সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
জননিরাপত্তা, নাকি সন্ত্রাসের রাজ?
ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
প্রশাসনিক এক্তিয়ার যখন বিস্তৃততর হয়, আইনি সংজ্ঞাগুলি যখন ঘোলাটে হয়ে যায়, তখন সাংবাদিকরাও দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচনে দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। ট্রেড ইউনিয়নগুলি শিল্পক্ষেত্রে আন্দোলনে যেতে আরেকবার ভাববে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও দ্বিধাগ্রস্ত হবে। সাধারণ মানুষ ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে দু’বার ভাববেন।

ব্যক্তি স্বাধীনতার ইতিহাস প্রধানত জনসুরক্ষার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও তার নিশ্চয়তা দাবির ইতিহাস —বিচারপতি এইচ আর খান্না, অতিরিক্ত জেলাশাসক বনাম শিবকান্ত শুক্লা মামলা (১৯৭৬)।
সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলার দোহাই দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’ নামে একটি খসড়া পাশ করিয়ে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সরকারের যুক্তি, দাগী অপরাধী ও সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ মোকাবিলার জন্য এমন একটি আইন জরুরি। যদিও একটু খতিয়ে দেখলে সহজেই বোঝা যায়, এই বিল অপরাধ দমনের আরও একটি ব্যবস্থার চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। প্রশাসনের হাতে দীর্ঘতর মেয়াদে আটকের ক্ষমতা দিতে চাইছে এই আইন। যার মাধ্যমে সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণের আগেই একজন নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রকে।
একটি কার্যকরী ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে কোনও সাংবিধানিক গণতন্ত্রই চলতে পারে না। সংগঠিত অপরাধ, তোলাবাজি, মাদক পাচার, জমি-জবরদখল এবং স্বভাবগত হিংসার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তরফে কঠোর পদক্ষেপই প্রত্যাশিত। বিষয়টা এই নয় যে অপরাধীদের শাস্তি হবে কি না, কারণ সেটা প্রশ্নাতীতভাবেই কাম্য। সাংবিধানিক মূল প্রশ্নটি হল, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) এবং অন্যান্য অপরাধ দমনের ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হাতে সাধারণ বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতা তুলে দেওয়ার কী প্রয়োজন রয়েছে?
এই বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল— এর মূল ভিত্তি আগাম সতর্কতামূলক বা প্রতিরোধমূলক আটক (প্রিভেনটিভ অ্যারেস্ট) ব্যবস্থা। সাধারণ ফৌজদারি আইনে যেমন বিচার শেষে সাজার ব্যবস্থা রয়েছে— প্রতিরোধমূলক আটক ব্যবস্থায় ঠিক তার বিপরীতে— ভবিষ্যতের কর্মপন্থায় নিছক অনুমানের ভিত্তিতে আটক করাকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে আসলে ফৌজদারি ন্যায়-বিচারের প্রাচীনতম নীতিকেই উলটে দেওয়া হয়েছে— যেখানে বলা হয়ে এসেছে: আগে বিচার, তারপর সাজা। এ ধরনের ক্ষমতাবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবেই মেনে নেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে। এবং সেটিও কঠোর রক্ষাকবচকে সুনিশ্চিত করে। যখনই সেই রক্ষাকবচগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই অবধারিতভাবে বেড়ে যায় প্রশাসনিক বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা।
অস্পষ্টতা, প্রশাসনিক এক্তিয়ার এবং আইনের শাসন
