সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংরক্ষণ ও উৎকর্ষের ওকালতি (শেষ পর্ব)
প্রভাত পট্টনায়েক
ভারতে সংরক্ষণ কেন্দ্রিক বিতর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল যে সংরক্ষণকে দেখা হয়েছে সামাজিক হিতের প্রতিপক্ষ হিসেবে। এটা যদি সত্যি হত তবে উদ্দীষ্ট সুবিধাগ্রাহী সামাজিক গোষ্ঠীর কেউ কেউ অবশ্যই সংরক্ষণের বিরোধিতা করতেন। এই ব্যবস্থা নিজেদের সামাজিক গোষ্ঠীর জন্যে প্রদত্ত হলেও যারা সংরক্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন তারা এর বিরোধিতা করতেন এমনটা আশাই করা যায়; কিন্তু এমন কোনো বিরোধিতা দেখতে পাওয়া যায় নি। যদি সামাজিক হিতকে ব্যক্তির ওপরে এক অধিসত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে এই যুক্তি, অনিবার্য হলে, কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করত ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে ব্যক্তির অতীত সামজিক হিতের স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে। কিন্তু তেমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায় নি। মোদ্দা কথা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সামাজিক হিত’ কথাটির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই যা থেকে বোঝা যায় ‘সামাজিক হিত’-এর এমনতর ধারণাটি সুবিধাভোগী শ্রেণিরই আত্মস্বার্থবাহী ধারণা।

প্রথম পর্বের পর...
মেধা বনাম সংরক্ষণ, এই বাইনারি সাধারণভাবে আমাদের দেশে এবং দুনিয়াতে বেশিরভাগের চেতনাতেই গেড়ে বসে আছে। মজার ব্যাপার হল সুবিধাভোগীরাই তৈরি করেছেন এই বাইনারি। তারা নিজেদের যোগ্যতাকেই একমাত্র 'মেধা' হিসেবে হিসেবে দাবি করেছেন, স্বীকৃতি দিয়ে চলেছেন। পুঁজি সমস্ত কিছুকেই ব্যাক্তি মালিকানার সাথে সম্পর্কীত করে দেখতে চায়। পুঁজিবাদের কাছে সমস্ত উৎকর্ষের পিছনে রয়েছে মূখ্যত ব্যক্তির ভূমিকা। এ-ধারণার মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশে সমষ্টির অবদানকে নাকচ করার প্রবণতাই প্রকাশিত হয়। ফলত, 'জ্ঞান' নামক সামাজিক/ যৌথ সত্তাটিকেও সুবিধাভোগীরা (শাসকরা) ব্যক্তির মেধা বা উৎকর্ষ হিসেবেই চিহ্নিত করে। সেটা করতে চায় বলেই সুবিধাভোগীরা, অর্থাৎ সমাজের ক্ষুদ্র অংশ বাকি বৃহৎ অংশের জন্য সৃজনশীল গুণাবলী-বিকাশের সম-সুযোগ কখনও-ই তৈরি করেনি। ফলে তাদের তৈরি ব্যবস্থা তাদেরই স্বার্থে আজও এমন কোনও কাঠামো তৈরি করেনি যেখানে সমস্ত মানুষের সমস্ত রকম গুণাবলী সমভাবে বিকাশিত হতে পারে। এই দুনিয়া, আজও এরকম কোনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেখতে পারেনি— যেখানে সমস্ত মানুষের সমস্ত রকম গুণাবলীর হতে পারে সম-বিকাশ। সেকারণে, মানব ইতিহাস জানেই না তার মানবসম্পদের সম্মিলিত মেধা আসলে ঠিক কতটা এবং কত রকমের। তাই যারা বঞ্চিত, অবহেলিত তাদের বাড়তি সুযোগ দিলে, যত্ন নিলে সম্মিলিত মেধার-ই পূর্ণবিকাশই হতে পারে। সেটাই তৈরি করতে পারে প্রকৃত সামগ্রিক উৎকর্ষ। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়ক এই লেখায় আসলে সেই সম্ভাবনার পক্ষেই ওকালতি করেছেন।
