খারিজ করতে হবে শ্রম কোড, গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ (পর্ব- ১)

আর কারুমালাইয়ান

১৯৯১ সালে শ্রমিকদের আইনি অধিকার শাসক শ্রেণির পরিকল্পিত আক্রমণের মুথে পড়েছিল। পিভি নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার মালিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘এগজিট পলিসি’ আইন চালু করা হবে যেখানে তাদের অধিকার থাকবে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে কোনও রকম বিধিনিষেধ ছাড়াই শ্রমিকদের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়ার। তখন থেকেই পুঁজিপতিরা পরের পর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে তথাকথিত ‘শ্রম আইন সংস্কার’ কার্যকর করার জন্য। বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও এনডিএ সরকার দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন নিয়োগ করে। কমিশনের সুপারিশগুলিই হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের তরফে চালু শ্রম আইনগুলিকে এখনকার শ্রম কোডে পরিণত করার ভিত্তি।

আধুনিক ভারতের শ্রমিকশ্রেণির উৎপত্তি পুঁজিবাদী বিকাশের ধারাতেই। ভারতে পুঁজিবাদের প্রথম উপাদান আবির্ভূত হয়েছিল ঊনবিংশ শতকে যখন ভারত ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনাধীনে। পুঁজিবাদের সেই সব প্রাথমিক উপাদানই থেকেই আধুনিক ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। ভারতে শ্রমিক শ্রেণির আইনি অধিকারের ধারণা এসেছে আরও পরে। 

মুনাফা লাভের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ভারতের শ্রমিক শ্রেণি ব্রিটিশ ও ভারতীয়, উভয় পুঁজিপতিদের তীব্র শোষণের শিকার হয়েছিল। প্রাথমিক পর্বে শ্রমিকদের সংগঠিত করে ইউনিয়ন গঠনের কোনও পরিকল্পিত প্রয়াস ছিল না। তবে তখনকার পর্বে অনেকগুলি উদাহরণ রয়েছে যখন তাদের কাজের শোচনীয়  পরিস্থিতির প্রতিবাদে শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিদ্রোহ করেছিলেন। শ্রমিকদের তরফে ক্রমশ বেড়ে ওঠা প্রতিরোধ এবং তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করেছিল কয়েকটি শ্রম আইন চালু করতে। এখানে বিষয়টা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, শ্রমিকদের কিছুটা সুরাহার ব্যবস্থা করা এই সব আইন চালুর লক্ষ্য ছিল না। বরং, এগুলোর লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা যাতে শিল্প শ্রমিকের যোগান অব্যাহত থাকে। এবং তা ধারাবাহিক শিল্পোৎপাদন এবং পুঁজিপতিদের মুনাফা নিশ্চিত করে।


এর ফলে দ্য আসাম প্ল্যান্টেশন লেবার ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট, দ্য ম্যাড্রাস প্ল্যান্টার্স লেবার অ্যাক্ট, দ্য মাস্টারস অ্যান্ড সার্ভেন্টস অ্যাক্ট, দ্য ওয়ার্কমেন্স ব্রিচ অফ কনট্র্যাক্ট অ্যাক্ট, এবং এই ধরনের আরো কয়েকটি আইন গোড়ার যুগে চালু করা হয়েছিল। এগুলোর লক্ষ্য ছিল যাতে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাজে নিয়ে তাদের শোষণ করতে পারে। এবং গায়ের জোরে তাদের কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। এই সব আইনগুলি ছিল এমনই যে, অসহ্য রকমের কঠোর কাজ থেকে শ্রমিকেরা যদি পালাতে চাইতেন, তাহলেও এই আইনগুলোকে কাজে লাগিয়ে মালিকেরা শ্রমিকদের কঠোর সাজা দিতে পারত। ১৮৬০ সালে পাস হয়েছিল দ্য এমপ্লয়ার্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স (ডিসপিউট) অ্যাক্ট)। ওই আইনে মালিকদের এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যার সাহায্যে অবাধ্যতার দায়ে তারা শ্রমিকদের ওপর জরিমানা চাপাতে পারত কিংবা জেলে পাঠাতে পারত। 