এই বিলের আরও একটি সাংবিধানিক উদ্বেগের বিষয় হল, ‘সমাজবিরোধী কার্যকলাপ’-এর উল্লেখযোগ্য মাত্রার সম্প্রসারিত সংজ্ঞা। সাধারণভাবে চিহ্নিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বাইরেও এর আওতায় এমন সব আচরণের পরিসরে বিস্তৃত— যা ‘ভয়’, ‘আতঙ্ক’ এবং ‘নিরাপত্তাহীনতার অনুভব’ তৈরি করতে পারে, কিংবা বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। প্রথম দেখায় এই অন্তর্ভুক্তিকে যুক্তিগ্রাহ্যই মনে হবে। কিন্তু মনে রাখা উচিত, এই সংজ্ঞার কোনও আইনী পরিসীমা নেই। যুক্তিনির্ভর আইনী মানদণ্ডের পরিবর্তে এর বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত ন্যস্ত থাকবে প্রশাসনিক ব্যাখ্যার ওপর।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত আইনি নিশ্চয়তার উপর। নাগরিকদের অবশ্যই মোটের উপর সুনির্দিষ্ট করে জানতে হবে যে কোন ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ।
আইনের ভাষা যদি অস্পষ্ট হয়, প্রশাসনিক এক্তিয়ার তাহলে সম্প্রসারিত হয়। এমতাবস্থায়, আইনের অর্থ আইনসভা যতটা নির্ধারণ করে— তার চেয়ে বেশি নির্ধারণ করে বাস্তবে যারা এর প্রয়োগ করে, তারা।
এই বিলের ‘গুণ্ডা’ শব্দের সংজ্ঞাও একই ধরনের উৎকন্ঠার জন্ম দিয়েছে। যদিও অতীতের সাজাপ্রাপ্তি বা একাধিক চার্জশিটের মতো বিষয় যোগ হওয়ায় এক ধরনের সুরক্ষা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, একজন ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্যে বিপজ্জনক কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যাপ্ত ক্ষমতাও প্রশাসনের হাতে দেওয়া হয়েছে। সাংবিধানিক গণতন্ত্র নির্দোষিতার ধারনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সন্দেহ, পরিচিতি বা প্রশাসনিক অভিমত কখনওই আইনগত সিদ্ধান্তের বিকল্প পারে না। ব্যক্তি স্বাধীনতা কখনওই কেবল প্রশাসনিক সন্তুষ্টির উপর নির্ভরশীল হতে পারে না।
এই বিলে এছাড়াও কোনওরকম পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, বাজেয়াপ্ত করা এবং আটক করার অত্যধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ‘শুদ্ধমতি’ আধিকারিকদের আইনি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বিষয়ক আইনে এ ধরনের দায়মুক্তি-সংক্রান্ত বিধান অস্বাভাবিক নয়। তবে বিচারব্যবস্থার জোরালো নজরদারি না থাকলে, প্রশাসনিক কর্মতৎপরতা অর্থবহ জবাবদিহির বাইরে যাওয়ার সুযোগ থেকে যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার দমনমূলক ক্ষমতার ব্যাপকতার মধ্যে নিহিত নয়। বরং, তা নিহিত থাকে তার ওপর আরোপিত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে।
প্রতিরোধমূলক আটক ও সংবিধানগত পরিসীমা
সংবিধানগত যে প্রধান বিপদটি এই বিল হাজির করেছে তা হল: প্রতিরোধমূলক আটকের ব্যবস্থা। সংবিধানের ২২ নং ধারা প্রতিরোধমূলক আটকের অনুমতি প্রদান করে। কিন্তু এর প্রবর্তকরা কখনওই অনুমান করেননি যে এটি একটা সময়ে প্রশাসন চালনার নিত্যকার বাহনে পরিণত হবে। একটি ব্যতিক্রমী বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবেই তখন এটি ভাবনায় এসেছিল। এবং একে খুবই সুস্পষ্ট এবং সীমাবদ্ধ প্রেক্ষিতে কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা সহকারে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছিল।
ফলে এই আইনকে উপলব্ধি করতে হবে সংবিধানের ২১ নং ধারাকে পাশে রেখে, যেখানে আইনানুগ পদ্ধতি ছাড়া কোনও নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করায় অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে।
নিশ্চয়তা প্রদানের অর্থটি ১৯৭৮ সালের মানেকা গান্ধী বনাম ভারত সরকার মামলায় আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, এই আইনের নিছক অস্তিত্বের চেয়ে এর সাংবিধানিক প্রাকশর্তটির তাৎপর্য অনেক বড়। ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী যে কোনও পদক্ষেপকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক হতে হবে। প্রশাসনিক উপযোগিতা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংকোচনের সাংবিধানিক যথার্থতার কারণ হতে পারে না।