৩
তবে ‘উৎকর্ষের ওকালতি’ সম্পর্কে একটি দ্বিতীয় এবং পদ্ধতিগত আপত্তিও রয়েছে। ‘সামাজিক ন্যায় উৎকর্ষের বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়’, এই প্রস্তাবনাটিই এই আপত্তির মধ্যে নিহিত রয়েছে। আমরা আলোকপাত করতে পারি এই আপত্তির প্রশ্নে এবং এরই পথ ধরে এই অন্তর্নিহিত প্রস্তাবনাকে আরও পরিস্ফুট করব। আমরা যদি বলি সমাজের ‘ক’ পর্বে ‘খ’ পর্বের চেয়ে অনেক বেশি উন্নততর মানের উৎপাদন হয়েছে অর্থাৎ প্রদত্ত বস্তুগত ও মানব সম্পদের কোনও একটি নির্দিষ্ট সুফলের ক্ষেত্রে কাজের মান ও পরিমাণ ‘ক’ পর্বে অধিকতর ইতিবাচক, তা সত্ত্বেও স্বতঃপ্রণোদিত হিসেবে বলা যাবে না যে ‘ক’ সামাজিক পর্ব হিসেবে ‘খ’ পর্বের চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য। এ কথা বলার অর্থ, ‘ক’ পর্বের উৎপাদনের মান ও পরিমাণ যেহেতু অধিকতর (> এর অর্থে)। তার মানে কি ‘ক’ পর্বে নীতিগতভাবে ‘খ’ পর্বের চেয়ে শ্রেয়তর ভাবে সমাজের সব অংশের মধ্যে এই সুফল এমনভাবে বন্টন করা যাবেই যে অন্তত কিছু মানুষ তুলনায় বেশি সঙ্গতি অর্জন করবে এবং কেউই সঙ্গতিহীন অবস্থায় পতিত হবে না? অন্য ভাবে বললে, ‘ক’ পর্বে নীতিগতভাবে সকলের উপযোগিতা মান ও পরিমাণের বিচারে ‘খ’ পর্বের চেয়ে বেশি। (অর্থনীতির বিদ্যাগত ভাষায় এটাকে কখনো এভাবে বলে প্রকাশ করা হয় যে ‘ক’ পর্বে উপযোগিতার সম্ভাবনার রেখা ‘খ’ পর্বের উপযোগিতার সম্ভাবনা রেখার চেয়ে উঁচু।)
কিন্তু নীতিগতভাবে ‘ক’ পর্বে প্রত্যেকের জন্যে উপযোগিতা সম্ভাবনার রেখাটি ‘খ’ পর্বের চেয়ে অধিকতর বলার অর্থ এই নয় যে প্রকৃতঅর্থেই তা ‘খ’ পর্বের চেয়ে অধিকতর। অন্য ভাষায় বললে, ‘ক’ পর্বে প্রাপ্ত উৎপাদিত সামগ্রী নীতিগতভাবে এমনভাবে সকলের মধ্যে বন্টন করা সম্ভব যাতে সকলে তুলনায় ‘খ’ পর্বের চেয়ে বেশি সঙ্গতি অর্জন করে বলে দাবি করা আর সত্যিকার অর্থে সকলের মধ্যে উৎপাদিত সামগ্রী বন্টন করা সমার্থক নয়। যদি ‘ক’ পর্বে ধরা যাক ‘চ’ ও ‘ছ’ নামে দু’টি সামগ্রী যথাক্রমে ১০০ ও ৮০ পরিমাণে উৎপাদিত হয়েছে এবং ‘খ’ পর্বে তাদের পরিমাণ ৫০ ও ৫০, তবে ‘ত’ পর্বকে স্পষ্টতই ‘খ’ পর্বের তুলনায় উৎপাদন উৎকর্ষের স্তর বলতে হবে, যদি প্রাথমিক অবস্থায় সম্পদজাত সুফল দু’টি ক্ষেত্রেই অভিন্ন থাকে। স্পষ্টতই অধিকতর উৎপাদনের বলে ‘ক’ পর্বে সকলকে ‘খ’ পর্বের তুলনায় অধিকতর সঙ্গতিসম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু ‘অধিকতর সঙ্গতিসম্পন্ন করা সম্ভব’ বলা আর ‘অধিকতর সঙ্গতিসম্পন্ন’ বলা তো এক নয়। সমাজে যদি ১ ও ২ নামে মাত্র দু’জন বাস করে এবং ‘খ’ পর্বে উৎপাদিত সামগ্রী সমানভাবে দু’জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘ক’ পর্বে সবটাই ১-এর দিকে জমা হল। সেক্ষেত্রে ২ মানুষটি ‘ক’ পর্বে সঙ্গতির দিক থেকে ‘খ’ পর্বের তুলনায় সঙ্গতিহীন অবস্থায় থাকবে। ফলে ‘ক’ পর্বে উৎপাদন উৎকর্ষ থাকলেও এবং প্রত্যেককে সঙ্গতিপ্রদান সম্ভব হলেও, প্রকৃতপক্ষে সকলে ‘ক’ পর্বে সঙ্গতিসম্পন্ন হচ্ছে না।
