Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

শ্রম কোড: প্রতিরোধই পথ

তপন সেন
বাস্তব সত্য একটাই।  শ্রম কোডের বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া আর অন্য কোনও পথ নেই। এ লড়াই শুধু মজুরি বা কাজের সময়ের লড়াই নয়। এ লড়াই, দেশজুড়ে লুটের যে বেপরোয়া অর্থনৈতিক অভিযান শুরু হয়েছে, তার যে বর্বরতম বিকৃত রূপ প্রকট হচ্ছে, তার থেকে দেশকে বাঁচানোর লড়াই। এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন শ্রমিকশ্রেণি, রয়েছেন কৃষক-সহ মেহনতি মানুষ। আর তাঁদের নিরস্ত্র করতেই এই শ্রম কোড। লক্ষ্য: অবাধ লুটের জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম। যে চক্র আজ শ্রমিকদের উপর আধুনিক দাসত্ব চাপিয়ে দিয়ে জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে, তাকে প্রতিহত করার ঐতিহাসিক দায়িত্বই আজ তাঁদের সামনে।
Labor Code, Resistance is the way

বিএমএস বাদে দেশের প্রায় সব কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও সরকার একরকম জোর করেই শ্রম কোডগুলি কার্যকর করেছে। সরকার দাবি করছে, যে তারা নাকি ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরই এই সিদ্ধান্ত  নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে, এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ঘটনা হলো, এই বিষয়ে কোনও অর্থবহ আলোচনাই হয়নি। 

শ্রম আইন বদলের পরিকল্পনা মোদী সরকারের আমলে ২০১৭–১৮ থেকে সামনে আসে। তখন থেকেই ইউনিয়নগুলো সরকারকে তাদের মতামত দিয়েছে। ডকুমেন্ট দিয়ে। তথ্য দিয়ে। যুক্তি দিয়ে। কিন্তু সরকার কেবলমাত্র ‘ব্যবসায় স্বাচ্ছন্দ্য আনা’, ‘সম্মতির প্রশ্নকে মসৃণ করা’ এবং ‘পরিসর’ বাড়ানোর নামে শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করার পথকেই বেছে নিয়েছে। সরকারের দাবি, শ্রম কোডে নাকি শ্রমিকের অধিকার বাড়াবে, পরিধি বাড়াবে, সুরক্ষা বাড়াবে। এসবই আসলে ভাঁওতা। বাস্তব হলো, সম্পূর্ণ বিপরীত।

শ্রম কোড কার্যকর হলে বাস্তবে শ্রমিকদের সুরক্ষা কমবে। আইনের পরিসর কমবে। কর্মস্থলের নিরাপত্তা, মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা—  সব ক্ষেত্রেই অধিকার সংকুচিত হবে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, শ্রমিকদের সংগঠিতভাবে দাবি তোলার ক্ষমতা দুর্বল করা হবে। সীমিত করা হবে ইউনিয়নের ভূমিকা। সংকুচিত করা হবে সমষ্টিগত দর কষাকষির অধিকারকে।



ইউনিয়নগুলো প্রত্যেক ধাপে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। প্রত্যেকটি বিষয়ে স্পষ্ট যুক্তি দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সরকার ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট এবং আরও বহু আইনে ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। এর মানে, আরও বেশি কারখানা ও কর্মী আইনগত সুরক্ষার বাইরে চলে যাবে। শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ—  সবই দুর্বল হবে।

অথচ, ইউনিয়নগুলো কিন্তু এর ঠিক উলটো কথাই বলেছে। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে সংখ্যায় অনেক কম শ্রমিক দিয়েই আজ অনেক বেশি উৎপাদন সম্ভব। ফলে বড় কারখানা ছোট টিমে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ঊর্ধ্বসীমা বরং কমানো দরকার। বাড়ানো নয়। ইউনিয়নগুলো এই যুক্তি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে। বিকল্প প্রস্তাব-ও জমা দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেসব উপেক্ষা করেছে বিদ্বেষের সঙ্গে। যথারীতি সেই উলটো পথেই  হেঁটেছে।

শ্রম কোডের প্রতিটি শব্দে এই একই বাস্তবতা।  যেখানে সরকার বলছে ‘অধিকার বাড়বে’, সেখানে বাস্তবে অধিকার কমছে। যেখানে বলছে ‘কভারেজ বাড়বে’, সেখানে উলটে সঙ্কুচিত হচ্ছে। যেখানে বলছে ‘আয় বাড়বে’, সেখানে শ্রমিকের দরকষাকষির শক্তি ভেঙে দিয়ে কম মজুরি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও চরম অস্থায়িত্বকে স্থায়ী করা হচ্ছে।

২২ নভেম্বর প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর যে বিবৃতি সরকার প্রকাশ করেছে, সেটাকেও সিআইটিইউ পয়েন্ট ধরে ধরে খণ্ডন করেছে। তথ্য দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে সরকারের প্রতিটি দাবি মিথ্যা। প্রমাণ  করে  দিয়েছে যে শ্রম কোডকে ‘শ্রমিক-বান্ধব’ বলে দাবি করা হলেও, তা আসলে শ্রমিক-বিরোধী। কর্পোরেটপুঁজির স্বার্থ রক্ষার জন্য শ্রমিকদের অধিকার ছেঁটে ফেলার এক নির্মম প্রচেষ্টা। গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের ক্ষেত্রে কোনও ন্যায্য কর্মসংস্থান সম্পর্ক স্বীকৃত নয়। কোনও নিয়ন্ত্রণও নেই। এই অবস্থায় সরকারের ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি’ দেওয়ার দাবিটা পুরোদস্তুর প্রতারণা।

কারণ, কর্মসংস্থান সম্পর্কই যখন নেই, সুরক্ষা দেবে কাকে?

গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কাজের ভিত্তিটাই তৈরি হয়েছে এই অনিশ্চয়তার ওপর। আর সরকার সেই মডেলকেই উৎসাহ দিচ্ছে। অন্য শিল্পে শ্রমিক শুধু শ্রম দেন। যন্ত্রপাতি, মেশিন, উৎপাদনের পরিকাঠামো, সবই মালিকের দায়িত্ব। কিন্তু গিগ-অর্থনীতি হলো তার উলটো ছবি।

ডেলিভারি হোক বা পরিবহণ— পুরো ব্যবস্থাই শ্রমিকের কাঁধে। গাড়ি বা বাইক তার নিজের। রক্ষণাবেক্ষণ সে  নিজে করে। জ্বালানি তার নিজস্ব। অথচ, সারাদিন সীমাহীন কাজ করার পরও যেটুকু উপার্জন হয়, তার থেকেও অ্যাপ মালিকেরা অবৈধভাবে একটা বড় অংশ কেটে নেয়।

আর সেই অ্যাপ মালিককে শনাক্ত করাই যায় না।

অ্যামাজন, সুইগি বা এদের প্লাটফর্ম-এ এদের জন্যে কাজ করে শ্রমিকরা। তথাপি সংস্থাগুলির কোনও দায় নেই এদের প্রতি। একই অবস্থা পরিবহণ ক্ষেত্রেও। ওলা, উবার, র‌্যাপিডো— সব প্ল্যাটফর্মেই মানুষ পরিষেবা পাচ্ছেন। কিন্তু সেই শ্রমিকদের সুরক্ষা নিয়ে সরকারের কোনও চিন্তা নেই।

বিপরীতে, চলছে শ্রমিকের রোজগার লুঠ। নিজের গাড়ি, নিজের জ্বালানি, নিজের পরিকাঠামো— সব খরচ শ্রমিকের। অথচ, তার পরেও  তার আয় থেকে চলছে  অবৈধ  কাটছাঁট। এই পুরো ব্যবস্থাই চূড়ান্ত অবৈধ। আর সরকার সেই ব্যবস্থাকেই বাড়িয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। এটাই আসল ট্র্যাজেডি।

তারপরও সরকার বলছে, ‘সবার জন্য ন্যূনতম মজুরি।’ এটাও নিছকই মিথ্যা দাবি। দেশের আজকের বাস্তবতাই তার প্রমাণ। এখনও দেশের ৭০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক আইনানুগ ন্যূনতম মজুরি পান না। বেশিরভাগ রাজ্যেই পরিস্থিতি একই। কেবল হাতে-গোনা কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম আছে।

শ্রম কোডে যে ‘ন্যূনতম মজুরি’-র কথা বলা হয়েছে, তা কোনওভাবেই সর্বজনীন নয়। সরকার যে ‘চার স্তরের জাতীয় মজুরি’-র কথা বলে, সেটাও জাতীয় নয়। এলাকাভেদে বদলে যায়। ফলে সরকারের ‘সবার জন্য ন্যূনতম মজুরি’ দাবি পুরোটাই ভাঁওতা। 

📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ

এরপর আসে ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট। সরকার বলছে দুই বা তিন বছরের চুক্তিতে নেওয়া শ্রমিকেরাও নাকি নিয়মিত শ্রমিকের সমান সুবিধা পাবেন। এ দাবিও সম্পূর্ণ ভুয়ো। বাস্তবে কোনও শিল্পেই ফিক্সড টার্ম শ্রমিকরা নিয়মিত শ্রমিকের সমান মজুরি পান না। সোশ্যাল সিকিউরিটি, ছুটি, অন্যান্য সুবিধা, সব মিলিয়ে তাদের অবস্থান অনেক নিচে।

আইনে যা-ই লেখা থাক, মাঠে-ময়দানে বৈষম্য স্পষ্ট। চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরা জানেন, দুই বছরের শেষে চাকরি নবীকরণ হবে কী না তার নিশ্চয়তা নেই।  তাই তারা কোনও দাবিই তুলতে পারেন না। এই অনিশ্চয়তাকেই কাজে লাগিয়ে মালিকপক্ষ লাভ তোলে। উদাহরণ স্পষ্ট। আগের ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের সহযোগী সংস্থা অ্যালায়েন্স এয়ারে ফিক্সড টার্ম শ্রমিকদের দীর্ঘদিন একই অবস্থায় আটকে রাখা হত; আজ টাটার অধীনে সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে।

সব মিলিয়ে সরকারের দাবিগুলি— তা ন্যূনতম মজুরি হোক, বা ফিক্সড টার্মের সুবিধা, সবটাই প্রতারণা। বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। এয়ার ইন্ডিয়ার বাইরে যে সমস্ত কর্মীরা কাজ করতেন, তাঁরা প্রায় সবাই ফিক্সড টার্ম-এ ছিলেন। প্রতি বছর চুক্তি নবীকরণ হতো। কিন্তু তাঁরা এয়ার ইন্ডিয়ার নিয়মিত শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম মজুরি পেতেন। এ তথ্য রেকর্ডে আছে।  যে কেউ খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। আইন অনুযায়ী ফিক্সড টার্ম শ্রমিকদের সম-মজুরি পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের মজুরি ছিল অনেক কম। এই উদাহরণই দেখিয়ে দেয় সরকারের দাবি পুরোপুরি মিথ্যা।

এরপর আরও এক হাস্যকর দাবি তুলে সরকার বলেছে, ‘শিল্প বিরোধ দ্রুত মিটে যাবে।’ এ দাবিও সম্পূর্ণ ভুয়ো। শিল্প সম্পর্কিত শ্রম কোডে শ্রম দফতরের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের ওপর আর কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু ‘ফ্যাসিলিটেট’ করার নির্দেশ। ইনস্পেকশন তুলে দিয়ে তার জায়গায় ‘ফ্যাসিলিটেশন’ বসানো হয়েছে। এর ফলে বিরোধ মেটানো সহজ নয়, বরং আরও কঠিন হবে।

আজ শ্রম দফতরের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১২ লক্ষেরও বেশি বিরোধ মুলতুবি রয়েছে। একটি শিল্প-বিরোধ নিষ্পত্তি হতে সাধারণত ৩-৫ বছর লাগে। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধের রায় বেরোনোর আগেই শ্রমিক মারা গেছেন— এমন ঘটনাও আছে। শ্রম কোডে শ্রম দফতরের ভূমিকা যেভাবে দুর্বল করা হয়েছে, তা বিরোধ নিষ্পত্তিকে কার্যত অসম্ভবই করে তুলবে। তবুও সরকার উলটো কথা বলছে। বাস্তবের বিপরীত দাবি তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।

এখানে আরও বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। যে ‘সমঝোতা মেশিনারির’ কথা বলা হচ্ছে, তা ব্যবহার করা হচ্ছে শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার খর্ব করার অস্ত্র হিসেবে। সমষ্টিগত সংগ্রামের অধিকার সংকুচিত করা, এটাই  হলো প্রকৃত উদ্দেশ্য। 

সরকার দাবি করছে, শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন হবে। বাস্তবে ঘটবে ঠিক উলটো। শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এক নতুন দাসত্ব। আরও বিপজ্জনক হলো,  শ্রম কোডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকার ইতিমধ্যেই ৪০০-র বেশি অপরাধ ডি-ক্রিমিনালাইজ করেছে। অর্থাৎ মালিকরা আইন ভাঙলেও জেলে যাবে না। কেবল জরিমানা দিলেই পার পেয়ে যাবে। আইন ভেঙে যে লাভ হবে মালিকদের তা জরিমানার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে আইনভাঙাকে উৎসাহ দেওয়ার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।



এটাই আজকের বাস্তবতা।

এটাই শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক সংগঠিত প্রতারণা। দেশের শ্রমিকশ্রেণির উপর আজ যে বহুমাত্রিক আক্রমণ নেমে এসেছে, নয়া শ্রম কোড তার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে। এই আক্রমণের উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক শোষণ বাড়ানো নয়— এটি শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তিকে ভেঙে দেওয়া এবং গণতন্ত্রের কার্যকর ভিত্তিগুলিকে দুর্বল করার বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনারই অঙ্গ।

প্রথমত, শ্রমিকদের সংগঠিত প্রতিবাদের অধিকারকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার বিপজ্জনক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা  ১১১’–এর মতো ধারার মাধ্যমে যে কোনও সংগঠিত প্রতিবাদ বা ট্রেড ইউনিয়নের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। এই ধারার অপব্যবহারে ইতিমধ্যে বহু ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বিশেষত সিআইটিইউ-র কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অযৌক্তিকভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদেরকে মাসের পর মাস জামিনবিহীন অবস্থায় জেলেও কাটাতে হয়েছে। অর্থাৎ শ্রমিকের কণ্ঠ বন্ধ করা, সংগ্রামকে আটকে দেওয়া এবং সংগঠনগুলিকে পঙ্গু করার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক নকশা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

অন্যদিকে মালিকদের আইনভঙ্গকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ডি-ক্রিমিনালাইজ করা হয়েছে। শ্রমিকদের ঠকানো, বকেয়া মজুরি আটকে রাখা, হঠাৎ ছাঁটাই  এসব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এখন মালিকরা কার্যত কোনও ফৌজদারি দায়িত্ব বহন করেন না। অর্থাৎ একদিকে শ্রমিকদের উপর অপরাধের খাঁচা চেপে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মালিকপক্ষ পাচ্ছে সম্পূর্ণ সুরক্ষা। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে শ্রম কোড আসলে শ্রমিকদের উপর নতুন ধরনের দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা।

গণতন্ত্রের সঙ্গে এই নতুন শ্রমব্যবস্থার বিরোধ একেবারে মৌলিক। কারণ শ্রমিকদের অধিকার সংকুচিত করা মানে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক অধিকারকেও সংকুচিত করা। সরকারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট  গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বাইরে রেখে ভেতরে ভেতরে গণতান্ত্রিক অধিকারকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। শ্রমক্ষেত্রে এই আক্রমণ তাই বৃহত্তর গণতন্ত্রবিরোধী প্রক্রিয়ার প্রথম পর্ব মাত্র।

এই পরিস্থিতিতেও শ্রমিকরা নতিস্বীকার করেননি। বরং গত কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে অবিরাম প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজ্যে সরকার ও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাজের সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বহু সেক্টরে শ্রমিকদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে।

উদাহরণ হিসেবে কর্ণাটকের কথা উল্লেখযোগ্য— সেখানে তিন লক্ষেরও বেশি শ্রমিকের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে ১২০০-রও বেশি কারখানা, মাল্টিন্যাশনাল-সহ, বাধ্য হয় ৮ ঘণ্টার কাজে ফিরে যেতে। অনেক সেক্টরে শ্রমিকরা মালিকদের পিছিয়ে যেতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু কিছু রাজ্যে সরকার ইতিমধ্যেই শ্রম আইন পরিবর্তন করেছে, যাতে ১২ ঘণ্টার কর্মদিবস আইনি সুরক্ষা পায়। প্রায় ২৫টি রাজ্য এভাবে তাদের আইন বদলেছে।

তবুও এই আইনগুলি এখনও পুরোপুরি কার্যকর করতে সরকার পিছিয়ে আছে। কেন? কারণ শ্রমিকদের সংগঠিত প্রতিরোধ এখনও শক্তিশালী এবং সরকার জানে— এই প্রতিরোধকে ভাঙা সহজ নয়।


শ্রম কোড প্রথম সংসদে পাশ হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তার পরপরই শ্রমিকদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। ২৬ নভেম্বর ২০২০-র সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট ছিল তারই ঐতিহাসিক প্রকাশ। একই দিনে শুরু হয় কৃষক আন্দোলন, যা পরে সমগ্র জাতির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন পথ দেখায়। এরপর থেকে প্রতি বছর ২৬ নভেম্বর শ্রমিকরা দিনটিকে প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করছেন।

এ বছরও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। বরং আরও তীব্র। সরকার যখন সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিমূলক বিবৃতি দিয়ে শ্রম কোড প্রয়োগের ঘোষণা করেছে, তখন দেশজুড়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে।

বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিকরা বিক্ষোভ, মিছিল, শ্রম কোডের কপি পোড়ানো—এভাবে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ২৬ নভেম্বর সারা দেশে জেলা স্তর পর্যন্ত ব্যাপক গণমোর্চা এবং প্রতিরোধের বিস্ফোরণ দেখা যাবে— এরই প্রস্তুতি চলছে।

বাস্তব সত্য একটাই।  শ্রম কোডের বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া আর অন্য কোনও পথ নেই।

এ লড়াই শুধু মজুরি বা কাজের সময়ের লড়াই নয়। এ লড়াই, দেশজুড়ে লুটের যে বেপরোয়া অর্থনৈতিক অভিযান শুরু হয়েছে, তার যে বর্বরতম বিকৃত রূপ প্রকট হচ্ছে, তার থেকে দেশকে বাঁচানোর লড়াই। এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন শ্রমিকশ্রেণি, রয়েছেন কৃষক-সহ মেহনতি মানুষ। আর তাঁদের নিরস্ত্র করতেই এই শ্রম কোড। লক্ষ্য: অবাধ লুটের জঙ্গল রাজত্ব কায়েম। যে চক্র আজ শ্রমিকদের উপর আধুনিক দাসত্ব চাপিয়ে দিয়ে জঙ্গল রাজত্ব কায়েম করতে চাইছে, তাকে প্রতিহত করার ঐতিহাসিক দায়িত্বই আজ তাঁদের সামনে।

প্রতিরোধের এই লড়াই শুরু হয়েছে। এবং এর গতি, তীব্রতা ও সম্ভাবনা দেখেই শ্রমিকরা যে কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে প্রস্তুত।


প্রকাশের তারিখ: ২৭-নভেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

সমৃদ্ধ হলাম
- Prakash Taru Chakraborty , ২৮-নভেম্বর-২০২৫


very much relevant and appropriate in present situation in INDIA Hope other articles like these will be published in future. Red Salute.
- Ashoke Paul, ২৮-নভেম্বর-২০২৫


শ্রমকোডের বিরুদ্ধে সকল শ্রেণীর মানুষের এগিয়ে আসতে হবে। কমরেড তপন সেনের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। র
- Sankar sen., ৩০-নভেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