|
সংরক্ষণ ও উৎকর্ষের ওকালতি (প্রথম পর্ব)প্রভাত পট্টনায়েক |
ভারতে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ কেন্দ্রিক সমস্ত বিতর্কই ঘটেছে সামাজিক গোষ্ঠী বা জাতপাতের বর্গগুলিকে কেন্দ্র করেই। যেহেতু যে সামাজিক বর্গগুলিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেগুলি আয়তনে যথেষ্ট বড় এবং এদের পারস্পরিক সীমানির্ধারণের মাপকাঠিও এমন যে, সমস্ত সামাজিক বর্গগুলি জুড়ে মেধার সমবিন্যাসের যুক্তিও এখানে প্রযোজ্য। ফলেই গোষ্ঠী শব্দটি একটু আগে যেভাবে বিশ্লেষণমূলক ভাবে সংজ্ঞায়িত হল তার নিরিখে এই সামাজিক বর্গগুলিকে গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করাই যায় এবং আমরা দ্বিধাহীনভাবেই বলতে পারি যে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপগুলি ভারতীয় পরিবেশে যেভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা উৎকর্ষ-বর্ধকই। |
মেধা বনাম সংরক্ষণ, এই বাইনারি সাধারণভাবে আমাদের দেশে এবং দুনিয়াতে বেশিরভাগের চেতনাতেই গেড়ে বসে আছে। মজার ব্যাপার হল সুবিধাভোগীরাই তৈরি করেছেন এই বাইনারি। তারা নিজেদের যোগ্যতাকেই একমাত্র 'মেধা' হিসেবে হিসেবে দাবি করেছেন, স্বীকৃতি দিয়ে চলেছেন। পুঁজি সমস্ত কিছুকেই ব্যাক্তি মালিকানার সাথে সম্পর্কীত করে দেখতে চায়। পুঁজিবাদের কাছে সমস্ত উৎকর্ষের পিছনে রয়েছে মূখ্যত ব্যক্তির ভূমিকা। এ-ধারণার মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশে সমষ্টির অবদানকে নাকচ করার প্রবণতাই প্রকাশিত হয়। ফলত, 'জ্ঞান' নামক সামাজিক/ যৌথ সত্তাটিকেও সুবিধাভোগীরা (শাসকরা) ব্যক্তির মেধা বা উৎকর্ষ হিসেবেই চিহ্নিত করে। সেটা করতে চায় বলেই সুবিধাভোগীরা, অর্থাৎ সমাজের ক্ষুদ্র অংশ বাকি বৃহৎ অংশের জন্য সৃজনশীল গুণাবলী-বিকাশের সম-সুযোগ কখনও-ই তৈরি করেনি। ফলে তাদের তৈরি ব্যবস্থা তাদেরই স্বার্থে আজও এমন কোনও কাঠামো তৈরি করেনি যেখানে সমস্ত মানুষের সমস্ত রকম গুণাবলী সমভাবে বিকাশিত হতে পারে। এই দুনিয়া, আজও এরকম কোনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেখতে পারেনি— যেখানে সমস্ত মানুষের সমস্ত রকম গুণাবলীর হতে পারে সম-বিকাশ। সেকারণে, মানব ইতিহাস জানেই না তার মানবসম্পদের সম্মিলিত মেধা আসলে ঠিক কতটা এবং কত রকমের। তাই যারা বঞ্চিত, অবহেলিত তাদের বাড়তি সুযোগ দিলে, যত্ন নিলে সম্মিলিত মেধার-ই পূর্ণবিকাশই হতে পারে। সেটাই তৈরি করতে পারে প্রকৃত সামগ্রিক উৎকর্ষ। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়ক এই লেখায় আসলে সেই সম্ভাবনার পক্ষেই ওকালতি করেছেন।
মজার কথাটা হচ্ছে সংরক্ষণের মত স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের সমর্থক ও বিরোধীরা একটা বিষয়ে একমত যে, যেখানেই এই নীতির প্রয়োগ হবে সেখানেই কাজের মান নিম্নগামী হতে বাধ্য। উদাহরণ হিসেবে, যদি চিকিৎসক নিয়োগে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়, তবে চিকিৎসা পরিষেবার মান নিম্নগামী হবে, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে এর বাস্তবায়ন হয়, তবে পাঠদানের মানে অবনমন ঘটবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নীতির সমর্থকরা ‘সামাজিক ন্যায়’ ও ‘সমতা’র অবস্থান থেকে অবনমনের