টার্গেট করা হয়, হয়রান করা হয়, এমনকি আমি প্রাণে মেরে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। আমি কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেও অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ডা. সুদীপ্ত রায়ের সহায়তায় ডা. সন্দীপ ঘোষ হাসপাতালে একটা মাফিয়া-র মতো র‌্যাকেট চালাতেন।’আখতার আলির অভিযোগগুলি নিয়ে এখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করছে।
'TMC-Aided Bullying': Not Just RG Kar

তৃণমূল কংগ্রেসের মদতে গুন্ডামি: শুধুমাত্র আরজি করে নয়। বাংলার ডাক্তারদের দাবি, গোটা রাজ্যেই চিকিৎসা শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে গভীর পচন।

ডা. চন্দ্রমৌলি ঝা-র আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল থেকে স্নাতক হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। কিন্তু তিনি ২০২৩ সালে শুধুমাত্র তাঁর ইন্টার্নশিপ শেষ করার শংসাপত্র লাভ করেন— তাও কলকাতা হাইকোর্ট হাসপাতালকে সেটি দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়ার পরে। মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাওয়ার জন্য ইন্টার্নশিপের এই শংসাপত্র অপরিহার্য, যা হাউসস্টাফশিপের আবেদন করার জন্য এবং মেডিসিন বিষয়ে প্র্যাকটিস করার জন্যও প্রয়োজন হয়। ঝা বলেন, তাঁর এবং আরও কয়েকজনের শংসাপত্র আরজি কর কর্তৃপক্ষ আটকে রেখেছিল। এর কারণ, ২০২১ সালে কলেজের কাজকর্ম যাতে স্বচ্ছভাবে চলে সেই দাবিতে তাঁরা একটি বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। যার ফলে তাঁদের প্রাপ্তির খাতায় জুটেছিল হুমকি, খারাপ গ্রেড (খারাপ নম্বর) এবং জোর জবরদস্তি। আরজি কর হল সেই মেডিক্যাল কলেজ যেখানে গত ৯ আগস্ট ডিউটিতে থাকাকালীন একজন শিক্ষানবিশ ডাক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা গোটা দেশকে আলোড়িত করেছে, যার প্রতিবাদে গত তিন সপ্তাহ ধরে পশ্চিমবঙ্গে চলছে বিক্ষোভ। দ্য অয়্যার কথা বলেছিল এই প্রতিষ্ঠানের একাধিক প্রাক্তন ছাত্রের সঙ্গে, যারা প্রত্যেকেই তুলে ধরেছেন  সেখানকার প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার চিত্র– যা ইঙ্গিত করে যে কলকাতার অন্যতম বিশিষ্ট এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রাতিষ্ঠানিক গুন্ডামি। গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকেরা বলেন, শুধুমাত্র হাসপাতালের ভেতরেই যে এক ভয়ের বাতাবরণ রয়েছে এবং ক্রমাগত হুমকি পাওয়ার ঘটনা ঘটছে তাই নয়, গোটা বাংলাতেই চিকিৎসা শিক্ষার উপর এসে পড়েছে এর ছায়া। একইসঙ্গে তাঁরা শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ এক ‘নর্থ বেঙ্গল লবি’-র কথাও উল্লেখ করেন।

যখন দেশের অন্যান্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনুরূপ অভিযোগ উঠে আসছে, তখন ডাক্তার এবং ডাক্তারি পড়ুয়াদের জবানবন্দি থেকে এ-কথা স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের এই ঘটনার অনেক আগে থেকেই আরজি কর মেডিকাল কলেজের ব্যবস্থাপনায় ঘুণ ধরেছে। এবং এটাও এখন স্পষ্ট যে, আরজি কর হিমশৈলের চূড়া মাত্র।

‘প্রতিবাদ করার জন্য হুমকি’

২০২১ সালে, আরজি কর হাসপাতালের ছাত্রছাত্রীরা কার্যকরী ছাত্র ইউনিয়ন, হাউস স্টাফশিপ নির্বাচনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং উন্নত হাসপাতাল পরিকাঠামোর মতো দাবিগুলি নিয়ে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন করেছিলেন। ঝা জানান যে, তাঁদের সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ফলাফল হিসাবে তাঁদের ‘খারাপ গ্রেড’ (খারাপ নম্বর) দেওয়ার হুমকি তো বটেই, এমনকি পুলিশি হস্তক্ষেপের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
দ্য অয়্যার এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলেছে। ডা. ঝা বাদে বাকি সকলেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

