ভেনেজুয়েলায় একতরফা মার্কিন আগ্রাসন

তারোয়া জুনিগা সিলভা, বিজয় প্রসাদ

৩ জানুয়ারির হামলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই যুদ্ধের একটা অংশ যা শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে। চিনুক হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন স্তব্ধ হওয়ার দীর্ঘকাল পরেও চলবে এই যুদ্ধ।

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি, স্থানীয় সময় রাত দুটোর কিছু পরে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদের ২ নম্বর ধারার তোয়াক্কা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বেশ কয়েকটি জায়গায় আক্রমণ শুরু করে। হামলা হয়েছে দেশের রাজধানী কারাকাসেও। বিস্ফোরণের শব্দ ও আলোর ঝলকানিতে জেগে ওঠেন বাসিন্দারা। আকাশে তখন গর্জন করছে বিশাল বিশাল হেলিকপ্টার। এই সব দৃশ্যের ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় উঠে আসতে শুরু করে। যদিও কোথায়, কী হামলা তা ছিল অস্পষ্ট। ফলে সোশাল মিডিয়া সংশয় ও গুজবে ভরে যায়।

এক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশ থেকে আর কোনও শব্দ শোনা যায়নি। সবকিছু চুপচাপ হয়ে যায়। ভোর ৪টে ২১ মিনিট নাগাদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, মার্কিন সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করেছে এবং আটক করেছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মোরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। একটু পরেই, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজ জানান, মাদুরো এবং ফ্লোরেস কোথায় তা জানা যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বনডি পরে জানান, মাদুরো এবং ফ্লোরেস রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তাদের বিরুদ্ধে ‘‌নার্কো–সন্ত্রাসবাদ ষড়যন্ত্র’‌–র অভিযোগ আনা হয়েছে।
 

ভেনেজুয়েলার ওপর এই আগ্রাসনের ফল কী হয়েছে তা অস্পষ্ট। প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পরেও দেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ভেনেজুয়েলার জনগণ স্তম্ভিত। কিন্তু তারা হার মানতে নারাজ। এটা স্পষ্ট নয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফের হামলা চালাবে কিনা। নাকি এই হামলার পর মার্কিন সরকারের ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে কোনও স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ

৩ জানুয়ারির হামলা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রথম হামলা নয়। বস্তুত, ভেনেজুয়েলাকে চাপে রাখার অভিযান শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে যখন হুগো শাভেজের সরকার ১৯৯৯ সালের বলিভারীয় সংবিধানের সার্বভৌম ব্যবস্থা মেনে হাইড্রোকার্বন আইন জারি করে। সেই অভিযানের অনেকগুলি ধারাবাহিক পর্ব ছিল (‌এখানে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করা হল। এটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়)‌:

১। (২০০১) ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি এবং ইউএসএইড–এর ‌মাধ্যমে বলিভারীয় রাজনৈতিক ধারা–বিরোধী সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলিকে আর্থিক মদত।
২। (‌২০০২)‌ ভেনেজুয়েলায় মার্কিন মদতে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা।
৩। (‌২০০২)‌ ইউএসএইড–এর ট্রানজিশন ইনিশিয়েটিভস অফিস তৈরি করে ভেনেজুয়েলা কর্মসূচি।
৪। (‌২০০৩–২০০৪)‌ গণভোটের মাধ্যমে শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে সুমাতের জন্য কাজ করতে রাজনৈতিক নির্দেশ ও অর্থবরাদ্দ (‌নেতৃত্বে ছিলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো)‌।
৫।  (‌২০০৪)‌ ৫ দফা স্ট্র্যাটেজি রচনা— শাভেজের ঘাঁটিতে ‘‌অনুপ্রবেশ’‌ করো, শাভেজের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলনকে ‘‌ভেঙে টুকরো করো’‌, শাভেজকে ‘‌বিচ্ছিন্ন করো’‌ , সুমাতের মতো গোষ্ঠী তৈরি করো এবং ‘‌গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করো।’‌

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

৬। (২০১৫) এগজিকিউটিভ আদেশে সই করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তাতে ঘোষণা করা হল ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠছে ‘অস্বাভাবিক বিপদ’- এর উৎস। এবং সেটাই হয়ে উঠল পরবর্তীকালে জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি।

৭। (২০১৭) মার্কিন আর্থিক বাজারে (ইউ এস ফিনান্সিয়াল মার্কেট) ভেনেজুয়েলাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। অর্থাৎ মার্কিন আর্থিক বাজারে লেনদেনের কোনও সুযোগ পাবে না ভেনেজুয়েলা।

৮। (২০১৮) আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক ও জাহাজ কোম্পানিগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হল যাতে তারা অবৈধভাবে জারি করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বেশি বেশি করে মেনে চলে। সেই সময় ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের সব সঞ্চিত সোনা বাজেয়াপ্ত করে নিল।

৯। (২০১৯) মার্কিন পরিকল্পনা ছিল, জুয়ান গুয়াইদোকে মার্কিন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসাবে নিয়োগ করে তৈরি করো ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকার। এবং সংগঠিত করো একটি অভ্যুত্থান (যা ব্যর্থ হয়েছিল)। ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করো এবং বিদেশে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ দখল করো।

১০। (২০২০) অপারেশন গিডেওনের সাহায্যে মাদুরোকে অপহরণের চেষ্টা (তাঁকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা)। অতিমারির সময়ে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রচার অভিযান চালিয়ে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ তৈরি করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ( ভেনেজুয়েলার নিজস্ব জমা রাখা সম্পদ দিতে অস্বীকার করল আইএমএফ)।

১১।  (২০২৫) নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল মারিয়া  কোরিনা মাচাদোকে। নোবেল কমিটি বলল মাদুরোর প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়া উচিত। 

১২। (২০২৫-২৬) ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে ছোট ছোট নৌকায় হামলা। সাজানো হল নৌবহর যাতে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অবরোধ জারি করা যায় এবং ভেনেজুয়েলার তেলের ট্যাঙ্কার দখল করা হল।

৩ জানুয়ারির হামলা সেই ২০০১ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধেরই অংশ। এবং আকাশে চিনুক হেলিকপ্টারের গর্জন থেমে যাওয়ার অনেক দিন পরও এই যুদ্ধ চলবে।

ঈগল যখন ক্রুদ্ধ

যখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার একতরফা ভাবে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা ২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে হোক কিংবা ২০০১ সালে ও ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে, তখন কোনও শক্তিই তাকে থামাতে পারেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাস্তায় রাস্তায় লক্ষ লক্ষ লোক মিছিল করেছে, দাবি করেছে যুদ্ধ বন্ধ করো, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের সরকার যুদ্ধের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা জারি করেছে, কিন্তু জর্জ বুশের এবং (বুশের সাঙাৎ ব্রিটেনের) টোনি ব্লেয়ারের সরকার তাদের বেআইনি যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। এবারও বৃহৎ শক্তিগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে যুদ্ধ হলে তা সারা বিশ্বকে বিপুলভাবে অস্থির করে তুলবে: ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশগুলির শাসক নেতাদেরও একই অভিমত (ব্রাজিল ও কলম্বিয়া) এবং একই অভিমত চীনের মতো বৃহৎ শক্তিগুলিরও ( চীনের বিশেষ দূত কুইউ শিয়াওকি মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মাদুরোর সঙ্গে দেখা করে গেছেন)। শুধুমাত্র ২০০৩ সালেই গোটা বিশ্ব আমেরিকাকে থামাতে পারেনি এমন নয়, ২০০১ এবং ২০২৬ এর মধ্যেও আমেরিকাকে থামাতে পারেনি। গোটা সময়পর্বে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধটা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেল সম্পদ দখলের যুদ্ধ।


🔍︎ আরও পড়ুন —ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু ২০০১ সালে , ট্রাম্পের আগ্রাসনে ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলার ওপর আক্রমণ এমন সময়ে হল যখন ৪ জানুয়ারি ট্রাম্প মার্কিন হাউস অফ কংগ্রেসের সামনে দাঁড়াতে পারবেন এবং তিনি তাঁর বার্ষিক ভাষণ দেবেন। এবং সেখানে দাবি করবেন যে তিনি বিরাট বিজয় অর্জন করেছেন। এটা কোনও বিজয় নয়। এটা একতরফাবাদের আরও একটা উদাহরণ যা বিশ্বের পরিস্থিতির কোনও উন্নতি ঘটাবে না। ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেআইনি যুদ্ধ শেষ হয়েছিল তখনই যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছিল সেদেশে থেকে সরে আসতে। তার আগে একটা নির্মম দশক জুড়ে সেখানে ১০ লক্ষাধিক সাধারণ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছে লিবিয়া ও আফগানিস্তানে —মার্কিন ঈগল এই দুই দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে।


কারাকাসের রাস্তায় উদ্বিগ্ন মাদুরোর সমর্থকেরা 

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বোমাবর্ষণ চালিয়ে যায় এবং সেদেশে সেনা পাঠায়, তাহলে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অন্যরকম হবে তেমন ভাবাটা অসম্ভব। এধরনের ‘জমানা বদলের যুদ্ধ’ থেকে কখনই ভাল কিছু হয় না। কেন ব্রাজিল ও কলম্বিয়া এই হামলার পর অস্বস্তিতে রয়েছে তা বোঝা যায়। কারণ তারা জানে এই আগ্রাসনের ফল হবে দক্ষিণ আমেরিকার সমগ্র উত্তরার্ধ জুড়ে দীর্ঘকালীন অস্থিরতা। আবার এর জেরে সমগ্র লাতিন আমেরিকাতেও একই ধরনের অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আফ্রিকার উত্তরার্ধে ঠিক এমনটাই ঘটেছে (নাইজিরিয়ায় ট্রাম্পের বোমা হামলা ২০১১ সালে লিবিয়ায় বোমাবর্ষণের ধ্বংসযজ্ঞের ওপর ধ্বংসের আরও একটা পরত।)

মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্প দারুন সংবর্ধনা পাবেন। তবে ভেনেজুয়েলায় হামলায় নিহত শত শত সাধারণ নাগরিককে ইতিমধ্যেই তার জন্য মূল্য চোকাতে হয়েছে। মূল্য চোকাতে হবে আরও লক্ষ লক্ষ লোককে যারা এই দীর্ঘকালীন মিশ্র যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকতে চাইছে। এই যুদ্ধ গত দু দশক ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস 
শিরোনাম মার্কসবাদী পথ-এর

🔍︎ আরও পড়ুন —সঙ্ঘাতের নতুন পটভূমি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বনাম একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা দেশ, শান্তির নোবেল ট্রাম্পের ঘরেই!


প্রকাশের তারিখ: ০৪-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org