এ রকম ক্ষেত্রে যখন একটি পরিস্থিতিতে সকলেই অন্য একটি পরিস্থিতির তুলনায় সঙ্গতিপূর্ণ, তখন তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্রে এক ধরনের সামাজিক বিচারও জরুরি। (এ ধরনের বিচার এমন ক্ষেত্রেও জরুরি যখন প্রত্যেকেই একটি পরিস্থিতির তুলনায় অন্য পরিস্থিতিতে সঙ্গতিসম্পন্ন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এটাই বলবেন সেটাই বেশি উৎকর্ষমূলক যা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।) ফলে এমনটা হওয়া খুবই সম্ভব যে যদিও ‘ক’ পর্ব ‘খ’ পর্বের তুলনায় উৎকর্ষমূলক তবু ‘খ’ পর্বই ‘ক’-এর তুলনায় সামাজিকভাবে গ্রহনযোগ্য হবে। ‘ক’ পর্ব অধিকতর উৎকর্ষমূলক বলেই সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। যে সমাজ ‘বন্টনমূলক ন্যায়বিচার’-কে একটি বাড়তি মূল্য প্রদান করে, সেখানে ‘খ’-ই সামাজিকভাবে ‘ক’-এর তুলনায় গ্রহণযোগ্য হবে যদিও ‘ক’ অধিকতর উৎপাদন উৎকর্ষমূলক। এই অর্থেই ম্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের সমর্থকেরা সওয়াল করে বলেন যে, যদিও স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ কিছুটা ‘অনুৎকর্ষ’ ডেকে আনবে, তবু ‘বন্টনমূলক ন্যায়বিচার’ ‘উৎকর্ষ বিবেচনা’-কে ছাপিয়ে যাবে এবং ফলেই যে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ সমাজকে ‘ক’ থেকে ‘খ’-তে স্থানান্তর করবে সেটা যথার্থ।
কল্যাণকামী অর্থনীতির সবচেয়ে প্রাথমিক নীতি অনুযায়ীর মতে, যারা এই মত পোষণ করেন যে ‘ক’ থেকে ‘খ’-এ স্থানান্তর উৎকর্ষ-হানি ঘটায় তারা হয় এটা বিশ্বাস করেন যে বন্টন বিষয়টি বিবেচনার যোগ্য বিষয় নয়, যা একটা কিম্ভূত ব্যাপার অথবা এমন একটি মূল্যবিচারকে প্রতিনিধিত্ব করেন যা সামাজিকভাবে অ-গ্রহণযোগ্য অথবা প্রাথমিক ধারণার বিপরীতে বিশ্বাস করেন যে ‘ক’ পর্বে সকলেই ‘খ’ পর্বের তুলনায় সঙ্গতিসম্পন্ন। (‘সকলে সঙ্গতিসম্পন্ন’ কথাটিকে এখানে মান ও পরিমাণের ইতিবাচক অর্থে ধরতে হবে অর্থাৎ তার মানে এটার ব্যাখ্যা হবে ‘কেউ কেউ সঙ্গতিসম্পন্ন এবং কেউই সঙ্গতিহীনতায় নেই’) তাদের যুক্তিধারা ধরা যাক এমনটা হতে পারে : চিকিৎসক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি সংরক্ষণ থাকে, তবে চিকিৎসকদের প্রদান করা চিকিৎসার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যে ক্ষেত্রে, যারা সংরক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন তারা সহ’ চিকিৎসা প্রার্থীর অবস্থান থেকে ক্ষতির মুখোমুখি হবে এব সবচেয়ে বড় কথা, তারা নিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধাগ্রাহী হিসেবে যে লাভটা পাচ্ছে সেটা চিকিৎসা প্রার্থী হিসেবে তাদের চিকিৎসার ক্ষতির দ্বরা ছাপিয়ে যাবে। এমনটা যদি সত্যিই সত্য হত তবে লাভার্থী অংশও (অন্তত তাদের কেউ কেউ) সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিরোধিতা করত যা দৃশ্যত তাদের উপকার করার