Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ট্রাম্পের বর্ণবাদী বিশ্বকাপ

জেরেমি করবিন
আমি ফুটবল ভালোবাসি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি নিছকই একটি খেলা। মানুষের জীবন তো আর তা নয়। মানুষের জীবন, মর্যাদা এবং অধিকার তার চেয়ে অনেক বড়। তাই এখন প্রয়োজন সাহসী অবস্থানের। তোষণ, ভীরুতা আর সুবিধাবাদী নীরবতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্পষ্টভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় এসেছে।
Trumps Racist World Cup

বিশ্বকাপে এই প্রথম একজন সোমালি রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন ওমর আরতান। ২০১৮ থেকে ফিফা স্বীকৃত রেফারি তিনি। ২০২৩-এ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস-এ দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। ২০২৫ সালে পেয়েছেন আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি হিসেবে স্বীকৃতি। অথচ, এমন একজন মানুষকেই শেষ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

আরতানের ওপর নিষেধাজ্ঞার কোনও ব্যাখ্যা সরকারিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি। যদিও, বাস্তবটা কারও কাছেই অজানা নয়। সোমালিয়া রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায়। পরে খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রশাসনের ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ একটি সূত্র থেকে দাবি করা হয়, আরতানের সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদী যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে ব্যাপক তোলপাড়ের মুখে এই দাবিটি গভীর সন্দেহ তৈরি করে। এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং, এটি একটি গভীর বর্ণবাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।

আরতানের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বরং একটি বৃহত্তর সংকটের চূড়ামাত্র। 


সোমালিয়া ছাড়াও লাওস, (কিউবা, ভেনেজুয়েলা), সিয়েরা লিওন, বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার, দক্ষিণ সুদান-সহ মোট ৩৯টি দেশ রয়েছে মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞার আওতায়। ফলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির চারভাগের একভাগের বেশি সমর্থকই ভিসা পেতে বাধার মুখে পড়ছেন। কেউ আবেদন করেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, কেউ বা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গিয়েছেন। এই রূঢ় বাস্তবতায় ‘ফুটবল বিশ্বকে এক করে’— এই বহুল বিজ্ঞাপিত স্লোগান পরিণত হয়েছে এক নির্মম তামাশায়। 

বিশ্বকাপ যেখানে মিলনের উৎসব হওয়ার কথা, সেখানে তা ক্রমে পরিণত হচ্ছে বিভেদের প্রতীকে।

এমন একটি প্রশাসনের অধীনে বিশ্বকাপ আয়োজিত হচ্ছে, যারা নির্বিচার মানুষকে ভাগ করছে, আটক করছে, এমনকি ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ফিরিয়ে দিতে পর্যন্ত দ্বিধা করছে না। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা কয়েক মাস ধরেই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় হুমকটি আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিপীড়নমূলক, বৈষম্যমূলক ও প্রাণঘাতী অভিবাসন-প্রয়োগ ব্যবস্থা এবং গণ-আটকের প্রক্রিয়া’ থেকে।

এই আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ মিলেছে একাধিক ঘটনায়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমরা দেখেছি, ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইমিগ্রেশন কন্ট্রোল এনফোর্সমেন্ট)-র কর্মীদের গুলিতে রেনি গুড নামে একজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। সপ্তাহদুয়েকের ব্যবধানে অ্যালেক্স প্রেট্টি নামের আরেকজন প্রাণ হারান একই সংস্থার হাতে। তাঁরা কেবল আলোচিত কয়েকটি নাম। বাস্তবে চলতি বছরে এই সংস্থার হেফাজতে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যার পিছনে আসলে রয়েছে অসংখ্য অজানা গল্প, অগণিত পরিবার ভাঙার বেদনা।

গত বছর জুন মাসে পাঁচ লাখের বেশি বৈধ অভিবাসীকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সংখ্যাটা আসলে কত বড়, সেটা বোঝাতে একটি ছোট্ট তথ্য বলা বলা যায়— বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যত মানুষ বসতে পারেন, তার প্রায় ছয় গুণ মানুষকে একসঙ্গে দেশছাড়া করার কথা ভাবা হয়েছিল। আইসিই-র ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেছেন যে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি ‘মূল অংশ’ হিসেবে সংস্থাটি কাজ করবে।

এখনও পর্যন্ত ফিফা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— কেউই এমন কোনও নিশ্চয়তা দেয়নি যে, সমর্থকরা দর্শকেরা নির্বিঘ্নে খেলা উপভোগ করতে পারবেন— বেআইনি আটক, অভিযান কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকবেন। পাশাপাশি রয়েছে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর কড়াকড়ি। গৃহহীন মানুষদের সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। নজরদারি ব্যবস্থার বিস্তার এবং বিশেষ করে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। অথচ বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় যে ‘নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বাগতপূর্ণ’ পরিবেশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবতা তার ঠিক বিপরীত ছবিই তুলে ধরছে। 

🔍︎ আরও পড়ুন— আলোছায়ার ফুটবল ফুটবল, পুঁজি ও স্মৃতি

চার বছর আগে কাতারে বিশ্বকাপ আয়োজনের সময় আমরা অনেকেই সরব হয়েছিলাম। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এলজিবিটিকিউ+র অধিকার এবং নির্মাণশ্রমিকদের শোষণ— যাদের অনেকেই টুর্নামেন্টের পরিকাঠামো নির্মাণের সময় প্রাণ হারিয়েছিলেন— সবকিছু নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশকারী মানবাধিকার সংগঠনগুলির সঙ্গে আমিও সরব হয়েছিলাম। সেই প্রতিবাদ ছিল ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু চার বছর আগে যারা সোচ্চার হয়েছিলেন— আজ, যখন একই বা আরও গভীর মানবাধিকার সংকট সামনে এসেছে, তখন সেই কণ্ঠগুলো— আমাদের প্রধানমন্ত্রী-সহ তাদের অস্বস্তিকর নীরবতা আমার নজর এড়ায়নি। 

এই নীরবতা কেবল বিস্ময়কর নয়। গভীরভাবে উদ্বেগজনক। 

এই দ্বিচারিতা কেবল নৈতিক দুর্বলতা নয়। বরং এটি তাদের কাপুরুষতাকেই বেআব্রু করে— যারা কেবল সুবিধাজনক হলেই মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ট্রাম্প ফিফার শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান, কিউবার ওপর অবরোধ আরও কঠোর করা— এই সবকিছুই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল। 

এই তিনটি ক্ষেত্রেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের নিজেদের (ব্রিটিশ) সরকারের নৈতিক কাপুরুষতার সুযোগ নিয়েছে— এই সরকার রাষ্ট্রপ্রধানের অপহরণের নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে, ইরানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে এবং চরম প্রয়োজনে কিউবার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে। এ যেন এক ‘হ্যাটট্রিক’! আর এর বাইরেও রয়েছে গাজায় ইজরায়েলের চালানো গণহত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেনের অংশগ্রহণের বিষয়টি।

আমি ফুটবল ভালোবাসি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি নিছকই একটি খেলা। মানুষের জীবন তো আর তা নয়। মানুষের জীবন, মর্যাদা এবং অধিকার তার চেয়ে অনেক বড়। তাই এখন প্রয়োজন সাহসী অবস্থানের। তোষণ, ভীরুতা আর সুবিধাবাদী নীরবতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্পষ্টভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় এসেছে। 

ঋণ: দ্য গার্ডিয়ান
শিরোনাম মার্কসবাদী পথ পত্রিকার


প্রকাশের তারিখ: ২৬-জুন-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আন্তর্জাতিক বিভাগে প্রকাশিত ৫৮ টি নিবন্ধ
২৬-জুন-২০২৬

১৮-জুন-২০২৬

২৯-মে-২০২৬

২৮-মে-২০২৬

২৪-মে-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