মানুষের জীবিকার লড়াইয়ে পাশে থাকব আমরা

এম এ বেবি
নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইন্ডিয়া ব্লকের ভবিষ্যৎ এবং বামপন্থার বর্তমান অবস্থান নিয়ে সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার। মূলত ইংরেজিতে নেওয়া এই আলোচনাটি পাঠকদের জন্য বাংলায় অনূদিত ও উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে উঠে এসেছে সমসাময়িক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লেফট ভিউজের সাংবাদিক সৌভিক ঘোষ।

আজ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন সিপিআই(এম) (CPIM) সাধারণ সম্পাদক, কমরেড এম এ বেবি। কমরেড, আপনাকে সঙ্গে পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত।

১. চারটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। এই নয়া-উদারবাদী ব্যবস্থার মধ্যে বিপুলসংখ্যক যুবসমাজের পরিবর্তনশীল আকাঙ্ক্ষা এবং পরিস্থিতির নিরিখে বামপন্থীদের কি নিজেদের কৌশল, রণনীতি এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?  

১৯৭৭ সালের পর এই প্রথমবার ভারতের কোনও রাজ্যে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন কোনও সরকার নেই। এ এমন এক পরিস্থিতি, যা এক অর্থে সামগ্রিক বাম শক্তির জন্য একটি ধাক্কা হিসাবে দেখা যেতে পারে। একই সাথে, আপনি যদি ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেন, তবে দেখতে পাবেন যে বেশ কয়েক বছর পরে সিপিআইএম এবং বামপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গে পুনরায় নির্বাচনে আসন জিতেছে এবং এখন বিধানসভার ভেতরে সমাজের নিপীড়িত, বিচ্ছিন্ন এবং প্রান্তিক ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর কার্যকর ও জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য অন্তত একজন সিপিআইএম বিধায়ক (MLA) রয়েছেন।

অনুরূপভাবে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরি— সেখানেও বিধানসভা রয়েছে, কিন্তু বিধানসভায় আমাদের কেউ নেই। বিগত ১০ বছর ধরে পুদুচেরি বিধানসভায় বামপন্থীদের এক জোরালো উপস্থিতি ছিল। তামিলনাড়ুতে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি অ-দ্রাবিড় দল ক্ষমতায় এসেছে। এরা অতি সম্প্রতি গঠিত একটি আঞ্চলিক দল যার নেতৃত্বে রয়েছেন একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা জোসেফ বিজয়।

এরা তামিলনাড়ুতে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা থেকে মাত্র ১১টি আসন তাদের কম ছিল। দুজন সিপিআইএম বিধায়ক, দুজন সিপিআই বিধায়ক এবং দুজন ভিসিকে (VCK) বিধায়ক জয়ী হন। চারজন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসহ এই ছজন (সিপিআইএম, সিপিআই উভয়কে মিলিয়ে), বিজেপি যাতে একক বৃহত্তম দলকে সরকার গঠনে বাধা দিতে কোনো কারসাজি করতে না পারে, তার প্রতিরোধে আমরা ভূমিকা পালন করেছি।

বিজেপি তামিলনাড়ুতে আরেকবার তাদের নির্বাচন-পরবর্তী জোটের পদ্ধতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, বামপন্থীদের কৌশলের ফলে তারা পিছনে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করাই হোক (যা আসলে বিজেপির পরোক্ষ শাসন) অথবা সমর্থনকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়াই হোক আরএসএস (RSS) সেরকম ষড়যন্ত্রই করেছিল।

তামিলনাড়ুতে তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং সেখানে বামপন্থীরা ভূমিকা পালন করেছে। এরপর কেরালায়, সিপিআইএম-এর নেতৃত্বাধীন এলডিএফ (LDF) বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ১০ বছর সরকারে থাকার পর, নির্বাচনে একই সরকারের পুনঃনির্বাচিত না হওয়া এক নতুন বিষয়। আমরা একে ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৫ বছর করতে পারিনি। তাই এটি একটি ধাক্কা এবং এমন পরাজয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু আমরা এখনও সেখানে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছি। নতুন ইউডিএফ (UDF) সরকার যদি এলডিএফ সরকারের কিছু প্রগতিশীল রাজনৈতিক উদ্যোগকে বাতিল করতে যায় তবে মনে রাখতে হবে যে শ্রমিক, কৃষক, যুবক, ছাত্র, মহিলা এবং সমাজের প্রান্তিক অংশগুলির মধ্যে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের উপস্থিতি এখনও যথেষ্ট মজবুত রয়েছে। পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা কেরালায় এখনও একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বামপন্থীদের জন্য একটি দৃশ্যমান ধাক্কা থাকলেও, বামেদের উপস্থিতি এখনও তাৎপর্যপূর্ণ।

কমিউনিস্ট ও বাম শক্তি হিসেবে আমরা নির্বাচনী রাজনীতির উপর সঠিক অর্থে নির্ভর করছি। নির্বাচনী রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের পাশে থাকা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায়, সমগ্র দেশে এবং এমনকি দেশের বাইরে থেকেও বহু মানুষ আমাদের অত্যন্ত লড়াকু এবং সক্রিয় নির্বাচনী প্রচার লক্ষ্য করেছেন যখন সারা রাজ্যজুড়ে বামফ্রন্ট লাল পতাকা হাতে নিয়ে প্রচার চালিয়েছে। ঐ প্রচার সমাজমাধ্যমের মাধ্যমেও অনেকে দেখেছেন।

অনেকে আমার সাথে যোগাযোগ করছিলেন, আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন— মনে হচ্ছে বাংলায় এবার আমরা কি ফিরে আসছি? অর্থাৎ সেই নৈতিক অনুপ্রেরণা সিপিআইএম এবং বামপন্থীরা তৈরি করতে পেরেছিল। বাংলায় কিছু বাম শক্তি যারা এর আগে বামফ্রন্টের সঙ্গে ছিল না, তারাও এবারে একসাথে এসেছেন।

এ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। বাংলার এবং ভারতের ইতিহাসে এই প্রথমবার বিজেপি বাংলায় রাজ্য সরকার দখল করার পর, তারা সমাজের দরিদ্রতর অংশের মানুষের উপর আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। আপনারা জানেন, উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের মতোই ছোটখাটো বিক্রেতা, হকার ও অন্যান্য সাধারণ মানুষদের উচ্ছেদ করার সময় সিপিআইএম ও বামপন্থী নেতারা, যেমন সুজন চক্রবর্তী, এসএফআই (SFI) সর্বভারতীয় নেতা সৃজন ভট্টাচার্য সহ আরও অনেকে সে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক যেমনটা বৃন্দা কারাত দিল্লিতে করেছিলেন।

এই ঘটনা দেখায় যে বামপন্থীরা সর্বদা মানুষের সঙ্গে থাকে। আমরা কিছু ধাক্কা খেয়েছি, কিন্তু একই সাথে মানুষের কাছে এ বার্তাও দিয়েছি যে লাল পতাকা এবং লাল পতাকার দলই একমাত্র শক্তি যা প্রান্তিক, নিপীড়িত, শোষিত এবং গ্রাম ও শহরের দরিদ্র মানুষের অধিকার রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। জনসাধারণের সঙ্গে জীবন্ত যোগাযোগ স্থাপনের পদ্ধতিগুলিকে নতুন করে নির্মাণ করার বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্ব দিতে হবে।

মানুষ যেখানেই সমস্যার সম্মুখীন হবে, সেখানেই পৌঁছাতে হবে লাল পতাকা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এই বার্তা আমাদের দিতে হবে এবং কীভাবে আমরা বিধানসভাগুলিতে আরও বেশি আসন জিততে পারি এবং বামপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করে একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তন করতে পারি সে বার্তাই আমাদের দিতে হবে।  দেরিতে হলেও আমরা তেমনটি করতে সক্ষম হব।

২. বর্তমান ব্যবস্থা অর্থাৎ নীতি ও ব্যবস্থা হিসাবে নয়া-উদারবাদ প্রসঙ্গে আসা যাক আমাদের দেশে নয়া-উদারবাদের সঙ্গেই একদিকে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণ আবার কল্যাণমুখী ও পরিচিতি সত্বার রাজনীতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছেআমরা কি আমাদের বর্তমান আদর্শগত কাঠামোর মধ্যেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারি নাকি অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে? আমরা কীভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চলেছি?

আপনি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন যা কমিউনিস্ট এবং বাম শক্তিগুলির অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার।

প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত জোয়ান রবিনসন একবার ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় এমনই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন- ‘চীন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রায় একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চীনে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ১৯৪৯ সালে, কমিউনিস্টরা বিজয় অর্থাৎ বিপ্লব অর্জন করতে সক্ষম হয়। এখন আমরা দেখছি চীন সমগ্র বিশ্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমেরিকার মতো একক কোনো কেন্দ্রের পরিবর্তে বিশ্বে চীনা সরকার এবং চীনা অর্থনীতির উপস্থিতিকে এক অত্যন্ত শক্তিশালী উপস্থিতি হিসাবে দেখছে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের উপস্থিতির কারণে এক বহুমুখী বিশ্বও (multipolar world) গড়ে উঠছে। তাহলে চীনের মত ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি কেন হেজিমনি বা আধিপত্য অর্জন করতে পারল না?’

আপনার উত্থাপিত পয়েন্টগুলি জোয়ান রবিনসনের করা ঐ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। ভারতের কমিউনিস্টরা বলেছিলেন, চীনের মতো হয়নি কারণ ভারতের একটি বড় সমস্যা হল জাতিভেদ (caste difference)।

আপনি পরিচিতি সত্বার রাজনীতির (identity politics) কথা উল্লেখ করেছেন। জাতিভেদের পাশাপাশি ধর্মীয় পার্থক্যের কারণেও এমনটি ঘটেছে। আরএসএস ও ব্রাহ্মণবাদী শক্তিগুলি তথাকথিত হিন্দু পরিচিতির উপর কাজ করছে।

আরএসএস তাদের নিজস্ব পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির অনুশীলন করছে, যেখানে সমগ্র উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলিতে বিভিন্ন ধরণের জাতি-ভিত্তিক পরিচিতির রাজনীতি চর্চা করা হচ্ছে। জাতির ভেদাভেদের কারণে ধনী ও দরিদ্রের দ্বন্দ্বের উপর ভিত্তি করে যে রাজনীতি গড়ে ওঠার কথা, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিভিত্তিক রাজনীতি, পরিচিতি সত্বার রাজনীতি এবং ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে জনসাধারণের উপর প্রভাব বিস্তার করে আসল লড়াইটিকে আটকে দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গেও এখন এটি বড় আকারে কাজ করছে।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সামনে এ এক অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাজ হল ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন জনসাধারণের মধ্যে কাজ করা, তাদের বোঝানো যে ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন হওয়া এক বিষয় আর সাম্প্রদায়িক হওয়া একেবারেই অন্য বিষয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রয়োজন কারণ সাম্প্রদায়িকতা মানুষেরই এক অংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। যার ফলে শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শ্রমিক, কৃষক এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের যে ঐক্য, তা দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা সাধারণভাবে ধর্মে বিশ্বাস করেন, সেই সকল মানুষকেও আমাদের পাশে টানতে হবে— যারা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে। ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি ভারতীয় প্রেক্ষাপটে কমিউনিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাম শক্তিগুলির সমাধান করা প্রয়োজন।

আমাদের নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় যে আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে, আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে নই। এ এমন একটি বিষয় যা কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলসকে ১৮৬৭ সাল, যখন প্রথম ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয়, তখনই আলোচনা করতে হয়েছিল।

মিখাইল বাকুনিন নামে একজন রুশ বিপ্লবী, যিনি প্রথম ইন্টারন্যাশনালের অংশ ছিলেন, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে যারা প্রকৃত অর্থে নাস্তিক, কেবল তাদেরই আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতিতে (International Workingmen's Association) অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। মার্কস এবং এঙ্গেলস বললেন এটি ভুল; যে সমস্ত শ্রমিকরা শ্রমিকদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে ইচ্ছুক, তাদের ধর্মীয় মনোভাব থাকুক বা না থাকুক, তারা ঈশ্বরে বিশ্বাসী হোন বা না হোন, তাদেরও আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমিতির অংশ হিসেবে সংগঠিত করা উচিত। মার্কস ও এঙ্গেলসের এই চিন্তাধারা ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে মানুষের সামনে কমিউনিস্টদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তারা ধর্মে বিশ্বাস করে না। সুতরাং, এদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়— মানুষের কিছু অংশের মধ্যে এমন ধারণা কাজ করছে। উদাহরণ হিসাবে আমারা কেরালার কথা বলতে পারি, আরএসএস এখানে ঐ ধরণের প্রচার চালায়।

মুসলমান চরমপন্থী সংগঠনগুলিও একই ধরনের কথা বলে। খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থী দল হিসাবে সক্রিয় কাজ করছে, তারাও বলে— না, না, কমিউনিস্টদের সাথে আপনাদের কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। তারা ধর্মের বিরুদ্ধে; যা আসলে সত্য নয়। একথা অবশ্যই সত্য যে প্রকৃত কমিউনিস্টরা দ্বান্দ্বিক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে আত্মস্থ করে পথ চলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিতে চান, আমরা তাদের সবার উপরে বস্তুবাদ জোর করে চাপিয়ে দেব।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র গঠনতন্ত্রে এমন কোনো শর্ত নেই যে কাউকে ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, তবেই সে পার্টিতে আসতে পারবে। প্রত্যেকেই, নিজের নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নির্বিশেষে— আস্তিক হোন বা নাস্তিক, কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে পারেন। ভারতীয় সমাজে পরিচিতি সত্বার রাজনীতি যেভাবে শিকড় গেড়ে বসছে, সে সমস্যাকে কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে তা আমাদের জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, যারা শোষিত, যারা প্রান্তিক, যারা মনে করেন যে আমাদের অধিকার বা আমাদের জীবিকা রক্ষা করার জন্য কেউ নেই— সমাজের সেই সমস্ত অংশের মানুষের সঙ্গে আমাদের যুক্ত হতে হবে। তাদের কাছে আমাদের পৌঁছাতে হবে। এই রাজনৈতিক-সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গিই আজ দেশের প্রতিটি রাজ্যে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাকে ভাঙতে সক্ষম হবে।

📲এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

৩. আপনার উত্তর থেকেই আমাদের পরবর্তী প্রশ্নে যাওয়া চলে। সাম্প্রতিক ফলাফলের পর— চারটি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ফলাফল যা আপনি প্রথম উত্তরে ব্যাখ্যা করলেন— এর পর আপনি কি বলতে পারেন যে বামপন্থীদের মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরার জন্য আরও অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম করতে হবে? আমাদের কাজে মধ্যে কি কোথাও কোনো ফাঁক রয়ে গেছে নাকি মানুষের সমস্যাগুলো তুলে ধরে আমাদের আরও বেশি লড়াই করতে হবে? আমাদের কি সেভাবেই ভাবা উচিত নাকি অন্য কোনো উপায় আছে?

ঠিক। চার রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনের পর যে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষের জীবিকার সমস্যা এবং রাজনৈতিক সমস্যাগুলিকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বামপন্থীদের দায়িত্ব আরও অনেক বেশি গুরুতর। আমরা যা করে আসছি তার চেয়ে আরও বেশি কাজ করা প্রয়োজন। আপনারা জানেন, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে সম্প্রতি আমরা মজুরি এবং শ্রম কোড বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রামের এক স্বতঃস্ফূর্ত উত্থান প্রত্যক্ষ করেছি।

এমনকি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের ডাক ছাড়াই, উত্তর ভারতের আরও অনেক রাজ্যে শ্রমিকরা নিজস্ব উদ্যোগে রাস্তায় নেমে এসেছেন। এর মানে হলো, শ্রমিকরা আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে আন্দোলনে নামতে প্রস্তুত। যখন ছত্তিশগড়ের মতো কিছু রাজ্যে আদিবাসী মানুষরা আন্দোলনে নামছেন। তারা লড়াই করছেন কারণ তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ধনকুবের আদানি, আম্বানির মতো মানুষদের সেসব হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে যাতে সেখানে সহজলভ্য প্রাকৃতিক সম্পদকে শোষণ করা যায়।

এধরণের প্রতিটি বিষয়ে কমিউনিস্টদের হস্তক্ষেপ করা উচিত। শ্রমিকরা যখন তাদের বাঁচার দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন, মজুরি চান, ন্যূনতম মজুরি যেখানে কার্যকর করা হচ্ছে না— সেখানে জীবনধারণের উপযোগী মজুরি দেওয়ার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে যখন এ ধরণের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন সেন্ট্রার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নসের (CITU) নেতারা সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাও আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এখনও কিছু শ্রমিক জেলে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন।

শ্রমিকদের যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন আমরা তাদের অধিকারের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছি। যখন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সামনে আসে সেখানে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে এবং এমন কার্যক্রমকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়। তাই শ্রমিক, কৃষক ও খেতমজুরদের জন্য গণতান্ত্রিক ও ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমেই সে কাজ করে যেতে হবে।

যখন মহিলা, ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজ আন্দোলনে নামবেন, তখন কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। সমাজের সমস্ত অংশের সঙ্গে এমন জীবন্ত যোগাযোগ বজায় রেখে, সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে সক্ষম হব। প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি, শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের জন্য কর্তব্যবিশেষ।

এধরণের উপস্থিতি ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস আসবে যে এমন একটি শক্তি রয়েছে যাদের উপর তারা আস্থা রাখতে পারেন। সমাজের সাধারণ মানুষকে এই আস্থা দিতে কমিউনিস্ট এবং বামপন্থীদের সমর্থ হতে হবে।

৪. নির্বাচনী ফলাফলে আগের তুলনায় সংসদে আমাদের এবং বামপন্থীদের আসন সংখ্যা কমেছে। এর ফলে কি সংসদে আমাদের সংগ্রাম দুর্বল হয়ে পড়বে? যদি পরিস্থিতি এমনই হয়, তবে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বামপন্থীরা কীভাবে সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার ও তাকে কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করছে?

সংসদ এবং বিধানসভাগুলিতে আমাদের উপস্থিতি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেখানে মানুষের সমস্যাকে উত্থাপন করা যায়। কিন্তু, যেমনটি আমি আগের এক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় উল্লেখ করেছি— কমিউনিস্ট হিসাবে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন পথে, মাঠে-ঘাটে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনেও সেসমস্ত কথা তুলে ধরতে পারি।

কেবল জনগণের প্রতিনিধিত্বের ফোরামই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও মানুষের সমস্যাগুলিকে আমরা অর্থাৎ কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে তুলে ধরি। নির্বাচিত ফোরামের ক্ষেত্রে কমিউনিস্টরা একটি অপ্রচলিত বা ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় তামিলনাড়ুতে বর্তমান টিভিকে (TVK) সরকার আমাদের দলকেও সরকারে যোগ দিতে বলে। আমরা যখন টিভিকে সরকারকে সমর্থন জানাই, তখন কিন্তু তারা প্রকাশ্যে সে ঘোষণা করেনি। সিপিআইএম, সিপিআই এবং ভিসিকে-র সমর্থনের কারণেই ঐ সরকার টিকে আছে। পরবর্তীতে অন্য দল থেকে আরও কয়েকজন পদত্যাগ করে তাদের সমর্থন বাড়িয়েছেন।

তামিলনাড়ু বিধানসভায় কংগ্রেসের পাঁচটি আসন রয়েছে। তারাও আমাদের মতোই ডিএমকে (DMK) জোটের অংশ হিসাবেই ঐ পাঁচটি আসনে জিতেছে। জোট ভেঙ্গে তারা নতুন সরকারে যোগ দিয়েছে এবং প্রশাসনে তাদের দুইজন মন্ত্রী রয়েছেন।

কিন্তু কমিউনিস্টরা সরকারে যোগ দেয়নি। কেউ কেউ মনে করেন যে সরকারে যোগ দিয়ে, সরকারে থেকে মানুষের জন্য কিছু ভালো কাজ করা যায়। তবে এমন ভাবনার আরেকটি দিকও রয়েছে। কমিউনিস্টরা মনে করেন যে, তারা সংসদকে সংগ্রামের এক ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহার করবেন, যেখানে মানুষের সমস্যাগুলিকে উত্থাপন করা যাবে। আমরা তখনই কোনও সরকারে অংশগ্রহণ করব যখন আমরা নিশ্চিত হব যে সরকারে যোগ দিয়ে আমরা মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব। সুতরাং, বিধানসভা বা সংসদে এবং মানুষের মধ্যেও আমাদের পর্যাপ্ত শক্তি থাকতে হবে। তাই কমিউনিস্ট পার্টি প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করে। ১৯৬৭ সালে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ইত্যাদিতে অনেক বিরোধী সরকার গঠিত হয়েছিল। ষাটের দশকের শেষের দিকে সিপিআই(এম) সেই সমস্ত বিরোধী সরকারগুলিতে যোগ দেয়নি। আপনারা জানেন, বাংলায় এটি আলোচনার এক প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে যখন ১৯৯৬ সালে কমরেড জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

আমরা প্রশাসন পরিচালনার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, চর্চা করেছিলাম। আমরা অনুভব করেছিলাম যে এর ফলে শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হবে। তারা মনে করবেন একজন কমিউনিস্ট নেতা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাই তিনি আমাদের বেশিরভাগ সমস্যা অবিলম্বেই সমাধান করতে পারবেন।

আমি তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলাম যা প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণের ইতিবাচক সম্ভাবনা এবং নেতিবাচক সম্ভাবনাগুলি প্রসঙ্গে আলোচনা করেছিল। সংসদে থাকা, গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় দায়িত্ব নেওয়া— যেমন প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া বা সরকারে অংশগ্রহণ করা— কেবল সেটুকুই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, মানুষের জীবিকার লড়াইয়ে আমরা সর্বদা তাদের পাশে থাকব। আমাদের সংসদীয় শক্তি হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কমেনি। শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক অংশের মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করার মানসিকতায় কোনো খামতি আসেনি।

তার মানে এই নয় যে আমরা বিধানসভা বা সংসদে আরও ভালো প্রতিনিধিত্বের জন্য লড়াই করব না। দেরিতে হলেও বাংলায় একটি বামফ্রন্ট সরকার ফিরে আসুক তা আমরা চাই। ত্রিপুরায় একটি বামফ্রন্ট সরকার ফিরে আসুক আমরা তা চাই। কারণ এমন সরকারগুলি মানুষের জন্য অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু শেষ অবধি কি চাই? আমরা চাই সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য জনগণতন্ত্র (People’s Democracy)। এই জনগণতন্ত্রের প্রচারে অনেক সময় আমরা অসমর্থও হই। আর তাই নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন। কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাম শক্তিগুলি কেবল একটা মঞ্চ ধরে রাখার মতো কোনো সংগঠন হওয়া উচিত নয়। আমি নিজে একসময় দক্ষিণ ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম।

কিন্তু এখন আমি ৭০ বছর বয়স পার করেছি। তাই আমার সচেতনভাবে দেখা উচিত, পাশাপাশি পার্টিরও দেখা উচিত যাতে এক নতুন প্রজন্ম তৈরি হয় এবং তারা পার্টির কাজে এগিয়ে আসে। সেই নতুন প্রজন্মের ভাষায় কথা বলতে আমাদের সক্ষম হতে হবে অর্থাৎ তারা যেভাবে কথা বলে সেভাবে। নতুন নতুন শব্দও আসছে।  আদর্শগত প্রত্যয় বজায় রেখেই নতুন প্রজন্মের ভাষায় তাদের কাছে আমাদের পৌঁছাতে হবে।

৪. আগামী দিনগুলোতে ইন্ডিয়া ব্লকের (India bloc) ভেতরে আমরা কী ভূমিকা পালন করব? এই ব্লকের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কী? এ ব্লকের অনেক শরিক দলই এখন অনেক রাজ্যে ক্ষমতায় নেই। এ ব্লকের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কী?

এম এ বেবি: ২০২৫ সালে মাদুরাইতে সিপিআই(এম)- র ২৪ তম পার্টি কংগ্রেস আয়োজিত হয়। পার্টি কংগ্রেসের অধিবেশনে এ প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা হয়েছে। সেই দীর্ঘ আলোচনা থেকেই সিদ্ধান্ত হয় যে মতাদর্শগত বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে এমন সমস্ত রাজনৈতিক পার্টিগুলিকে একসাথে নিয়ে এসে এক সুবিস্তৃত রাজনৈতিক বোঝাপড়া (arrangement) নির্মাণ করাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। সেই বোঝাপড়াকে কেউ ব্লক বলতেই পারেন। গুরুত্বপূর্ণ হল ঐ বোঝাপড়ায় আমাদের মতো মার্কসবাদী পার্টি যেমন থাকবে, সোস্যালিস্টরা থাকবে তেমন কংগ্রেসের মতো দলও থাকবে। কংগ্রেস এমন এক পার্টি যাদের মধ্যে শোষক শ্রেণির প্রতিনিধিরা রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। কিন্তু সংবিধান ও তার মূল্যবোধকে রক্ষা করার প্রশ্নে, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে রক্ষা করার প্রশ্নে যে লড়াই প্রয়োজন তাতে শুধু বামপন্থীদের জোরে এগোনো যাবে না। মনে রাখতে হবে, বিজেপি আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতো পার্টি মাত্র নয়, বিজেপির নিয়ন্ত্রক ও দিশানির্দেশকারী হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) যাদের চরিত্র ফ্যাসিস্টসুলভ। বিজেপিকে সামনে রেখে সেই আরএসএস সারা দেশে নিজেদের শক্তি সংহত করছে। শেষ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির শক্তি কিছুটা কমেছে ঠিকই। এর আগের দুটি নির্বাচনে তারা একাই সরকার গড়েছিল, কিন্তু এবার তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। টিডিপি ও জেডিইউ এর মতো সহযোগীদের থেকে তারা সমর্থন আদায় করে নরেন্দ্র মোদীকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী করেছে। বাংলায় এই প্রথম তারা সরকার গড়েছে, মুখ্যমন্ত্রীও তাদেরই লোক। ইতিমধ্যে ওড়িশায় তারা ক্ষমতা দখল করেছে। অর্থাৎ একাধিক রাজ্যের সঙ্গে এবার উত্তর-পূর্ব ভারতে আরএসএস নিজেকে সংহত করছে। মনে রাখতে হবে দেশে সরকারেও তারাই বসে রয়েছে। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যই এক সুবিস্তৃত রাজনৈতিক বোঝাপড়া দরকার।

একথা ঠিক যে ইন্ডিয়া ব্লকের কোনো কোনো দল বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে উদাসীন। যেমন আম আদমি পার্টি, অবশ্য ইন্ডিয়া ব্লক থেকে তাদের সরে যাওয়ার পিছনে কংগ্রেসের ভূমিকাও মনে রাখতে হবে। তামিলনাড়ুর নির্বাচনে কংগ্রেস যেভাবে জোট ভেঙে টিভিকে সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে তার প্রতিবাদে ডিএমকে ব্লক থেকে নিজেদের কিছুটা সরিয়ে রাখছে। আমি বলতে চাইছি ইন্ডিয়া ব্লকের মধ্যে সমস্যা নেই এমনটা নয়, কিন্তু এসব বাধা কাটিয়েই ইন্ডিয়া ব্লককে সামনে এগোতে হবে। ফ্যাসিস্ট সুলভ আরএসএস-এর নিয়ন্ত্রণে থাকা বিজেপি ও তাদের সহযোগীদের না হলে আটকানো যাবে না।

ভারত একটি বিরাট দেশ। এখানে বহু ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। সারা দেশে মানুষের রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্যে বিভিন্ন ধারার প্রভাব রয়েছে, সেই বৈচিত্রই এদেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, পাঞ্জাব, কেরলম, তামিলনাড়ু যেদিকেই দেখা হোক না কেন প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। আমরা জানতাম ইন্ডিয়া ব্লকের মধ্যেও সেসবের আঁচ আসবে, প্রভাব থাকবে। আরএসএস-বিজেপিকে রুখে দেওয়ার লড়াই আমাদের সবার সাধারণ লড়াই, কিন্তু সে লড়াই দেশের একেক প্রান্তে সেখানকার নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরিখেই একেক কৌশলে সম্পন্ন হবে। একাজে সফল হতে গেলে সিপিআই(এম)-এর নিজস্ব শক্তির বৃদ্ধি ঘটা একান্ত জরূরী। এর পরে বামপন্থীদের আরও বেশি করে সুসংহত করে নির্মিত বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্টই হতে পারে এদেশের বুকে আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে এক কার্যকরী রাজনৈতিক বিকল্প। তার মাধ্যমেই আমরা জনগণতন্ত্রের দিকে এগোতে পারব। আজকের ভারতে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক পার্টির সামনে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এ এক বিরাট দায়িত্ব। যত কঠিনই হোক না কেন ভারতের রাজনীতিতে বামপন্থীদের সেই কর্তব্য সম্পন্ন করতেই হবে। 

এ আলোচনার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

এমন বিষয়ে আলোচনার সুযোগ পাওয়ায় আমিও আনন্দিত, তাই আপনাদেরও ধন্যবাদ জানাই।


উপরের ইউটিউব ভিডিওতে ক্লিক করে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখুন।

ভাষান্তর: সৌভিক ঘোষ

🔍︎ আরও পড়ুন— নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতি এবং ইন্ডিয়া ব্লক


প্রকাশের তারিখ: ০১-জুলাই-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org