একজন ছাত্র বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের বাবা-মাকে ডেকে পাঠিয়ে হুমকি দিয়েছে।’ অন্য একজন দাবি করেছেন যে, বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানোর জন্য তাঁদের বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। ২০২১ সালের এই আন্দোলনেই ছাত্ররা কলেজের বিতর্কিত অধ্যক্ষ ডা. সন্দীপ ঘোষকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছিলেন, যিনি এই ঘটনার পরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও এরপর দ্রুত কলকাতার অন্য একটি নামী সরকারি মেডিক্যাল কলেজে তাঁকে নিয়োগ করা হয়। এই ঘটনার জেরে সরকারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তখনও ছাত্ররা জুনিয়র ডাক্তারদের এখনকার প্রতিবাদের দাবিগুলিই তুলে ধরেছিলেন।  তাঁদের অভিযোগ ছিল, সন্দীপ ঘোষ হাসপাতালকে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো করে পরিচালনা করেন। ছাত্ররা এই পরিচালনা পদ্ধতির বিষয়ে তদন্ত চেয়েছিলেন। প্রায় এক মাসব্যাপী অনশন এবং বেশ কয়েকজন ছাত্র অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনস্থ রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ এ-বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদী ছাত্রদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার এবং তাদের মেডিকেল রেজিস্ট্রেশন আটকে রাখার হুমকি দেয়। ডা. চন্দ্রমৌলি ঝা ও ডা. মৈনাক রায় অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করা এবং রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে আবেদন করার পরেও ইন্টার্নশিপ ডকুমেন্ট পেতে ব্যর্থ হয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। ডা. রায় বলেন ‘যখন আমরা অধ্যক্ষের সাথে দেখা করি, তিনি আমাদের সাথে অত্যন্ত অসম্মানজনক আচরণ করেন।’ 

ডা. ঝা জানান, অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের দায়ের করা ছয়টি ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্টে তাঁর নাম রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখাত তাহলেই তাকেই প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ট্রান্সফার করা হত। মনে হত, যেন তৃণমূল কংগ্রেসই এখানে সবকিছু চালায়।’

‘উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার’

হাসপাতালের ক্লিনিকাল ডার্মাটোলজি বিভাগের প্রাক্তন প্রধান একজন প্রবীণ অধ্যাপক দ্য অয়্যার-কে জানিয়েছেন, ২০২১ সালের ছাত্রবিক্ষোভের স্বপক্ষে সোচ্চার হওয়ার পরেই তাঁকে হঠাৎ উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার করা হয়েছিল। ডার্মাটোলজি বিভাগের এই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলেন, তাঁকে যেখানে ট্রান্সফার করা হয়েছিল সেখানে চর্মরোগ বিভাগই ছিল না! 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চিকিৎসক জানান, ‘আমার চাকরির আর মাত্র পাঁচ বছর বাকি থাকা সত্ত্বেও, ওরা আমাকে আমার শহর থেকে দূরে ট্রান্সফার করে দিয়েছিল। আরজি করে চর্মরোগের বহির্বিভাগের উন্নতিতে আমার অনেকটা ভূমিকা ছিল। মাঝে মাঝে আমি কোনও ইন্টার্ন ছাড়াই প্রত্যেক দিন ৫০০ জনেরও বেশি রোগীকে দেখেছি।’

এই চিকিৎসক জানান, ‘উত্তরবঙ্গ লবি’ নামে পরিচিত এই লবি থেকে হুমকি পাওয়া রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে একটি সুপরিচিত বিষয়। কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফারকে ‘শাস্তি’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। উল্লিখিত এই লবিতে শাসক দল তৃণমূলের সদস্য এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই রয়েছে। ট্রেনি চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে বর্তমান বিক্ষোভ-প্রতিবাদে অংশ নেওয়া দুজন ইন্টার্ন দ্য অয়্যার-কে বলেছেন যে, তাঁদেরও এই ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে হাসপাতালে কর্মরত একজন সহযোগী অধ্যাপক জানান যে, অনেক সময় শিক্ষকদের হাতে অকৃতকার্য করাতে হবে এমন শিক্ষার্থীদের তালিকা তুলে দেওয়া হত। সহযোগী অধ্যাপক দাবি করেন, ‘আমার অনেক সহকর্মী যারা এই দাবি মানতে অস্বীকার করেছিল তাদের বদলি করে দেওয়া হত।’ একজন প্রাক্তন ছাত্র একথাও জানান যে, তিনি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গীকে অকৃতকার্য করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রাক্তন ছাত্র আরও বলেন, ‘অন্যান্য ছাত্রদের যেসব বন্ধু এবং সঙ্গীরা এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিল তাদের আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার মতো চাপ দেওয়া হত। এটা আমাদের কাছে ট্রমার মতো হয়ে উঠেছিল।’

