সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শান্তির নোবেল ট্রাম্পের ঘরেই!
শান্তনু দে
সেকারণে মাচাদো যখন ঘোষণা করেন, ‘ভেনেজুয়েলার সংগ্রাম হলো ইজরায়েলের সংগ্রাম’, তখন আসলেই তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার প্রকৃত সংগ্রামকে আড়াল করতে চান। ভেনেজুয়েলা আজও সব অর্থেই রয়েছে প্যালেস্তাইনের সঙ্গে। আর নোবেল কমিটি যখন মাচাদোকে শান্তি পুরস্কার দেয়, তখন আসলেই চরম অবজ্ঞায় অস্বীকার করে নেতানিয়াহুর বেপরোয়া গণহত্যাকে।

৮-৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। মাদ্রিদ। প্যাট্রিয়ট ফর ইউরোপ ব্যানারের ডাকে শহরের অডিটোরিয়াম হোটেলে মিলিত হয়েছে ইউরোপীয় সংসদের উগ্র দক্ষিণপন্থী ব্লক। ৭২০-সদস্যের ইউরোপীয় সংসদের ৮৬ জন সাংসদ। কুড়ি দিনও হয়নি ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের জন্য হোয়াইট হাউসে। বিশ্বজুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থার সহজাত উচ্ছ্বাস। প্যাট্রিয়টের আয়োজক স্পেনের উগ্র দক্ষিণপন্থী নব্য ফ্র্যাঙ্কোবাদী দল ভক্স পার্টি। কে নেই সেখানে? ফ্রান্সের নব্য-ফ্যাসিবাদী দল ন্যাশনাল র্যালির লি পেন থেকে জার্মানির উগ্র দক্ষিণপন্থী দল নয়া নাৎসি অলটারনেটিভ ফর জার্মানি। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান থেকে অস্ট্রিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, গ্রিস, ইতালির মতো দেশগুলির সমস্ত উগ্র দক্ষিণপন্থী দল।
দু’দিনের মাদ্রিদ-বৈঠক থেকে আসে দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি: ‘আমরাই ভবিষ্যৎ’! সকলেই সগর্বে ট্রাম্পকে ‘পরম বন্ধু’ বলে ঘোষণা করেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতির স্লোগান মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (আসলে, মেক আমেরিকান ইম্পিরিয়ালিজম গ্রেট এগেইন) ধার করে বলেন, মেক ইউরোপ গ্রেট এগেইন! একধাপ এগিয়ে অরবান বলেন, ‘মাত্র কয়েক-সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প-টর্নেডো বদলে দিয়েছে গোট বিশ্বকে। এখন আমরাই মূলস্রোত।’ যেমন তার ক’দিন বাদেই মার্কিনমুলুকে নয়া-ফ্যাসিবাদী মহাসম্মেলন কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশান কনফারেন্স (সিপ্যাক)-এ মুসোলিনির উত্তরসূরী ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘দেশে দেশে আমাদের জয়জয়াকার শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমেরিকায় আমরা সফল হয়েছি... ট্রাম্পের জয়ে সবাই ভয়ে কাঁপছে। আরও বিভিন্ন দেশ থেকেও অচিরেই সুখবর আসতে চলেছে।’
এ’সবই স্বাভাবিক। দস্তুর। নজরকাড়ার মতো বিষয় হলো মাদ্রিদ-বৈঠকে আমন্ত্রিত ছিলেন ইউরোপের বাইরের তিনটি দলের প্রতিনিধি। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি, আর্জেন্টিনার উগ্র দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি হাভিয়ের মিলেই এবং ভেনেজুয়েলার উগ্র দক্ষিণপন্থী দল ভেন্তে ভেনেজুয়েলা-র নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো।
এক ভিডিও-বার্তায় মাচাদো তাঁর ইউরোপীয় মিত্রদের ভেনেজুয়েলায় একটি সুশৃঙ্খল পরিবর্তন আনার জন্য তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা আজ আমাদের মহাদেশে পশ্চিমীদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এটি একটি সংগঠিত অপরাধের কেন্দ্রস্থল এবং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের শত্রুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আমরা এই জমানাকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেব’ (লা জর্নাদা, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)।
শুক্রবার ভারতীয় সময় দুপুর আড়াইটের সময় সমস্ত জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে নোবেল কমিটি জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন ভেনেজুয়েলার এই বিরোধী নেত্রী, মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্জেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেসের দাবি, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল এক কালে দ্বিধাবিভক্ত ছিল। তাদের একত্রিত করার কৃতিত্ব মারিয়ার। বিরোধীদলগুলিকে একত্রিত করে অবাধ নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের দাবি তুলে ধরেছেন তিনি।আর মাচাদো কী করেছেন? ভেনেজুয়েলার ‘লড়াইয়ে সর্বোত ভাবে সাহায্য করার জন্য’ নোবেল পুরস্কার উৎসর্গ করেছেন ট্রাম্পকে।
কাকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে নোবেল দেওয়া হয়েছে? যিনি ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে।
শুধু তাই নয়, ২০২০ সালের ২১ জুলাই মাচাদোর দল ভেন্তে ভেনেজুয়েলা আনুষ্ঠানিকভাবে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির সঙ্গে চুক্তি সই করে। চুক্তিপত্রের বয়ানে স্পষ্ট বলা হয়: ‘রাজনৈতিক, মতাদর্শগত এবং সামাজিক বিষয়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা দুই দল যেমন একটি জোট গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনই স্ট্র্যাটেজিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে সহযোগিতা করার প্রশ্নে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ, যাতে তৈরি করা যায় একটি কার্যকরী অংশীদারিত্ব।’ সেইসঙ্গে যোগ করা হয়, ‘লক্ষ্য হল ইজরায়েলের জনগণকে ভেনেজুয়েলার জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা।’
গাজায় ইজরায়েলি গণহত্যার প্রতিবাদে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তেল আভিভের সঙ্গে সমস্ত রকম কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে কারাকাস। উগো সাভেজ তখন রাষ্ট্রপতি। তার আগেই ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে কারকাস থেকে বহিস্কার করেন সাভেজ। এবছর জানুয়ারিতে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ এবং মাচাদো এক টেলিকনফারেন্স করেন ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রী গিদিওন সায়ারের সঙ্গে। ১৫ ফেব্রুয়ারি গঞ্জালেজ এবং সায়ার দেখা করেন জার্মানিতে, যেখানে গঞ্জালেজ ইজরায়েল ভ্রমণে তাঁর আগ্রহের কথা ঘোষণা করেন।
ভেনেজুয়েলায় ২০০২ সালের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করেছিলেন মাচাদো, যা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতিকে সাময়িকভাবে উৎখাত করেছিল। সই করেছিলেন কারমোনা ডিক্রিতে, যা সংবিধানকে পুরোপুরি মুছে ফেলে। এবং রাতারাতি প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেয়। তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কারাকাসের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলাকে ‘মুক্ত’ করার জন্য বিদেশী সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি করেছেন। ট্রাম্পের আক্রমণের হুমকি এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প যখন যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন, মাচাদো তখন তার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন, ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে বন্ধক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জেরুজালেমে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস পুনরায় চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন তিনি দেশের তেল, জল এবং পরিকাঠামোকে তুলে দিতে চান বেসরকারি কর্পোরেশনের হাতে। সেই একই কায়দা, যা ১৯৯০-এর দশকে লাতিন আমেরিকাকে নয়া উদারনীতির পরীক্ষাগারে পরিণত করেছিল।
সেকারণে মাচাদো যখন ঘোষণা করেন, ‘ভেনেজুয়েলার সংগ্রাম হলো ইজরায়েলের সংগ্রাম’, তখন আসলেই তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার প্রকৃত সংগ্রামকে আড়াল করতে চান। ভেনেজুয়েলা আজও সব অর্থেই রয়েছে প্যালেস্তাইনের সঙ্গে। আর নোবেল কমিটি যখন মাচাদোকে শান্তি পুরস্কার দেয়, তখন আসলেই চরম অবজ্ঞায় অস্বীকার করে নেতানিয়াহুর বেপরোয়া গণহত্যাকে।
দু’বছরে যে গণহত্যার বলি শুধু সরকারি হিসেবেই অন্তত ৬৭,০০০ জন প্যালেস্তিনীয়। প্রতি ৩৩-জনে একজন! অথবা প্রাক্-আগ্রাসন জনসংখ্যার ৩ শতাংশ। অন্তত ২০,০০০ শিশুর মৃত্যু। গত ২৪-মাসে প্রতি ঘণ্টায় একটি শিশুর মৃত্যু! জখমের সংখ্যা ১,৬৯,০০০! প্রতি ১৪ জনে একজন! দ্য ল্যানসেট-এর (জুলাই, ২০২৪) গবেষণা বলছে, সরাসরি আঘাতের কারণে সরকারি হিসাবে মৃত্যুর যে সংখ্যা বলা হয়, তা আসলে মোট প্রাণহানির মাত্র ২০ শতাংশ! মানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৩,৩৫,০০০। দিনে ৪৫০ জন! এই সময়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ১২৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক! নিহত ১,৭২২ জন স্বাস্থ্যকর্মী। গাজার জল, নিকাশী ব্যবস্থার ৮৯ শতাংশ আজ ক্ষতিগ্রস্ত! ৯২ শতাংশ আবাসিক বাড়ি মিশে গিয়েছে মাটির সঙ্গে। ১০,৮০০ প্যালেস্তিনীয় বন্দি রয়েছেন ইজরায়েলের জেলে। হত্যা করা হয়েছে ৩০০ জন সাংবাদিক-সংবাদকর্মীকে। এরমধ্যে শুধু আল-জাজিরা-র ১০ জন (আল-জাজিরা)।
এ যেন শান্তির সঙ্গে এক কৌতুক! বরং বলা ভালো, শান্তিকে নিয়ে এক নির্মম তামাশা! মাচাদো আসলেই কারাকাসের জমানা-বদলে ওয়াশিংটনের হাতিয়ার। একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বেসরকারিকরণ, বিদেশী হস্তক্ষেপের একজন ঝকঝকে মুখপাত্র!
প্রকৃত অর্থেই মাচাদো ফ্যাসিবাদ, জায়নবাদ এবং নয়া উদারবাদের বিশ্বায়িত জোটের অংশ। যদি হেনরি কিসিঞ্জার নোবেল পেতে পারেন, তবে মাচাদো নয় কেন! আগামী বছর হয়তো পেতে পারেন নেতানিয়াহু!
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ১১-অক্টোবর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
