সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ফকল্যান্ড, আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড
টিম মার্কসবাদী পথ
কোনও ফুটবল টিমকে হারানো নয়, এটি ছিল একটি দেশকে হারানো। যদিও ম্যাচের আগে আমরা বার বলেছিলাম, মালভিনাস যুদ্ধের সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে আমরা বেশ উপলব্ধি করছিলাম যে ওরা আমাদের বাচ্চাদের কী নির্মমভাবে মেরেছে এই যুদ্ধে। এটা ছিল আমাদের প্রতিশোধ। এটা ছিল মালভিনাসের একটি অংশের পুনরুদ্ধার। আমরা যুদ্ধের সঙ্গে ফুটবলকে মিশিয়ে না দেওয়ার কথা যেটা বলেছিলাম, সেটা মিথ্যে। পুরোপুরি মিথ্যে।

লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস। মালভিনাস, আর্জেন্টিনার।
দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসাগরে আর্জেন্টিনা উপকূল থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ কিলোমিটার দূরে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আজ, এই একুশ শতকেও ব্রিটিশদের দখলদারিতে!
ফকল্যান্ড— লাতিন আমেরিকার কাছে মালভিনাস নামে পরিচিত।
গোটা আর্জেন্টিনা আজও ফকল্যান্ড-কে তার সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে এই দ্বীপগুলি তাদের ভূখণ্ডের অংশ। স্বাভাবিক। ফকল্যান্ডের অধিকারের দাবিতে তারা সরব।
২০১৪, স্লোভেনিয়ার সাথে প্রীতি ম্যাচে টিম আর্জেন্টিনা
বিপরীতে, ফকল্যান্ড থেকে ২২০ কিলোমিটার উত্তরে ‘সি লিয়ন’ নামে একটি তেলক্ষেত্রের খননের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। অনুমান, ২০২৮ সালের মার্চ থেকে তেল উত্তোলন শুরু হয়ে যাবে। আর ২০৩২ নাগাদ দৈনিক সর্বোচ্চ ৫০,০০০ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে পারবে। প্রকল্পের মূল মালিক ইজরায়েলি সংস্থা নাভিটাস পেট্রোলিয়াম। সঙ্গে রয়েছে ব্রিটিশ রকহোপার। তাদের হিসেবে, প্রকল্প থেকে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ কর ও রয়্যালটি পাওয়া যাবে, তা দ্বীপের প্রায় ৩,৫০০ বাসিন্দার প্রত্যেকের জন্য বছরে প্রায় ৮০,০০০ পাউন্ডের সমান। নাভিটাসের হিসেব, এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক সরকারি আয়— যার বড় অংশই আসবে কর্পোরেট কর ও রয়্যালটি থেকে— ২০৩৪-এ তা পৌঁছবে সর্বোচ্চ ২৮ কোটি পাউন্ডে। আর যদি তা ঘটে, তবে ফকল্যান্ড তেল ও গ্যাস থেকে ব্রিটেনের চেয়েও বেশি বার্ষিক আয় করবে। কারণ ব্রিটেনের এই খাত থেকে আয় ২০৩১-এ কমে ১০ কোটি পাউন্ডে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে (ফিনান্সিয়াল টাইমস, ২ জুলাই, ২০২৬)।
আজ থেকে ২০০ বছর আগে ফকল্যান্ডে উড়েছিল আর্জেন্টিনার পতাকা। ১৮৩৩, ব্রিটেন এই দ্বীপপুঞ্জর দখল নেয়। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৮২-তে কড়া পদক্ষেপ নেয় বুয়েনস আয়ার্স। আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জমানার নির্দেশে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে আর্জেন্টাইন সেনা। এর জবাবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দক্ষিণ অতলান্তিকে পাঠান যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও সেনা। টানা ৭৪ দিন যুদ্ধ চলে। অবশেষে আত্মসমর্পণ করে আর্জেন্টিনা। এরপর ফকল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে যায় ব্রিটেনের হাতে। ভয়াবহ এই যুদ্ধে প্রায় ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সৈন্যর মৃত্যু হয়।
১৯৮২, ফকল্যান্ডের অভিমুখে ব্রিটিশ রণতরী।
সেদিন ব্রিটিশ সাবমেরিনের আক্রমণে আর্জেন্টিনার রণতরী জেনারেল বেলগ্রানো যখন ৩২০ জন নাবিককে নিয়ে ডুবছে, তখন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে রুপার্ট মার্ডকের সান পত্রিকা। প্রথম পাতায় শিরোনাম ছিল: ‘গাঁচা’। জাহান্নামে যাক! অথচ, বেলগ্রানোর ওপর এই আঘাত ছিল স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ। কারণ, জাহাজটি ফকল্যান্ডের জলসীমায় ছিল না। ছিল রণক্ষেত্রের অনেক বাইরে। এটাই কর্পোরেট মিডিয়া। যুদ্ধের ফেরিওয়ালা! আর্জেন্টিনায় তখন সামরিক জুন্টার জমানা। বুয়েনস আয়ার্সে সামরিক জুন্টার প্রতি তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ফকল্যান্ডে আর্জেন্টিনার সার্বভৌম অধিকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান ফিদেল কাস্ত্রো। সামরিক সহায়তারও প্রস্তাব দেন।
বিরাশিতে মারাদোনা একুশ। জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ। লালকার্ড। ইতালি, ব্রাজিলের কাছে হেরে দ্বিতীয় রাউন্ডেই আর্জেন্টিনার বিদায়। কোচ সিজার মেনোত্তি। আর্জেন্টিনার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। মেসির তখন জন্মই হয়নি।
চারবছর বাদে, মেক্সিকোয় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি দুই দল। দু’ গোল করে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে দেওয়ার পর দিয়েগো মারাদোনার প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ এই জয়।’
পরে আত্মজীবনী এল দিয়েগো-তে অকপটে বলেছেন: ‘কোনও ফুটবল টিমকে হারানো নয়, এটি ছিল একটি দেশকে হারানো। যদিও ম্যাচের আগে আমরা বার বলেছিলাম, মালভিনাস যুদ্ধের সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক নেই, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে আমরা বেশ উপলব্ধি করছিলাম যে ওরা আমাদের বাচ্চাদের কী নির্মমভাবে মেরেছে এই যুদ্ধে। এটা ছিল আমাদের প্রতিশোধ। এটা ছিল মালভিনাসের একটি অংশের পুনরুদ্ধার। আমরা যুদ্ধের সঙ্গে ফুটবলকে মিশিয়ে না দেওয়ার কথা যেটা বলেছিলাম, সেটা মিথ্যে। পুরোপুরি মিথ্যে। ঘটনা হলো, আমরা এটা ছাড়া আর কোনও কিছু ভাবিনি। আর এটা কোনওভাবেই একটা সাধারণ ফুটবল ম্যাচ ছিল না।’
এবারে আবার বিশ্বাকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি দু’টি দল।
🔍 আরও পড়ুন: কাবো ভার্দে, ফিদেল এবং চে
‘এটা স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ।’ বলেছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। যোগ করেছেন, ‘তাই আমি একে ফুটবল ম্যাচ হিসাবেই দেখতে চাই। আমার অন্তত এটাই বলার। এটা একটা ফুটবল ম্যাচ এবং আমরা একটা কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে নামব। ওদের অসাধারণ একজন কোচ রয়েছেন, যিনি খেলাটা ভাল বুঝতে পারেন। এটুকুই আমার বলার।’
ঠিক যেমন ছিয়াশিতে ম্যাচের আগে বলেছিল টিম-আর্জেন্টিনা।
একজন কোচ হিসেবে স্কালোনির কথাই ঠিক— মাঠের লড়াই আসলে কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচের। তবে একথাও সত্য, আর্জেন্টিনীয়দের কাছে কিছু ঘটনা খেলার ফলাফলের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক গভীরে। বিশ্বকাপ এমন সব আবেগ, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়কে জাগিয়ে তোলে— যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে যখন সামনে চলে আসে ইংল্যান্ড, তখন ফুটবল ও যুদ্ধকে এক করে দেখা ঠিক না হলেও— সমষ্টির স্মৃতিতে অনিবার্যভাবেই ভেসে ওঠে ইতিহাস থেকে বর্তমান। হৃদয় তখন চালিত করে মস্তিস্ককে। যুক্তিবোধকে ছাপিয়ে যায় আবেগ।
স্কালোনি নিজেই সাত বছরের একটি কিশোরের কথা মনে করিয়েছেন— যে একরত্তি ছেলেটি সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে মেসি, জাতীয় দল, বিশ্বকাপের সঙ্গে ফকল্যান্ডের কথাও বলেছে। এই ঘটনা তুলে ধরেছে একটি গভীর সত্যকে: খুব কম বিষয়েই আর্জেন্টিনার সমগ্র সমাজ— বয়স, মতাদর্শ, সামাজিক শ্রেণি বা দলীয় ফুটবলের প্রতি সমর্থন নির্বিশেষে— সবার মনে সমানভাবে সাড়া জাগাতে পারে— সবাইকে এক করে দেয়। জাতীয় দল এবং ফকল্যান্ড ইস্যু— সম্ভবত এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল দুটি বিষয়। বিশ্বকাপের সময় রিভার প্লেট, বোকা জুনিয়র্স, রেসিং ক্লাব, ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে, সান লরেঞ্জো-সহ অন্যান্য সব ক্লাবের জার্সি কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখা হয়। তখন আর্জেন্টিনার পতাকার আকাশনীল ও দুধসাদা রঙই হয়ে ওঠে একমাত্র রঙ। আবার প্রতি বছর ২ এপ্রিলও দেখা যায় অনেকটা একই দৃশ্য। সেদিন ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতিতে সকলে একত্রিত হন— যারা যুদ্ধ করেছিলেন তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে— একইসঙ্গে উঠে আসে সার্বভৌমত্বের অমোঘ দাবি, যা আজও অটুট ও প্রশ্নাতীত।
ছিয়াশির বিশ্বকাপে ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’— চার মিনিটের ব্যবধানে দু’টি গোলে ম্যাচের রং বদলে দিয়েছিলেন মারাদোনা। আর্জেন্টিনীয়দের কাছে এই দু’টি মুহূর্ত ছিল আনন্দের এক বিশাল গর্জন। ঠিকই, এটি যুদ্ধের কোনও প্রতিশোধ ছিল না— কোনও খেলায় জয় যুদ্ধের বিপুল ক্ষয়ক্ষতিকে পুষিয়ে দিতে পারে না। ফিরিয়ে আনতে পারে না হারানো প্রাণ। কিংবা মুছে ফেলতে পারে না সেই নিদারুন যন্ত্রণা। তবে সবার হৃদয়ের গভীরে ছিল একটি ছোটখাটো, প্রতীকি প্রতিশোধ।
এবং আজও আর্জেন্টিনাকে এক করে দেয় ফকল্যান্ড যুদ্ধ আর টিম-আর্জেন্টিনা। সব ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক সারিতে। একটি যৌথ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নিজেদের চিনতে শেখায়। মনে করিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা এখনও একই সম্প্রদায়ের অংশ।
কারণ, আবেগ, ফুটবল আর ফকল্যান্ড— এসবই ঐক্যবদ্ধ করে আর্জেন্টিনাকে।
প্রকাশের তারিখ: ১৫-জুলাই-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
