খারিজ করতে হবে শ্রম কোড, গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ (শেষ পর্ব)

আর কারুমালাইয়ান
শ্রমিকদের অধিকারের যে ধারণা তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্রমিকদের বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। এই সব সংগ্রাম গোড়ার দিকে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। পরে শ্রমিকেরা নিজেদের ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত করেন। শ্রমিক শ্রেণির এই সব সংগ্রামের ফলে শাসক শ্রেণিগুলি বাধ্য হয়েছিল এমন আইন প্রণয়ন করতে যাতে শ্রমিকদের কিছু অধিকার ও সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত হয়। এর মধ্যে ছিল সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাও। সারা পৃথিবী জুড়ে এখন কার্যকর করা হচ্ছে নয়া উদারনৈতিক নীতিসমূহ এবং তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির অর্জিত অধিকার ও সুবিধাগুলির ওপর সরকারের আক্রমণ নেমে আসছে। এই আক্রমণ নেমে আসছে আমাদের দেশেও। এর লক্ষ্য হল শ্রমিক শোষণ বাড়িয়ে কর্পোরেটের মুনাফাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্কট গভীরতর হওয়ায় মালিকপক্ষের শোষণ ও হামলা তীব্রতর হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বের পর

ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার, যৌথ দর কষাকষি ও নির্দিষ্ট কার্যকলাপ চালানোর অধিকার যার মধ্যে পড়ে ধর্মঘটের অধিকারও — এগুলি শ্রমিক শ্রেণির অবিচ্ছেদ্য এবং প্রতিষ্ঠিত অধিকার। শিল্প সম্পর্ক কোড  শ্রমিকদের এই অধিকারগুলি থেকে বঞ্চিত করতে চায়।

ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন : শিল্প সম্পর্ক কোড ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। এই কোডে কোনও ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়া এবং সেই রেজিস্ট্রেশন টিকিয়ে রাখাকে আরও কঠিন করে তোলা হয়েছে। বলা যায়, শিল্প সম্পর্ক কোডের ধারা ৬ (২) এবং ধারা ৬ (৪) এ যে সব শর্ত দেওয়া হয়েছে তাতে ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন পাওয়া এবং  সেই রেজিস্ট্রেশন টিকিয়ে রাখাকে কার্যত অসম্ভব করে তোলা হয়েছে।

ধারা ৬ (২) এ বলা হয়েছে যে, কোনও ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন পাবে না যতক্ষণ না কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠানে কিংবা ইউনিয়ন যে শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত  সেখানে কর্মরত কিংবা নিয়োগীকৃত শ্রমিকদের ‘কমপক্ষে ১০ শতাংশ’ কিংবা ১০০ জন শ্রমিক, যেটা কম হবে সেটা ধরা হবে, সেই ইউনিয়নের সদস্য না হন। ধারা ৬ (৪) এ বলা হয়েছে, ট্রেড ইউনিয়নকে সর্বদাই কমপক্ষে মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশ কিংবা ১০০ জন শ্রমিককে, যেটা কম হবে সেটাই ধরা হবে, কোনও শিল্প প্রতিষ্ঠানের কিংবা ইউনিয়ন যে শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত সেখানকার কমপক্ষে ৭ জন কর্মরত বা নিয়োগীকৃত শ্রমিককে সদস্য হিসাবে ধরে রাখতে হবে। এই কোডে রেজিস্ট্রারকে এবং উপযুক্ত সরকারগুলিকে যথেচ্ছ  ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে তাদের তারা ইচ্ছামতো ট্রেড ইউনিয়নকে রেজিস্ট্রেশন দিতে পারে বা নাও পারে। এবং তারা ইচ্ছামতো ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিলও করতে পারবে। 

শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার: শিল্প সম্পর্ক কোড কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর। সেই অধিকার হল ইউনিয়নে নিজের পছন্দমতো নেতা নির্বাচন করা। এক্ষেত্রে ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইনে থাকা বহু পরীক্ষিত ব্যবস্থাগুলিকে নাকচ করা হয়েছে।

সংগঠিত ক্ষেত্রের ইউনিয়নে, যে সব শ্রমিক বাস্তবে কোনও প্রতিষ্ঠান/ সেক্টর/ পেশায় কর্মরত, তাদের ছাড়া বহিরাগতদের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হয়েছে মোট পদাধিকারীদের এক তৃতীয়াংশে কিংবা পাঁচ  জনে। এ ক্ষেত্রে যেটা কম সেটাকেই  ধরা হবে।

পূর্ণ সময়ের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠকেরা ট্রেড ইউনিয়নগুলি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বহিরাগত কিংবা পূর্ণ সময়ের ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠকদের মালিকপক্ষ হুমকি দিতে বা ভয় দেখাতে পারে না। তবে ট্রেড ইউনিয়নের কাজকর্ম করার জন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের ভয় দেখানো যায় ও শাস্তি দেওয়া যায়। সেকারণেই সরকার ইউনিয়নের পদাধিকারী হিসাবে বহিরাগতদের সংখ্যা কমিয়ে দিতে চাইছে। ইউনিয়নে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শ্রমিকেরা নিজেরাই নিজেদের নেতা বেছে নেবেন, এটা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে কোডে এই অধিকার খর্ব করা হয়েছে। 

এমনকী বিদ্যমান ইউনিয়নগুলিকে রেজিস্ট্রারের কাছে এই মর্মে বিবৃতি দিতে হবে যে তাদের এগজিকিউটিভদের সংখ্যা এই কোড অনুযায়ী করা হয়েছে। তা না হলে রেজিস্ট্রারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে উক্ত ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার। 

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

যৌথ কার্যকলাপ: শিল্প সম্পর্ক কোড কার্যত শ্রমিকদের যৌথ কার্যকলাপ চালানোর অধিকার, এমনকী ধর্মঘট করার অধিকারকেও নিষিদ্ধ করেছে। অথচ ধর্মঘটের অধিকারই শ্রমিক শ্রেণির মৌলিক অধিকার। শ্রমিকেরা ধর্মঘট করতে চাইলে তার ওপর জঘন্য সব শর্ত চাপিয়েছে এই কোড।

  • শিল্প সম্পর্ক কোডে বলা হয়েছে যে কোনও প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট করতে হলে আগে থেকে নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ বিদ্যমান শিল্প বিরোধ আইন অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠান সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জনহিতকর পরিষেবা দেয় মাত্র সেগুলিতেই ধর্মঘট করার আগে ১৪ দিনের নোটিশ দিতে হবে। 
  • পরিকল্পিত ভাবেই এই কোডে ধর্মঘটের নোটিশ দেওয়ার সময়সীমার বিষয়টিকে বিভ্রান্তিকর করে করা রাখা হয়েছে। ধারা ৬২ (১) (ক)- এ বলা হয়েছে,’ধর্মঘট শুরু করার আগের ৬০ দিনের মধ্যে’ যদি মালিককে ধর্মঘটের নোটিশ দেওয়া না হয়, আবার (খ)-এ বলা হয়েছে ‘এই ধরনের নোটিশ ধর্মঘট শুরু করার আগের ১৪ দিনের মধ্যে’ দেওয়া না হয়। এই অস্পষ্টতা নিশ্চিতভাবেই রাখা হয়েছে যাতে মালিকপক্ষ ও তাদের দাসানুদাস সরকারের প্রশাসন নিজেদের সুবিধামতো পুরো বিষয়টার ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
  • শিল্প সম্পর্ক কোডে সমঝোতা আলোচনা অমীমাংসিত থাকা অবস্থায় এবং সমঝোতা আলোচনা শেষ হওয়ার পরবর্তী সাত দিনে ধর্মঘট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিয়ম সব ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
  • যদি সমঝোতা আলোচনা ট্রাইবুন্যালে গড়ায় তাহলে সেখানে আলোচনা অমীমাংসিত অবস্থায় থাকা পর্যন্ত এবং ট্রাইবুন্যালে সমঝোতা আলোচনা নিষ্পত্তির পর ৬০ দিন পর্যন্ত ধর্মঘট করা নিষিদ্ধ। 
  • যে শিল্প বিরোধ আইন বাতিল করা হয়েছে তাতে সমঝোতা আলোচনার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত কিংবা ট্রাইবুন্যালে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট নিষিদ্ধ ছিল শুধুমাত্র যেসব প্রতিষ্ঠান সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জনহিতকর পরিষেবা দেয় তাদের ক্ষেত্রে।
  • এভাবে শিল্প সম্পর্ক কোড সরকারগুলিকে / শ্রম দপ্তরগুলিকে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে যাতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সমঝোতা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে এবং ধর্মঘট ঠেকিয়ে রাখতে পারে।
  • এরই পাশাপাশি, শ্রমিকেরা তথাকথিত বেআইনি ধর্মঘটে গেলে তাদের ওপর কঠোর শাস্তি আরোপ এবং বিপুল পরিমাণে জরিমানা ধার্য করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই ভাবে যারা শ্রমিকদের ধর্মঘট করায় উস্কানি দেবে এবং তাদের সমর্থন করবে, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তি ও জরিমানা আরোপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন থেকে গণহারে ক্যাজুয়াল লিভ নেওয়া হলে তাকে বেআইনি ধর্মঘট হিসাবেই বিবেচনা করা হবে। 

এর পাশাপাশি, শিল্প সম্পর্ক কোডে সব শিল্পের মালিকদের পক্ষে লক আউট ঘোষণা করার বিষয়টিকে অনেক সহজ করে তোলা হয়েছে।যেখানে শ্রমিকেরা ধর্মঘটে রয়েছেন সেখান লক আউট ঘোষণার জন্য আর কোনও নোটিশ দেওয়ার দরকার পড়বে না। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লকডাউনের নোটিশ পৌঁছে দিলেই চলবে।

কোনও আইন তখনই অর্থবহ হতে পারে যখন তা প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ব্যবস্থা এবং বলবৎ করার ব্যবস্থা সহ কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা যায়।  শ্রম কোডে শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাকে কার্যত বিদায় জানানো হয়েছে। এমনকী নামটাও বদলে ফেলে ‘ইনস্পেক্টর’ থেকে রাখা হয়েছে ‘ইনস্পেক্টর কাম ফেসিলিটেটর’।  এরা ‘পরিদর্শন করবেন যার মধ্যে থাকবে ওয়েবভিত্তিক পরিদর্শনও এবং তা করা হবে এমনভাবে যেভাবে ঠিক করে দিতে পারে এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত সরকারগুলি।’ এই ব্যবস্থা মূলত আইএলও-র লেবার ইনসপেকশন কনভেনশন এর বিরোধী (নং ৮১)। 

  • শ্রমিকদের অধিকারের যে ধারণা তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্রমিকদের বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। এই সব সংগ্রাম গোড়ার দিকে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। পরে শ্রমিকেরা নিজেদের ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত করেন। শ্রমিক শ্রেণির এই সব সংগ্রামের ফলে শাসক শ্রেণিগুলি বাধ্য হয়েছিল এমন আইন প্রণয়ন করতে যাতে শ্রমিকদের কিছু অধিকার ও সুবিধা পাওয়া নিশ্চিত হয়। এর মধ্যে ছিল সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাও। সারা পৃথিবী জুড়ে এখন কার্যকর করা হচ্ছে নয়া উদারনৈতিক নীতিসমূহ এবং তার ফলে শ্রমিক শ্রেণির টঅর্জিত অধিকার ও সুবিধাগুলির ওপর সরকারের আক্রমণ নেমে আসছে। এই আক্রমণ নেমে আসছে আমাদের দেশেও। এর লক্ষ্য হল শ্রমিক শোষণ বাড়িয়ে কর্পোরেটের মুনাফাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্কট গভীরতর হওয়ায় মালিকপক্ষের শোষণ ও হামলা তীব্রতর হয়েছে। 

সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি তাদের জীবন-জীবিকার ও কাজের পরিস্থিতির ওপর এই ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সামিল হয়েছে। একই ভাবে সংগ্রামে সামিল আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণিও। আমাদের দেশে যুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বিরাট বিরাট লড়াই সংগঠিত করেছে যার মধ্যে পড়ে সাধারণ ধর্মঘট এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রের ধর্মঘট। 

২০১৯-২০ সালে কোডকে আইনে পরিণত করার সময় থেকে যৌথভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ভারতের শ্রমিক শ্রেণি। তবে সেগুলিকে অগ্রাহ্য করেই নয়া ফ্যাসিবাদী মোদি জমানা এই কোডগুলি কার্যকর করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই কোডগুলিকে আমাদের খারিজ করতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ কাজ করতে হবে শুধুমাত্র শ্রমিক শ্রেণির বহু মূল্যে অর্জন করা অধিকারগুলি রক্ষা করার জন্যই নয়। একই সঙ্গে এই লড়াই শ্রমিকদের এ কথাও বুঝিয়ে দেবে, শ্রমিকদের অধিকারের ওপর আক্রমণ এবং মালিক শ্রেণির স্বার্থে মোদি সরকার যে নয়া উদারনীতিক নিয়ে চলেছে — এ দুয়ের যোগসূত্র কোথায়। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শোষণমূলক চরিত্র সম্পর্কে শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। শ্রমিক শ্রেণির কাজ হল সমস্ত শোষিত ও নির্যাতিত অংশকে ঐক্যবদ্ধ করে এই পরিস্থিতিকে বদলে দেওয়া। 


ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস

আরও পড়ুন: 
শ্রম কোড: প্রতিরোধই পথ
খারিজ করতে হবে শ্রম কোড, গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ (পর্ব- ১)
খারিজ করতে হবে শ্রম কোড, গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ (পর্ব- ২)


প্রকাশের তারিখ: ০২-ডিসেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org