যদিও আটকের কারণ জানানো এবং একটি পরামর্শ পর্ষদে তা সুপারিশের বিধি রয়েছে, আবার এখানে একইসঙ্গে জনস্বার্থের বিরোধী বলে বিবেচিত হলে তথ্য চেপে রাখারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এতে একটি স্বাভাবিক সাংবিধানিক সমস্যার উদয় হয়। যে বন্দী তার আটকের কারণ সম্পর্কে অবগত নয়, সে তার আটক আদেশকে কীভাবে আইনগত প্রশ্ন করবে? স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতিমালা মানে শুধু প্রশ্ন করার অধিকার নয়, সেটার ভিত্তি সমুচিত তথ্য পাওয়ার অধিকারের উপর।
সাধারণ ফৌজদারি বিচারের বিকল্প হিসেবে প্রতিরোধমূলক আটককে বিবেচনা করার প্রবণতা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট বারবার সতর্ক করেছে। ১৯৭৫ সালের ক্ষুদিরাম দাস বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মামলায়, আদালত জানায় যে প্রশাসনের ‘নিজস্ব সন্তুষ্টি’ বৈচারিক পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এবং তাকে প্রাসঙ্গিক বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে।
১৯৮২ সালের এ কে রায় বনাম ভারত সরকারের মামলায় জাতীয় নিরাপত্তা আইনকে সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েও আদালত বলেছিল, প্রতিরোধমূলক আটকের আইনগুলিকে সংকীর্ণতম ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কারণ এই আইনগুলি সরাসরিভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।
পরিশেষে, ২০১১ সালের রেখা বনাম তামিলনাডু সরকারের মামলায় আদালত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সাধারণ ফৌজদারি আইনে যে ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে, সেই ক্ষেত্রগুলিতে প্রতিরোধমূলক আটকের আইন প্রয়োগ করা যাবে না। প্রশাসনিক আটকাদেশ একটি ব্যতিক্রমী সমাধান। এটি ফৌজদারি তদন্ত ও বিচারের যথেচ্ছ বিকল্প হতে পারে না।
ইতিহাস, স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সংস্থান
পশ্চিমবঙ্গের এই বিলের প্রসঙ্গে রেখা মামলায় উত্থাপিত যুক্তিমালার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তোলাবাজি, সংগঠিত হিংসা, জমি-জবরদখল এবং অপরাধমূলক হুমকির মতো যে অপরাধগুলি এই বিলে আলোচিত হয়েছে, তার সবগুলির ক্ষেত্রেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস), অস্ত্র আইন এবং এনডিপিএস (মাদক ও মনোরোগ সংক্রান্ত ওষুধ বিষয়ক জাতীয় আইন)-এর মাধ্যমে সাজাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই সাংবিধানিক প্রশ্নটি উঠবে, কেন তবে একটি অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে— যা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে সাধারণ বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাবার সুযোগ দেবে?
এটি শুধুমাত্র আইন বিষয়ক নয়। এটি একটা সাংবিধানিক প্রশ্ন। অকার্যকর তদন্ত ও শ্লথ বিচার প্রক্রিয়ার ঘাটতি পূরণের উপায় হিসেবে প্রতিরোধমূলক আটক আইনকে কখনওই ভাবা হয়নি। এটি রয়েছে শুধুমাত্র বিরলতম পরিস্থিতির জন্য। যখন সত্যিই সাধারণ ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে জননিরাপত্তা আর সুনিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেসময়ের জন্য। অত্যধিক ক্ষমতা প্রদানের ব্যতিক্রমী এই ব্যবস্থা প্রশাসন পরিচালনার সাধারণ হাতিয়ারে পরিণত হয়ে যাওয়া নিয়ে ইতিহাস বারবার সতর্ক করেছে।
জরুরি অবস্থার সময়ে (১৯৭৫-১৯৭৭) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বহাল আইন বা মিসা আইন রাজনৈতিক বিরোধী, সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন সদস্য এবং নাগরিক আন্দোলন কর্মীদের দমনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বলবৎ করা এই আইন দেখিয়েছে কীভাবে ব্যতিক্রমী আইনি ক্ষমতা পরিণত হয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে। সাম্প্রতিকতম উদাহরণের জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ), বেআইনি কার্যকলাপ (নিরোধক) আইন (ইউএপিএ) এবং রাজ্যে রাজ্যে বলবৎ করা একাধিক প্রতিরোধমূলক আটক আইনগুলি সময়মতো বিচারকে উপেক্ষা করে প্রলম্বিত অন্তরীণের জন্যে ধারাবাহিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে আটকাবস্থাটিকেই সাজার নামান্তর করা হয়েছে।
আইনে কী লেখা হল তাতে নয়। সাংবিধানিক বিপদটি দাঁড়িয়ে আছে এর বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে। বিরলতম পরিস্থিতির জন্য রচনা করা আইন ক্রমে প্রতিদিনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
উৎকন্ঠাটিও শুধুমাত্র ভারতীয় সংবিধানের সাপেক্ষে নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধিমালার প্রেক্ষিতেও। মানবাধিকার বিষয়ক সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৯ নং ধারা এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারপত্র (আইসিসিপিআর) নির্বিচার গ্রেপ্তারি ও আটক নিষিদ্ধ করেছে। যখন প্রতিরোধমূলক আটক জরুরি বিবেচিত হবে, তখনও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দাবি করে— তাকে ব্যতিক্রমী, সুসমঞ্জস এবং তাৎক্ষণিক ও যথাযথ বৈচারিক পর্যালোচনার আওতাধীন হতে হবে। অতএব, পশ্চিমবঙ্গে বিলটি যে প্রশ্নগুলির মুখে দাঁড়াচ্ছে তার তাৎপর্য রাজ্য রাজনীতির সীমা ছাড়িয়েছে। এই বিলকে ভারতের ভিতরে ও বাইরে স্বীকৃত সাংবিধানিক নীতিমালার নিরিখে অনুপুঙ্খ যাচাইয়েরও মুখে পড়তে হবে।
ভীতিপ্রদ প্রভাব
আইনজ্ঞদের মতে এই আইনের সাংবিধানিক বিপদটি হল এর ‘ভীতিপ্রদ প্রভাব’। জনগণের গতিবিধিকে প্রভাবিত করার জন্যে এর বারংবার প্রয়োগের কোনও প্রয়োজন নেই। এর নিছক অস্তিত্বটিই মানুষকে তার সাংবিধানিক স্বাধীনতা প্রয়োগ থেকে নিবৃত্ত করবে। প্রশাসনিক এক্তিয়ার যখন বিস্তৃততর হয়, আইনি সংজ্ঞাগুলি ঘোলাটে হয়ে যায়, তখন সাংবাদিকরাও দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচনে দ্বিধাগ্রস্ত হবেন। ট্রেড ইউনিয়নগুলি শিল্পক্ষেত্রে আন্দোলনে যেতে আরেকবার ভাববে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও দ্বিধাগ্রস্ত হবে। সাধারণ মানুষ ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে দু’বার ভাববেন।
অনেক সময়, স্বাধীনতা ধীরগতিতে হ্রাস পায়— যখন আইনি নিশ্চয়তার জায়গা নেয় অনিশ্চয়তা এবং নাগরিকরাও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার তুলনায় প্রশাসনিক পরিণতির ভয়ে নিজেরাই নিজেদের গুটিয়ে নেয়।
নাটকীয় ধরনের সাংবিধানিক সংকটের তুলনায় এই গতিহ্রাসকে চিহ্নিত করা কঠিনতর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই বদল অনেক সময়ই অনেকটা দীর্ঘায়িত হয়।
সাংবিধানিক বিকল্প
কোনও গণতান্ত্রিক সমাজই সংগঠিত অপরাধ, হিংসা ও অরাজকতা মেনে নিতে পারে না। জনজীবনে শৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্রের যেমন কর্তৃত্ব রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও। একইভাবে, ব্যক্তিস্বাধীনতা শাসন পরিচালনার পথে বাধা নয়, বরং এটিই মূল উদ্দেশ্য এই সত্যটিও সাংবিধানিক গণতন্ত্র স্বীকৃতি দেয়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যেকার সম্পর্ক একটি সহজ সাংবিধানিক আদান-প্রদানের উপর রচিত হয়।
রাষ্ট্র ব্যতিক্রমী ক্ষমতার অধিকারী হয়, সাংবিধানিক সীমার ভিতরে সেটার প্রয়োগ হবে সেই সম্মতির মাধ্যমে। যখন এই সীমা অনিশ্চিত হয়ে যায়, তখনই স্বাধীনতা ও কর্তৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে যায়।
ফলেই যে প্রয়োজনীয় প্রশ্নটি এই প্রস্তাবিত আইনের সূত্রে উঠছে সেটা একপাক্ষিক বা মতাদর্শগতও নয়, এটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক।
প্রশাসনিক শাসনতন্ত্রের সন্দেহগ্রস্ততাকে প্রশ্রয় দিয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে কি কখনও খর্ব করা উচিত? নাকি শুধুমাত্র ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরতার মাধ্যমেই ব্যক্তির স্বাধীনতায় প্রয়োজনে হ্রাস ঘটানো যেতে পারে? ভারতের সংবিধান সুস্পষ্টভাবে দ্বিতীয়টির পক্ষ নিয়েছে।
জনজীবনে শৃঙ্খলা অপরিহার্য। কিন্তু সেটি গণতান্ত্রিক সরকার এবং প্রশাসনিক শাসনতন্ত্রের মধ্যেকার সংবিধান প্রদত্ত পার্থক্যকে দুর্বল করার বিনিময়ে হতে পারে না। একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র তদন্ত করে নিবিড়ভাবে, বিচার করে স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং অভিযোগের প্রমাণ হাজির করে স্বাধীন বিচারালয়ে। সাধারণভাবে কখনোই প্রশাসনিক সন্তুষ্টি বৈচারিক বিবেচনার বিকল্প হয় না।
ফ্যাসিস্ট আইনের নতুন পাঠ দেয় ইতিহাস
বেনিতো মুসোলিনির শাসনে ‘লেগি ফ্যাসিস্টিসম’ (উগ্র-ফ্যাসিবাদী আইন) প্রশাসনিক বিভাগের হাতে মাত্রারিক্ত কর্তৃত্ব তুলে দেয়, রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সংকুচিত করে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সীমিত করে এবং পুলিশের ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে। জার্মানিতে রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডের পর অ্যাডলফ হিটলারের পরামর্শে রাষ্ট্রপতি পল ভন হিন্ডেনবুর্গ রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ডিক্রি জারি করে সমস্ত মৌলিক নাগরিক স্বাধীনতা প্রত্যাহার করে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সীমাহীন ক্ষমতা। ওই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাগুলিকে আজকের দিনের আইনের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা উচিত। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা কতগুলি সাংবিধানিক সংকটের পর্বে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত করে। সরকারসমূহ বারংবার সমূহ বিপদের দোহাই দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতাগ্রহণকে যুক্তিসিদ্ধ করে। এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়।
সেজন্যেই এই বিলকে একটি বিচ্ছিন্ন আইনি প্রস্তাব হিসেবে না দেখে প্রশাসনিক কর্তৃত্বের পরিসীমা সংক্রান্ত বৃহত্তর সাংবিধানিক বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শেষ পর্যন্ত প্রতিটি গণতন্ত্রকেই এই চিরকালীন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: জননিরাপত্তা কি সীমাহীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়, নাকি সাংবিধানিক এমন একটি ব্যবস্থাপনায় প্রাপ্ত হয় যেখানে রাষ্ট্রও আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে।
গণতন্ত্রের শক্তি প্রশাসনিক ক্ষমতার বিস্তৃতিতে নয়, সংযমে। সন্দেহের বশে নাগরিককে কারাগারে নিক্ষেপ করে সরকার ন্যায্যতা লাভ করে না। বরং সযত্নে মনযোগী তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং স্বাধীন বিচারালয়ে সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণের ব্যবস্থার মাধ্যমে। একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের প্রকৃত মানদণ্ড হল নাগরিকদের স্বাধীনতা হরণ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নয়, বরং সেই স্বাধীনতা রক্ষার সদিচ্ছা— এমনকি তা রক্ষা করা যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখনও।
পূর্বে উল্লেখিত রায়গুলি ধারাবাহিকভাবে একটি সাংবিধানিক নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে: যখন সাধারণ ফৌজদারি আইন প্রকৃত অর্থেই অপর্যাপ্ত বলে প্রমাণিত হয়, তখনই, একমাত্র তখনই প্রতিরোধমূলক আটক ব্যবস্থা অনুমতি পেতে পারে। তবে, সেক্ষেত্রেও তা কঠোরতম বিচারব্যবস্থার নজরদারির আওতাধীন থাকতে হবে।
ঋণ: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ১৩-জুলাই-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
