|
মাইক্রোফাইনান্স, সমস্যার স্বরূপরানা মিত্র |
|
গৌড়চন্দ্রিকা নয়, মোদ্দা কথা ...আমি আর সহ্য করিতে না পারিয়া বলিলাম, ‘থাম! থাম মার্জ্জারপণ্ডিত! তোমার কথাগুলি ভারি সোশিয়ালিষ্টিক্! সমাজবিশৃঙ্খলার মূল! যদি যাহার যত ক্ষমতা, সে তত ধনসঞ্চয় করিতে না পায়, অথবা সঞ্চয় করিয়া চোরের জ্বালায় নির্ব্বিঘ্নে ভোগ করিতে না পায়, তবে কেহ আর ধনসঞ্চয়ে যত্ন করিবে না। তাহাতে সমাজের ধনবৃদ্ধি হইবে না।’ মার্জ্জার বলিল, ‘না হইলে ত আমার কি? সমাজের ধনবৃদ্ধির অর্থ ধনীর ধনবৃদ্ধি। ধনীর ধনবৃদ্ধি না হইলে দরিদ্রের কি ক্ষতি?’ আমি বুঝাইয়া বলিলাম যে, ‘সামাজিক ধনবৃদ্ধি ব্যতীত সমাজের উন্নতি নাই।’ বিড়াল রাগ করিয়া বলিল যে, ‘আমি যদি খাইতে না পাইলাম, তবে সমাজের উন্নতি লইয়া কি করিব?’ —বিড়াল, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চৈত্র, ১২৮১, বঙ্গদর্শন পত্রিকা। আজ থেকে ১৫১ বছর আগে, তৎকালীন বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলার প্রথম সফল কথা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই বিড়াল রচনাটি আজকের ভারত তথা বাংলার শ্রেণিবিভক্ত সমাজেরও এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, তাকে পালটানোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করে, কমলাকান্ত ও বিড়ালের কাল্পনিক কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির হাত ধরে গ্রাম ভারত ও গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা বা মাইক্রোফাইনান্সের দাপট গরিব কৃষক বা মহিলাদের ঋণজালে জড়িয়ে দিয়ে সর্বস্বান্ত করার নিরন্তর উদ্যোগে ব্যস্ত, তার থেকে বাঁচতে একদিকে যেমন স্বল্পমেয়াদী কার্যকরী, বিকল্প পদক্ষেপ জরুরী, একইভাবে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ের সাথে এই ছোট, ছোট ক্ষুদ্র পরিসরের লড়াইগুলো গড়ে তোলা বা তাকে শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। এই লক্ষ্যেই প্রথম প্রয়োজন এই মাইক্রোফাইনান্সের করালগ্রাসের বিস্তারের রাজনৈতিক অর্থনীতিটা বোঝা, আর বুঝে নিয়ে, নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে, আশু ও দীর্ঘমেয়াদী অসংখ্য ছোট, ছোট লড়াইগুলোকে সংহত করে, এক ব্যাপক লড়াইয়ের রূপ দেওয়া। একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীক্ষা এই লক্ষ্যেই সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি ও ইণ্ডিয়ান স্কুল অব উইমেন স্টাডিজ অ্যাণ্ড ডেভেলপমেন্ট দেশজুড়ে সম্প্রতি ২১ টি রাজ্যে, ১০০ গ্রামে, ৯০০০ হাজার প্রান্তিক মহিলাদের মধ্যে (পশ্চিমবঙ্গে ১০২০ জন মহিলা) এই মাইক্রোফাইনান্সের উত্তরোত্তর বেড়ে চলা দাপট নিয়ে এক কার্যকরী সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষার কাজ চালাতে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড ইউনিয়ন, যেমন, সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতিসহ অন্যান্য প্রগতিশীল গণসংগঠনগুলোও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এই বিস্তারিত প্রতিবেদনটা গত ২৩-২৪ অগাস্ট ২০২৫ দিল্লির হরকিষেণ সিং সুরজিৎ ভবনে এক গণশুনানির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। এই গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গসহ ২০ টি রাজ্য থেকে ৫০০ জন মহিলা প্রতিনিধি। এর মধ্যে থেকে ১৬ জন মহিলার সাক্ষ্য গ্রহন করা হয়। জুরি বোর্ডে ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মদন লোকুর, সুপ্রিম কোর্টের নামকরা আইনজীবী কীর্তি সিং, সাংবাদিক পামেলা ফিলিপোজ ও ব্যাঙ্ক অফিসারদের সংগঠন আইবকের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক টমাস ফ্রাঙ্কো। এই সমীক্ষা ও গণশুনানিতে একদিকে যেমন মাইক্রোফাইনান্সের দাপটে চরম ভুক্তভোগী গরিব, প্রান্তিক মহিলাদের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে সংযোজিত হয়, একইভাবে সারা ভারত নাবার্ড কর্মচারী সমিতি, কেরালার সফল বিকল্প ক্ষুদ্র ঋণ মডেল কুদুম্বশ্রী, তামিলনাড়ুর মাল্লার প্রভৃতি সংগঠন থেকে উপস্থিত নেতৃত্ব বিকল্প মডেল তুলে ধরেন। সবশেষে, জুরি বোর্ড এই গণশুনানির ভিত্তিতে তাদের অতি মূল্যবান কার্যকরী পদক্ষেপগুচ্ছ এক সুচারু প্রতিবেদনের আকারে দেশের সামনে তুলে ধরেন। বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্সের দাপট উপরোক্ত বিষয়টি নয়া উদারবাদের এক সামগ্রিকতার পটভূমিতেই বিচার করা উচিত, যার মূলে আছে বিশ্বজুড়ে আর্থিক পুঁজির বিস্তার, বল্গাহীন শোষণ, বর্তমানে আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের নব্য ফ্যাসিবাদী ও একচেটিয়া পুঁজির সাথে এই নয়া উদারবাদের গাঁটছড়া বাঁধা; আর এর ফলে এই মডেলের ক্রমশঃ ঘনিয়ে ওঠা বর্তমান সংকট। বিষয়টি ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের পটভূমিতে বুঝতে গেলে কিছু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্যে ডুব দিতেই হবে। প্রথমেই দেখা যাক, ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া, ভারতের ক্ষুদ্র ঋণদানের সরকারি মডেলটির জনক, নাবার্ডের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন রুরাল ইকনমিক কন্ডিশানস অ্যান্ড সেন্টিমেন্টস সার্ভে, সেপ্টেম্বর ২০২৪, নাবার্ড অল ইন্ডিয়া ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশান সার্ভে (এনএএফআইএস), ২০২১-২২। এই প্রতিবেদন দু’টিতে দেখা গেল, গোটা দেশে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ৩৭.৬ শতাংশের যেমন আয় বেড়েছে ২০২৪ সালে, তেমনি বেড়ে চলা নানা খরচ ও জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধির কারণে, ৮০ শতাংশ পরিবারের ভোগব্যয়ও বেড়েছে মারাত্মক হারে। ফলে, ৫১.৩ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের সঞ্চয়ের প্রবণতা হয় বাড়েইনি, নতুবা, ২৭.৮ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমেছে। সম্ভবত, এই প্রবণতারই আরেকটি প্রতিফলন দেখা যায় ভারতের পরিবারগুলোর নিট আর্থিক সঞ্চয়ের হার মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির নিরিখে ২০২৩ সালে পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিন্ম স্তরে, ৫.১ শতাংশে নেমে যাওয়ার মধ্যে। এনএএফআইএস, ২০২১-২২ দেখাচ্ছে, ভারতের গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যে উদ্বৃত্ত থাকে তার মাসিক পরিমান মারাত্মক কম, মাত্র ১৪৩৬ টাকা। নানা ঢক্কানিনাদ সত্ত্বেও, পশ্চিমবঙ্গে এর পরিমান এই জাতীয় গড়ের থেকেও অনেকটাই কম, মাসে মাত্র ৯৪৭ টাকা। পাশের রাজ্য ওড়িষায় এই উদ্বৃত্ত মাসে ৯৭৯ টাকা, বিহারে ৪৩৩ টাকা, ঝাড়খণ্ডে ৬১৪ টাকা, উত্তরপ্রদেশে ৯০৩ টাকা, এমনকি তথাকথিত ঝাঁ চকচকে উন্নয়ণের মডেল গুজরাটে মাত্র ১৩০৩ টাকা (অর্থাৎ জাতীয় গড়ের থেকে কম)। তামিলনাড়ু, কেরালা, রাজস্থান প্রভৃতি রাজ্যে এই উদ্বৃত্তের পরিমান মাসে গড়ে ২০০০ টাকার বেশি। অন্যদিকে পঞ্জাবে এই উদ্বৃত্ত মাসিক ৫৬৮৩ টাকা, হরিয়ানায় ৪৯৫৬ টাকা। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে,তামিলনাড়ু, কর্নাটক,অন্ধ্র বাদ দিলে, এই মাইক্রোফাইনান্সের দাপট মূলত দেশের পূর্বাঞ্চল (যেমন বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িষা,আসাম, ঝাড়খণ্ড) ও উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যগুলোর মধ্যে বেশি, যেখানে গ্রামীণ, বিশেষতঃ মহিলাদের অর্থনৈতিক প্রগতির হার, সঞ্চয় ইত্যাদি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আরও পড়ুন– কবিগুরুকেও পুশব্যাক! পাশাপাশি, নজর করলে দেখা যাবে, পশ্চিমবঙ্গ-সহ এই রাজ্যগুলোতে গরিবের বন্ধু সমবায় ব্যাঙ্ক বা সামগ্রিকভাবে সমবায় ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা, ১৯৬৯ সালের জাতীয়করণের পর গরিব, প্রান্তিক মানুষদের কাছে ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার সুফল পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গৌরবজনক ভূমিকা নিলেও, বর্তমানে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির চাপে, সংযুক্তিকরণ, বেসরকারিকরণ, কর্মীসংখ্যার প্রবল অপ্রতুলতা প্রভৃতি সরকারি নীতির কারণে, ক্রমশঃ শহরমুখী, বৃহৎ, কর্পোরেট বানিজ্যিক শিল্প ও কৃষিতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। এমনকি কৃষি ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও, এখন নানা অছিলায় কর্পোরেট কৃষিকে পুষ্ট করার অভিপ্রায়ে কলকাতা, মুম্বাই প্রভৃতি শহুরে শাখাগুলোর থেকে কৃষি ঋণ বিতরণের পরিমান ক্রমশঃ উর্দ্ধমুখী। এরই পরিপূরক আর সমান্তরাল প্রবণতা হিসাবে দেখা দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব-সহ বানিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলোর বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানি, যেমন, নন্ ব্যাঙ্কিং মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানি (এনবিএফসি-এমএফআই), নন্ ব্যাঙ্কিং ফাইনান্স কোম্পানি (এনবিএফসি), স্মল ফিনান্স ব্যাঙ্ক (এসএফবি), ইত্যাদি বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কম সুদে ঋণের যোগান দিয়ে পুষ্ট করা, বা, এদের প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা, যাতে তারা এই পুঁজি উঁচু সুদের হারে, গরিব, ভূমিহীন কৃষক, মহিলা এদের সরবরাহ করে মুনাফা কামাতে পারে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আবার বানিজ্যিক ব্যাঙ্ক থেকে মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলোকে ঋণদান সামাজিক অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের (প্রায়োরিটি সেক্টর অ্যাডভান্সেস) তালিকায় ফেলে এদের পুঁজির যোগান নিশ্চিত করতে চেয়েছে, যা একান্তভাবেই জনবিরোধী। পশ্চিমবঙ্গে কতটা ভয়ঙ্কর পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে, গোটা দেশের নয়া উদারবাদী সামগ্রিক প্রবণতার অংশ হিসেবে ও নির্দিষ্টভাবে, ২০১১ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে পুষ্ট হয়ে, সমবায় ব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়। সমবায় ব্যবস্থা পরিচালনার জনঅংশগ্রহন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে নতুন ব্যবস্থায় একদিকে কেন্দ্র (তার নতুন সমবায় নীতির মাধ্যমে), অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসন এক কালাপাহাড়ী আক্রমণে প্রায় খাদের কিনারায় এনে ফেলেছে। লক্ষ্মীন্দর-বেহুলার বাসরের ওই ছিদ্র পথেই প্রবেশ করেছে কালনাগিনী। বা, হরেক কিসিমের বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলো। এরা ২০২২ সাল থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলোর ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়া প্রভৃতি সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে গরিব মানুষ, বিশেষত মহিলাদের চড়া সুদে, অথচ সহজে, একাধিক ঋণ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, ঋণজালে জড়িয়ে দিয়েছে। ফলত, আয়ের সাথে ঋণগ্রহনের কোন সামঞ্জস্য না থাকার কারণে, এই গরিবগুর্বো মানুষ, মহিলারা চড়া সুদের (যার পরিমান, এমনকি, বার্ষিক ৬০-৭০ শতাংশেরও বেশি) এই ঋণশোধের ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে। এই প্রেক্ষিতে মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলি গায়ের জোরে, কোথাও বাউন্সার নিয়োগ করে, মহিলা, গরিব মানুষদের ঘর, বাড়ি, ঘটিবাটি, যে কোনও কার্যকরী সম্পদ, দখল করে নিচ্ছে। মহিলাদের সম্ভ্রম, মানইজ্জত ধরেও টানাটানি করতে এদের বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামাঞ্চলে মানুষ ক্ষোভে, এই বিকৃত ঘৃণ্য মডেলটির নাম দিয়েছে, ‘বৌ-বন্ধকী’ ঋণ! এর আসল তাৎপর্য কি, তার ব্যাখ্যা নিস্প্রয়োজন। অথচ, ১৯৯২ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা দেশে নাবার্ড স্বনির্ভর গোষ্ঠী–ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের রাস্তা খুলে দিয়ে, সরকারি ক্ষেত্র পরিচালিত মাইক্রোফাইনান্স মডেলকে কার্যকরী করে। বর্তমানে নানা ত্রুটি সত্ত্বেও এই মডেলটির আওতায় রয়েছে ১৪৩.৩০ লক্ষ ব্যাঙ্ক সংযুক্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠী। তার মধ্যে ৮৪.৯৪ লক্ষ গোষ্ঠী মোট ৩.০৪ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ঋণ পেয়েছে। (প্রসঙ্গত, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, পশ্চিমবঙ্গে, রাজ্য সমবায় ব্যাঙ্ক ‘সমবায়ের মধ্যে সমবায়’ নীতি প্রয়োগ করে, সমবায় ব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলতঃ মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো গড়ে তোলে, এই মডেলটিকে গোটা দেশে নাবার্ডও স্বীকৃতি দেয়)। এই ব্যবস্থা ২০০০ সালের পর নয়া উদারবাদের বল্গাহীন দাপটে, গোটা দেশেই ক্রমশঃ দুর্বল হতে শুরু করে। এর জায়গা নেয়, বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্স মডেল। 📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ যদিও, সাম্প্রতিক সময়ে, অনাদায়ী ঋণ, সুলভ পুঁজির সরবরাহের অপ্রতুলতার দরুণ, ক্ষুদ্র ঋণদানের এই দ্বিতীয় কর্পোরেট বেসরকারি মডেলটি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলস্বরূপ, এদের ২০২৫ সালে মার্চ মাসের শেষে, মোট ঋণদানের পরিমান (আউটস্ট্যান্ডিং লোন) দাঁড়িয়েছে ৩,৮৪,২২৫ কোটি টাকা, যা মার্চ, ২০২৪-র তুলনায় ২৭,০০০ কোটি টাকারও (১৪ শতাংশ) কম। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে, এদের মোট জমে থাকা দেয় ঋণের পরিমান ৩৬,১৬১ কোটি টাকা (মার্চ, ২০২৪) থেকে কমে হয়েছে ৩১,৪৯৭ কোটি টাকা (মার্চ, ২০২৫); অর্থাৎ, প্রায় ১৩ শতাংশ কম। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গে, ৯,৩৭,০৩২টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ব্যাঙ্ক ঋণ ২৫,০৮৬ কোটি টাকা (২০২৪)। ২০২৫-এ গোটা দেশে, কর্পোরেট মাইক্রোফাইনান্স মডেলের অনাদায়ী ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪.৮৩ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ২.০৪ শতাংশ। অথচ, স্বনির্ভর গোষ্ঠী-ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের মডেলের অনাদায়ী ঋণের হার ২০২৫ সালে মাত্র ১.৭৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ২.০৫ শতাংশ। অন্যান্য তথ্যের সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি বুঝিয়ে দেয় যে, নাবার্ডের মূল ক্ষুদ্র ঋণদান মডেলটি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র ঋণদান মডেলটির তুলনায় কতটা বেশি কার্যকরী। দুঃখের বিষয়, বর্তমান কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন, বা সরাসরি মদতে, এই দ্বিতীয় কর্পোরেট মডেলটির ‘পোস্টার বালক’ হয়ে উঠেছে প্রথমত বিহার, আর দ্বিতীয়ত পশ্চিমবঙ্গ। বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রিত সংস্থা, ‘সাধন’ তাদের ২০২৫ সালের মার্চ মাসের প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, গোটা দেশের যে ২৫টি জেলায় বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্সের দাপট সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে ১১টি জেলা বিহারের, আর তারপরেই আজকের পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জেলা। গোটা দেশে শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা, যেখানে মোট মাইক্রোফাইনান্স ঋণ ৪২৩৯ কোটি টাকা (২০২৫)। ঘুরে দাঁড়াতেই হবে তাই এই বেসরকারি আর্থিক হাঙরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লড়াই কোনও একটি বা দু’টি সংগঠনের কাজ নয়। এর রাজনৈতিক অর্থনীতিটাকে সঠিক উপলব্ধির মধ্যে এনে, আজকের কেরালার জনমুখী, রাজ্য সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ‘কুদুম্বশ্রী’ মডেল, বা পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের ‘সমবায়ের মধ্যে সমবায়’ মডেলটি, বা নাবার্ডের স্ব-নির্ভর গোষ্ঠী-ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ মডেলগুলোকে পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশে শক্তিশালী, বা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কেন্দ্র, রাজ্য সরকার, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। যেমন, বেসরকারি মাইক্রোফাইনান্স কোম্পানিগুলোকে আরো কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে তার আর্থিক উদ্বৃত্তের অংশ হিসেবে, আগের মত নাবার্ডকে পর্যাপ্ত সুদহীন অর্থের যোগান দেওয়া। সরকারি, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, সমবায় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ইত্যাদি। এই পথই রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠির’ ভাষায় ‘সভ্যতার পিলসুজ’দের লড়াইকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে পারে। আরও পড়ুন– প্রকাশের তারিখ: ০৯-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |