|
খারিজ করতে হবে শ্রম কোড, গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ (পর্ব- ২)আর কারুমালাইয়ান |
‘সুপারভাইজার’ ও ‘ম্যানেজার’ নামকরণ করে শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিরাট অংশকে শ্রম কোডের আওতার বাইরে করে দেওয়া হবে। যারা ‘সুপারভাইজরি পদে’ কাজ করছেন এবং মজুরি হিসাবে মাসে ১৮ হাজার টাকার বেশি পাচ্ছেন তারাও শ্রমিক সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়বেন। এই পদে মজুরির পরিমাণ সময়ে সময়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংশোধনও করা যাবে। ইতিমধ্যেই বহু প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের একাংশকে ‘সুপারভাইজার’ /‘ম্যানেজার’/ ‘অফিসার’/ ‘এগজিকিউটিভ’ ইত্যাদি নামে যথেচ্ছভাবে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এসবের লক্ষ্য হল ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থেকে এদের বঞ্চিত করা এবং ‘ইউনিয়নভুক্ত নন’ হিসেবে এদের বিবেচনা করা। এই বিষয়টাকে শিল্প সম্পর্ক কোডের মাধ্যমে আইনসম্মত করা হয়েছে। |
[প্রথম পর্বের পর] কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে এই কোড কার্যকর করা হবে। এই কোডগুলি একেবারে শ্রমিকদের স্বার্থের কেন্দ্রে ঘা বসিয়েছে। সরকার দাবি করছে, এর ফলে শ্রম আইন ও তৎসংক্রান্ত সুবিধাগুলির আওতায় আরও অনেক বেশি শ্রমিককে আনা যাবে। বাস্তবে কিন্তু বিদ্যমান আইনি অধিকার এবং সুযোগ সুবিধাগুলি থেকে আরও অনেক বেশি শ্রমিক বঞ্চিত হবেন। সরকারের দাবি, ‘বহু সংখ্যক সংজ্ঞা’ থাকার অস্পষ্টতাকে দূর করাই শ্রম কোড চালু করার অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু শ্রম কোডে যে অস্পষ্টতার সঙ্গে ‘শ্রমিক’ ও ‘কর্মচারী’দের সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, তাতে মালিকদের সামনে ভুল ব্যাখ্যা করার রাস্তা খুলে যাবে এবং শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করা সহজ হবে। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের একাংশকে শ্রম কোডের আওতার বাইরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়ে যাবে। বর্তমানে কয়েকটি শিল্পে অ্যাপ্রেন্টিস ও ট্রেইনিরা শ্রমিক নামেই কাজ করছেন। এখন তাদের শ্রমিক সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া হবে। চুক্তি শ্রমিকদেরও আর শ্রমিক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। আগের চালু আইনগুলি থেকে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিচ্ছেদ। ‘সুপারভাইজার’ ও ‘ম্যানেজার’ নামকরণ করে শ্রমিক ও কর্মচারীদের বিরাট অংশকে শ্রম কোডের আওতার বাইরে করে দেওয়া হবে। যারা ‘সুপারভাইজার পদে’ কাজ করছেন এবং মজুরি হিসাবে মাসে ১৮ হাজার টাকার বেশি পাচ্ছেন তারাও শ্রমিক সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়বেন। এই পদে মজুরির টাকার পরিমাণ সময়ে সময়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সংশোধনও করা যাবে। ইতিমধ্যেই বহু প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের একাংশকে ‘সুপারভাইজার’/ ‘ম্যানেজার’/ ‘অফিসার’/ ‘এগজিকিউটিভ’ ইত্যাদি নামে যথেচ্ছভাবে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এসবের লক্ষ্য হল ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থেকে এদের বঞ্চিত করা এবং ‘ইউনিয়নভুক্ত নন’ হিসেবে এদের বিবেচনা করা। এই বিষয়টাকে শিল্প সম্পর্ক কোডের মাধ্যমে আইনসম্মত করা হয়েছে। তাছাড়া, সুপারভাইজার-এর কাজ করেন এমন পদের মাইনের সীমা ১৮০০০ টাকায় বেঁধে দেওয়াটা নিতান্তই হাস্যকর। কারণ সরকার মেনে নিয়েছে যে, সরকারি কর্মীাদের মাসে ১৮০০০ টাকা হল ন্যূনতম মজুরি এবং সেটাই হল সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ। শ্রম কোডের আওতা থেকে শ্রমিকদের বাদ দেওয়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হল শ্রম কোড প্রয়োগের আওতা বাড়িয়ে দেওয়া। ওএসএইচ কোড সেই সব ফ্যাক্টরিতে প্রয়োগ করা যাবে যেখানে ২০ জনের বেশি শ্রমিক কর্মরত এবং যেখানে ম্যানুফ্যাকচারিং-এর কাজ করা হয় বিদ্যুতের সাহায্যে। ম্যানুফ্যাকচারিং-এ বিদ্যুতের সাহায্য না নিলে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফ্যাক্টরিতে কর্মরত শ্রমিক সংখ্যা হবে ৪০। আগেকার ফ্যাক্টরি আইনে এই সংখ্যাগুলি ছিল যথাক্রমে ১০ ও ২০। একই ভাবে কনট্র্যাক্ট লেবার (রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যাবলিশন অ্যাক্ট) প্রয়োগযোগ্য ছিল ২০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেন এমন প্রতিষ্ঠানে। কোডে এই সীমা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০ জন। ষষ্ঠ অর্থনৈতিক সেন্সাস থেকে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের ৯৪.৬ শতাংশ অ-কৃষি প্রতিষ্ঠান ভাড়া করে ৫ জন বা তার কম শ্রমিককে। এতেই দেখা যাচ্ছে ৯০ শতাংশ শ্রমিক বিদ্যমান শ্রম আইনের বাইরে ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সীমা আরও বাড়ানোর মানে প্রায় সব শ্রমিককেই শ্রম অধিকারের পরিসরের বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ওএসএইচ কোডের আওতায় নতুন চুক্তি শ্রমিক ব্যবস্থার বিপদ হল, এই কোড নিয়োগের ধরন হিসাবে চুক্তি শ্রমকে স্বীকৃতি দেয়। অথচ সিএলআর আইনের আওতায় যতদূর সম্ভব এই ব্যবস্থার বিলোপ ঘটানোই ছিল লক্ষ্য। নিয়োগের যেটা সবচেয়ে অনিশ্চিত ধরন, সেই নির্দিষ্ট সময়ের নিয়োগকেও স্বীকৃতি দিয়েছে এই কোড। দ্য ইন্টার-স্টেট মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কমেন (রেগুলেশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড কনডিশনস অফ সার্ভিস) অ্যাক্ট, ১৯৭৯ (এসএমডব্লিউ অ্যাক্ট)-কে বাতিল করা হয়েছে। এর বদলে আনা হয়েছে অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস (ওএসএইচডব্লিউসি) কোড ২০২০। অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস কোডে আন্তঃ-রাজ্য পরিয়ায়ী শ্রমিক সংক্রান্ত অধ্যায়টি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন করে রচনা করা হয়েছে তাতে শ্রমিকদের রক্ষা করার যেসব ব্যবস্থা ছিল এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের যে সব অধিকার ছিল তা তুলে দেওয়া হয়েছে। ওএসএইচডব্লিউসি কোডে পরিযায়ী শ্রমিকদের চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে একাসনে বসানো হয়েছে। যদি কেউ পাঁচ জন পরিযায়ী শ্রমিককে নিয়োগ করতেন, তাহলেই কার্যকর হত আইএসএম ডব্লিউ আইন। সেই আইনেই বিবেচনা করা হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিকে। এখন মোদি সরকার এই পাঁচ জনের সীমা বাড়িয়ে করেছে ৫০ জন। এখন যারাই পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে লাগাবেন তারাই আইএসএম ডব্লিউ আইনের আওতার বাইরে চলে যাবেন। দ্য ওএসএইচডব্লিউসি কোড পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছে নিয়োগকারী, কনট্র্যাক্টর এবং সংশ্লিষ্ট সরকারের পক্ষে মেনে চলা বাধ্যতামূলক এমন সব বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা। পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে এই বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাগুলি ১৯৭৯ সালের আইএসএমডব্লিউ আইনে পাওয়া যাবে। নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং কল্যাণ বিষয়ক ব্যবস্থা পাওয়ার অধিকারের সীমা এমন ভাবে রাখা হয়েছে তাতে কোডের আওতায় যেটুকু ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যতা নিয়োগকারীর ছিল, নিয়োগকারী তা সহজেই এড়িয়ে যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, ৫০০-র কম শ্রমিক কাজ করছেন এমন কারখানা কিংবা বাড়ি বা অন্য কিছু নির্মাণ প্রকল্পে কোনও নিরাপত্তা অফিসার রাখার এখন দরকার পড়বে না। যদি শ্রমিকের সংখ্যা ২৫০ বা তার কম হয় তাহলে ওয়েলফেয়ার অফিসার রাখার দরকার পড়বে না। যদি শ্রমিকের সংখ্যা ১০০-র কম হয় তাহলে ক্যান্টিন রাখার দরকার নেই। যদি মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ এর বেশি হয় তাহলেই ক্রেশের ব্যবস্থা রাখতে হবে। যদি শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০ হয় তাহলেই অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা রাখলে চলবে। ফলে সব সুযোগ সকলে সমানভাবে পাবে বলে যে দাবি করা হচ্ছে সেটা যে কত ফাঁকা, এখানেই তা স্পষ্ট। ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিকের, বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের, বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার রাজ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোড। আগে বিদ্যমান আইনগুলি যা নির্দিষ্ট সেক্টরে প্রযোজ্য হত, যেমন বিড়ি, লৌহ আকরিকের খনি, অভ্রের খনি, চুনাপাথরের খাদান, ডলোমাইট খনি— এ সবগুলিকেই সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোডে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই আইনগুলিতে সেস সংগ্রহের যে ব্যবস্থা ছিল সরকার তা তুলে দিয়েছে। এই কোডে সামাজিক নিরাপত্তার কোনও সুবিধাকেই সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে অসহায় অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং সামাজিক নিরাপত্তাজনিত সুবিধার খাতে অর্থ বরাদ্দ করা বা কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে সরকারের তরফে কোনও অঙ্গীকার করা হয়নি। ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ০১-ডিসেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |