|
দক্ষিণপন্থীরা কেন কাজের অধিকারের বিরুদ্ধে?সাত্যকি রায় |
|
পৃথিবীর বৃহত্তম চাহিদা নির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প মনরেগা সরকার বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার পরিবর্তে চালু হয়েছে ভিবিজি-রামজি প্রকল্প। দ্বিতীয় প্রকল্পটি আর কিছুই নয় আর পাঁচটা কর্মসংস্থান প্রকল্পের মত যা বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে। চাহিদা নির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্পে আসলে গ্রামীণ গরিব মানুষকে ১০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়াটা একটি সরকারি দায়বদ্ধতা ছিল এবং সেই দায়বদ্ধতা পালন না হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আইনগত নির্দেশ সরকারকে পালন করতে হত। অর্থাৎ বাজেটে বরাদ্দ নেই বলে মানুষ কাজ পাবে না এ কথা বলার অধিকার সরকারের ছিল না। এর মানে এটা কখনোই নয় যে বিনা বাজেটে প্রকল্পের খরচ ও মজুরি আকাশ থেকে পড়বে। এর আসল অর্থ হল সরকারি খরচের তালিকায় এই প্রকল্প সংক্রান্ত বরাদ্দ প্রাথমিক গুরুত্ব পাবে। অন্য যে কোনো যোগান নির্ভর প্রকল্পে সরকার কোন গ্রামীন কর্মপ্রার্থীকে এ কথা বলতেই পারে যে সরকারের টাকা এক্ষেত্রে যতটা বরাদ্দ সেই অনুযায়ী তোমার কাজের সুযোগ স্বীকৃতি পাবে—টাকা বরাদ্দ না থাকলে কাজ নেই। এই ধরনের প্রকল্পে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ কর্ম দিবসের কার্যত কোন মানে নেই। ১০০ দিনের পরিবর্তে কাজ দেওয়ার ঊর্ধ্বসীমা ১২৫ দিন করা হল না ৩৬৫ দিন করা হল তাতে কিছু যায় আসে না তার কারণ টাকা না থাকলে ১২৫ দিনের পরিবর্তে ১২ দিন কাজ দিলেও কারো কিছু দাবি করার অধিকার নেই। আরও বড় কথা হল মনরেগা প্রকল্পে খরচের ৯০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকার বহন করত যা এখন ৬০ শতাংশ হবে এবং বাকি ৪০ শতাংশ রাজ্য সরকার দেবে। মোদ্দা কথাটি হল রাজ্য সরকারের ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করবে বাকি ৬০ শতাংশ কতটা হবে এবং তার উপরে নির্ভর করবে কত মানুষের কাজ হবে। এক্ষেত্রে যেহেতু কারোরই কোন বাধ্যবাধকতা নেই ফলে রাজ্য সরকার যদি হাত উল্টে বলে আমার পক্ষে টাকা দেওয়া সম্ভব নয় তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ৬০ শতাংশ দেওয়ার কোন প্রয়োজন থাকে না উপরন্তু কাজ না হওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে দায়ী করার একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কেন্দ্র রাজ্য পরস্পরকে দোষারোপ করে সুন্দরভাবে পার পেয়ে যাবে এবং যে মানুষের কর্মসংস্থান মনরেগা প্রকল্পে হচ্ছিল তা কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এর উপরে আবার কোন্ রাজ্যে কোন্ অঞ্চলে গ্রামের মানুষের নতুন কর্মসংস্থান প্রকল্পে কাজ হবে তা ঠিক করবে কেন্দ্রীয় সরকার। অতএব রাজ্য সরকার কোন্ দলের ওই অঞ্চলে প্রকল্প চালু হলে তার রাজনৈতিক ফল কী হবে এবং কাদেরকে কাজ দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করায় মানুষের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে বিভিন্ন স্তরের শাসকদলের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি গুরুত্ব পাবে। মনে রাখা দরকার যে মনরেগা প্রকল্পের সুফল যতটা না প্রত্যক্ষ তার চাইতে অনেক বেশি পরোক্ষ। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা দেখায় যে কর্মসংস্থান ও মজুরি একদিকে সরাসরি অংশগ্রহণকারী মানুষের আয়ের সংস্থান করেছে অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গরিব মানুষের অংশগ্রহণের বহুবিধ ইতিবাচক অভিমুখ খুলে দিয়েছে। গ্রামের গরিবদের জন্য মনরেগার মূল প্রভাব হল তা এক প্রকার মজুরি সুরক্ষার কাজ করেছে। শ্রম বাজারে মজুরি নির্ধারিত হয় নৈতিকতার ভিত্তিতে নয়—নিয়োগকারী ও নিযুক্ত মানুষের পারস্পরিক দরকষাকষির ক্ষমতার উপর। গ্রামের নিঃস্ব ভূমিহীন কৃষি মজুরদের কাছে এই কাজের অধিকার আসলে মজুরির একটি নিম্নতম গ্রহণযোগ্য মাত্রা উপস্থিত করে ছিল। অর্থাৎ সবাই যে মনরেগার কাজেই যুক্ত হয়ে এর সুফল পেয়েছেন তা নয় যারা মনরেগার কাজের সাথে যুক্তই হননি তারাও যখন গ্রামে অন্যান্য মজুরির কাজে যুক্ত হয়েছেন তখন তাদের মজুরি হার ইচ্ছে করলেও নিয়োগকারী মনরেগার মজুরির চেয়ে কম করতে পারেনি। এরই ফলে গ্রামীণ মজুরি হার এই সময়কালে কিছুটা বৃদ্ধি পায় যেটা বিভিন্ন ধরনের নিয়োগকারীর জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামের ভুস্বামী, কন্ট্রাক্টর, বড় ব্যবসায়ী অথবা ব্যক্তিগত কাজে নিয়োগকারী সম্পন্ন পরিবারের লোকেরাও মনরেগার বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে শুরু করে। এর কারণ হল ইচ্ছে মত গ্রামীণ মজুরের মজুরিকে কমানোর স্বাধীনতা চলে গেল! এরপরই প্রকল্প সংক্রান্ত নানা দুর্নীতি ও অপচয়ের বয়ান সরকারি ভাষ্য ও শহুরে জনমানসে প্রাধান্য পেতে শুরু করল।একটি বৃহৎ প্রকল্পে ছোটখাট কিছু দুর্নীতি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এ সংক্রান্ত গবেষণাই দেখায় যে দুর্নীতির কারণে লিকেজের মোট পরিমান প্রকল্প মূল্যের তুলনায় নগন্য। বড় কথা হল বহু রাজ্যে এই ধরনের দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাতে দুর্নীতির মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছিল। দেশের বৃহৎ পুঁজিপতিদের বড় বড় দুর্নীতি ও কর ফাঁকির জন্য কারো কারখানা বা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। কিন্তু যেহেতু মনরেগা বন্ধ হলে গরিব মানুষের ক্ষতি হবে এবং গ্রামের সামন্তপ্রভু ও বড়লোকদের লাভ হবে তাই এই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হল এবং সে নিয়ে দৈনন্দিন বৈঠকি আলোচনায় বিশাল কিছু আলোড়ন তৈরি হয়েছে বলে তো মনে হয় না। এই প্রকল্প বন্ধ হলে গ্রামে শ্রমের মজুত বাহিনী আবার ফুলে ফেঁপে উঠবে যা গ্রামের মজুরি হারকে আবার নিম্নগামী করবে। শুধু তাই নয় কাজ না পাওয়ার কারণে গ্রাম থেকে শহর ও শহরতলীর অভিমুখে কৃষি-বহির্ভূত কাজের আশায় পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ার প্রবণতা বাড়বে। এর ফলে শহরাঞ্চলে অদক্ষ শ্রমিকের যোগান বাড়বে এবং যে সমস্ত ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা আছে সেখানে মজুরী হারও নিম্নগামী হবে। মনে রাখা দরকার যে গরিব মানুষের অর্জিত অধিকার যদি ধনী ও ক্ষমতাসীনরা প্রত্যাবর্তন করাতে সক্ষম হয় তাহলে ক্ষমতার কাঠামোর কারণে ওই অধিকার প্রতিষ্ঠার আগের অবস্থার চেয়েও প্রত্যাবর্তন পরবর্তী অবস্থা প্রতিকূল হয়ে পড়ে। তার কারণ এই পরিবর্তিত অবস্থা অধিকারহীনতার চেয়েও খারাপ, তাকে গরিব খেটে খাওয়া মানুষের অর্জিত অধিকারের বদলা হিসেবে দেখা হয়। এই প্রত্যাবর্তনকে গ্রামীণ ধনীরা তাদের শ্রেণী আধিপত্যের জয় হিসেবে উদযাপন করে। তাই সরকার মনরেগা তুলে দিয়ে যেটা বলতে চাইল সেটা হল গরিব মানুষের ভবিতব্য বড়লোকেদের অনুকম্পার উপরে নির্ভর করবে এটাই স্বাভাবিক হিসেবে মানতে হবে! আসলে কাজের অধিকার নিয়ে দক্ষিণপন্থী সরকার গুলির এত এলার্জি কেন? অধিকারের চেয়ে অনুদান কেন তাদের বেশি পছন্দ? সরকার নানা জনকল্যাণকর প্রকল্পে বিভিন্ন অংশের মানুষকে অর্থ অথবা সুবিধা দিয়ে থাকে, তাতে সরকারের বিশেষ অসুবিধা নেই। কেন্দ্রে, রাজ্যে, দেশে ও বিদেশে এই ধরনের দক্ষিণপন্থী জনকল্যাণ প্রকল্পের অজস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু কাজের বিনিময়ে অর্থ পাওয়া আর যে অর্থ প্রাপ্তির সঙ্গে কাজের কোন সম্পর্ক নেই—এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য আছে, যেটা শাসক শ্রেণী ভালো করে বোঝে। কাজ পাওয়াটা যদি অধিকার হয় তাহলে কাজ যে দিচ্ছে সে উপকারীর চরিত্রে অবতীর্ণ হতে পারে না এবং সে কারণেই প্রাপ্ত মজুরিটা মানুষ অনুদান হিসেবে দেখে না বরং তার প্রাপ্য হিসেবেই দেখে।জিনিসপত্রের দাম বাড়লে মজুরি বৃদ্ধির দাবিটা সমাজে স্বীকৃতি পায় তার কারণ যে মানুষ এই দাবি করছে সে উৎপাদনের সাথে যুক্ত।কিন্তু যে অনুদান বা ভাতাগুলি কাজের সঙ্গে যুক্ত নয় সেই অনুদানের পরিমান মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি করার দাবির কোন সামাজিক স্বীকৃতি জোটে না।এর কারণ অনেকেই মনে করেন যে এই অর্থ তো কোন উৎপাদনের বিনিময় দেওয়া হচ্ছিল না ফলে তা বাড়ানোরও কোন প্রশ্নই ওঠে না।অনুদানের পরিমাণের কোন ন্যায় অন্যায় হয় না। বিনা কাজে যা পাচ্ছো ওতেই সন্তুষ্ট থাকো, বেশি চাইলে যা পাচ্ছ সেটাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে! এ কারণেই শাসকদের কাছে অনুদান শ্রেয়, অধিকার বিপজ্জনক। দ্বিতীয়ত, কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে শোষণের সম অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শ্রমজীবী মানুষ পরস্পর পরস্পরের স্বার্থের কাছাকাছি আসতে থাকে ফলে শ্রেণির নির্মাণ সহজতর হয়। ব্যক্তি মানুষ শোষণের কাঠামোয় অনেকের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়। অনুদানে সেসব কোন ঝামেলা নেই। সরকার ও অনুদান প্রাপকের মধ্যে এক্ষেত্রে সরাসরি যোগাযোগ। কোন শ্রেণি সংহতির বাস্তব প্রয়োজনীয়তা গড়ে ওঠে না। উপরন্তু কাজ না পাওয়ার ক্ষোভও কিছুটা প্রশমিত হতে পারে, কারণ ততদিনে কাজ না পাওয়াটাকেই মানুষ স্বাভাবিক হিসেবেই ধরে নিয়েছেন।তৃতীয়ত, অধিকারের চেয়ে অনুদানের রাজনৈতিক বিনিময় ফল অনেক বেশি।যে প্রজন্ম অধিকারের জন্য লড়াই করেছে অথবা অধিকারের প্রথম স্বাদ পেয়েছে তারা কোন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে পারে কিন্তু যত সময় যায় ওই অধিকার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং কোন কিছু হারানোর ভয় চলে যায়।তাই অধিকারের প্রণেতার প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। সেক্ষেত্রে অধিকার প্রসারিত করার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা সম্ভব।অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন অংশের জন্য যে অনুদান প্রকল্পগুলো চালু হয় তা মানুষের মধ্যে একটা বিশেষ বাড়তি পাওনার অনুভূতি নিয়ে আসে— যা সবার জন্য নয়, আবার যা প্রাপ্য নয় তা হারানোর ভয়ও থাকে— এই বোধ রাজনৈতিক আনুগত্যের দিক থেকে অনেক শক্তিশালী ফলাফল এনে দিতে পারে। মনরেগা তুলে নেওয়া অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শ্রম কোড এই দুইয়ের দর্শন একটাই।কাজের জায়গায় শ্রমিকের অধিকারকে খতম করে নিয়োগকারীর শোষণের পূর্ণ স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা।গরিব খেটে খাওয়া মানুষের কাজের ক্ষেত্রে নিজেদের অধিকার রক্ষার যেটুকু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ছিল তাকে সমূলে বিলোপ করাই এগুলির লক্ষ্য।তারপর বর্ধিত শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত রাজনৈতিক ভাবে একা হয়ে যাওয়া মানুষদের কাছে অনুদানের থলি নিয়ে হাজির হতে হবে রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড়ের জন্য! শুধু তাই নয় যত আয় ও অধিকার কমবে ওই নিঃস্ব মানুষের কাছে একই অল্প অনুদানের টাকাটার গুরুত্বও ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। অতএব মোদ্দা কথা হল মালিকের শ্রমিক বাবদ খরচ কম। সরকারের অনুদান বৃদ্ধির কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বরং কৃতজ্ঞতা জনিত রাজনৈতিক ফায়দা আছে। খরচ কম রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি--এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে? দক্ষিণপন্থী এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ছাড়া গরিব খেটে খাওয়া মানুষের জন্য আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-জানুয়ারি-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |