সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচনী বন্ড, কর্পোরেট এবং সঙ্ঘ
টিম মার্কসবাদী পথ
নির্বাচনী বন্ডের দুর্নীতি সামনে আসার পরে সরাসরি তার সমর্থনে দাঁড়িয়েছে আরএসএস। তিনদিনের অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভার শেষে সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবালের দাবি, ‘নির্বাচনী বন্ড একটি পরীক্ষা। সময়ই বলে দেবে এটা কতটা উপরকারী ও কার্যকর হয়েছে। তাছাড়া কোনও কিছু নতুন করে শুরু করলেই প্রশ্ন ওঠে। যখন ইভিএম আনা হয়, তখনও এই ধরনের কথা উঠেছিল।’

এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ
চ্যানেল
নির্বাচনী বন্ড ভোটারদের ওপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। এমনই দাবি করেছেন কর্পোরেট সংস্থার কর্ণধাররা।
নির্বাচনের দিন ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই পুঁজিবাদের বিশ্বস্ত মুখপত্র বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা প্রকাশ করেছে সিইও-পোল। কর্পোরেট সংস্থার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারদের মধ্যে মতামত সমীক্ষা। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এজন্য বেছে নিয়েছে দশজন দাপুটে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারকে। পত্রিকার সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের শিল্পমহলের ক্যাপ্টেনরা সকলেই মনে করেন নির্বাচনী বন্ডে দাতা-গ্রহীতার নাম প্রকাশ্যে এলেও তা নির্বাচনে আদৌ কোনও প্রভাব ফেলবে না।
বক্তব্য সহজ, স্পষ্ট: এটি মোদীর তৃতীয়বারের জয়ের ক্ষেত্রে ফেলবে না কোনও নেতিবাচক প্রভাব।
কর্পোরেট কর্তাদের এই মনোভাব স্বাভাবিক। মোদী সরকারের ন’বছরে ভারতে অসাম্য ছাপিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশরাজকে।
ব্রিটিশরাজ থেকে এখন বিলিওনেয়ার-রাজ। উপার্জনে অসাম্য চরমে। জানিয়েছে প্যারিস স্কুল অব ইকনমিক্সেরওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব। এই প্রতিষ্ঠানে গবেষণারত প্রথম সারির অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্রিটিশ জমানার থেকেও এখন ভারতে আর্থিক অসাম্য বেশি। ১৯২২, আয়কর আইনকে যখন গোটা ব্রিটিশ ভারতে সম্প্রসারিত করা হয়, তখন শীর্ষ ১ শতাংশের আয় ছিল ২২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি ও লুকাস চ্যানেলের গবেষণা অন্তত তেমনই বলছে। ‘ভারতে আয়ের অসাম্য, ১৯২২-২০১৪: ব্রিটিশ রাজ থেকে বিলিওনেয়ার রাজ শীর্ষক গবেষণায় পিকেটি ও চ্যানেল দেখিয়েছেন, ‘১৯৩০ সালের শেষের দিকে দেশের সবচেয়ে বেশি আয়ের ১ শতাংশের হাতে থাকত মোট আয়ের ২১ শতাংশের সমান। আটের দশকের গোড়ায় এই বৈষম্য কমে হয় ৬ শতাংশ। তবে আজ তা বেড়ে হয়েছে ২২ শতাংশ।’ আর অতি সম্প্রতি, ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের ভারতের আর্থিক অসাম্য: ধনকুবেরদের রাজত্বে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজত্বের থেকেও বেশি অসাম্য শীর্ষক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে ভারতের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশই ছিল ধনীতম ১ শতাংশ ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত। দেশের মোট আয়ে তাঁদের ভাগ ২২ শতাংশের বেশি। এমনকি আমেরিকা, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশেও জাতীয় আয়ে ধনীতমদের ভাগ এত বেশি নয়। বিপরীতে, আয়ের দিক থেকে শেষ সারির ৫০ শতাংশ বা দেশের অর্ধেক মানুষের আয় দেশের মোট আয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ।
নয়া উদারবাদে দুর্নীতির চরিত্রে ‘ধান্দার ধনতন্ত্র’ প্রকট। কর্পোরেট-রাজনীতিবিদ-আমলার মধ্যে অবৈধ আঁতাতের চক্র এখন প্রকাশ্যে।
আর এই ধান্দার ধনতন্ত্রকে বৈধতা দিয়েছে, আইনসিদ্ধ করেছে নির্বাচনী বন্ড। শুরুতেই বলেছিলেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। ‘অর্থ ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ আঁতাত’কে বোঝাতে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম শব্দের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্ট ব্যবহার করেছে নতুন লাতিন শব্দবন্ধ: কুইড প্রো কুয়ো, অর্থাৎ কোনও কিছুর বিনিময়ে কাউকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া।
সর্বোচ্চ আদালত যখন কুইড প্রো কুয়ো-র কথা বলছে, তখন কর্পোরেট সংস্থার কর্ণধারদের দাবি, ভোটাররা ওসব সেকেলে নৈতিকতার ধারপাশ দিয়ে যাবেন না। কর্পোরেট সংস্থাগুলির এই বোঝাপড়া বা আশাবাদের মূল কথা কী? তাঁরা সকলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তাকে হাতিয়ার করে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসা ও অসৎ রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে ধান্দার আঁতাত তৈরি হয়েছে, তার পতন রুখতে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবেন। সেকারণে মতামত সমীক্ষায় যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, বিকাশ ও প্রশাসনের মাপকাঠিতে গত পাঁচ-বছরকে আপনারা কত দেবেন, তখন শিল্পমহলের কর্ণধাররা প্রত্যেকে দু’হাত তুলে মোদীর জমানাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
অতীতে কখনও শিল্পোদ্যোগীরা এভাবে প্রকাশ্যে তাদের রাজনৈতিক পছন্দের কথা জানাননি। ধান্দার ধনতন্ত্র ও মোদীর জমানার যুগলবন্দি নিয়ে এরপরেও যদি কোনও সন্দেহ থেকে থাকে, তবে দেখতে পারেন নির্বাচনের দিন ঘোষণার একদিন বাদে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার প্রথম পাতার বিজ্ঞাপন। আম্বানি গোষ্ঠীর চ্যানেল নিউজ এইটিন-এর রাইজিং ভারত সামিট-এর বিজ্ঞাপন। বক্তাদের তালিকার শীর্ষে প্রধানমন্ত্রী। অ-বিজেপি বলে নেই একজনও। কোনও রাখঢাক না-করে দেশের বৃহত্তম শিল্পসংস্থাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে তার এক এবং একমাত্র পছন্দ।
একদিকে মোদীর ওপর অগাধ আস্থা। অন্যদিকে, নির্বাচনী বন্ডের ইউনিক আলফানিউমেরিক নাম্বার এবং সিরিয়াল নাম্বার যাতে প্রকাশ না-করা হয়, তার জন্য একযোগে সুপ্রিম কোর্টের একযোগে দ্বারস্থ হয়েছে দেশের শীর্ষ তিন বণিকসভা সিআইআই, ফিকি এবং অ্যাসোচ্যাম। যাতে কে কোন দলকে টাকা দিয়েছে, আর কোন দল সেই টাকা ভাঙিয়েছে, তা থাকে গোপনে। অর্থ পরিষ্কার, বিজেপি কার থেকে কত টাকা নিয়েছে, তা জানা না-গেলে বোঝাই যাবে না বিজেপি তাকে সেই অর্থের বিনিময়ে বরাত-সহ কী কী সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। যদিও সর্বোচ্চ আদালত এই আরজি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে। এবং এই তথ্য সহজলভ্য।
একদিকে যখন কর্পোরেট সংস্থাগুলি নির্বাচনী বন্ডের পক্ষে সওয়াল করেছে, তখন আরএসএস কী করেছে?
নির্বাচনী বন্ডের দুর্নীতি সামনে আসার পরে সরাসরি তার সমর্থনে দাঁড়িয়েছে আরএসএস। তিনদিনের অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভার শেষে সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবালের দাবি, ‘নির্বাচনী বন্ড একটি পরীক্ষা। সময়ই বলে দেবে এটা কতটা উপরকারী ও কার্যকর হয়েছে। তাছাড়া কোনও কিছু নতুন করে শুরু করলেই প্রশ্ন ওঠে। যখন ইভিএম আনা হয়, তখনও এই ধরনের কথা উঠেছিল।’
সরসঙ্ঘচালক বা সঙ্ঘের প্রধানের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ এই সাধারণ সম্পাদক, বা সরকার্যবাহ। সেদিক থেকে হোসবালের এই বক্তব্য আসলে সংগঠনেরই মৌলিক অবস্থান। এই অবস্থান থেকেই কর্পোরেটের সঙ্গে সঙ্ঘের সমঝোতার সুর চড়া এবং স্পষ্ট। সেইসঙ্গে, হিন্দুত্ববাদী দলের সঙ্গে কর্পোরেটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আরও এক স্বীকারোক্তি। একইসঙ্গে, কর্পোরেট সংস্থাগুলি যে হিন্দুত্ব-প্রজেক্টের শরিক, তা-ও এতে প্রমাণিত।
আজ নয়। বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে সঙ্ঘের আঁতাত দীর্ঘদিনের। ২০০২ সালে প্রকাশিত ঘৃণার জন্য অর্থায়ন (দ্য ফরেন এক্সচেঞ্জ অব হেট: আইডিআরএফ অ্যান্ড দি আমেরিকান ফান্ডিং অব হিন্দুত্ব) রিপোর্টেই স্পষ্ট: সঙ্ঘ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলির সঙ্গে বিদেশি অর্থায়নের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। এতে বলা হয়েছে রিপোর্টটি প্রকাশ হওয়ার আগের সাত বছরে আইডিআরএফ সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠানগুলিকে পাঠিয়েছিল ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ। যদিও, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটি স্বাধীনতার আগে অর্থনীতির প্রশ্নে সঙ্ঘের অবস্থানের সঙ্গে পুরোদস্তুর সঙ্গতিপূর্ণ। সেসময় ব্রিটিশ ও বিদেশি পুঁজির ভারতে প্রবেশকে তারা স্বাগত জানিয়েছিল। মনে করেছিল ভারতে শিল্প বিকাশের জন্য এটিই একমাত্র পথ। আরএসএস, পরে জনসঙ্ঘ ছিল ভারতে বিদেশি পুঁজির অবাধ লগ্নীর পক্ষে। সমাজতন্ত্রের ভূত দেখে বিরোধিতা করেছিল পরিকল্পিত অর্থনীতির উদ্যোগকে। স্বাধীনতার পরেও আরএসএস ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটিশ অক্ষের পক্ষে সওয়াল করেছিল, যা ছিল নাস্তিক কমিউনিস্ট এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান, ইহুদি এবং হিন্দুত্বের একটি জোট।
এই নির্বাচন সেকারণেই সঙ্ঘ, মোদী ও তার কর্পোরেট বন্ধুদের সঙ্গে দেশের মানুষের লড়াই। একদিকে দেশের কায়েমী স্বার্থের সবচেয়ে কায়েমী অংশ। অন্যদিকে দেশের সমৃদ্ধি ও জনগণের মঙ্গল। একদিকে কর্পোরেট-ভারত। অন্যদিকে সর্বস্বান্ত ভারত। একদিকে মুনাফার পাহাড়। অন্যদিকে দারিদ্র, বেকারত্ব, ক্ষুধা। একদিকে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ঝাঁ চকচকে ভারত। অন্যদিকে প্রকৃত ভারত। একদিকে মেরুকরণের চেষ্টা, হিন্দুত্ব-কর্পোরেট চক্রের ভারত। অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। পছন্দ এই দুইয়ের মধ্যে।
আরও জানতে পড়ুন:
নির্বাচনী বন্ড এবং ধান্দার ধনতন্ত্র
কর্পোরেটের পৌষমাস, মানুষের সর্বনাশ
তৃণমূলের তোলাবাজির ইকোসিস্টেম
নির্বাচনী বন্ড সম্পর্কিত রায় ও ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণি
প্রকাশের তারিখ: ২৪-মার্চ-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
