সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অগ্নিগর্ভ বলিভিয়া, ইতিহাস ও সম্ভাবনা
রবিকর গুপ্ত
বিক্ষোভের আর আন্দোলনের টুকরো টুকরো এই কোলাজ ধীরে ধীরে জুড়ে তৈরি হতে লাগল গণ বিদ্রোহের একটি বৃহৎ চিত্র। যোগসূত্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আবারও নিলেন আদিবাসীরা। সামগ্রিক ভাবে দেশের এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে গত ৮-ই এপ্রিল পান্ডো ও বেনি প্রদেশ থেকে লং মার্চ শুরু করলেন তাঁরা রাজধানী লা পাজ্-এর উদ্দেশ্যে। এই মিছিলে পা মেলালো বলিভিয়ান ওয়ার্কস সেন্ট্রাল (সিওবি)-এর সঙ্গে যুক্ত সমস্ত সংগঠন। দেশকে বাঁচানোর এই যাত্রায় সামিল হলেন খনি শ্রমিক, স্বাস্থ্য কর্মী, গ্রামীণ শিক্ষক, পরিবহন কর্মীরা।

It rechristened its territories as the ’Banana Republics’
and over the sleeping dead, over the restless heroes
who brought about the greatness, the liberty and the flags,
it established the comic opera:
abolished the independencies,
presented crowns of Caesar, unsheathed envy, attracted
the dictatorship of the flies.
—The United Fruit Company, Pablo Neruda
লাতিন আমেরিকা। প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদে সমৃদ্ধ লাতিন আমেরিকা। সোনায় মোড়া ইনকা সাম্রাজ্যের লাতিন আমেরিকা, জ্ঞান বিজ্ঞানে অগ্রগামী মায়া সভ্যতার লাতিন আমেরিকা… ‘পাইতিতি’ আর ‘এল ডোরাডো’-র প্রবাদের টানে স্বর্ণলোভী শত শত স্প্যানিশ কঙ্কিস্তোদোরকে টেনে এনেছিল যে মহাদেশ, সেই লাতিন আমেরিকা। বিশ্বের অন্যতম বৈষম্যময় মহাদেশ – যেখানে ‘যাদের আছে’ আর ‘যাদের নেই’-এর মধ্যে বিশাল ব্যবধান – সেই লাতিন আমেরিকা। আর ‘যাদের নেই’-এর পক্ষে সিমোন বলিভার থেকে চে গেভারার মতো বিপ্লবের তরবারি ঝলকে উঠেছে বারেবারে যে মহাদেশে – সেই লাতিন আমেরিকা। সেই লাতিন আমেরিকা যে অসম্ভব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বারংবার দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছে ‘লিবের্তাদ ও মুয়ের্তে!’ (‘মুক্তি অথবা মৃত্যু!’)।
গত বিংশ শতকে লাতিন আমেরিকাকে শেকল দিয়ে বেঁধেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে গণতন্ত্রের স্বঘোষিত ধ্বজাধারী ও আত্মনিয়োজিত রক্ষাকর্তা এই দেশটি লাতিন আমেরিকার বামপন্থী নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলির বারে বারে পতন ঘটিয়েছে। বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রের শবের উপর সে চাপিয়ে দিয়েছে উড্ডীন ভনভনে মাছির মতো গণহত্যাকারী একনায়কদের। চিলের আউগস্তো পিনোচে, আর্জেন্টিনার হোর্হে রাফ্যায়েল ভিদেলা, বলিভিয়ার হুগো বাঞ্জের, ব্রাজিলের কাস্তেলো ব্রাঙ্কো, গুয়েতেমালার কাস্তিলো আর্মাস – তালিকা অতি দীর্ঘ। কিন্তু এই লড়াই একতরফা হয়নি। বিংশ শতকের লাতিন আমেরিকাই আবার জন্ম দিয়েছে সালভাদোর আইয়েন্দে, চে গেভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, জুয়াঁউ গুলার, জ্যাকোপো আর্বেঞ্জদের – যাঁরা মার্কিন পুতুলদের বিরুদ্ধে জনতার পতাকা বহন করেছেন। কখনো সফল হয়েছেন তাঁরা, জনতার পতাকা উড়েছে হাভানায় বা মানাগুয়াতে। কখনো বা জনতার পতাকা পরাস্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়েছে সান্তিয়াগো বা রিও-র রাস্তায়। এই দীর্ঘমেয়াদী ও চলমান সংগ্রাম বিশ শতকের গন্ডি পেরিয়ে প্রবেশ করেছে একুশ শতকে। এই সংগ্রামেরই সাম্প্রতিকতম অধ্যায় বর্তমানে লিখছে বলিভিয়া।
প্রাচীন ইনকা সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল লাতিন আমেরিকার চারটি আধুনিক দেশ জুড়ে – ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া এবং চিলে। সূর্য দেবতা ইন্তির নিজের দেশে পিজারোর মত স্প্যানিশ কঙ্কিস্তোদোরের হাতে এই অঞ্চলের আদিবাসীরা হেরে গেলেও হারিয়ে জাননি। দীর্ঘ স্প্যানিশ শাসন দাঁতে দাঁত চেপে পার করেছেন তাঁরা। বলিভারের বিদ্রোহের পর আন্দিজের কোলে নতুন যে রাষ্ট্রগুলি জন্ম নিল, তাতে বারেবারে নিজেদের ভাগিদারি দাবি করেছেন। কাজটা সহজ হয়নি। সেও এক লম্বা চড়াই উতরাই ভরা পথ। এই পথে এখনো পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য যে দেশে এসেছে, তার নাম বলিভিয়া। ২০০৫ সালে ‘মুভিমেন্টো সোশ্যালিজমো’ বা ‘সমাজতন্ত্রী আন্দোলন’ (সংক্ষেপে এমএএস) নামক রাজনৈতিক দল বলিভিয়ায় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসীদের দীর্ঘ আন্দোলনভিত্তিক মৈত্রীর ওপর প্রতিষ্ঠিত এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন হুয়ান ইভো মোরালেস আয়ামা, যিনি শপথ নিয়েছিলেন বলিভিয়ার প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হিসেবে। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছর সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা, মার্কিন সমর্থিত ক্যু প্রচেষ্টা এবং অন্যান্য নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করে লা পাজে উড্ডীন ছিল বলিভিয়ার বহুজাতিক রাষ্ট্রের পতাকা। এই সময়ে দেশের উন্নয়নের মূল স্রোতে প্রথমবারের মত পা রেখেছিলেন আদিবাসীরা। অর্থনৈতিক মাপকাঠির প্রায় সব পরিমাপে বলিভিয়ার ঘোড়াদৌড় শুরু হয়েছিল। ‘বেসরকারী হলে পরিষেবা ভালো হবে’ শিকাগো স্কুলের এই আপ্তবাক্যকে ভুল প্রমাণিত করে এই কাজ হয়েছিল নব রাষ্ট্রায়ত্তকৃত বিবিধ শিল্পকে চাঙ্গা করেই।
কিন্তু এই অবস্থা চিরকাল থাকল না। বিশ্ব পরিস্থিতি এর মধ্যে পাল্টে গেছে। খনিজ তেলের সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাটারি চালিত গাড়ি ও মেশিনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। এই আধুনিক ব্যাটারি নির্মাণের অন্যতম উপাদান লিথিয়ামের বিপুল ভান্ডার রয়েছে বলিভিয়ায়। রাষ্ট্রের অধীনে থাকা এই খনিগুলি ছিল বৈদেশিক পুঁজির নাগালের বাইরে। বলিভিয়ায় এমএএস-এর শাসন অব্যহত থাকলে এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এই কারণেই ২০১৯ সালে বলিভিয়ার সাধারণ নির্বাচনে মোরালেসের জয় লাভের পর একটি ক্যু প্রচেষ্টা ঘটল। বিরোধীদের দাবি ছিল মোরালেসের বিজয় অসাংবিধানিক, কারণ তিনি রাষ্ট্রপতি থাকার নির্দিষ্ট মেয়াদ লঙ্ঘন করে চতুর্থবারের জন্য নির্বাচনে লড়ছেন। মোরালেসের বক্তব্য ছিল, যেহেতু সাম্প্রতিক সুম্প্রিম কোর্টের একটি রায়ে এই মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে, তাই তিনি অসাংবিধানিক কিছু করছেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথারীতি এই রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে। সেনাবাহিনির প্রবল চাপের মুখে মোরালেস পদত্যাগ করেন ও দেশ ছেড়ে মেক্সিকোর বাম সরকারের কাছে আশ্রয় নেন। মোরালেসের অপসারণের পর হেনিনে আনেজ্ চাভেজ-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সমগ্র গণবিক্ষোভ কড়া হাতে দমন করে। বিশেষ করে আদিবাসী সমাজ মোরালেসের অপসারণ মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় যে অবরোধ ও বিক্ষোভ চালান তাতে গুলি চলে। এই সময় মার্কিন সমর্থিত হেনিনে আদিবাসী সমাজের বিরুদ্ধে এমন ভাষা প্রয়োগ করেন যা কঙ্কিস্তোদোরদের মুখে একদা শোনা যেত। অনেক টালবাহানার পর জনগণের প্রবল চাপে অবশেষে ২০২০ সালের অক্টোবরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে এমএএস অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। মোরালেস সরকারের ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী লুইস আর্সে রাষ্ট্রপতি হিসেবে যখন শপথ নিলেন, অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই বলেছিলেন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে নতুন করে এমএএস-এর যে সরকার এলো তা অন্ততঃ এক দশক এখনও শাসন করবে।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই পর্যবেক্ষণ ভুল প্রমাণিত হল। লাতিন আমেরিকায় বাম আন্দোলনের একটি বড় সমস্যা হল আন্দোলনের ব্যাটন সঠিক ভাবে হস্তান্তরিত হয়না। বলিভিয়ার প্রতিবেশী ইকুয়েডরে যেমন রাফায়েল কোরেয়া বনাম লেনিন মোরেনোর লড়াই বাম আন্দোলনকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছিল,একই ভাবে আর্সে বনাম মোরালেসের রাজনৈতিক লড়াই বলিভিয়ায় বামপন্থীদের মধ্যে এক গভীর বিভাজন তৈরি করল। ২০২৪ সালে আর্সের বিরুদ্ধে একটি ক্যু প্রচেষ্টা হলে মোরালেস দাবি করেন, সবটাই ‘লুচো’-র (আর্সের ডাকনাম, ঐ নামেই মোরালেস তাঁকে ডাকেন) নাটক। অপরদিকে মোরালেসকে গুপ্তহত্যা করার একটি প্রচেষ্টা হলে তাতে আর্সে একেবারেই কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নারাজ হন। নবীন ও প্রবীণের এই তিক্ততা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে ২০২৫-এর নির্বাচনের আগে মোরালেস এমএএস থেকে পদত্যাগ করে নতুন দল খোলেন এবং আর্সেও রাষ্ট্রপতির দৌড় থেকে সরে আসেন। যে কৃষক-শ্রমিক-আদিবাসী জোট এমএএস-কে এতকাল ক্ষমতায় এসেছিল, তা ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। আদিবাসীদের একটি বড় অংশ প্রতিবাদ স্বরূপ ভোটে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। প্রায় রেকর্ড ২০ শতাংশ নষ্ট অথবা ফাঁকা ব্যালটের সিংহভাগই এই প্রতিবাদের অংশ। অপরদিকে এমএএস-এর অন্তর্কলহে বীতশ্রদ্ধ শ্রমিক ও কৃষকদের একটি বড় অংশ অতি দক্ষিণপন্থী লিব্রে দলকে আটকাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে সমর্থন করে। পরিণামে এমএএস মাত্র ৩.১৭% ভোট পেয়ে শুধু যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরাজিত হল তাই নয়, আইনসভার নিম্নকক্ষে তার আসন সংখ্যা কমে দাঁড়ালো ৭৫ থেকে ২ আর উচ্চকক্ষে ২১ থেকে ০-তে। বলিভিয়ার মেহনতি মানুষের দীর্ঘদিনের এই রক্ত, ঘাম ও পরিশ্রমের আপাত সলিল সমাধিতে মার্কিন রাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিওর উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মত। মনে হয়েছিল আর্জেন্টিনা বা পেরুর মত দেশে, যেখানে জনতার পতাকা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তার পাশে নাম লেখাতে চলেছে এবার বলিভিয়াও।
কিন্তু ইতিহাস সরলরেখায় চালিত হয় না। আইনসভার মধ্যে বামপন্থীদের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নব-নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি রডরিগো পাজের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি বাম ভোটারদের ভোট পাওয়ার জন্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁর সরকার আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা থেকে ঋণ নেবে না। ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তিনি প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ আইএমএফ-এর থেকে শর্ত সাপেক্ষে গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি আরও ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে চলেছেন। এই ঋণগুলির শর্ত হিসেবে আইএমএফ চাপিয়ে দিয়েছে একগুচ্ছ জনবিরোধী নীতি, যেমন বিদ্যুতের ওপর কর হ্রাস না করা, খাদ্য ও জ্বালানির ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, খনি ও শিল্পের বেসরকারীকরণ। বিগত ৪-ঠা নভেম্বর বিশেষ ডিক্রি নং ৫৫০৩ জারি করে রাষ্ট্রপতি পাজ্ বৃহৎ ব্যবসায়ীদের দেয় করের পরিমাণ হ্রাস করার একটি উদ্যোগ নেন। এর ফলে যে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়, তা সরকার শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার সংক্রান্ত নানা নীতি ও ভর্তুকির কাটছাঁট ও ছোটো ব্যবসায়ীদের ওপর কর বৃদ্ধির মাধ্যমে পূরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রবল জন বিক্ষোভের মুখে পাজ্ এই ডিক্রি প্রত্যাহার করে নেন। সাময়িক ভাবে পিছু হটলেও নব্য উদারনৈতিক নীতির প্রয়োগের আরেকটি প্রচেষ্টা হয় ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ডিক্রি নং ১৭২০-এর মাধ্যমে। এই ডিক্রির লক্ষ্য ছিল কৃষি। সরকার ক্ষুদ্র কৃষকদের মাঝারি কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আয়করের আওতায় নিয়ে আসে। দেউলিয়া হয়ে গেলেও ক্ষুদ্র কৃষকদের জমি নিলামে তোলা বা বিক্রি করা যায় না। কিন্তু তাদের মাঝারি কৃষক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর কর বাড়িয়ে দিলে এই কাজটি সহজেই করা যাবে। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের মতে সমগ্র প্রচেষ্টাটিই স্প্যানিশ আমলের লাতিফুন্দিও ধাঁচের বড় জমিদারী ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এর মূল চালিকা শক্তি বলিভিয়ার সান্তা ক্রুজ কেন্দ্রিক অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত পুঁজি। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বাম শাসন অপসারিত হয়েছে বটে, কিন্তু তা মানুষের মধ্যে যে অধিকার বোধ তৈরি করে দিয়ে গেছে তা এখনও অপসারিত হয়নি। এর বিরুদ্ধেও বলিভিয়া গর্জে উঠল। রাস্তায় নামল আন্দিজের আদিবাসী চাষি মেয়েরা, তাদের সঙ্গে হাত ধরল বলিভিয়ার সমতল আমাজন সংলগ্ন এলাকার কৃষকরা। ইতিমধ্যে বলিভিয়ার অর্থনীতির পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে গেছে। আইএমএফ-এর নীতি মানতে গিয়ে অর্থনীতি ৩.৩% সংকুচিত হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি প্রায় কুড়ি শতাংশ। পরের আন্দোলনের ঢেউ এল শিক্ষকদের তরফ থেকে। শিক্ষক সংগঠন সিএও ন্যূনতম ২০% বেতন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে রাস্তায় নামল। জিনিস পত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া, জ্বালানি অগ্নিমূল্য। যে পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে, তাতেও এত ভেজাল যে গাড়ি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। পথে নামলেন পরিবহন কর্মীরাও।
বিক্ষোভের আর আন্দোলনের টুকরো টুকরো এই কোলাজ ধীরে ধীরে জুড়ে তৈরি হতে লাগল গণ বিদ্রোহের একটি বৃহৎ চিত্র। যোগসূত্রের ঐতিহাসিক দায়িত্ব আবারও নিলেন আদিবাসীরা। সামগ্রিক ভাবে দেশের এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে গত ৮-ই এপ্রিল পান্ডো ও বেনি প্রদেশ থেকে লং মার্চ শুরু করলেন তাঁরা রাজধানী লা পাজ্-এর উদ্দেশ্যে। এই মিছিলে পা মেলালো বলিভিয়ান ওয়ার্কস সেন্ট্রাল (সিওবি)-এর সঙ্গে যুক্ত সমস্ত সংগঠন। দেশকে বাঁচানোর এই যাত্রায় সামিল হলেন খনি শ্রমিক, স্বাস্থ্য কর্মী, গ্রামীণ শিক্ষক, পরিবহন কর্মীরা। বলিভিয়া দেখল খনি শ্রমিকদের ইউনিয়ন এফএসটিএমবি-এর সদস্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই মিছিল করছে সিএসটিইউবি-এর ক্ষুদ্র কৃষক সংগঠন। এই সারি সারি মিছিল মিলিত হল লা পাজ্ আর এল অল্টোতে ৪-ঠা মে-তে। তাঁরা ১০ দিনের সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিলেন। দেশের প্রায় ১০০ জায়গায় অবরোধের খবর এল। প্রায় সাড়ে তিন হাজার সামরিক বাহিনি মোতায়েন করা হল। গ্রেপ্তার হলেন শত শত আন্দোলনকারী। সিওবি-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক মারিও আর্গুলো সহ আর ২৮ জন ইউনিয়ন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হল। কিন্তু আন্দোলন থামল না। বেগতিক বুঝে রাষ্ট্রপতি পাজ্ ডিক্রি নং ১৭২০ প্রত্যাহার করে নিলেন। কিন্তু বাকি দাবিগুলি মানলেন না। তাঁর আশা ছিল, আদিবাসী ও কৃষকদের মূল দাবি মেনে নিলে তাঁরা যদি আন্দোলন থেকে সরে যান, শ্রমিক-শিক্ষকদের জোটের পক্ষে বেশিদিন আন্দোলন চালানো সম্ভব হবে না। এই ‘বিভাজন এবং শাসন’ নীতি ব্যর্থ হল। সমগ্র দাবি না মানা অবধি কৃষক আর আদিবাসীরাও রাস্তা ছাড়তে অস্বীকার করল।
প্রাথমিক ভাবে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। কিন্তু মুখে আলোচনার প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্ষেত্রে দমন-পীড়ন বর্তমানে আন্দোলনের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে। মে মাসে যে স্বতঃস্ফুর্ত সাধারণ ধর্মঘটের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা এক মাস পরেও অব্যহত। লা পাজ আর এল অল্টো দেশের বাকি অংশের থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এল অল্টোতে আন্দোলনকারী শ্রমিক-কৃষক-আদিবাসী-শিক্ষকরা নিজেদের একটি কাবিলদো বা কাউন্সিল তৈরি করেছে। এই ঘটনা অনেককেই মনে করিয়ে দিয়েছে ১৯১৭-এর বিপ্লবের প্রাক্বালে পেত্রোগ্রাদের দ্বৈত সরকারের পরিস্থিতির কথা। প্রভিশনাল গভর্নমেন্ট ও পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সঙ্গে অনেকে মিল খুঁজে পেয়েছেন লা পাজ্ আর এল অল্টোর। কিন্তু অমিলও রয়েছে। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের অন্যতম শক্তি ছিল একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের দল। ছিল বহু দীর্ঘদিনের সংগ্রামে পোড় খাওয়া নেতা। ছিল সেনাবাহিনির একটি বৃহৎ অংশের সমর্থন। এল অল্টোর কাবিলদো-র এর তিনটির কোনোটিই নেই। বর্তমান সরকার আন্দোলনের পেছনে ইভো মোরালেসের হাত দেখলেও মোরালেস কিন্তু নিজের এলাকা কোচাবাম্বার বাইরে এক পা রাখেননি। তিনি এই আন্দোলন সমর্থন করলেও তার নেতৃত্বে নেই। বিবিধ কৃষক, শ্রমিক ও আদিবাসী সংগঠন এর নেতৃত্ব দিচ্ছে – কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সেনাবাহিনির একটি অংশ এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও তারা সরকার ছেড়ে এই আন্দোলনকে সমর্থন দেবে না। সুতরাং, এখনও অবধি যা পরিস্থিতি, তার ভিত্তিতে যদি কেউ বলেন বলিভিয়ায় বিপ্লব হতে চলেছে, তাহলে তিনি ভুল বলবেন। একটি বৈপ্লবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও তার সুযোগ নেওয়ার কোনো রাজনৈতিক শক্তি দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়ার শক্তি আঘাত করার জন্য সংগঠিত হচ্ছে। গত ১৫-ই মে লাতিন আমেরিকার আটটি দক্ষিণপন্থী সরকার বলিভিয়ার সরকারকে সর্বপ্রকার সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্দোলনকারীদের দাগিয়েছে ‘নার্কো টেররিস্ট’ হিসেবে। গত ২৪-শে মে কার্গো প্লেনে করে মার্কিন সেনাবাহিনির সাউথকম অস্ত্র পাঠিয়েছে বলিভিয়ার সরকারকে। ডিইএ-এও বলিভিয়ার মাটিতে বর্তমানে সক্রিয়। এই সংগঠিত প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফুর্ত জন আন্দোলন কতদিন বজায় রাখা যাবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। তবে ব্যর্থতার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই স্মরণ করা যেতে পারে এইরকমই গণ আন্দোলন প্রবল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ২০০৫ সালে একদা বামেদের বলিভিয়ায় ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। ধ্রুপদী অর্থে ‘বিপ্লব’ না হলেও, সেই ঘটনা বলিভিয়ার ইতিহাসে ছিল বৈপ্লবিক। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না থাকলেও তার ছন্দ থাকে। আপাতত আস্থা রাখা যাক, যে সাহসী উদ্যমী গণআন্দোলন বলিভিয়ায় মেহনতি মানুষের এক নতুন শ্রেণি জোট গড়ে তুলেছে, তা ছন্দ মেলাতে সক্ষম হবে।
প্রকাশের তারিখ: ১৮-জুন-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