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

বিশেষ করে সূতিবস্ত্র শিল্পে শ্রমিকদের শোষণ করা, আরও উদ্বৃত্তমূল্য আদায় করা এবং মুনাফা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্রিটিশ ও ভারতীয় পুঁজিপতিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত। এই প্রতিযোগিতা আটকাতে ব্রিটিশ মিল মালিকেরা কৌশল করে শ্রমিকদের ‘অতিরিক্ত শোষণের’ বাহানা খাড়া করেছিল। তারা এ নিয়ে হইচই জুড়ে দেয় এবং দাবি করে ভারতে এমন ‘অমানবিক ব্যবস্থা’ বন্ধ করার জন্য শ্রম আইন চালু করতে হবে। এরই পাশাপাশি অসহনীয় কাজের পরিবেশের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে শ্রমিকদের প্রতিরোধ। একই সঙ্গে ভারতে ও ব্রিটেনে উদারপন্থীরা শ্রমিকদের কাজের অসহনীয় পরিবেশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এসব কিছুর জেরে ১৮৮১ সালে প্রথম ভারতীয় ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট চালু হয়।

১৯১৭ সালের মহান অক্টোবর বিপ্লব ঘোষণা করেছিল শ্রমিকশ্রেণির শাসন। এই ঘটনা ভারতের শ্রমিকদের তো বটেই, অনুপ্রাণিত করেছিল সারা বিশ্বের শ্রমিকদের। এই ঘটনা তাদের চেতনায় এনেছিল একটা নতুন মতাদর্শগত দিশা। দুটি বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্বে একটানা ধর্মঘট এবং তারই ফলশ্রুতিতে ট্রেড ইউনিয়নগুলির আত্মপ্রকাশ ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিকাশমান বিপ্লবী আন্দোলনের জোয়ার ঠেকাতে ১৯১৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেসন (আইএলও) গঠন করেছিল লিগ অফ নেশনস। এই সংস্থাই ছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘের পূর্বসূরি। বিশ্বজুড়ে শ্রমিক শ্রেণি এবং পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্বের তীব্রতা সাময়িক ভাবে কমিয়ে আনার স্বার্থেই আইএলও গঠন করা হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উৎপাদনের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শাসক শ্রেণিগুলি বাধ্য হয়েছিল কয়েকটি আইন চালু করার মাধ্যমে শ্রমিকদের  কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে। আইএলও বলেছিল, ‘শিল্পক্ষেত্র থেকে মজুরি যাদের আয়ের উৎস তাদের শারীরিক, নৈতিক এবং বৌদ্ধিক ভাবে ভাল থাকাটা আন্তর্জাতিকভাবেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ 


প্রথম সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এআইটিইউসি গঠিত হয়েছিল ১৯২০ সালে। বিংশ শতকের কুড়ি ও তিরিশের দশক জুড়ে শ্রমিকশ্রেণি গড়ে তুলেছিল জঙ্গী সংগ্রাম। এর জেরে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়েছিল ওয়ার্কমেন্স কমপেনসেসন অ্যাক্ট ১৯২৩, ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট ১৯২৬ এবং বোম্বে ম্যাটারনিটি অ্যাক্ট ১৯৩০ ইত্যাদি আইনগুলি চালু করতে। ১৯২৯ সালে গঠন করা হয়েছিল রয়্যাল কমিশন অফ লেবার। এই কমিশনের কাজ ছিল শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে কয়েকটি সুপারিশ করা। দ্য ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৩৪ এবং পেমেন্ট অফ ওয়েজেস অ্যাক্ট ১৯৩৬ ছিল কমিশনের সুপারিশের ফল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম আরও ছড়িয়ে পড়েছিল। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়েছিল ১৯৪২ সালে ত্রিপাক্ষিক শ্রম সম্মেলন আয়োজন করতে। পরে এর নাম হয়েছিল ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্স। ভাইসরয়ের এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের শ্রম সদস্য হিসাবে ডক্টর বি আর আম্বেদকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তিনি শ্রমিকদের জীবনধারনের পরিস্থিতির উন্নতি দাবি করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে এআইটিইউসির কলকাতা অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালের ১৮ মার্চ ‘মূল দাবিসমূহ দিবস’ পালনের ডাক দেওয়া হয়। যদিও ভারতীয় এবং ব্রিটিশ পুঁজিপতি — উভয়েই ভারতীয় শ্রমিক শ্রেণিকে শোষণ করত, তবুও ভারতে শ্রমিকেরা একথা বুঝেছিলেন যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও নিপীড়ণ তাদের জীবনের পরিস্থিতিকে উন্নত করার পথে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। ফলে আশু দাবিগুলি নিয়ে লড়াইয়ের পাশাপাশি এদেশের শ্রমিকেরা বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। ১৯০৮ সালে তিলককে গ্রেপ্তার করার পর বোম্বের শ্রমিকদের ধর্মঘট, ১৯৪৬ সালে নৌবিদ্রোহের সমর্থনে বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট এসবের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। 

শ্রমিক শ্রেণি স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় ভারত স্বাধীনতা অর্জনের পর তাদের প্রত্যাশা জন্মেছিল খুব বেশি। সংবিধান পরিষদের বিতর্কে যদিও শ্রমিক শ্রেণির দাবিগুলি অভিব্যক্তি পেয়েছিল, তবে সেগুলির বেশির ভাগই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতির মধ্যে। এবং রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতির কোনও প্রয়োগযোগ্যতা ছিল না। স্বাধীন ভারতে শ্রম আইন চালু করা হয়েছিল মূলত নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। স্বাধীন ভারতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল দেশিয় পুঁজিপতিদের হাতে। তাদের লক্ষ্য ছিল যাতে উৎপাদনে কোনও বাধা না আসে তা নিশ্চিত করা এবং উদ্বৃত্ত ও মুনাফা ঠিকমতো আসে তা দেখা। একই সময়ে তখনকার প্রদত্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শ্রমিক শ্রেণির আকাঙ্ক্ষার কথা বিবেচনা করলে দেখা যাবে, শ্রমিকদের কল্যাণে কিছু আইন চালু করা হয়েছিল। এই আইনগুলি প্রাক স্বাধীনতা পর্বের তুলনায় কিছু পরিমাণে শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছিল।

শ্রম আইনের গুরুত্ব হ্রাস করার লক্ষ্যে শাসকশ্রেণির প্রথম পরিকল্পিত প্রয়াস শুরু হয়েছিল ভারত স্বাধীন হওয়ার দু দশকের মধ্যেই। ১৯৬৬ সালে ভারত কঠিন অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছিল। এর কারণ ছিল, সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলির দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া মুদ্রার অবমূল্যায়ণ। তখন সরকার প্রথম জাতীয়  শ্রম কমিশন গঠন করে। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি গজেন্দ্র গাডকার। কমিশনের লক্ষ্য ছিল শ্রম আইনগুলির পর্যালোচনা করা এবং পরিবর্তনের সুপারিশ করা। ১৯৫৭ সালে পঞ্চদশ ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্স ন্যূনতম মজুরি ধার্য করার একটি কাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল। তাকে খারিজ করে দেয় প্রথম জাতীয়  শ্রম কমিশন । বদলে এই সংস্থা জোর দিয়েছিল এবিষয়ে যে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করার সময় শিল্পের কতটা বেতন দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাও বিবেচনা করতে হবে। 

১৯৯১ সালে আবারও শ্রমিকদের আইনি অধিকার শাসক শ্রেণির পরিকল্পিত আক্রমণের মুথে পড়েছিল। সেই পর্বেই একেবারে সরকারি স্তর থেকে নয়া উদারবাদী নীতি সমূহ চালু করা হচ্ছিল এই অজুহাতে যে, ১৯৯০ সালে ভারত যে ব্যালান্স অফ পেমেন্টের সঙ্কটে পড়েছে তা সামাল দিতে গেলে নয়া উদারবাদী নীতিই চালু করতে হবে। পি ভি নরসিংহ রাওয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার মালিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ‘এগজিট পলিসি’ আইন চালু করা হবে যেখানে তাদের অধিকার থাকবে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে কোনও রকম বিধিনিষেধ ছাড়াই শ্রমিকদের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়ার। তখন থেকেই পুঁজিপতিরা পরের পর সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে তথাকথিত ‘শ্রম আইন সংস্কার’ কার্যকর করার জন্য। বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও এনডিএ সরকার দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন নিয়োগ করে। তাদের বলা হয়েছিল শ্রম আইনে রদবদলের সুপারিশ করার জন্য। শ্রমিকদের রক্ষা করা এই কমিশনের লক্ষ্য ছিল না, বরং ছিল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে শ্রমিকদের অবস্থাকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা। এই কমিশনের সুপারিশগুলিই হয়ে দাঁড়িয়েছে মোদির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের তরফে চালু শ্রম আইনগুলিকে এখনকার শ্রম কোডে পরিণত করার ভিত্তি।

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল) 

ভাষান্তরঃ সুচিক্কণ দাস

আরও পড়ুন: 
শ্রম কোড: প্রতিরোধই পথ


প্রকাশের তারিখ: ৩০-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org