এই হাসপাতালে যে একটা ভয়ের পরিবেশ রয়েছে সেটা মোটামুটি সকলেরই জানা। ২০২২ সালের আগস্টে, আরজি করে একজন মেডিক্যাল ছাত্র কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং শাসক দলের সঙ্গে জড়িত ছাত্রদের একটা অংশের চাপের কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেই ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এমনটাই জানান সেই ছাত্রের দুই বন্ধু।

বেশ কয়েকজন ডাক্তার মেডিক্যাল ছাত্রীদের যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগের বিষয়েও দ্য অয়্যার-কে জানিয়েছেন। ‘খারাপ গ্রেড’ (খারাপ নম্বর) দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়া হত বলে অভিযোগ।

সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আখতার আলির অভিযোগ

২০২৩ সালের মার্চ মাসে, আরজি করের একজন নন-মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট আখতার আলি কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অবৈধ দেহ পাচার এবং বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য নিষ্পত্তি সহ একাধিক বিষয়ে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ এনে কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। তাঁকে খুব দ্রুত মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ট্রান্সফার করা হয়। পরে আখতার আলি রাজ্য ভিজিল্যান্স কমিশনেও চিঠি লেখেন। তিনি এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসাবে টিএমসি বিধায়ক এবং হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ডা. সুদীপ্ত রায়ের নামেও অভিযোগ করেছিলেন।

আখতার আলি বলেন,‘স্বাস্থ্য বিভাগ, অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো এবং রাজ্য ভিজিল্যান্স কমিশনকে যথেষ্ট প্রমাণ সরবরাহ করা সত্ত্বেও, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে, আমাকে টার্গেট করা হয়, হয়রান করা হয়, এমনকি আমি প্রাণে মেরে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। আমি কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং মুখ্যমন্ত্রীর দফতরেও অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। ডা. সুদীপ্ত রায়ের সহায়তায় ডা. সন্দীপ ঘোষ হাসপাতালে একটা মাফিয়া-র মতো র‌্যাকেট চালাতেন।’আখতার আলির অভিযোগগুলি নিয়ে এখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করছে।

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ডা. সন্দীপ ঘোষকে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজে ট্রান্সফার করা হলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আবারও আরজি করে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে আবার বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ আছে যে, অধ্যক্ষের অফিস তালা দিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তৎকালীন মনোনীত অধ্যক্ষকে এক সপ্তাহ সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সন্দীপ ঘোষের বদলির বিরোধিতা করে টিএমসির ছাত্র শাখা বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। এই ঘটনাটি ঘটার সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পেনে ছিলেন। তিনি ফিরে আসার পর, সন্দীপ ঘোষকে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে পুনর্বহাল করা হয়।

রাতে সেমিনার হলে একা থাকার জন্য নির্যাতিতাকে দায়ী করা অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ ট্রেনি চিকিৎসক হত্যার তিন দিন পর এক সাংবাদিক বৈঠকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অথচ এর চার ঘণ্টার মধ্যে সরকার তাঁকে কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপতিরা তাঁর কাজের ‘পুরস্কার’ বলে মনে করেছিলেন। সন্দীপ ঘোষ তাঁর নতুন কর্মক্ষেত্রে বিক্ষোভের মুখে পড়লে, শাসক দলের এক মন্ত্রী সহ দুই সিনিয়র টিএমসি নেতা প্রতিবাদী ছাত্রদের হঠিয়ে দিতে  আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করেন।

বাংলায় চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থা

এই মাসের শুরুর দিকে, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের বেঙ্গল শাখা একটি জোরালো বিবৃতি জারি করে। তাতে উল্লেখ ছিল যে, রাজ্যের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থা ‘সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।’

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ছাত্র সাবিত হুসেন, যিনি সেখানে আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে পরিচিত মুখ, তিনি দ্য অয়্যার-কে জানান,  পরীক্ষাগুলোয় প্রভূত অনিয়ম করা হয়। তিনি আরও জানান যে, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ-ই এসব অনিয়মের কেন্দ্রস্থল। কিন্তু বাদবাকি কলেজগুলোতেও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে থাকা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অবাধে জালিয়াতির সুযোগ দেওয়া হয়। হাউজস্টাফ নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনও স্বচ্ছতা নেই।

কোচবিহার মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী একজন ডাক্তার বলেছেন যে, তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় প্রথম বর্ষের এমবিবিএস পরীক্ষায় পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট পরে ‘উত্তর লেখা নোট’ বিতরণ করতে দেখেছেন। এই ধরনের প্রতারণার সাথে যারা যুক্ত থাকে তাদের সাধারণত বড় পদে বসিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

গত শুক্রবার, ৩০ অগাস্ট, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন মহিলা জুনিয়র ডাক্তার এই অভিযোগে বিক্ষোভ শুরু করেন যে, তাঁদেরকে কলেজে টিএমসিপি নেতার জন্য ‘আইটেম ডান্স’ নাচতে বাধ্য করা হয়েছিল।

এর থেকেই সিস্টেমে এই গাফিলতি ধরা পড়ে যার ফলে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিশেষ করে ‘উত্তরবঙ্গ লবি’-র ঘনিষ্ঠরা বিশেষ সুযোগ সুবিধা পেত। এ-কথা অনেক চিকিৎসকই দ্য অয়্যার-কে জানিয়েছেন।

ডা. সৌরভ দত্ত বলেন, ‘ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অতীতে বারেবারে চিকিৎসকদের ট্রান্সফারের জন্য টাকা নেওয়া, বেআইনি কার্যকলাপে জড়িত থাকা এবং কলেজের অধ্যক্ষকে অকথ্য ভাষায় হুমকি দেওয়ার মতো অসংখ্য অভিযোগ উঠে এসেছে।’ ডা. সৌরভ দত্ত রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য আইএমএর বেঙ্গল শাখা দ্বারা গঠিত অ্যাকশন কমিটির আহ্বায়ক।

সম্প্রতি প্রচারিত একটি অডিও ক্লিপে ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাসকে ডা. চন্দ্রমৌলি ঝা-এর মামলার কথা উল্লেখ করে একজন ইন্টার্নকে তার ইন্টার্নশিপ সার্টিফিকেট আটকে রাখার হুমকি দিতে শোনা গিয়েছে। তবে দ্য অয়্যার এই অডিও ক্লিপটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাস টিএমসির ছাত্র শাখার একজন বিশিষ্ট নেতা এবং পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলে একটি প্রভাবশালী পদে অধিষ্ঠিত, যার সভাপতি ডা. সুদীপ্ত রায় এবং সহ-সভাপতি ডা. সুশান্ত রায়। ডা. অভীক দে সহ এই তিনজনকে আরজি কর হাসপাতালে ট্রেনি চিকিৎসকের মৃতদেহ পাওয়া যাওয়ার দিন ওই হাসপাতালেরই চেস্ট মেডিসিন বিভাগে দেখা গেছে বলে জানা গিয়েছে। অথচ  ওই দিন নির্যাতিতার বাবা-মাকে তাঁদের মেয়েকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। দ্য অয়্যার ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাস এবং ডা. অভীক দে-এর সাথে যোগাযোগ করেছে। তাদের প্রতিক্রিয়া পেলে এই প্রতিবেদনটি পরে আপডেট করা হবে।

২০২০ সালে, রাজ্য সরকার একটি পৃথক পদ তৈরি করে এবং পেশায় চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুশান্ত রায়কে উত্তরবঙ্গের ওএসডি পদে নিয়োগ করে। ২০২১ সালে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস’ ডা. রায়কে ‘কর্তৃত্ব ফলানো, রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত কুৎসিত হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল। 

অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিসের প্রাক্তন সম্পাদক ডা. মানস গুমটা অভিযোগ করেন যে, ‘আরজি করের ঘটনায় সামনে আসা দুর্নীতিগুলি রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রচলিত পদ্ধতিগত দুর্নীতির ছোট্ট একটা অংশ মাত্র। এই সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য উত্তরবঙ্গ লবির বিরুদ্ধে তদন্ত করা উচিত এবং তাদের জবাবদিহি চাওয়া উচিত।’

২০২১ সালে আরজি করের একজন মহিলা ডাক্তার আত্মহত্যা করেন। কারণ হিসাবে উঠে এসেছে যে, তিনি বহুদিন ধরে তাঁর অটিস্টিক কন্যার যত্ন নেওয়ার জন্য বাড়ির কাছাকাছি থাকতে তাঁর শহরের হাসপাতালে ট্রান্সফারের জন্য রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই আবেদন বারে বারে নাকচ করা হয়। উত্তরবঙ্গের সরকারি হাসপাতালে কর্মরত প্রায় ১৮ জনের ডাক্তার সাম্প্রতিক সময়ে কর্মক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

ডা. গুমটা বলেন, ‘গত কয়েক বছরে, উত্তরবঙ্গের লবি উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করেছে। অফিশিয়াল কোনও ক্ষমতা না-থাকা সত্ত্বেও এই লবির সদস্যরা পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য ও কল্যাণ দপ্তরের বদলি, নিয়োগ এবং পদোন্নতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়৷ তারা সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতা ভোগ করে, যার উদাহরণ আরজি করের অধ্যক্ষ ডা. সন্দীপ ঘোষ। তিনি এই লবিরই একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।’


শিরোনাম মার্কসবাদী পথের

সূত্র: দ্য অয়্যার
অনুবাদ: সৃজনী


প্রকাশের তারিখ: ০৪-সেপ্টেম্বর-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