বাস্তবতা সত্ত্বেও এর স্বপক্ষে সওয়াল করে, আর বিরোধীরা ‘সামাজিক ন্যায়’-এর স্বার্থে মানের অবনমন কোনো অবস্থাতেই মেনে নিতে রাজি থাকে না। স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের সমর্থকরাও যে কাজের মানের অবনমনের বিষয়টি বিশ্বাস করে এই কথাটা প্রথমাবস্থায় বিস্ময়করই শোনাবে। তা সত্ত্বেও এটা সত্য। প্রকৃতপক্ষে ভিপি সিং সরকারের সময়ের পর যখন থেকে ভারতে ‘সামাজিক ন্যায়’ কথাটি জোরালোভাবে আলাপ আলোচনায় উঠে আসে তখন থেকেই এটা সত্য। স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের দাবি মূলগতভাবে নিহিত রয়েছে ‘ন্যায়’ চাওয়ার মধ্যে যা অন্য আর সমস্ত বিবেচনাকে তুচ্ছ করে দেয়। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই কথাটির স্বীকৃতিও যে অন্য বিবেচনাগুলি আসলে উল্টো পক্ষের যুক্তি। তার মানে প্রচ্ছন্নভাবে এটা স্বীকার করে নেওয়াই হচ্ছে যে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের বাস্তবায়নে মান অবনমনের মূল্যটি দিতেই হয়। অন্যভাবে বললে, নীরবতাও যেহেতু অনেক কথা বলে, ফলে ‘উৎকর্ষ’-এর যুক্তি সম্পর্কে নীরব থেকে ‘ন্যায়’-এর সওয়ালে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ এক অর্থে ‘উৎকর্ষ’-এর ওকালতির স্বীকৃতিরই নামান্তর। টাকার অঙ্কে দেখলে যেহেতু কাজের মানের অবনমন কাজের পরিমাণগত অবনমনের সমতুলই, ফলে দেখা যাবে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে এমন একটি সমাজে বস্তুগত ও মানব সম্পদের কোনো একটি নির্দিষ্ট সুফলের ক্ষেত্রে কাজের মান ও পরিমাণ যে কোনো সময়পর্বেই এ ধরনের স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ না-করা সমাজের চেয়ে কম। কাজের ক্ষেত্রে এই ঘাটতিটি অতএব ‘অনুৎকর্ষতা’রই এক ধরনের ফলাফল। অন্যভাবে বললে যখন ‘সমতা’ ও ‘সামাজিক ন্যায়’-এর পক্ষে সওয়াল করা হয়, তখনও স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ যে সাধারণভাবে উৎকর্ষহীন উৎপাদনকে উৎসাহিত করে এমনটা মেনে নেওয়াই হয়। দুটো ভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজের গুণ ও পরিমাণগত ফলাফলের তুলনার উপর ভিত্তি করা এই সওয়ালকেই আমি ‘উৎকর্ষ’-এর সওয়াল বলে অভিহিত করি। এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য ‘উৎকর্ষের ওকালতি’-কে একটু বিশদে বিশ্লেষণ করা। এই নিবন্ধ সওয়াল করে দেখাবে যে উৎকর্ষের ওকালতি প্রকৃতপক্ষে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে যাওয়ার পরিবর্তে বরং একে সমর্থনই করবে। অন্য ভাবে বললে, স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের সওয়াল, অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত কারণে, শুধুমাত্র উৎকর্ষের চেয়ে ন্যায়কে এগিয়ে রাখে, বরং এটাই সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত অবস্থান যে, ন্যায় এবং উৎকর্ষ দুইই স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের দাবি করে। ১ যেহেতু বুদ্ধিমত্তা বা মেধা সমাজের সমস্ত গোষ্ঠীর মধ্যেই সমভাবে ছড়িয়ে থাকে অর্থাৎ মেধার সম্ভাব্যতার বিন্যাস মোটামুটিভাবে প্রতিটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তরেই অভিন্ন, ফলে কোনো একটি পেশায় কোনো একটি বা