জন্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। যদি তারা বিরোধিতা না করে (এবং আজ পর্যন্ত ভারতে এমন একটি ঘটনাও শোনা যায় নি যেখানে স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের উদ্দীষ্ট সুবিধাগ্রাহীরা এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন এই যুক্তিতে যে এতে প্রকৃত অর্থে ওরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন), তবে এই তথ্যবলেই বলা যায় এরা এই পদক্ষেপের দ্বারা প্রকৃত অর্থেই উপকৃত। সেক্ষেত্রে ‘ক’ পর্বে সকলেই ‘খ’ পর্বের তুলনায় সঙ্গতিসম্পন্ন দাবিটিও ভ্রান্ত।
এখান থেকেই সিদ্ধান্ত করা যায়, ভারতে সাধারণ যুক্তিতে যে বলা হয়ে থাকে যেহেতু মানের অবনমন ঘটে তাই সংরক্ষণ ব্যবস্থা সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত, সেটা যেদিক থেকেই দেখা হোক, কথাটা আসলে ভ্রান্ত। এই যুক্তি যেদিকে দিকনির্দেশ করে তা হল উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত হবে (যদি ধরা যায় আমরা প্রাথমিক প্যারেটো মানদণ্ডটি মেনেও নিলাম যার মতে ব্যক্তির উপযোগিতার ক্ষেত্রে মান ও পরিমাণের ইতিবাচক বৃদ্ধি সামাজিক কল্যাণের পথ প্রশস্ত করে এবং উপযোগিতার মান ও পরিমাণের ইতিবাচক দিকের ঘাটতি সমাজ কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে) যদি এর ফলে উপযোগিতার মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি দেখা দেয় অর্থাৎ কেউ কেউ সঙ্গতিহীন হবে আর কোনো একজনও সঙ্গতিসম্পন্ন হবে না। কিন্তু যেহেতু সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে কেউ কেউ অবশ্যই সঙ্গতিসম্পন্ন হয়ে ওঠে, ফলে মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি (যদি আদৌ তেমন ঘাটতি থেকে থাকে) সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি ডেকে আনবে না। (অবশ্য সংরক্ষণ ছাড়াও ‘ক’ পর্বে বিতরণমূলক ন্যায়বিচারের আরো অন্য পন্থা থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক নয়)
ভারতে সংরক্ষণ কেন্দ্রিক বিতর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল যে সংরক্ষণকে দেখা হয়েছে সামাজিক হিতের প্রতিপক্ষ হিসেবে। এটা যদি সত্যি হত তবে উদ্দীষ্ট সুবিধাগ্রাহী সামাজিক গোষ্ঠীর কেউ কেউ অবশ্যই সংরক্ষণের বিরোধিতা করতেন। এই ব্যবস্থা নিজেদের সামাজিক গোষ্ঠীর জন্যে প্রদত্ত হলেও যারা সংরক্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন তারা এর বিরোধিতা করতেন এমনটা আশাই করা যায়; কিন্তু এমন কোনো বিরোধিতা দেখতে পাওয়া যায় নি। যদি সামাজিক হিতকে ব্যক্তির ওপরে এক অধিসত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে এই যুক্তি, অনিবার্য হলে, কোনো ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করত ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে ব্যক্তির অতীত সামজিক হিতের স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে। কিন্তু তেমন কোনো দৃষ্টান্ত দেখতে পাওয়া যায় নি। মোদ্দা কথা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ‘সামাজিক হিত’ কথাটির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই যা থেকে বোঝা যায় ‘সামাজিক হিত’-এর এমনতর ধারণাটি সুবিধাভোগী শ্রেণিরই আত্মস্বার্থবাহী ধারণা।
৪
এতক্ষণ অবধি যা যা যুক্তি পেশ করা হল এবার সেগুলোকে গুটিয়ে আনি। স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ যা ভারতীয় প্রেক্ষিতে মূলত সংরক্ষণকেই বোঝায়. তার বিরুদ্দে সর্বাধিক প্রচলিত যুক্তির অর্থ হল সংরক্ষণ উৎপাদনের মানের অবনমন ঘটায় অর্থাৎ ‘টাকার মূল্যে’ মান ও পরিমাণের নিরিখে ইতিবাচকতার ঘাটতি ঘটায়। যে কোনো সময়পর্বে বস্তুগত ও মানব সম্পদজাত নির্দিষ্ট সুফলের প্রেক্ষিতে উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি হলে উৎকর্ষের হানি ঘটে। সেজন্যেই স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত যুক্তিকে ‘উৎকর্ষের ওকালতি’ বলা যায়।
‘উৎকর্ষের ওকালতি’-র দু’টি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। প্রথম যখন উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতির সময়কালে একটি পর্ব থেকে অন্য পর্বে স্থানান্তর অর্থাৎ উৎকর্ষের হানি ঘটা সাধারণভাবে সামাজিক ভাবে অনভিপ্রেত নয়। এটা তখনই সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত যখন উৎপাদনের ঘাটতি কিছু মানুষকে সঙ্গতিহীন করেও কাউকেই সঙ্গতিসম্পন্ন করে না (যদিও এখানেও এক ধরনের মূল্য বিচার রয়েছে)। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে উৎপাদনের ঘাটতির ফলে কিছু মানুষ সঙ্গতিসম্পন্ন হয় এবং কিছু সঙ্গতিহীন, তখন সামাজিক অবস্থার তুলনায় একটি নির্দিষ্ট বিতরণমূলক ন্যায়বিচারের প্রয়োজন হয়। যদি উৎকর্ষ হানিকর পরিস্থিতি থেকে এমন এক ধরনের উৎপাদন বন্টনের সূচণা হয় যা সামাজিক ‘শ্রেয়’, তখন তথাকথিত ‘নিম্ন উৎকর্ষ পরিস্থিতি সামাজিক ভাবে অধিকতর উৎকর্ষের চেয়ে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। দু’টি পরিস্থিতির তুলনায় সময়ে উৎকর্ষতা কখনওই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সমার্থক নয়। ফলে ‘উৎকর্ষতার’ ওকালতিকে যেভাবে হাজির করা হয় তা একটি ভ্রান্ত যুক্তি।
নিম্নলিখিত বিষয়গুলি হচ্ছে উৎকর্ষতার ওকালতির দ্বিতীয় সমস্যা। এখন অবধি আমরা একটি সময়পর্বের কথা বলেছি যখন উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি দেখা দেয়। যেহেতু মেধা সামাজিক গোষ্ঠী নির্বিশেষে সমভাবে বিন্যস্ত (প্রত্যেকের একটি ন্যূনতম আয়তনও রয়েছে), সংরক্ষণের প্রভাবে উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার হ্রাস না হয়ে বৃদ্ধি হওয়ারই কথা। এটা সত্যি যে এমনটা সঙ্গে সঙ্গে ঘটে না, ফলে উৎপাদনের মান ও পরিমাণের ইতিবাচকতার ঘাটতি স্বল্পমেয়াদে অব্যাহত থাকে। যে মুহূর্তে এতদিন ধরে বঞ্চিত হয়ে থাকা বর্গ থেকে নিযুক্ত মেধাসম্পন্নরা নিজেদের প্রকাশ করতে সক্ষম হয়, তখন স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আগেকার