সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মানুষের রেগা, মানুষের পঞ্চায়েত, মানুষের লড়াই
চন্দন দাস
কলেজে পড়াশোনা ছেড়ে উপার্জনের জন্য গেছেন মুম্বাই, কাজ— রঙের কারখানায়। দম্পতির ছোট ছেলে কাঞ্চন। এখনও পড়ছে। ‘‘কতদিন পারবে পড়তে, জানি না। ছেলের পাঠানো টাকার দিকে চেয়ে তো আর বসে থাকা যায় না। স্বামীর বয়স হয়েছে। সবসময় কাজও মেলে না। আমার জবকার্ড আছে। আমার কাজ করার ক্ষমতা আছে। কেন আমাকে কাজ দেবে না?’’

আগামী ২রা আগস্ট রাজ্যে শুরু হচ্ছে ‘আমার পাড়া আমার সমাধান।’ এটি একটি সরকারি প্রকল্প। ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প।
আগামী ১লা আগস্ট রেগার কাজ শুরু হচ্ছে না। অন্তত এখনও পর্যন্ত অবস্থা তাই। যদিও হাইকোর্ট গত ১৮ই জুন পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ থাকা রেগা প্রকল্প চালুর নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট।
রেগা কোনও প্রকল্প নয়। রেগা আইন।
‘আমার পাড়া আমার সমাধন’(এপিএসএ)-এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের প্রায় ৮০ হাজার বুথে যে সমস্যাগুলির সমাধান ১০ লক্ষ টাকার মধ্যে মেটানো সম্ভব, সেগুলি হবে এই প্রকল্পে। কেমন কাজ হতে পারে ‘এপিএসএ’-তে? এই প্রশ্নে একটিই উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে এক কিমি রাস্তা বানানোর ন্যূনতম খরচ ৩০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ ‘এপিএসএ’-এর লক্ষ্য ছোটখাটো কাজ করিয়ে ফেলা। যেমন ভাঙা রাস্তার অল্প বিস্তর মেরামতি। কাজ করবেন ঠিকাদাররা।
এটিতে মানুষের অধিকারের প্রশ্ন নেই। সরকার নির্বাচিত পঞ্চায়েতকে পাশ কাটিয়ে শিবির করবে। সেখানে গিয়ে মানুষকে তাঁর অসুবিধা, দাবি বলতে হবে।
রেগা ঠিকাদার-নির্ভর প্রকল্প নয়। রেগা, অর্থাৎ একশো দিনের কাজের প্রকল্পের মূল লক্ষ্যে গ্রামীণ শ্রমজীবীর কাজের বন্দোবস্ত করা। রেগার কাজের দায়িত্ব পঞ্চায়েতের। ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’-এ পঞ্চায়েতের কোনও ভূমিকা নেই। এর জন্য তৈরি টাস্ক ফোর্সে মুখ্যসচিব, জেলা শাসকরারা আছেন। এমনকি জেলার পুলিশ সুপাররাও আছেন।
কিন্তু জেলা পরিষদ থেকে পঞ্চায়েত? স্রেফ বাদ। গ্রামের নির্বাচিত সদস্যরা এই প্রকল্পে প্রায় দর্শক। তৃণমূলের প্রায় দশ জন প্রধান, উপপ্রধানের সঙ্গে কথা হয়েছে গত ক’দিনে। সবার একসুর। একজনের প্রতিক্রিয়া জানাই। কোচবিহারের শিতলকুচির মহিষমারী পঞ্চায়েতের উপপ্রধান দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘‘কিছু বুঝতে পারছি না। পঞ্চায়েতের কোনও কাজ থাকবে বলে তো শুনিনি। তবে আমাদের বাদ দিয়ে এই কাজ কী করা সম্ভব? জানি না। বুঝতে পারছি না। আপনি কিছু বুঝছেন?’’