কয়েকটি গোষ্ঠীর অযৌক্তিক রকমের বৃহদায়তন উপস্থিতি মূলগতভাবেই উৎকর্ষতা হানিকর, কারণ তার অর্থ অবশ্যই এই যে, সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর উন্নত মেধার সদস্যদের পরিবর্তে ‘সুবিধাভোগী‘ গোষ্ঠীর তুলনায় হীনমেধার সদস্যরাই সেই স্থান অধিকার করে রেখেছে। অন্যভাবে উপস্থাপন করে বলা যায়, প্রতিটি গোষ্ঠীর অভ্যন্তর থেকে যদি মেধার ভিত্তিতে চয়ন হয়, তখন কোনো একটি পেশায় গোষ্ঠীগত জনবিন্যাস সামগ্রিক জনসংখ্যার গোষ্ঠীগত বিন্যাসের যত কাছাকাছি হবে, ততই অর্থনীতিতে উৎকর্ষের মান উন্নত হবে। তার মানে উৎকর্ষের উন্নয়ন শুধুমাত্র মেধাভিত্তিক চয়ন নয়, যে কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচিত সদস্যদের জনবিন্যাস সামগ্রিক জনসংখ্যার জনবিন্যাসের কাছাকাছি হওয়াও দাবি করে। বাস্তবে যেহেতু মেধাভিত্তিক চয়নের মাধ্যমে নিযুক্তি থেকে উঠে আসা চিত্র সামগ্রিক জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করে না এবং একইসাথে এটাও ধারণায় থাকে যে সামগ্রিক জনসংখ্যার মধ্যে থাকা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীতে মেধা সমভাবে বিন্যস্ত থাকে, তার অর্থ দাঁড়ালো যে, কিছু কিছু গোষ্ঠীর সামনে নিশ্চিতভাবেই কিছু দৃশ্যমান ও কিছু অগোচরে থাকা প্রতিবন্ধক বিরাজমান রয়েছে। যেহেতু স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের উদ্দেশ্যই হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিবন্ধকগুলিকে পেরিয়ে যেতে এই সমস্ত গোষ্ঠীকে সহায়তা করা, ফলে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ অবশ্যই উৎকর্ষ বর্ধক একটি ব্যবস্থা। এর অব্যবহিত ক্ষণেই প্রশ্ন উঠবে : একটি ‘গোষ্ঠী’ গঠিত হয় কীসের ভিত্তিতে? উপরোক্ত বিশ্লেষণমূলক সওয়ালের নিরিখে এই প্রশ্নের উত্তরও বিশ্লেষণমূলক হওয়াই কাম্য। এটা বলাই বাহুল্য যে একটি এক কোটি সদস্যের গোষ্ঠীর সাথে একটি এক সদস্যের গোষ্ঠীর প্রতিতুলনায় প্রতিটি গোষ্ঠীতে মেধা সমভাবে বিন্যস্ত কথাটির কোনো সাধারণ বৈধতা থাকে না। এই কথাটির অধিকতর বৈধতা তৈরি হয় যখন প্রতিটি গোষ্ঠীর আয়তন বৃহদাকার হয়। একটি গোষ্ঠীর একটি ন্যূনতম আয়তন থাকলেই বলা যায় যে তার অভ্যন্তরে মেধার বিন্যাস গড়পড়তা সামগ্রিক জনসংখ্যার অভ্যন্তরে থাকা মেধার বিন্যাস বা সদৃশ অন্য কোনো ন্যূনতম আয়তনের চেয়ে বড় গোষ্ঠীর অভ্যন্তরের মেধার বিন্যাসের কাছাকাছি। এই গোষ্ঠী ন্যূনতম আয়তনের চেয়ে বড় হতে পারে কিন্তু ক্ষুদ্রতর হলে হবে না, যেহেতু একটি গোষ্ঠী আয়তনে যথেষ্ট বড় না হলে অন্য গোষ্ঠী বা সমগ্র জনসংখ্যার সাথে মেধার বিন্যাসের সমতায় আসতে পারে না, সুতরাং একটি গোষ্ঠী ন্যূনতম আয়তনের তুলনায় আরো বড় হলে এই বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রশ্ন থাকে না। ফলে কীসের ভিত্তিতে একটি গোষ্ঠী গঠিত হয়, এই প্রশ্নের উত্তরটি এমনভাবে দেওয়া যাবে যাকে প্রথম দৃষ্টিতে বৃত্তাকার যুক্তির (বৃত্তাকার যুক্তি যা উপসংহারকে আবার প্রশ্নে ফিরিয়ে আনে-অনুবাদক) উপর আধারিত মনে হলেও আসলে কোনোভাবেই তা নয়। যেমন, এই যুক্তিশৃঙ্খলায় গোষ্ঠী মানে ব্যক্তিদের সেই সমাহার যার অভ্যন্তরে মেধার বিন্যাস সামগ্রিক জনসংখ্যার হুবহু অনুরূপ। ভারতে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ কেন্দ্রিক সমস্ত বিতর্কই ঘটেছে সামাজিক গোষ্ঠী বা জাতপাতের বর্গগুলিকে কেন্দ্র করেই। যেহেতু যে সামাজিক বর্গগুলিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেগুলি আয়তনে যথেষ্ট বড় এবং এদের পারস্পরিক সীমানির্ধারণের মাপকাঠিও এমন যে, সমস্ত সামাজিক বর্গগুলি জুড়ে মেধার সমবিন্যাসের যুক্তিও এখানে প্রযোজ্য। ফলেই গোষ্ঠী শব্দটি একটু আগে যেভাবে বিশ্লেষণমূলক ভাবে সংজ্ঞায়িত হল তার নিরিখে এই সামাজিক বর্গগুলিকে গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করাই যায় এবং আমরা দ্বিধাহীনভাবেই বলতে পারি যে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপগুলি ভারতীয় পরিবেশে যেভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটা উৎকর্ষ-বর্ধকই। আগেই বলা হয়েছে, স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য প্রবেশপথের প্রতিবন্ধকতা দূর করা। কিন্তু এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হিসেবে নিজের মেধা প্রকাশ করার সুযোগের অসমতা রয়েছে, সেখানে প্রকাশিত মেধার ভিত্তিতে চয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিবন্ধকতার অস্তিত্ব থেকে যায়। অন্যভাবে বললে, যেখানে পরিস্থিতিটিই মূলগতভাবে অসাম্য-জর্জর সেখানে আনুষ্ঠানিক সমতা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি অসাম্যের পথেই হাঁটবে অর্থাৎ সমতার সম্পূর্ণ বিপরীতকেই সুনিশ্চিত করবে। এদেশে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপকে বিদ্যমান মূলগত অসাম্যের প্রভাব ভাঙার পদক্ষেপে পরিণত করতে হবে অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক সমতার গণ্ডী পেরিয়ে সত্যিকারের সমতা অর্জনের পথে এগোতে হবে। যেহেতু মেধার আবিষ্কার বা প্রকাশ বা লালন একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়, ফলে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের অনুবর্তী ফল হিসেবে কিছু স্বল্পকালীন ‘উৎকর্ষ-হানি’ দেখা দেবেই। কিন্তু অবধারিতভাবেই এর ফলে একটি দীর্ঘকালীন অর্জন সাধিত হবে। স্বল্পকালীন ‘উৎকর্ষ-হানি’-র জন্ম হয় বিদ্যমান ‘প্রকাশিত মেধা’-র ভিত্তিতে নিয়োগের নীতি লঙ্ঘনের ফলে; দীর্ঘকালীন উৎকর্ষ বর্ধন সম্ভব হয় যখন স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে একটা সময়ের পর ‘প্রকাশিত মেধা’-র বিন্যাস বদলে যায়। (সমভাবে বিন্যস্ত ‘নিহিত মেধা’ এবং অসমভাবে ছড়িয়ে থাকা ‘প্রকাশিত মেধা’-র মধ্যে থাকা ব্যবধান দূর করার জন্যে নেওয়া স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মেধার ‘লালন’ শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র সংরক্ষণের চেয়ে আরো অনেক কিছুর পথ সুগম করবে। এর জন্যে অতিরিক্ত সুরাহার প্রয়াস হিসেবে ‘সেতু পাঠক্রম’ বা ’ব্রিজ কোর্স’, ‘পূর্ব অধ্যয়ন’ বা ‘প্রি-রিকুইজিট’ পাঠক্রম, বিশেষ পাঠক্রম প্রভৃতির প্রয়োজন হবে। ) এই স্বল্পকালীন ক্ষতি ও দীর্ঘকালীন লাভের মধ্যে তুলনা কীভাবে হবে? এখন এর দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলি যদি প্রবলভাবে দূরদৃষ্টিহীন হয় তবে ক্ষতির বিবেচনারই জয় হবে। অর্থনীতিবিদ আর্থার সিলি পিগু এমন দূরদৃষ্টিহীনতাকে ‘দূরবীক্ষণের গুণাবলীর অভাব’ বলে অভিহিত করেছেন। এখন এই দূরবীক্ষণের গুণাবলীর অভাব দিয়ে ব্যক্তিবিশেষকে চেনা যায় কিনা সেটা বিতর্কের বিষয়। জোসেফ শ্যুমপিটার সহ নানা বিশিষ্ট মানুষ এই মত সম্পর্কে কঠোর সন্দেহ ব্যক্ত করেছেন। ওরা অস্বীকার করেছেন এই কথাটি যে ব্যক্তি জন্মগতভাবেই ভোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সময়-প্রাধান্যের দ্বারা প্রভাবিত অর্থাৎ ভোগের ক্ষেত্রে একটি বাড়তি একক সংযোজিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগন্তুক সময়খণ্ডের চেয়ে বিদ্যমান সময়খণ্ডকেই প্রাধান্য দেয় যদি দৈনন্দিন ভোগের প্রাপ্তি এই বাড়তি সংযোজন ব্যতিরেকেও বিদ্যমান ও আগন্তুক সময়খন্ডে অপরিবর্তিত থাকে। ফলত তাঁরা এই কথাও অস্বীকার করতেন যে, ব্যক্তি সবসময়ই একটি সীমাবদ্ধ সময়ের মাপকাঠিতে কাজ করে। যদি ব্যক্তির এতটা দূরবীক্ষণের গুণাবলীর ঘাটতি নাই থাকে, তবে সমাজকে ব্যক্তির আণবিক সত্তার সমাহার হিসেবে দেখা হলেও সেই ঘাটতির দায় সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আবার এই ব্যক্তিসমূহ যদি আণবিক সত্তা হিসেবে এই ঘাটতির অধিকারীও হয়, কিন্তু সমাজকে আণবিক ব্যক্তিসত্তার সমাহার না ভেবে ‘আণবিক ব্যক্তি’-র অতীত কোনো অধিসত্তা হিসেবে দেখা হয়, তখনও সমাজের সেই ঘাটতি থাকার কোনো কারণ নেই যেহেতু এই অর্থে সমাজ একটি চিরজীবি সত্তা। (যদিও সমাজ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু এই সত্যটি কখনোই এই মতের মানুষদের বোধগম্যতায় আসে না। ) মোদ্দা কথা হল সেক্ষেত্রে সমাজের অদূরদর্শিতা বা দূরবীক্ষণের গুণাবলীর ঘাটতি, এমনকী ইতিবাচক সময়-প্রাধান্যের ঘাটতির প্রশ্নও ওঠেই না। সুতরাং তাদের হিসেব অনুযায়ী উৎকর্ষ বর্ধনের দীর্ঘকালীন লাভ উৎকর্ষ-হানির স্বল্পকালীন ক্ষতিকে ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত, যেহেতু উৎকর্ষ-হানি বিষয়টি অতিক্রান্তিকালীন, আর উৎকর্ষ-বর্ধন একবার পুঞ্জিত হতে শুরু হলে অনন্তকাল ধরে বেড়েই চলবে। এ থেকে সিদ্ধান্ত করা যায় যে সমাজের ক্ষেত্রে বিশেষ করে নীতি রূপায়ণের সময়-সীমানাকে এতদূর অবধিই প্রসারিত করতে হবে যাতে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ তার ক্ষেত্রে উৎকর্ষ-বর্ধক হয়। ২ স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের স্বপক্ষে এ যাবৎ উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক যুক্তিগুলি অদ্ভুতভাবে মুক্তবাণিজ্যের হাত থেকে ‘শিশু শিল্প’ সুরক্ষার যুক্তিগুলিকে মনে করিয়ে দেয়। ‘শিশু শিল্প’ সুরক্ষার স্বপক্ষে মূল যুক্তি হল যে অন্যদেশে এতদিন ধরে ব্যবসা করে আসা শিল্পের সমান বা কম উৎপাদন ব্যয় নিয়েও শিশু শিল্পগুলি পুরো মাত্রায় প্রতিযোগিতার উপযোগী হয়ে উঠতে সক্ষম। কিন্তু এর শৈশব অবস্থা কাটিয়ে ওঠাটি সময়সাপেক্ষ। এখন একে সুরক্ষা প্রদান না করলে দীর্ঘকালীন ফল হিসেবে উৎকর্ষের হানি ঘটবে (যদি বর্তমান অবস্থা থেকে উৎপাদন ব্যয় আরো কমে যায়)। একে সুরক্ষা প্রদান করলে এই হানি ঘটবে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে যখন সে শৈশব অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে নি এবং প্রারম্ভিক পর্ব থেকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলশ্রুতিতে প্রতিযোগিতার জন্যে অনুপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে। শিশু শিল্প সুরক্ষা যুক্তি অনুযায়ী এমন শিল্পগুলিকে সুরক্ষা প্রদান করতে হবে এবং দীর্ঘকালীন উৎকর্ষ-বর্ধনের স্বার্থে স্বল্পকালীন উৎকর্ষ-হানিকে সহ্য করতে হবে। ঠিক এই কথাগুলিই স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের স্বপক্ষেরও সওয়াল। এবং অবশ্যই সংরক্ষণেরও। শিশু শিল্প সুরক্ষারে যুক্তি সর্বত্রই মান্যতা পেয়ে থাকে। কিন্তু সংরক্ষণের স্বপক্ষের সওয়ালকে সেই মান্যতা দেওয়া হয় না। যদিও স্বীকৃতিমূলক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে শিশু শিল্প সুরক্ষার যুক্তি অনেক বেশি জোরালো হয়ে ওঠে অন্তত দু’টি কারণে। প্রথমত, একটি দেশের শিশু শিল্পকে অন্য দেশের শিল্পের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যে শিশু শিল্প সুরক্ষা যুক্তি একটি গৎবাঁধা সওয়াল। যদি পৃথিবীর অন্য দেশের উৎপাদকের তুলনায় জাতীয় উৎপাদকদের উৎপাদনের ব্যয় শেষ পর্যন্ত একই থেকে যায় অথবা একই আয়তনের হয় এবং তার থেকে আর না-ও কমে, তবু জাতীয় উৎপাদককে সুরক্ষার স্বপক্ষে যুক্তি থেকে যায়। অন্যভাবে বললে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ে হ্রাস ঘটে যাওয়া এই সওয়ালের বৈধতা পাওয়ার জন্যে জরুরি নয়। ফলেই প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের বিষয়টি এক্ষেত্রে পূর্বশর্ত করা হয় নি। কিন্তু সংরক্ষণ প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে যাওয়ার পর উৎকর্ষের প্রকৃত উন্নতি ঘটায় যেহেতু প্রাথমিক ধারণা হিসেবে ধরেই নেওয়া হয় যে মেধা গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমভাবে বিন্যস্ত থাকে। একবার এই প্রাথমিক ধারণার মান্যতা হয়ে গেলে উৎকর্ষের প্রশ্ন থেকেই সংরক্ষণের সওয়াল শিশু শিল্প সুরক্ষার যুক্তির চেয়েও জোরালো হয়ে ওঠে। অর্থাৎ দীর্ঘকালীন ফলাফলে সংরক্ষণ যেভাবে উৎকর্ষের উন্নতি ঘটায় সেটা শিশু শিল্প সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঘটে না। দ্বিতীয়ত, কোন কোন শিল্পের জন্যে শিশু শিল্প সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন সেটা আগে থেকে বোঝা যায় না। কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে একটি শিল্প শিশু শিল্প সুরক্ষা পেলে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলনীয় উৎপাদন ব্যয়ের স্তরে উন্নীত হতে পারবে। কিন্তু গোষ্ঠী নির্বিশেষে মেধার সমবিন্যাসের ধারণার ভিত্তিতে সংরক্ষণের আওতায় আসার প্রতীক্ষায় থাকা গোষ্ঠীগুলিকে আগেভাগে চিহ্নিত করা যায়। এটা সত্য যে পৃথকীকরণের সবসময়ই কতগুলি পদ্ধতিগত বিকল্প ধারণাও থাকবে যার ভিত্তিতে ‘সুবিধাভোগী’ ও ‘সুবিধা-বঞ্চিত’ পৃথকীকরণও বিকল্প পথে হবে, কিন্তু প্রায়োগিক স্তরে পৃথকীকরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত এই সমস্যা গুণগতভাবেই সুরক্ষা/সংরক্ষণের যথার্থতা প্রমাণে সুবিধাপ্রাপ্তদের নির্দিষ্ট স্তরে উৎকর্ষ উন্নীত করার সক্ষমতা বিষয়ক অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া বিশ্লেষণমূলক সমস্যার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘শিশু শিল্প’ সুরক্ষার যুক্তি সর্বজনমান্য, অথচ এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকার পরও সংরক্ষণের সওয়াল ততটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। সংরক্ষণের সওয়াল ও শিশু শিল্প রক্ষার সওয়ালের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে একটি শিশু শিল্প নির্দিষ্ট স্তরের উৎকর্ষ সাধনে সমর্থ হবে, কিন্তু তার জন্যে প্রাথমিকভাবে তার গড়ে ওঠাটি অবারিত হতে হবে। অন্যভাবে বললে, এই যুক্তি নিজেই পূর্বশর্ত দেয় যে শিল্প সুরক্ষার ক্ষেত্রে আশু উচ্চব্যয় থেকে অবশেষে নিম্নব্যয়ে পৌঁছে যাওয়াটি একটি স্বনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি ফলাফল যাকে বলা যায় ‘করতে করতে শেখা’। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন এজন্যেই যাতে সুরক্ষা প্রত্যাহার হলে শিশু শিল্পটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে সক্ষম হয়। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সমান্তরালে আরো কিছু প্রতিকার-সাধক ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে সুবিধাগ্রাহীদের সুপ্তমেধা প্রকাশ পেতে পারে। উচ্চশিক্ষায় সংরক্ষণের পাশাপাশি সমান্তরাল ব্যবস্থা হিসেবে ‘সেতু পাঠক্রম’, ‘প্রতিকার-সাধক পাঠক্রম’ এছাড়াও আরো নমনীয় পদক্ষেপ (যেমন পাঠক্রমের পুনরাবৃত্তির সুযোগ) রাখতে হবে। ‘এখানে ‘পাঠগ্রহণ’ এখানে শুধু ‘করা’-র মাধ্যমে হবে না। এখানে অতিরিক্ত পদক্ষেপও থাকতে হবে। আমরা যদি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ বলতে সংরক্ষণ সহ এমনতর প্রতিকার-সাধক পদক্ষেপের একটি গুচ্ছ কার্যক্রম মনে করি, তবে এই কার্যক্রম বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক বিরোধিতার তরফে কী আপত্তি তোলা হবে তা অনুমান করা কঠিন। তখন নিশ্চিতভাবেই বিচিত্রধর্মী বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। যেমন স্তর চিহ্নিত করে পৃথকীকরণ কিংবা আরো পিছিয়ে গিয়ে প্রাক-উচ্চশিক্ষা পর্ব থেকে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি, বাস্তব ক্ষেত্রে পরিপূরক প্রতিকার-সাধক পাঠক্রম আয়োজনের সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে যে ভাষায় ‘উৎকর্ষের ওকালতি’ করে বিশ্লেষণমূলক বিরোধিতা উপস্থিত করা হয়, তার কোনো সুযোগ থাকবে না। বিশ্লেষণমূলক বিরোধিতার একমাত্র ভিত্তি হতে পারে সামাজিক গোষ্ঠী নির্বিশেষে মেধার সমবিন্যাসের ধারণার প্রত্যাখান এবং বিকল্প ধারণা হিসেবে কিছু বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠীর সার্বিক মেধাগত উচ্চতা (যা মূলত এক ধরনের বর্ণবাদ এবং হেরেনভোক-সদৃশ ধারণা) অথবা গোষ্ঠী বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে উন্নততর সহজাত সক্ষমতার (যা প্রাথমিকভাবেই জাতপাতের ব্যবস্থাকে মান্যতা দেয়) ধারণার ওকালতি। যদি এই দুই বিকল্প পূর্বানুমান যুক্তিসঙ্গত কারণেই প্রত্যাখাত হয়, তখন উৎকর্ষের ওকালতির উপর নির্ভর করে আনা বিশ্লেষণমূলক বিরোধিতা শুধু বাতিলই হবে না, বরং এর সম্পূর্ণ উল্টো পক্ষে গিয়ে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের স্বপক্ষের সওয়ালে পরিণত হবে।
প্রকাশের তারিখ: ২৭-জুলাই-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |