সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অস্ট্রিয়ায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন কমিউনিস্টরা
রবিকর গুপ্ত
সাম্প্রতিক সময়ে গত ২৮-শে জুন গ্রাজের স্থানীয় নির্বাচনে ৩৫.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন কমিউনিস্টরা। প্রায় ৭ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে কমিউনিস্টরা আবার ফিরেছেন ক্ষমতায়।

বিংশ শতকে মার্কসবাদের তাত্ত্বিক চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ভিত্তিতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির যদি একটি তালিকা করা হয়, তাহলে তার প্রথমদিকেই থাকবে অস্ট্রিয়ার নাম। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ঐ একই তালিকা যদি বিংশ শতকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের শক্তি ও প্রভাবের নিরিখে করা হয়, তাহলে অস্ট্রিয়ার নাম থাকবে তালিকার নিচের দিকে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, ব্যাপারটা আশ্চর্য নয়, বরং ইতিহাস ঘাঁটলে স্বাভাবিকই মনে হবে। ফ্রান্স, জার্মানি অথবা ইতালির মতো অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (Kommunistische Partei Österreichs, KPÖ) কখনও গণপার্টি হয়ে ওঠেনি। এই আন্দোলন যে হারে প্রথম শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর জন্ম দিয়েছে, সেই হারে মাটি থেকে উঠে আসা দক্ষ সংগঠক ও কর্মীর জন্ম দিতে পারেনি। তাই তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হয়েও তাকে প্রয়োগের দিক থেকে দুর্বল হয়ে থাকতে হয়েছে। এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে অস্ট্রিয়ার সোশ্যালিস্ট পার্টির (Sozialistische Partei Österreichs, SPÖ) উপস্থিতির কথা। জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মতো অস্ট্রিয়ার সোশ্যালিস্ট পার্টি (বর্তমানে অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা Sozialdemokratische Partei Österreichs) তার মার্কসবাদী ঐতিহ্য থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পুরোপুরি মুখ ঘুরিয়ে নেয়নি। ম্যাক্স অ্যাডলার, কার্ল রেনারের মতো ব্যক্তিত্ব অস্ট্রিয়ার মূল ধারার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতি থেকে মার্কসকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাসিত না-করার কারণে কমিউনিস্টরা এখানে অন্যান্য দেশের মতো সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ছেড়ে যাওয়া পরিসরে নিজেদের রাজনীতি খাড়া করার সুযোগ পাননি। সাফল্য না-আসার পেছনে অবদান রয়েছে অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট রাজনীতির বিখ্যাত (কুখ্যাতই বলা উচিত) গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের প্রবণতারও, যা বারে বারে তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করেছে।
তবে এ সব কিছু আলোচনার পরেও স্মরণে রাখতে হবে তত্ত্বের পাশাপাশি প্রয়োগেও সীমিত শক্তি নিয়েই অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্টরা অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছেন বারে বারে। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ডলফুসের অস্ট্রো-ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলতে অগ্রগণ্য ভূমিকা তাঁদেরই ছিল। যে ইউরোপীয় কমিউনিস্ট দলগুলি ফ্যাসিবাদের অভিনব বিপদ সবার আগে উপলব্ধি করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করতে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট-সহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গে একটি যুক্তফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তার তত্ত্বায়নে তাঁরাই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহন করেন। এই প্রসঙ্গে কমিন্টার্নকে তার ষষ্ঠ কংগ্রেসের নীতি পরিবর্তন করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন তাঁরা। ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অস্ট্রো-ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানে অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাঁরা রাস্তায় গড়ে তোলেন ব্যারিকেড। হিটলারের বাহিনী পরবর্তী সময়ে অস্ট্রিয়া দখল করলে নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল তাঁদের। তিরিশ ও চল্লিশের দশকে প্রথমে দেশীয় অস্ট্রো-ফ্যাসিবাদী ও পরে জার্মান নাৎসি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ নির্মাণে কমিউনিস্টরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁদের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থনের ঢেউ তৈরি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চ্যান্সেলার কার্ল রেনারের নেতৃত্বে যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে ভাইস-চ্যান্সেলার ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান জোহান কোপলেনিগ। এছাড়াও এই সরকারে ৭ জন কমিউনিস্ট মন্ত্রী ছিলেন, বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গৃহমন্ত্রী ফ্রাঞ্জ হোনার ও শিক্ষামন্ত্রী এর্নস্ট ফিশার। কিন্তু এই প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। ঠাণ্ডা যুদ্ধ ক্রমশ তেতে উঠতেই অস্ট্রিয়ার সরকারের উপর মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অস্ট্রিয়া নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। মস্কোর আশঙ্কা ছিল এই দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে বেশি সমর্থন করলে খাতায় কলমে নিরপেক্ষ অস্ট্রিয়া NATO-তে প্রবেশ করতে পারে। তাই অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ লাভ করেনি। এর একটি উদাহরণ হল ১৯৫০ সালের ধর্মঘট। সরকারের ব্যয়সংকোচ নীতি-সহ আরও বেশ কয়কটি জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদ করে অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি তখন সরকারের বাইরে। তারা এই সমস্ত নীতি প্রত্যাহারের দাবি নিয়ে একটি সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়, যাতে দেশব্যাপী অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া পাওয়া যায়। ভীত ও সন্ত্রস্ত পশ্চিমী শক্তিগুলি অস্ট্রিয়ার সরকারকে সর্বপ্রকার সাহায্য করে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, যাদের সেই মুহূর্তে অস্ট্রিয়ায় সেনা অবধি মোতায়েন ছিল, তারা মৌখিক ভাবে সমর্থন করা ছাড়া অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্টদের আর বিশেষ কোনও সাহায্য করেনি। পূর্বতন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণই ছিল এই সাহায্যে অনিহার প্রধান কারণ।
১৯৫৫ সালে অস্ট্রিয়া থেকে সকল মিত্র শক্তির সৈন্য প্রত্যাহার এবং অস্ট্রিয়াকে একটি নিরপেক্ষ দেশ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এরপর থেকে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের গুরুত্ব কমতে থাকে। অস্ট্রিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতি ক্রমশ দক্ষিণপন্থী অভিমুখে সরে যায়। তারা অস্ট্রিয়ান পিপলস্ পার্টির (Österreichische Volkspartei, ÖVP) খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোট সরকার গঠন করে। এই জোট ও বোঝাপড়ার সমীকরণ এরপর অস্ট্রিয়ার রাজনীতি প্রায় সাত দশক নিয়ন্ত্রণ করেছিল। নতুন এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের রাজনীতির পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এল। হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ অথবা ইউরো-কমিউনিজম্ বনাম সোভিয়েত কমিউনিজম নিয়ে দলের মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিতর্ক পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে তুলল। জাতীয় রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার পর প্রথমে প্রাদেশিক রাজনীতিতে এবং অবশেষে একেবারে স্থানীয় রাজনীতিতেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্টরা। ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় দেড় লক্ষ সদস্যসংখ্যা ১৯৭০-এ কমে দাঁড়ায় কয়েক হাজারে। ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হল, তখন অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলন ধুঁকছে। ইতালি বা ব্রিটেনের মতো এখানেও এই সময়ে একটি প্রচেষ্টা হয় কমিউনিস্ট পার্টিই তুলে দিতে। ওয়াল্টার সিল্বারমায়ার এবং সুজান শোহন্-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি কমিউনিস্ট প্রকল্প ত্যাগ করে একটি ‘আধুনিক’ ইউরোপীয় বাম দল হিসেবে পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টা করে। কিন্তু কর্মী সমর্থকদের প্রবল প্রতিবাদে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। দুই চেয়ারপার্সনই পদত্যাগ করলেও অভ্যন্তরীণ সংঘাত থেকেই গেল। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন ওয়াল্টার বেয়ারের হাতে। তিনিও সিল্বারমেয়ার ও শোহনের পথের চলতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু দলের মধ্যে পদে পদে কর্মী সমর্থকদের থেকে তিনি বাধার সম্মুখীন হলেন। অবশেষে ২০০৬ সালে ওয়াল্টার পদত্যাগ করলে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মির্কো মেসনার এবং মেলিনা ক্লাউস। কর্মী-সমর্থকদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা সচেষ্ট হলেন কমিউনিস্ট পরিচিতি বিসর্জন না-দিয়েই দলের আধুনিকীকরণ করতে।
মেসনার এবং ক্লাউস যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তার মূল কথা হল আগে স্থানীয় রাজনীতি, তার পর প্রদেশ এবং তারপর জাতীয়। অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে এবং সব থেকে বেশি সময় ব্যয় করবে স্থানীয় রাজনীতিতে। স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সফল আন্দোলনের মাধ্যমে যদি দলের প্রাসঙ্গিকতা ও জনতার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মিত হয়, তাহলে তাকে কাজে লাগিয়ে প্রদেশ স্তরে দলের প্রাসঙ্গিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে। সেখানে যখন সাফল্য আসবে,একমাত্র তখনই জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধি সম্ভব হবে।
নতুন এই রাজনৈতিক অভিমুখে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম পরীক্ষাগার ছিল স্টিরিয়া প্রদেশের গ্রাজ শহর।
স্টিরিয়া অস্ট্রিয়ান কমিউনিস্টদের একদা অন্যতম ঘাঁটি ছিল। এখানে ৭০-এর দশক অবধিও প্রাদেশিক রাজনীতিতে কমিউনিস্টরা প্রভাব রাখত। স্টিরিয়ার রাজধানী গ্রাজ, অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। তাই এখানে স্থানীয় বিজয় নিছক আঞ্চলিক বিজয় থাকবে না, এই উপলব্ধিও অঞ্চলটি বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করছিল। প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণের কাজ শুরু হয় মধ্য ৯০-এর দশকে স্থানীয় কমিউনিস্ট নেতা এর্নস্ট কাল্টেনেগারের উদ্যোগে। তিনি স্থানীয় বাসযোগ্য সুলভ গৃহের সংকটের সমস্যাকে সামনে রেখে শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এর ফলে গ্রাজ শহরে কমিউনিস্ট প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বৃদ্ধি পায় কমিউনিস্ট কাউন্সিলারদের সংখ্যাও।
