সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রম শক্তি নীতি ২০২৫: মুক্ত বাজার আর মনুস্মৃতির মিশেল
কে এন উমেশ
শ্রম আইন বলবৎ করা, বিধিনিয়ম মেনে চলা, পরিদর্শনের ব্যবস্থা এবং শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আপস আলোচনার ব্যবস্থা করা বা ফয়সালা করা — শ্রম আইনের পরিসরে এসব কাজে শ্রম মন্ত্রকের ভূমিকা রয়েছে। আলোচ্য নীতিতে মন্ত্রকের সেই সব কাজের সুযোগ ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন শ্রম মন্ত্রকের ভূমিকা হবে শুধুমাত্র নিয়োগ বা কাজ পেতে সাহায্য করা। তবে সেই দায় মন্ত্রক ঠিকমতো পালন করছে কিনা তা পরিমাপ করার কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। শ্রম শক্তি নীতি ২০২৫ মালিকশ্রেণির হাতে সেই ক্ষমতা দিতে চেয়েছে যাতে তাদের কাছে শ্রম আইন ভাঙার লাইসেন্স থাকে। তার চেয়েও বড় কথা, এমনকী অনেক বেশি দুর্বল করে ফেলা শ্রম কোডগুলিকেও ক্রমাগত লঙ্ঘন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এবং মালিকপক্ষকে এমনভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে যাতে তারা নয়া মুক্ত বাণিজ্যের একটা রাজত্ব কায়েম করতে পারে।

কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক একটা খসড়া নীতি প্রকাশ করেছে। এই খসড়া নীতির শিরোনাম — শ্রম শক্তি নীতি ২০২৫। এই নীতির পরিপ্রেক্ষিত ও উদ্দেশ্য হিসাবে বলা হয়েছে যে, এর শিকড় রয়েছে সমানাধিকার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার মতো সাংবিধানিক মূল্যবোধের ভিতরে। এই নীতির বৈধতা এবং নৈতিক কর্তৃত্বের উৎস ভারতের সংবিধান। ভারতের সংবিধানই গড়ে দিয়েছে একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনকল্যাণমুখী শ্রম ব্যবস্থার ভিত। সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার এবং নির্দেশাত্মক নীতিই হল ভারতীয় শ্রম আইন পরিচালনার ভিত্তি। দাবি করা হয়েছে যে, এই নীতি আসলে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর উপযোগী শ্রম বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে একটা নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গী। এর শিকড় রয়েছে শ্রম ধর্ম সংক্রান্ত সভ্যতার আদর্শের মধ্যে। সেই আদর্শের আবার ভিত্তি হল মনুস্মৃতি ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ, যেখানে কাজের নৈতিক মূল্যবোধের নিদান দেওয়া আছে।
এই খসড়া নীতিতে যেবিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে তাতে এর আসল উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। এই নীতি প্রাসঙ্গিকতাও হারিয়েছে। কারণ এই নীতির অনুপ্রেরণা হল সেই শ্রম ধর্ম যার ভিত্তি প্রাচীন কালের মনুস্মৃতি সহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ। সেটার ভিত্তিতেই শ্রম কোড কার্যকর করার চেষ্টা হচ্ছে। এই দুটো বিষয়ই ভারতের সংবিধান বিধৃত মূল্যবোধের বিরোধী। প্রথম জাতীয় শ্রম কমিশনের শীর্ষে ছিলেন বিচারপতি শ্রী গজেন্দ্র গাডকার। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা অনুসারে প্রথম জাতীয় শ্রম কমিশন কিছু আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ করেছিলেন রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতি কার্যকর করার জন্য। কিন্তু এখানে যে নীতি সংক্রান্ত বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তা রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এখানে ভণ্ডামিপূর্ণ ভাবে দাবি করা হয়েছে যে এই নীতির ভিত্তি হল রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতি। দাবি করা হয়েছে যে, এই নীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্য। এবং দাবি করা হয়েছে যে, পুরো প্রক্রিয়াটির শিকড় রয়েছে সাংবিধানিক মূল্যবোধের মধ্যে। এই দাবি সর্বৈব মিথ্যা ও প্রতারাণমূলক।
চারটি শ্রম কোডে শ্রমিক বিরোধী যে সব ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সেগুলিকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রবল চেষ্টা করা হয়েছে এই নীতিতে। বিদেশি ও দেশি বেসরকারি কর্পোরেট স্বার্থ যাতে রক্ষা করা যায় সেজন্য এই নীতির মাধ্যমেই চারটি শ্রম কোড কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়েছে। এবং তা করা হয়েছে নয়া উদারবাদী ব্যবস্থার আওতায়। এমনকী যাতে শ্রম কোডকেও লঙ্ঘন করা যায় সেই লক্ষ্যেও অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিদেশি ও দেশি বেসরকারি কর্পোরেট শক্তিকে।
কার্যকর করার ব্যবস্থাদি এবং পরিদর্শনের কর্তৃত্বসহ শ্রম আইনগুলি পরিচালনার কাজে রক্ষকের ভূমিকা পালনের দায়িত্ব শ্রম মন্ত্রকের। এই নীতি মন্ত্রকের হাত থেকে সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এখানে নিজেরাই নিজেদের শংসাপত্র দেওয়ার মাধ্যমে স্বপরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এবং এভাবে নিয়োগকর্তার অপরাধগুলিকে অপরাধ হিসাবে গণ্য না করার আরো বেশি ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে জনবিশ্বাস আইনের মাধ্যমে, শ্রম সুবিধা সমাধান পোর্টাল চালু করে, সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত কিন্তু খেয়ালখুশিমতো পরিদর্শনের ব্যবস্থার সুযোগ করে দিয়ে।
শ্রম আইন বলবৎ করা, বিধিনিয়ম মেনে চলা, পরিদর্শনের ব্যবস্থা এবং শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আপস আলোচনার ব্যবস্থা করা বা ফয়সালা করা — শ্রম আইনের পরিসরে এসব কাজে শ্রম মন্ত্রকের ভূমিকা রয়েছে। আলোচ্য নীতিতে মন্ত্রকের সেই সব কাজের সুযোগ ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন শ্রম মন্ত্রকের ভূমিকা হবে শুধুমাত্র নিয়োগ বা কাজ পেতে সাহায্য করা। তবে সেই দায় মন্ত্রক ঠিকমতো পালন করছে কিনা তা পরিমাপ করার কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এই নীতি মালিকশ্রেণির হাতে সেই ক্ষমতা দিতে চেয়েছে যাতে তাদের কাছে শ্রম আইন ভাঙার লাইসেন্স থাকে। তার চেয়েও বড় কথা, এমনকী অনেক বেশি দুর্বল করে ফেলা শ্রম কোডগুলিকেও ক্রমাগত লঙ্ঘন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এবং মালিকপক্ষকে এমনভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে যাতে তারা নয়া মুক্ত বাণিজ্যের একটা রাজত্ব কায়েম করতে পারে। এখন চালু শ্রম আইনগুলি ক্রমশ বেশি বেশি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। অথচ সেবিষয়ে এই নীতি চোখ বন্ধ করে রাখার অবস্থান নিয়েছে। বরং চাইছে শ্রম আইনের বিধিনিষেধগুলি আরও ছাঁটাই করতে। যেসব নিয়ম চালু রয়েছে সেগুলি মেনে চলতে বাধ্য করার যে দায়িত্ব মন্ত্রকের রয়েছে সেই ক্ষমতাও কেড়ে নিতে চাইছে এই নীতি। কারণ তাদের লক্ষ্য হল দানবীয় কর্পোরেট দাসত্ব প্রক্রিয়া যাতে চালু করা যায় তার ব্যবস্থা করা।
এই নীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ ঘটনা হল, শ্রমিকদের একটা বিরাট অংশকে এখনকার শ্রম আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা করা সম্ভব হয়েছে কারণ শ্রম কোডের আওতায় থাকতে পারে এমন শিল্প ইউনিটে যুক্ত থাকা শ্রমিক সংখ্যার সীমা অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা বারে বারে দাবি করা সত্ত্বেও শ্রম কোডের আওতায় আরো বেশি শিল্প সংস্থাকে আনার জন্য শ্রমিক সংখ্যার সীমা কমানো হয়নি। তাই এই নীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক — এমন দাবিটা নেহাতই ভণ্ডামি এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে জালিয়াতি করার সমান। পোর্টাল চালু করে ও জিডিটাইজেশনের মাধ্যে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা সর্বজনীন করা হয়েছে, এমন দাবিও কোনও বাজেট বরাদ্দ ছাড়া নেহাতই অর্থহীন।
যদি নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হয় তবে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ২০২৪-২৫ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা দেখাচ্ছে, পরবর্তী দশকের জন্য বছরে গড়ে ৮৫ লক্ষ কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। কিন্তু সরকারের নীতি যা, এবং প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ এবং ক্যাপেক্স ইনসেনটিভের নামে যত ধরনের সুবিধা বিলি করা হয়েছে, তাতে যত সংখ্যক কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে তত কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি। নিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ইনসেনটিভ স্রেফ একটা ধাপ্পার হাতিয়ার যার সাহায্যে এমনকী সংগঠিত সেক্টরের চাকরিগুলোকেও ধাপে ধাপে অসংগঠিত কাজে পরিণত করা যায়। এবং তা করা হচ্ছে অ্যাপ্রেন্টিশশিপ, ইন্টার্ন এবং ট্রেনি ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে যাতে পুরো বিষয়টাকে সব ধরনের শ্রম আইনের আওতার বাইরে এনে ফেলা যায়।
শিল্পসমূহের বার্ষিক সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে নীট মূল্য যুক্ত করার ক্ষেত্রে মজুরির অংশ একেবারে চোখে পড়ার মতো কমছে। ১৯৮১-৮২ সালে যেখানে নীট মূল্য যুক্ত করার ক্ষেত্রে মজুরির অংশ ছিল ৩০.২৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে তা নেমে এসেছে ১৫.৯৭ শতাংশে। উল্টোদিকে মালিকদের লভ্যাংশের অনুপাত একই সময়পর্বে ২৩.৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫১.০১ শতাংশ। মজুরির অনুপাত কমায় একই সঙ্গে কমেছে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি কোম্পানির হাতে অতিরিক্ত নগদ জমে রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকা। তবে চাহিদা সংকুচিত থাকায় সেই টাকা তারা বিনিয়োগ করতে পারছে না। এর ফলে সংগঠিত ক্ষেত্রে সুস্থভাবে বাঁচার মতো চাকরি তৈরি হচ্ছে না।
শ্রমের পরিচালন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর যে প্রয়াস সেটা চরিত্রের দিক থেকে খুবই ধ্বংসাত্মক। মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে গত ১১ বছরে এটাই বেপরোয়াভাবে কার্যকর করা হয়েছে। সেই বিষয়টাই এই নীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিরোধের ফলে ২০১৯-২০ সাল থেকে শ্রমিকবিরোধী, মালিকদের স্বার্থবাহী চারটি শ্রম কোড মোদি সরকার কার্যকর করতে পারেনি। এখন শ্রম শক্তি নীতির নামে মোদি সরকার সেগুলি চালু করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন তৃতীয় প্রজন্মের সংস্কারের কথা। সেই ভাষণে মালিকপক্ষের জন্য তাঁর নিদান ছিল, ধাম কম-ধুম জ্যাদা (খরচ কম-আরও গুণমান) মন্ত্র। শ্রম শক্তি নীতি সেই ভাষণেরই অনুসারী।
ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের ত্রিপাক্ষিক ব্যবস্থা, আলোচনা ও পরামর্শ করার জন্য ত্রিপাক্ষিক সংস্থাগুলি, বিধিবদ্ধ পরামর্শদাতা সংস্থা, সবগুলিকে এক ধাক্কায় বিদায় করা হয়েছে। তার বদলে শ্রম কোডে যে সব অন্যান্য কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলি রাখাই হয়েছে শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরকে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনার জন্য। গত ১০ বছর ধরে ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের আয়োজন না করার রেকর্ড রয়েছে মোদি সরকারের। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির তরফে বার বার এর আয়োজনের দাবি তোলা সত্ত্বেও এবং এই আয়োজন না করার কারণে সরকারের বিরুদ্ধে সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সমালোচনা সত্ত্বেও ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের আয়োজন করার বিষয়ে সরকার কর্ণপাত করেনি। সেই ১৯৪২ সাল থেকে বিদ্যমান ত্রিপাক্ষিক ফোরাম আইএলসি। এই সংস্থার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছনোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তা তুলে দেওয়া হয়েছে। এবং তার বদলে গৃহীত নীতি কার্যকর করা হচ্ছে কিনা সেবিষয়ে যৌথ পর্যালোচনার জন্য অ্যানুয়াল কনভারজেন্স ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল লেবার অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশন কাউন্সিল (এনএলপিআই কাউন্সিল), স্টেট লেবার অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট মিশন, ডিস্ট্রিক্ট লেবার অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টারের (ডিএলইআরসিগুলি) মতো নীতি কার্যকর করার যে কাঠামো তাতে শ্রমিকদের সংগঠনগুলির কোনও প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ব্যবস্থার পরিবর্তে আনা হয়েছে একতরফা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য হল শ্রম ক্ষেত্রে নয়া উদারবাদী জমানাকে আরও শক্তপোক্ত করা।
এই নীতি নির্মমভাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভূমিকাকে খর্ব করে এবং রাজ্যগুলির ভূমিকা সঙ্কুচিত করে। লেবার অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট পলিসি ইভ্যালুয়েশন ইনডেক্স (এলপিইআই)র মাধ্যমে এই নীতি কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও রাজ্যগুলির ভূমিকা খর্ব করা হয়। এলপিইআই রাজ্যগুলিকে বেঞ্চ-মার্কিং করার একটা সূচক যার সাহায্যে শ্রম আইনের পরিসরকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা যাবে যাতে তা নয়া উদারবাদী স্বার্থ রক্ষা করে। মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার সংস্কারের জন্য ইনসেনটিভ বা সুবিধা দিয়ে থাকে। এই সুবিধা দেওয়া হয় মালিকদের জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ দেওয়ার মাধ্যমে। রাজ্যগুলি যদি শ্রম পরিসর সংস্কারের কাজ হাতে নেয় তাহলে তাদেরও এই ইনসেনটিভ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে এলপিইআয়ের আওতায় র্যাঙ্কিং ইনডেক্সের ভিত্তিতে রাজ্যগুলির যেমন অবস্থান, সেই মোতাবেক ইনসেনটিভ দেয় মোদি সরকার। শ্রম শক্তি নীতি ২০২৫ মোদি সরকারের সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা। এই নীতিতে তিন ধাপ প্রয়োগপর্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আশু পর্ব হল ২০২৫-২৭, মধ্যবর্তী পর্ব হল ২০২৭-৩০ এবং দীর্ঘস্থায়ী পর্ব হল ২০৩০ পার করে। স্পষ্টতই এই শেষ পর্বটির মেয়াদ আসলে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ শেষের পরেও। এই নীতিতে শ্রম সংস্কারের জন্য তহবিল গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে যে তহবিলের অর্থ আসবে কেন্দ্র, রাজ্য ও বেসরকারি স্টেহোল্ডারদের থেকে এবং সেই টাকায় এই তহবিল আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখা হবে।
প্রাচীন স্মৃতিশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা শ্রম ধর্ম নিজেই আসলে একটি আপাদমস্তক পিছনে হাঁটা শ্রমবিরোধী ধারণা। এই নীতি ভারতীয় সংবিধানের তিনটি মৌলিক বিষয়ের বিরোধী। সেই তিনটি বিষয় হল সংবিধানের প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতি। শ্রম ক্ষেত্রের সংবিধান ভিত্তিক গণতান্ত্রিক পরিচালনা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে এটা একটা বিপরীতমুখী প্রয়াস। এবং তার বদলে তথাকথিত রাজধর্মের নীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যার ভিত্তি হল আরএসএস/বিজেপির দার্শনিক ও মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গী। এ হল হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রকল্প যার ভিত্তি হল প্রাচীন কালের অমানবিক সব ধর্মগ্রন্থ, যার মধ্যে পড়ে মনুস্মৃতি, যাজ্ঞ্যবল্কস্মৃতি, নারদস্মৃতি, শুক্রনীতি, অর্থশাস্ত্র এবং সুল্ক ন্যায়। এ সবের লক্ষ্যই হল নয়া ফ্যাশিস্ত উপায়ে নয়া উদারবাদী শক্তির স্বার্থকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, মেয়েরা স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য নয় (মনুস্মৃতি ৯.৩), বর্ণ/জাতির ভিত্তি হল পেশা ও বাধ্যতামূলক শ্রম দান (মনুস্মৃতি ১.৮৮-৯১)। এগুলি সবই আমাদের সাংবিধানিক নীতির ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের শাসন পরিচালনা ব্যবস্থার বিরোধী। এই নীতি রচনার সময় এগুলিকেই রাজধর্মের উৎস হিসাবে ধরে নেওয়া হয়েছে। এ সব থেকেই এই নীতির শ্রমিক বিরোধী, মানুষবিরোধী ফ্যাশিস্ত ধরনের উপাদানগুলি স্পষ্ট হয়ে যায়। শাসন পরিচালনায় সাম্প্রদায়িক-কর্পোরেট বোঝাপড়া, প্রাচীনকালের স্মৃতিশাস্ত্রগুলির সঙ্গে নয়া মুক্ত বাজারের মিশেল ঘটাচ্ছে এবং মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের হিন্দুত্ববাদী স্বৈরাচারী নয়া ফ্যাশিস্ত ধরনের প্রবণতার সঙ্গে সেই মিশেলের সুরকে মিলিয়ে দিচ্ছে। এবং এভাবে শ্রম পরিচালনার বিষয়টির ওপর থেকে ক্রমশ এতদিনের বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলি তুলে দিচ্ছে।
শ্রম শক্তি নীতির বিরুদ্ধে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং এগুলিকে স্পষ্টতই অস্বীকার করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ভিত্তি হবে সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও নীতিমালা যা এমন নীতি চালু করার জন্য জোর দেয় যেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কঠোর হবে, পরিদর্শনের মাধ্যমে দেখতে হবে শাসন পরিচালনার নীতি মেনে চলা হচ্ছে কিনা, এবং উন্নত শ্রমিককেন্দ্রিক শ্রম পরিসর গড়ে তুলতে হবে যার ভিত্তি হিসাবে থাকবে ত্রিপাক্ষিক আলোচনার ব্যবস্থা।
ভাষান্তর: সুচিক্কন দাস
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ২৬-অক্টোবর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