পর্বের তুলনায় উৎপাদনে বৃদ্ধি আসা সঙ্গত হয়ে ওঠে। এটা বাণিজ্য সুরক্ষায় শিশু শিল্প সুরক্ষার যুক্তিধারার সমতুল : একটি স্বল্পকালীন উৎকর্ষ-হানি দীর্ঘকালীন উৎকর্ষ-বর্ধন দিয়ে পুষিয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে একটি শিশু শিল্পের পারদর্শী হয়ে ওঠার চেয়ে এই বাস্তবতাটির আত্মপ্রকাশ অনেক বেশি নিশ্চিত। অদ্ভুত বিষয় হল, শিশু শিল্পের যুক্তিমালার একটি সর্বজনগ্রাহ্যতা রয়েছে, অথচ উৎকর্ষের উন্নতির পন্থা হিসেবে সংরক্ষণের স্বপক্ষের সওয়ালের ন্যূনতম মান্যতা নেই (যদিও এই উন্নতি সাধনকে সম্ভব করতে হলে সংরক্ষণকে একগুচ্ছ প্রতিকার-সাধক পদক্ষেপের দ্বারাও সমর্থিত হতে হবে)।
সবশেষে আমরা একটি বৈসাদৃশ্যকে নজরে আনতে পারি। যদিও বন্টনমূলক বিবেচনা থেকে এটাই উঠে আসে যে স্বল্পকালীন ক্ষতি আক্ষরিক অর্থে সামাজিক কল্যাণের ক্ষতিকে বোঝায় না, আবার এর ফলে সামাজিক কল্যাণের উন্নতিও দেখা দিতে পারে, স্বল্পকালীন পরিস্থিতি ও প্রারম্ভিক পরিস্থিতি দুইয়েরই নিরিখে। স্বল্পকালীন পরিস্থিতির সাপেক্ষে বাকি সব কিছু অপরিবর্তিত রেখে উৎপাদনের ক্ষেত্রে মান ও পরিমাণের ইতিবাচক উন্নতি ঘটাতে পারে এবং ফলেই সামাজিক কল্যাণেরও উন্নতি হয়। প্রারম্ভিক পরিস্থিতির সাপেক্ষে এর ফলে একইসাথে উৎপাদনের মান ও পরিমাণের উন্নতি ও বন্টনমূলক ন্যায়বিচার দুইই ঘটে এবং তারই ফলশ্রুতিতে সামাজিক কল্যাণেও উন্নতি দেখা দেয়।
শেষ বক্তব্যটি এভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ধরা যাক, সরকার একটি স্থির হারের কর ব্যবহার করে প্রারম্ভিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘকালীন পরিস্থিতিতে যাতে কেউ সঙ্গতিহীন না হয়ে পড়ে তার ব্যবস্থা করছে। তখন শুধুমাত্র নিযুক্তির জনবিন্যাসের পরিবর্তন থেকে তৈরি হওয়া উৎকর্ষের উন্নতি দীর্ঘকালীন পরিস্থিতিকে বাঞ্ছনীয় করে তোলে। এখন আয়ের বন্টনের পরিবর্তন যদি স্থির করের সুসমন্বয়ের মাধ্যমে ঘটানো যায় এবং তার ফলে নিযুক্তির জনবিন্যাসে পরিবর্তন আসে, তবে বন্টনমূলক ন্যায়বিচারের যুক্তিতেই দীর্ঘকালীন পরিস্থিতি আরো অতিরিক্ত বাঞ্ছনীয় হয়ে যায় (যতদিন অবধি এই পরিবর্তন বন্টনমূলক ন্যায়বিচারের যুক্তিতে যথার্থতা পাবে)। অতএব স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপকে উৎকর্ষতা ও বন্টনমূলক ন্যায়বিচার, এই দুইয়ের নিরিখেই সমর্থন করা সম্ভব।
( ১৯-২১ মার্চ, ২০০৮, নতুন দিল্লিতে প্রোগ্রাম ফর দ্য স্টাডি অব ডিসক্রিমিনেশন এন্ড এক্সক্লুশন, স্কুল অব সোস্যাল সায়েন্স, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন দিল্লি এবং দ্য সেন্টার ফর কমপারেটিভ কনস্টিটিউশনিলজম, চিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকায় উচ্চশিক্ষায় স্বীকৃতিবাচক পদক্ষেপ’ শীর্ষক সম্মেলনের সমাপনী ভাষণ)
ভাষান্তর- শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ২৮-জুলাই-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