২০০৪-০৫ থেকে জাতীয় স্তরের পার্টি রণকৌশল পরিবর্তন করলে গ্রাজের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। ২০০৫ সালের স্থানীয় নির্বাচনে কমিউনিস্টরা গ্রাজে ২০.৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকায় উঠে আসে। কমিউনিস্টদের প্রচেষ্টায় আইন করে গ্রাজে বাড়ি ভাড়া বেঁধে দেওয়া হয়। স্থির হয় ভাড়া ভাড়াটের উপার্জনের এক তৃতীয়াংশ কোনওভাবেই অতিক্রম করবে না। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে গৃহ নির্মাণ প্রকল্পে জোর দেওয়া হয়। কমিউনিস্ট প্রচেষ্টায় প্রত্যেক সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হাউজিং ইউনিটে বাথরুম বাধ্যতামূলক করা হয়। এই সময় গ্রাজে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও রক্ষণশীল খ্রিস্টান পিপলস পার্টি উভয়েই সরকারি উদ্যোগে গৃহনির্মাণের প্রকল্প বন্ধ করে দিতে আগ্রহী ছিল। এই সিদ্ধান্ত পাশ হওয়ার আগেই কমিউনিস্টরা ১০,০০০ সই সংগ্রহ করে বিষয়টি গণভোটের আওতায় নিয়ে আসে। গণভোটে প্রায় ৯৬% গ্রাজবাসী সরকারি উদ্যোগে গৃহনির্মাণ অব্যাহত থাকার পক্ষে মত দান করে। এই বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের জনসমর্থন ও বৃহত্তর বিশ্বাসযোগ্যতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করে। কমিউনিস্ট কাউন্সিলারদের নিজেদের আয় ও ব্যায়ের হিসেব প্রতি বছর নিয়ম করে জনতার সামনে প্রদর্শন এবং শিল্প মজুরির সঙ্গে নিজেদের বেতনকে বেঁধে রেখে অতিরিক্ত বেতন বিবিধ সামাজিক প্রকল্পে দানের রীতিও জনমানসে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি প্রভাব ফেলেছিল। ২০২১ সালের ২৬-শে সেপ্টেম্বর স্থানীয় নির্বাচন হলে দেখা যায় প্রায় ২৯ শতাংশ ভোট লাভ করে অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি গ্রাজের বৃহত্তম দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টির সঙ্গে জোট স্থাপন করে কমিউনিস্টরা হাতে পেল অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের চাবি। কমিউনিস্ট নেত্রী এল্কে কাহ্র শপথ নিলেন গ্রাজের মেয়র হিসেবে।
স্থানীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মধ্যে দিয়েই প্রথমে প্রদেশে ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্তরে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন সম্ভব হবে, এই ছিল দেড় দশক পূর্বে গৃহীত কমিউনিস্টদের গৃহীত রণনীতি। গ্রাজের বিজয়ের পর এই রণনীতি ক্রমশ সাফল্যের মুখ দেখছে। স্টিরিয়া প্রদেশের প্রাদেশিক আইনসভা বা লান্ডটাগে বর্তমানে ২ জন কমিউনিস্ট প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৩ সালের স্থানীয় নির্বাচনে স্লাজবার্গ প্রদেশে ১১.৭% ভোট পেয়ে প্রাদেশিক আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন ৪ জন জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় পৌর রাজনীতিতেও ক্রমশ বিভিন্ন শহরে শক্তি বৃদ্ধি করছে কমিউনিস্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে গত ২৮ জুন গ্রাজের স্থানীয় নির্বাচনে ৩৫.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন কমিউনিস্টরা। প্রায় ৭ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে কমিউনিস্টরা আবার ফিরেছেন ক্ষমতায়।
স্থানীয় ও প্রাদেশিক ক্ষেত্রে এই সাফল্য এখনও জাতীয় নির্বাচনে তেমন দাগ কাটতে পারেনি। ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নির্বাচনে কমিউনিস্টরা কোনও আসন জিততে পারেননি, যদিও ভোট বেড়েছে তিনগুণ। ২০২৪ সালের অস্ট্রিয়ার জাতীয় নির্বাচনেও ১৯৬২ সালের পর শ্রেষ্ঠ ফল করেও কমিউনিস্টরা একটিও আসন জিততে পারেননি, যদিও অন্তত ৫-টি আসন জেতার লক্ষ্য তাঁদের ছিল। তবে এতে তাঁরা বিশেষ হতাশ হননি। একেবারে বিলুপ্তির খাদের কিনারায় তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন দেড় দশক আগে। সেখান থেকে তাঁরা যে আবার অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, এই বিষয়টিই কর্মী-সমর্থকদের কাছে আনন্দের। অস্ট্রিয়ায় বর্তমানে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রভাব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সমর্থন ক্রমশ কমছে। উগ্র দক্ষিণপন্থী ফ্রিডম পার্টি অফ অস্ট্রিয়া (Freiheitliche Partei Österreichs, FPÖ) বিগত কয়েক বছরে তার প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। সাম্প্রতিকতম জাতীয় নির্বাচনে তারা অস্ট্রিয়ার বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফ্রিডম পার্টির কাছে সমর্থক হারানোর ভয়ে মধ্য-দক্ষিণ খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাট রাজনীতির ধারক ও বাহক পিপলস্ পার্টি ক্রমশ সরছে আরও দক্ষিণে।
এমতাবস্থায় অস্ট্রিয়ার বামমনস্ক জনগণ স্পষ্টতই বিকল্পের সন্ধানে রয়েছেন। এই বিকল্প কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এখনও তাঁদের সেই সংগঠন ও জাতীয় স্তরে বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এখনই এই সামান্য শক্তি বৃদ্ধিতেই তাঁদের বিরুদ্ধে মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং দক্ষিণপন্থী দলগুলি থেকে নেতিবাচক প্রচারের বন্যা বইছে। এর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও স্থানীয় নির্বাচনে জয় পাচ্ছেন কীভাবে কমিউনিস্টরা? পিপলস্ ওয়ার্ল্ড-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে গ্রাজের কমিউনিস্ট কাউন্সিলার মিরিয়াম হারলিচ্কা, জোসেফ মেজ্লেনি এবং কার্ট লুটেনবার্গার মূল চারটি বিষয় তুলে ধরেছেন: ক) অন্যান্য দলের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর কমিউনিস্টরা তেমন জোর দিচ্ছেন না। বরং বর্তমানে অন্যান্য দলগুলি প্রত্যক্ষ জনসংযোগের যে রেওয়াজ প্রায় হারিয়ে ফেলেছে, তাতেই কমিউনিস্টদের নজর থাকছে বেশি। এই বিষয়টি ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। খ) জনগণ যখন দেখছে বিভিন্ন স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কমিউনিস্টরাই সামনের সারিতে রয়েছে, তখন তাদের বিরুদ্ধে চলা প্রচারের ধার অনেকটাই কমে যাচ্ছ। গ) প্রবল চাপের মুখেও কমিউনিস্টরা কমিউনিস্ট পরিচিতি নিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করেনি, তারা পূর্বের ভ্রান্তি স্বীকার করেছে, একই সঙ্গে যে গৌরবময় ঐতিহ্য ও কমিউনিস্ট প্রকল্প পরিত্যাগ করেনি। জনতার কাছে এটি ইতিবাচক মনে হয়েছে। ঘ) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পে সাফল্য বৃহৎ প্রকল্প সম্পর্কে কমিউনিস্ট বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে।
আরেকটি বিষয় এই সাক্ষাৎকারে না-উঠে এলেও কাউন্সিলারদের নাম থেকেই আমরা অনুমান করতে পারি। কমিউনিস্ট পার্টি কমিউনিস্ট সুলভভাবেই অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের প্রতিনিধিদের তুলে এনেছে। মিরিয়াম হারলিচ্কা চেক বংশোদ্ভূত, জোসেফ মেজ্লেনি হাঙ্গেরিয়ান এবং কার্ট লুটেনবার্গার জার্মান— কিন্তু তিনজনই অস্ট্রিয়ান, তিনজনই মেহনতি জনতা থেকেই উঠে এসেছেন। অস্ট্রিয়ায় উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যখন ক্রমশ শক্তি অর্জন করছে, তখন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে নিছক গুরুত্বপূর্ণ নয় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার পরিচায়ক। শ্রেণি রাজনীতি এইপ্রকার স্পষ্ট তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার সফল প্রয়োগ থেকেই শক্তিশালী হয়।
অস্ট্রিয়ার পূর্বে বেলজিয়ামেও কমিউনিস্টরা প্রায় বিলুপ্তির মুখ থেকে ফিরে এসেছিল। বর্তমানে তাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে শুধু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিই নন, ফ্লেমিশ বনাম ওয়ালুন সংঘাতে যখন বেলজিয়ামের প্রায় সব দল নাম লিখিয়েছে, তখন তাঁরা জাতীয় ঐক্যের পক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ স্বর হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আশা রাখা যায়, অস্ট্রিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিও একইভাবে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার মতো শক্তি অর্জন করবে।
প্রকাশের তারিখ: ১১-জুলাই-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
