সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কর্পোরেটের পৌষমাস, মানুষের সর্বনাশ
সুদীপ্ত বসু
আর সেই ডিয়ার লটারির ‘সোল ডিস্ট্রিবিউটার’ ফিউচার গেমিং অ্যান্ড হোটেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড। ‘কিং অব লটারি’ বলে পরিচিত স্যান্টিয়াগো মার্টিনের এই সংস্থাটি কিনেছে গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকার বন্ড। পরিমান ১৩৬৮ কোটি টাকা। সেই টাকার ৩৯.৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৪২ কোটি টাকা একাই পেয়েছে মমতা ব্যানার্জির দল। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে এই কোম্পানির কাছ থেকেই সর্বোচ্চ টাকা পেয়েছে তৃণমূল। বিজেপিকে এই কোম্পানি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে দিয়েছে ১০০ কোটি।

নূর আলিকে চেনেন? চেনার কথাও নয়।
লাল মাটির দেশের মানুষ। বোলপুরের শিমূলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। অনুব্রত বাহিনীর তাণ্ডবে নূর আলি ঘরছাড়া ছিলেন! কেন? সিপিআই(এম) সমর্থক হলে এরাজ্যে ঘরছাড়া হতে হয়, এমন হাজারো উদাহরণ দেখেছে গত একদশকের বাংলা। কিন্তু নূর আলি সিপিআই(এম) সমর্থক নন। তাহলে?
নূর আলি আসলে নির্বাচনী বন্ডের বিকৃততম চেহারার অসহায় শিকার। এদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে দুর্নীতির রাষ্ট্রীয় বৈধতা, কর্পোরেট আর শাসককের এমন নিবিড় প্রণয়ের সম্পর্ক এর আগে এভাবে সামনে আসেনি।
মধ্যবয়সী নূর আলিকে ঘরছাড়া থাকতে এবং তৃণমূলের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল স্রেফ একটিই কারনে। তা হলো– তিনি ডিয়ার লটারির টিকিট কেটে এক কোটি টাকার পুরস্কার জিতেছিলেন। সেই খবর পাওয়ার পরেই অনুব্রত মণ্ডলের বাহিনী শুরু করে অত্যাচার ওই লটারির টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। আপত্তি জানানোয় ঘরছাড়া হতে হয়। শেষে ১ কোটির পুরস্কার মূল্যের টিকিট মাত্র সাত লক্ষ টাকায় ‘কিনে’ ফেলে অনুব্রতর বাহিনী।
আর তারপর ২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি ডিয়ার লটারির ওয়েবসাইটে তৃণমূলের জেলা সভাপতি, মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে ‘বীর’ বিশেষণ পাওয়া অনুব্রতর ছবি– ১ কোটি টাকার পুরস্কার বিজেতা হিসাবে! রাজ্যজুড়ে তা প্রচারও করে ডিয়ার লটারি।
অনুব্রত কেবল ডিয়ার লটারিতে ১ কোটি টাকা ‘জিতেছিলেন’ তাই নয়! তার আগে তিন-তিনবার তিনি ও তিহার জেলেই বন্দি তাঁর মেয়ে লটারিতে বাম্পার পুরস্কার জিতেছিলেন! মোট ২ কোটি ১১ লক্ষ টাকা!
নূর আলির মতোই প্রকৃত বিজেতার কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে বাম্পার লটারির টিকিট কিনে নেওয়া হয়। নামমাত্র নগদ টাকায় ওই টিকিট কিনে লটারি সংস্থার কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাঙ্কের মাধ্যমে টাকা পেয়ে যান। ওদিকে কালো নগদ টাকা ততক্ষনে সাদা হয়ে গিয়েছে বিজেতার কাছ থেকে টিকিট কিনে নেওয়ার পরে। তারপর নেতা-মন্ত্রীর ছবি দিয়ে কোটিপতি হওয়ার বিজ্ঞাপন! আর সেই ফাঁদে পা হাজার হাজার সাধারণ মানুষের।
একই কায়দায় ১ কোটি টাকার লটারি বিজেতা হয়ে যান নলহাটির তৃণমূল বিধায়ক রাজেন্দ্র প্রসাদ সিংহের ভ্রাতৃবধূ। জোড়াসাঁকোর তৃণমূল বিধায়ক বিবেক গুপ্তর স্ত্রী রুচিরা গুপ্ত।
আর সেই ডিয়ার লটারির ‘সোল ডিস্ট্রিবিউটার’ ফিউচার গেমিং অ্যান্ড হোটেল সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড। ‘কিং অব লটারি’ বলে পরিচিত স্যান্টিয়াগো মার্টিনের এই সংস্থাটি কিনেছে গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টাকার বন্ড। পরিমান ১৩৬৮ কোটি টাকা। সেই টাকার ৩৯.৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৪২ কোটি টাকা একাই পেয়েছে মমতা ব্যানার্জির দল। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে এই কোম্পানির কাছ থেকেই সর্বোচ্চ টাকা পেয়েছে তৃণমূল। বিজেপিকে এই কোম্পানি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে দিয়েছে ১০০ কোটি।
পনজি স্কিম ভেঙে দিয়েছিল এ রাজ্যের গ্রাম ও মফঃস্বলের অর্থনীতিকে। বামফ্রন্ট সরকারের সময় গ্রামে মানুষের যে ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হয়েছিল, বাজারের বিস্তৃতি হয়েছিল, সেখানে সারদা-রোজভ্যালির মত স্রেফ দু’টি চিট ফাণ্ড সংস্থার দৌলতে এরাজ্যের বাজার থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়।
সেদিন মুখ্যমন্ত্রী ও সরকারের তাবড় তাবড় মন্ত্রীদের ছবি সারদা, রোজভ্যালির মানি মার্কেটিং ব্যবসার ‘গুডইউল’-এ পরিণত হয়েছিল। অর্থনীতিতে ‘গুডউইল’– আসলে সংস্থার অ্যাসেট হিসাবেই বিবেচনা করা হয়।
একইভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে তছনছ করেছে ডিয়ার লটারি। মাকড়সার জালের মতো ঘিরে ফেলেছে একের পর জনপদ। গ্রামে কাজ নেই। বাড়ছে পরিযায়ী শ্রমিক। কাজ হারানোর তল্লাটে বেকার যুবক। হতাশাগ্রস্ত পরিবার। শহর ও গ্রামীন জনগনের একটা বড় অংশ বাধ্য হচ্ছে নিজেদের ‘ভাগ্য’ পরীক্ষায়। সর্বস্বান্ত হচ্ছে একের পর এক পরিবার। আর লটারির ছবিতে শোভা পাচ্ছে অনুব্রতর হাসি-মুখ!
গত কয়েক বছর ধরে ডিয়ার লটারির রমরমা কারবার। একের পর এক শাসক দলের নেতাদের ‘বাম্পার পুরস্কার’ পাওয়ার ছবি। তৃণমূলের এক শীর্ষ সাংসদের ঘনিষ্ঠতার কাহিনী চিট ফান্ডের মতো ডিয়ার লটারিরও ‘অ্যাসেট’ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর তাই ডিয়ার লটারির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হলেও ২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে এই লটারি কিংপিন স্যান্টিয়াগো মার্টিন, এম নাগরাজনকে বেমালুম ক্লিনচিট দিয়েই চার্জশিট দায়ের করে কলকাতা পুলিশ! এই মার্টিনের সংস্থার বিরুদ্ধে এর আগে কয়েকশো কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ এনেছিল সিকিম সরকার, জেলও খেটেছেন তিনি, তবুও বিলকুল ছাড়!
নির্বাচনী বন্ডের নামে এই কর্পোরেট তোলাবাজি শুধু রাজনীতির অলিন্দে ‘পাওয়ার লবি’কে নিয়ন্ত্রণ করছে না, আমার আপনার প্রতিদিনকার বেঁচে থাকা, জীবনযুদ্ধে টিঁকে থাকার লড়াইকেও প্রভাবিত করছে। সাধারণ মানুষকে টেনে এনে দাঁড় করাচ্ছে জীবনজীবিকার লড়াইয়ের অসম জমিতে, খাদের কিনারায়।
দেশের সরকার এই বছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট খরচের মাত্র ১.৮ শতাংশ বরাদ্দ করেছে। আকাশছোঁয়া মূল্যের জীবনদায়ী ওষুধ কিনতে নাভিশ্বাস। সোনার বা হীরের গয়নার ওপর যেখানে ৩ শতাংশ জিএসটি নেওয়া হবে, সেখানে এক্স-রে মেশিনের ওপরে ১৮-২৮ শতাংশ জিএসটি চাপানো হবে। স্বাস্থ্য বীমায় প্রিমিয়ামে ১৮ শতাংশ জিএসটি বসানো হবে আর একই সঙ্গে দেশের ৩৭টি ওষুধ কোম্পানি প্রায় ১১০০ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড কিনে শাসক দলকে ‘তোফা’ দেবে।
সরকার বাজি রাখছে আপনাকে। নির্বাচনী বন্ডের চেহারা বলছে এখন দেশের নাগরিকরা কর্পোরেটের মতো সরকারের কাছেও নিছকই কনজিউমার, ‘খদ্দের’!
তাই কয়লার খরচ ৪০ শতাংশ কমলে, জিএসটির বোঝা সাত শতাংশ কমলেও কলকাতা শহর এলাকায় সাধারণ মানুষকে বিদ্যুতের জন্যে ইউনিট পিছু ৭ টাকা ৩১ পয়সা করে গুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে, আরপিজি-সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গোষ্ঠী গত পাঁচ বছরে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যে ৪৪৪ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছে! আবারও আপনি নিছকই ‘খদ্দের’, রাষ্ট্রের চোখে সহ-নাগরিক নন!
দুর্নীতির বন্ডের ধান্দাতেও তাই ঐক্য! নির্বাচন কমিশনের তরফে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যচ্ছে বিজেপি এবং তৃণমূলকে একইসঙ্গে টাকা দিয়েছে এমন সংস্থার সংখ্যা ৩৬টি। অর্থাৎ এই দু’টি সংস্থা বিজেপি ও তৃণমূলকেই তাদের কর্পোরেট মুনাফার অ্যাজেন্ডা পালনে সবচেয়ে ‘বিশ্বস্ত মিত্র’ বলে মনে করেছে। আর তৃণমূল যে বিজেপি’র ‘স্বাভাবিক মিত্র’ কে না জানেন! অভিজিৎ ইন্টারন্যাশানাল থেকে আরপিজি’র হলদিয়া এনার্জি, ডিয়ার লটারির ফিউচার গেমিং থেকে এমকেজে ইন্টারপ্রাইজ– ৩৬টি সংস্থা বিজেপি’কে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে দিয়েছে ৪৭৪ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা। আর এই ৩৬টি সংস্থাই তৃণমূলকে দিয়েছে ১ হাজার ৫৬ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা। নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া মমতা ব্যানার্জির দলের অডিট রিপোর্টের তথ্যও বলছে, ‘মোট আয়ের’ প্রায় ৯৮ শতাংশ এসেছে কেবলমাত্র নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে।
রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প কারখানার দেখা না মিললেও আয়কর দপ্তরের রিপোর্ট বলছে কলকাতা শহর এখন শিখন্ডী সংস্থাগুলির কাছে ‘ভূ-স্বর্গ’। কলকাতা শহর এখন ‘শিখণ্ডী সংস্থার হাবে’ পরিণত হয়েছে। মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতায় কয়েকশ’ এরকম শিখণ্ডী সংস্থা চলছে, যেসব সংস্থার ‘অ্যাসেট’ বলতে দেখানো হয় স্রেফ কয়েকটি টেবিল, চেয়ার। অথচ রয়েছে একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। মূলত সেই অ্যাকাউন্টগুলিকে চক্রবুহ্যের মতো ব্যবহার করা হয় কালো টাকা সাদা করতে। এমনকি ভাড়াও দেওয়া হয় অ্যাকাউন্টগুলিও।
যেমন একটি ঠিকানা– ৫৩ এ, মির্জা গালিব স্ট্রিট, চতুর্থ তল, কলকাতা-১৬। এই একটি ঠিকানাতেই রয়েছে ২৩টি সংস্থা। তার মধ্যে ১১টি সংস্থা কিনেছিল প্রায় ৬০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের বন্ড। যার সিংহভাগই গিয়েছে মমতা ব্যানার্জির দলের তহবিলে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঠিকানায় থাকা ওম গোষ্ঠীর সংস্থাগুলো বিজেপি’কে দিয়েছে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। আর তৃণমূলকে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা!
আরো মজার হলো ওই ওম গোষ্ঠীরই একটি সংস্থা ওম ভিনকম প্রাইভেট লিমিটেড ২০২১’র বিধানসভা ভোটের পরে জুলাই মাসে ৬০ লক্ষ টাকার বন্ড কিনেছিল, পেয়েছিল তৃণমূল। যদিও সেই সময় ওই সংস্থার মোট মুনাফার পরিমাণ ছিল আড়াই লক্ষ টাকা! আবার ওম এনক্লেভ ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পরে ৪ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার বন্ড কিনেছিল। এই টাকাও যায় তৃণমূলের ঘরে, যদিও সেই বছরেই সংস্থার মুনাফা ছিল মাত্র ১ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা!
শিখণ্ডী সংস্থার এই অর্থনীতি ধান্দার ধনতন্ত্রের কদর্য চেহারাকেই সামনে আনছে। কেন্দ্র রাজ্য দুই শাসকের মধ্যে বন্ডের ঐক্য আসলে ধান্দারই ঐক্য। এর উদ্দেশ্য আসলে মানুষের ঐক্যকে ভাঙো, দুই শাসকের মধ্যে বাইনারির ছবিকে জীবন্ত করে তোলো, কর্পোরেটের পছন্দের দলের প্রতিনিধিকে পাঠাও আইনসভায়। বন্ডের আড়ালে ঘুষের পরিমান তাতে আরো বাড়বে!
কর্পোরেটের পৌষমাস, শাসকেরও পৌষমাস! সর্বনাশ কেবল নাগরিক থেকে সরকারের ‘খদ্দের’ বনে যাওয়া আমজনতার।
আরও পড়ুন : তৃণমূলের তোলাবাজির ইকোসিস্টেম
প্রকাশের তারিখ: ২৭-মার্চ-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
