তৃণমূলের তোলাবাজির ইকোসিস্টেম

সুদীপ্ত বসু
এ যেন কর্পোরেট তোলাবাজির নয়া ইকোসিস্টেম। যা আসলে গণতন্ত্রের পক্ষেই বিপদজনক– কর্পোরেটের পছন্দের জনমত তৈরিতে অর্থাৎ নির্বাচনে খেটেছে, খাটছে সেই বিপুল অঙ্কের অর্থ। থাকছে না ‘লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড’। কর্পোরেট পছন্দের দলে কোটি কোটি টাকা ঢালছে, নির্বাচনে ব্যবহার হচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে গরিব, শ্রমজীবীর রুটিরুজির লড়াইয়ের প্রকৃত ইস্যু।

অমিত শাহ নাগরিকত্ব আইনের ‘ক্রনোলজি’ বুঝিয়েছিলেন।

নির্বাচনী বন্ডেরও একটা ক্রনোলজি আছে। গোটা দেশে একাধিক কর্পোরেট সংস্থায় কেন্দ্রীয় এজেন্সির অভিযান সেই ধারাপাতেরই অংশ, স্পষ্ট করেছে বিজেপি।

আর রাজ্যে, পশ্চিমবঙ্গে? কৌশলের নিরিখে এক্ষেত্রেও যে ‘এগিয়ে বাংলা’, তা স্পষ্ট করেছে মমতা ব্যানার্জির দল। টাকার হিসাবে সবচেয়ে বেশি পরিমানে নির্বাচনী বন্ড কেনা প্রথম দশটি কর্পোরেট সংস্থার আড়াই হাজার কোটি টাকা যেমন ঢুকেছে বিজেপির তহবিলে, তেমনই প্রায় ১২০০ কোটি টাকা ঢুকেছে তৃণমূলে।

সাধারণ তোলা আদায়ে স্থানীয় স্তরে রয়েছে শিবু হাজরা, শাহজাহানরা। অনুব্রত থেকে জ্যোতিপ্রিয়র মতো জেলা-স্তরের নেতারা। পাশে পুলিশ প্রশাসনের বৈধতা। পাশাপাশি, দলের কেন্দ্র থেকে তোলা আদায়ের আইনি বৈধতার (সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেওয়ার আগে পর্যন্ত) নির্বাচনী বন্ডের দুরন্ত সদ্ব্যবহার । আধুনিক তোলাবাজির কতটা সংগঠিত ও বিকৃততম চেহারা হতে পারে নির্বাচনী বন্ড তা-ও দেখিয়েছে শাসক তৃণমূল।

কীভাবে? ফিরে যাওয়া যাক কোভিড পর্বে।

তৃণমূলের তোলাবাজি, হামলায় যে কখনও ‘লকডাউন’ থাকে না, তা স্পষ্ট হয়েছিল ২০২০ সালের জুন মাসে। ভয়াবহ কোভিড সংক্রমণের সেই সময় ডায়মন্ডহারবার-২ নম্বর ব্লকের আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে রীতিমত আগ্নেয়াস্ত্র, তলোয়ার নিয়ে কারখানায় ঢুকে নির্বিচারে ভাঙচুর, হামলা চালায় শাসক তৃণমূলের বাহিনী। ঘণ্টা চারেকের বেশি সময় ধরে চলে তুমুল তাণ্ডব। এবং যথারীতি প্রশাসনের বৈধতা, দর্শক পুলিশ!

নূরপুরে সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির লোকসভা কেন্দ্রে এত বড় সংস্থার কারখানায় কেন এই হামলা? কারখানার একাংশের শ্রমিক-কর্মচারীদের কথায়, বিপুল পরিমাণ তোলা চাওয়া হয়েছিল কোম্পানির কাছ থেকে। একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, বছরে ৫০ কোটি টাকা তোলা দাবি করা হয়েছিল!

আইএফবি’র প্ল্যান্টে ২৫ কোটি বোতল তৈরি হয় প্রতিবছর। সেই হিসাবে দু’টাকা করে ৫০ কোটি! লকডাউনের বাজারে শিল্প সংস্থার কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকার তোলা! না দিতে পারায় পুলিশের সামনে বন্দুক, তলোয়ার নিয়ে ভিতরে ঢুকে বেপরোয়া হামলা, ভাঙচুর! হামলার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মেহেবুব গায়েন, সাংসদের ঘনিষ্ঠ অনুগামী। প্রকাশ্যে নিজেকে ‘যুবরাজের লোক’ বলে দাবি করেন। তৃণমূল যুব কংগ্রেসের ডায়মন্ডহারবার-২ নম্বর ব্লকের সভাপতিও বটে।

এই ঘটনার পরেই ২০২০ সালের ২৬ জুন এবং ২২ ডিসেম্বর পরপর দু’বার স্টক এক্সচেঞ্জে চিঠি লিখে আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড জানায় নূরপুর ইউনিটে ১৫০ জনের সশস্ত্র বাহিনী কারখানায় হামলা, ভাঙচুর চালিয়েছে। শুধু তাই নয় মুখ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রীকে জানিয়েও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। এমনকি আবগারি দপ্তরও তাঁদের অভিযোগের যথাযথ ভাবে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানানো হয়।

এরপরেই ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলকে ২০২১-২২ আর্থিক বর্ষে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।

তাতেও পরিস্থিতি ‘মসৃণ’ না হওয়ায় ফের সেই সংস্থা স্টক এক্সচেঞ্জে চিঠি লিখে জানায় যে, ব্যবসার পথ মসৃণ রাখতে সংস্থার পরিচালন পর্ষদের মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে ২০২২-২৩ আর্থিক বর্ষে তারা রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেবে।

আগাম তা জানিয়ে বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে সিদ্ধান্ত নেয় এই সংস্থা।

এবার কয়েকদফায় ভর্ৎসনার পরে বৃহস্পতিবার স্টেট ব্যাঙ্কের তরফে সুপ্রিম কোর্টের কাছে বন্ডের ইউনিক নম্বর সহ বন্ডের তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তরফে প্রকাশিত সেই তালিকা প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখা গিয়েছে সেই আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৪২ কোটি টাকা দিয়েছে শাসকদল তৃণমুলকে। এই হিসাবটি ২০১৯ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত।

স্টক এক্সচেঞ্জে ২০২২-২৩ আর্থিক বর্ষে রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে যে ৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেওয়া হবে, তা আগাম জানিয়ে দিয়েছিল এই সংস্থা। এখন তালিকায় দেখা যাচ্ছে তারা তৃণমূলকে দিয়েছে ৪২ কোটি টাকা। ব্যবসার পথ মসৃন করার জন্য, উৎপাদন অব্যহত রাখার জন্য!

অর্থাৎ ভয় দেখিয়ে তোলাবাজির সরাসরি টাকা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমেই ঢুকে পড়ল শাসকের তৃণমূলের তহবিলে। গোরু পাচার, কয়লা পাচারের টাকাও শিখণ্ডী সংস্থার মাধ্যমে ঢুকেছে বৃহৎ কর্পোরেটের অন্যতম পছন্দের দলে পরিণত হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসে।

বৃহৎ কর্পোরেটের স্বাভাবিক পছন্দ উগ্র দক্ষিণপন্থী দল হিসাবে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনে দায়ের করা রাজনৈতিক দলের সর্বশেষ অডিট রিপোর্টের হিসাব বলছে এদেশের বৃহৎ কর্পোরেটের পছন্দের দল হিসাবে বিজেপি’কে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এবং এটা রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ প্রবণতা। যে বৃহৎ কর্পোরেট অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তি প্রথম পছন্দের মনে করছে তারা একইভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ গোপনে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তৃণমূলের জন্য ঢালছে!

এ যেন কর্পোরেট তোলাবাজির নয়া ইকোসিস্টেম। যা আসলে গণতন্ত্রের পক্ষেই বিপদজনক– কর্পোরেটের পছন্দের জনমত তৈরিতে অর্থাৎ নির্বাচনে খেটেছে, খাটছে সেই বিপুল অঙ্কের অর্থ। থাকছে না ‘লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড’। কর্পোরেট পছন্দের দলে কোটি কোটি টাকা ঢালছে, নির্বাচনে ব্যবহার হচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে গরিব, শ্রমজীবীর রুটিরুজির লড়াইয়ের প্রকৃত ইস্যু।

নির্বাচনী বন্ড এভাবেই গণতন্ত্রের বৃত্ত থেকে বের করে দিয়েছে সাধারণ মানুষের মূল অ্যাজেন্ডাকে। ভোট লুট যেমন গণতন্ত্রের একটা অসুস্থ, পক্ষাঘাতগ্রস্থ চেহারা, তেমনই নির্বাচনী বন্ড আসলে সুষ্ঠ অবাধ নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার অনুঘটক হিসাবেই চিহ্নিত।

আর সেকারণে ভারতের একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসাবে সিপিআই(এম) প্রথম থেকেই এভাবে রাজনৈতিক দলকে গোপনে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদা দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে আসছে। পার্টি মনে করে নির্বাচনী তহবিলের অস্বচ্ছতাকেই বৈধতা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে। ফলে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে পার্টির তহবিলে ঢোকা অর্থের পরিমাণ শূন্য, নীতিগত ভাবেই নেওয়া হয়নি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে কোনও অর্থ। অডিট রিপোর্টের তথ্য বলছে পার্টির আয়ের ২৯শতাংশ হলো দলের সদস্যদের প্রতি মাসে দেওয়া লেভির টাকা, ৪০ শতাংশ হলো স্বেচ্ছা অনুদান! নির্বাচনী বন্ড থেকে একটি টাকাও নয়।


নির্বাচনী বন্ড সম্পর্কিত রায় ও ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণি
নির্বাচনী বন্ড এবং ধান্দার ধনতন্ত্র
নির্বাচনী বন্ড, কর্পোরেট এবং সঙ্ঘ


প্রকাশের তারিখ: ২৬-মার্চ-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org