দেলওয়ার হোসেন অসহায়। তাঁর এলাকায় কাজ হলে তাঁর দায়িত্ব থাকবে—এটিই সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্তব্য এবং অধিকার। দুটিই অবহেলিত। আসলে দেলওয়ার হোসেন নয়, দুর্বল করা হচ্ছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে। এই প্রথম নয়। ২০১১-১২ থেকে রাজ্যে এই চক্রান্ত শুরু করেছে তৃণমূল।
বিজেপি তার দোসর। কীভাবে?
উদাহরণ রেগা। একশো দিনের কাজ পাওয়া জবকার্ডধারী গ্রামবাসীদের অধিকার। এটি কোনও প্রকল্প নয়। এটি আইন। ২০০৫-এর আইন অনুসারে এই কাজের অধিকার স্বীকৃত। সেই আইনের ২৭নং ধারা অনুসারে রেগার কাজে অস্বচ্ছতা, দুর্নীতির অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গকে গত প্রায় সাড়ে তিন বছর টাকা দেওয়া বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গত ১৮ই জুন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম এবং বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় দাসের ডিভিসন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, আগামী ১ আগস্ট থেকে রাজ্যে ফের রেগার কাজ চালু করতে হবে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং দুর্নীতি রুখতে কেন্দ্রীয় সরকারকে শর্ত আরোপের ক্ষমতা দিয়েও প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ‘‘দুর্নীতির জন্য প্রকল্পটিকেই হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে না। এটা জনস্বার্থের এবং যে উদ্দেশ্যে কাজের অধিকারের আইনটি তৈরি হয়েছিল তা রক্ষা করার প্রশ্ন।’’
বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার চুপ।
রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার জানিয়েছেন,‘‘এখনও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে কোনও বার্তা পাইনি। ওরা টাকা না দিলে আমরা কাজ শুরু করবো কী করে?’’
মনে হবে বড়ো চমৎকার কথা বললেন। কিন্তু রেগার বকেয়া মজুরির জন্য ৩৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি ২০২৩-২৪-এর বাজেটে। লোকসভা নির্বাচনের আগের সেই বাজেটে ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩-র বকেয়া টাকা দেওয়ার কথা। সেই বকেয়া মজুরির পরিমাণ ২৮০০ কোটির কিছু বেশি। ৩৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ কেন? আগেই তো বকেয়া দিয়ে দিতে পারতেন। খেপে খেপে। তবে কোষাগারে চাপ কম পড়ত। একবারে লোকসভা নির্বাচনের আগে এই উদ্যোগ কেন—এসব প্রশ্ন ছিল।
কিন্তু এবার দুটি সমস্যা। এবং তা রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্মের ফলে উদ্ভুত।
প্রথমত, বকেয়া মজুরি যদি রাজ্য সরকার দিয়েই থাকে, তাহলে এবার কেন্দ্র টাকা দিলে শ্রমিকরা একই কাজের জন্য দ্বিতীয়বার মজুরি পাবেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ মানুষ রেগার কাজ দাবি করে পঞ্চায়েতে ৪ক ফর্ম জমা দিয়েছেন। তাঁদের কাজ দিতে পারেনি প্রশাসন, পঞ্চায়েত। ফলে রেগার আইন অনুসারে তাঁদের কাজ না দিতে পারার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রাজ্য সরকার দীর্ঘদিন এই টাকা দেয়নি। এই টাকা জবকার্ডধারী, ৪ক ফর্ম পূরণ করে বিডিও অফিসে জমা দেওয়া গ্রামবাসীদের প্রাপ্য। পশ্চিম মেদিনীপুর সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পুলিশের বাধা, বিডিও-দের অনীহা উপেক্ষা করে রীতিমতো আন্দোলন করে কাজের দাবি জানিয়ে ৪ক ফর্ম জমা দিতে হয়েছে গ্রামবাসীদের।
পঞ্চায়েত কিংবা রেগা—দুটিই আইন। দুটিই আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সংবিধান-নির্দিষ্ট আইন। আর তা রক্ষার জন্য লড়তে হচ্ছে সেই অংশকে, যাঁরা ভোটদাতা—যাঁরা ‘জনতা’।
সেই লড়াইয়ের সামনে মহিলারা।
উদাহরণ দেওয়া যাক ডেবরার। তপন মিশ্র ব্রাহ্মণ। তিনি যজমানি করেন। তিনি দিনমজুরও। তপন মিশ্র যা পান, তাই করেন। কারণ— অভাবের সংসার। সেই ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহবধূ জয়ন্তী মিশ্র। তাঁদের বাড়ি ডেবরার দলপতিপুরে। তাঁদের বড় ছেলে চন্দন। কলেজে পড়াশোনা ছেড়ে উপার্জনের জন্য গেছেন মুম্বাই, কাজ— রঙের কারখানায়। দম্পতির ছোট ছেলে কাঞ্চন। এখনও পড়ছে। ‘‘কতদিন পারবে পড়তে, জানি না। ছেলের পাঠানো টাকার দিকে চেয়ে তো আর বসে থাকা যায় না। স্বামীর বয়স হয়েছে। সবসময় কাজও মেলে না। আমার জবকার্ড আছে। আমার কাজ করার ক্ষমতা আছে। কেন আমাকে কাজ দেবে না?’’
‘বাংলাভাষী’ সেই ব্রাহ্মণ সন্তানকে ‘বাংলাদেশী’ বলে হেনস্থা করা, বাংলাদেশে পুশব্যাক করার আশঙ্কা আছে। কারণ— রাজ্যে রাজ্যে সেই হেনস্থার শিকার মূলত সংখ্যালঘুরাই হচ্ছেন। কিন্তু হিন্দুদের আক্রান্ত হওয়ার খবরও আসছে।
এই পরিস্থিতিতে ডেবরার ব্লক অফিসের সামনে রীতিমতো পুলিশ, প্রশাসনের সঙ্গে লড়ে ৪ক ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়ে এসেছেন পুরোহিত, ব্রাহ্মণ পরিবারের দিনমজুর মহিলা।
যে আর্থিক বছরে মমতা ব্যানার্জি রাজ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালু করেন, সেই বছরই রাজ্যে শেষবার রেগার কাজ হয়েছে। সেটি ২০২১-২২ আর্থিক বছর। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার চালু হয়। অন্যদিকে ২০২১-২২-এর পরে গত তিন বছর রেগায় কাজ দ্রুত বন্ধ হয়েছে।
২০২১-২২-এ রাজ্যে রেগায় কাজ করেছিলেন ৫১ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৩৬ জন মহিলা। ২০২২-২৩-এ তা নেমে আসে ৯ লক্ষ ৮৩ হাজারে। তারপর আর রেগার কোনও কাজই রাজ্যে হয়নি। তাৎপর্যপূর্ণ হলো রেগা প্রকল্পে ২০১৯-২০-তে কাজ পেয়েছিলেন প্রায় ৩৭ লক্ষ মহিলা। একবছরের মধ্যে সেই সংখ্যা পৌঁছে যায় ৫২ লক্ষ ৬৬ হাজারের বেশিতে। তারপরই বিধানসভা নির্বাচন ছিল। এক বছরে ১৬ লক্ষ মহিলা বেড়ে যাওয়ার এমন কোনও রেকর্ড রাজ্যে নেই। গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগ, ওই বছরই তৃণমূল সবচেয়ে বেশি চুরি করেছিল। অনেককে মজুরি পাইয়ে দিয়েছে তৃণমূল সেই সময়, যাঁরা কাজই করেননি। সেই মজুরি বাবদ পাওয়া টাকার একাংশ কমিশন বাবদ পকেটে ভরেছেন তৃণমূলের নেতারা।
কিন্তু কাজ না করে টাকা সবাই নেননি। বেশিরভাগই হকের টাকা পাননি। তাই লড়াই চলছে। রেগার জন্য লড়াই একটি দৃষ্টান্ত। হক আদায়ের এ লড়াই চলবে।
প্রকাশের তারিখ: ২৮-জুলাই-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
