সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আমাদের ফেব্রুয়ারি
ইমতিয়ার শামীম
দিবসেরও একটি উৎসবমুখর অর্থনৈতিক চরিত্র থাকে, তাকে উপেক্ষা করা সোজা নয়। বসন্ত মেলা, বৈশাখী মেলা কিংবা গ্রামীণ মেলাগুলো যেমন সংস্কৃতির প্রকাশ, তেমনি উৎসব আর অর্থনৈতিকতারও প্রকাশ। তবে সব মিলিয়ে এইসব প্রকাশ কিন্তু সমাজের বহু স্বরের মানুষের মধ্যে ঐকতান গড়ে তোলে। আমার মূল বক্তব্য সেখানে নয়। আমি বলতে চাইছি, সংস্কৃতি চর্চারই হোক আর মুক্তির সংগ্রামেরই হোক, ইতিহাসের নিরিখে বিভিন্ন সময় সেসবের আবার নানা পাঠ তৈরি হতে থাকে। অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও এমন পাঠ বা টেক্সট নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এই পাঠগুলো কখনো কখনো আক্রমণাত্মক ও মুখোমুখি হয়ে ওঠে। আমরা বোধকরি এখন তেমন এক পর্বে রয়েছি।

১.
বাংলাদেশের পরিস্থিতি যখনই ঝঞ্ঝামুখর হয়, ফেব্রুয়ারি মাস ততই আবেদনময় হয়ে ওঠে। কারণ একটাই,—একুশ মানে যে মাথা নত না করা, এই সত্যের আবাহন এই দেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে। তাই ফেব্রুয়ারি আমাদের বার বার উজ্জীবিত করে, প্রাণিত করে, বিকশিত করে; বলাই বাহুল্য, লড়াই করারও শক্তি যোগায়।
এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। সবাই দেখেছেন, মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি গত দেড় বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে এবং ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অপব্যবহার করে যে ভয়ঙ্কর হাইপ সৃষ্টি করেছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে তার এক ধরনের আপাতবিরতি ঘটেছে। এর মধ্যে জল আরও অনেক গড়িয়েছে। ২০২৪-এ গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, যেটির একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া আর কোনও সুনির্দিষ্ট মূর্ত লক্ষ্য বা কর্মসূচি ছিল না এবং যার নেতৃত্বে কোনও বিকশিত একক রাজনৈতিক কর্তৃত্বও ছিল না। এই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে এবং সমাজে এখন এমন একটি ধারা প্রবল হয়ে উঠেছে, যেটি যা কিছু প্রগতিশীল তাকেই প্রত্যাখান করে চলেছে ফ্যাসিবাদী বয়ান আখ্যা দিয়ে, ফ্যাসিস্ট সাংস্কৃতিক তকমা দিয়ে; ঠেলে দিচ্ছে মবের ভেতর। কার্যত রাজনীতিতে, সামাজিক ক্ষেত্রে, সংস্কৃতিতে এবং প্রাত্যহিক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে পাকিস্তানবাদী-জামায়াতি ইতিহাসবাদ ও বয়ানকে প্রতিষ্ঠার ধারাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি সংস্কৃতি আসলে কী? একটি সংস্কৃতি আসলে একটি সমাজ-কাঠামোরই অভিজ্ঞতাকে ধারণ করে, বহন করে; আর তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে, শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারিরই জয় হবে—যে ফেব্রুয়ারি আমাদের বিভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন জাতি-বর্ণ ও ধর্মের জনগণকে গণতান্ত্রিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ফেব্রুয়ারি আমাদের গভীর এক আবেগের জায়গা, যুক্তিরও বটে এবং শেষ পর্যন্ত নিবিড় এক সংস্কৃতির। আমরা আমাদের সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছি, নিঃশ্বাস নেয়ার শক্তিও পাচ্ছি এখান থেকেই। এখান থেকেই আমরা পেয়েছি মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বোধ। এ সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে আমাদের মধ্যে জাতীয়তার বোধ, বিভিন্নতর জাতীয়তার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বোধ। এমনকি আমাদের শ্রেণিবোধকে প্রাণিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে প্রধানত এই সংস্কৃতি।
২.
এটি ঠিক, যে কোনও দিবসই, তা যত আবেগময় ও রক্তপাতময় ইতিহাসেরই সাক্ষী হোক না কেন, কালের আবর্তে পুঁজির খপ্পরে পড়ে, ছোট থেকে বড় নানা রকম ব্যবসার আধার হয়ে ওঠে এবং তার ফলে স্বভাবতই একসময় উৎসবময় হয়ে উঠতে থাকে। আমাদের মহান শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি,—যা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও বটে, সেটিও অংশত ওই পরিণতির নিরুপায় এক শিকার। ফেব্রুয়ারিও এখন অনেকটাই বণিক পুঁজির দাপটে থরো থরো কম্পমান, তার কারণ অমর একুশে বইমেলার সূত্রে গড়ে ওঠা এর অর্থনৈতিক চরিত্র।
আমরা অবশ্য নানা ভাবে এখনও এই অর্থনৈতিকতাকে মহীয়ানত্ব দেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তবে এ-ও সত্য, আমাদের দেশের দীর্ঘ অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ফেব্রুয়ারি বার বার প্রেরণা যুগিয়েছে। তাই সারা বছর যত বন্ধ্যাত্বই থাক না কেন, এ সময় রাজনৈতিক আন্দোলন আলাদা গতি পায়। বাংলাদেশে বাঙালি থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু যত জাতিসত্বার মানুষ আছে, তারা সবাই আপন আপন স্রোতধারা নিয়ে বিস্ময়কর এক ঐকতান সৃষ্টি করে। তো এমন প্রেক্ষাপটে বইমেলার আয়োজনও আমাদের শক্তি যুগিয়ে এসেছে, রাজনীতি ও সাহিত্যের মেলবন্ধন তৈরি করেছে, তারুণ্যের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। নব্বইয়ের দশক অবধিও ফেব্রুয়ারিতে যত ছোট কাগজ, সাহিত্য সংকলন, ভাঁজপত্র ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগে মূলত তরুণদের অংশগ্রহণে বের হতো, শুধু সংখ্যা নয়, চিন্তার নতুনত্ব ও শিল্পমানের দিক থেকেও তা ছিল বিস্ময়কর। কিন্তু সময় পাল্টেছে, প্রযুক্তি বিকশিত হয়েছে, বই বা পত্রিকা ছাপানোও আগের চেয়ে সহজ হয়েছে—এত সহজ যে সংঘবদ্ধভাবে কোনও সংকলন প্রকাশের চেয়ে নিজে-নিজেই নিজের বই ছাপানোই জলের মতো সোজা হয়ে পড়েছে। কর্পোরেট ব্যবসায়িক নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকাশনা সংস্থার সাম্প্রতিক যোগ ও অবস্থান, ফাল্গুন ও বসন্ত ঋতু আবির্ভাবের সময়কাল ও বিভিন্ন ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের স্থূল তোড়জোড় ইত্যাদি বিষয়গুলোকে যদি বিবেচনা করা হয়, তা হলে বলতেই হয়, একুশে ফেব্রুয়ারির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আবেদন কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে। এদিকে সামাজিক ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। একসময় এই শ্রেণিটিকে সহজেই দোদুল্যমান বলে চিহ্নিত করা যেত, কিন্তু এখন কর্পোরেট অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে ব্যবস্থাপনাগত কর্মসংস্থানের সূত্রে তার যে অবয়ব দাঁড়িয়েছে, তার ফলে তাকে আর সেটা বলা তত সহজ নয়। ফলে এই শ্রেণিটির মধ্যে গত শতাব্দীর আশি-নব্বই দশকের কিংবা তারও আগের ষাট বা সত্তর দশকের আবেগ-আবেদনের উপাদান খোঁজার চেষ্টাও বৃথা।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
আগেই বলেছি, দিবসেরও একটি উৎসবমুখর অর্থনৈতিক চরিত্র থাকে, তাকে উপেক্ষা করা সোজা নয়। বসন্ত মেলা, বৈশাখী মেলা কিংবা গ্রামীণ মেলাগুলো যেমন সংস্কৃতির প্রকাশ, তেমনি উৎসব আর অর্থনৈতিকতারও প্রকাশ। তবে সব মিলিয়ে এইসব প্রকাশ কিন্তু সমাজের বহু স্বরের মানুষের মধ্যে ঐকতান গড়ে তোলে। আমার মূল বক্তব্য সেখানে নয়। আমি বলতে চাইছি, সংস্কৃতি চর্চারই হোক আর মুক্তির সংগ্রামেরই হোক, ইতিহাসের নিরিখে বিভিন্ন সময় সেসবের আবার নানা পাঠ তৈরি হতে থাকে। অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও এমন পাঠ বা টেক্সট নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এই পাঠগুলো কখনো কখনো আক্রমণাত্মক ও মুখোমুখি হয়ে ওঠে। আমরা বোধকরি এখন তেমন এক পর্বে রয়েছি।
৩.
অনেকেই হয়তো খেয়াল করেননি, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে দেশের বিশেষত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যে প্রত্যাশা জেগেছিল, তাতে ছন্দপতন ঘটে—বিশেষত জনতার উত্থানের সূত্রে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আগমনের ও তার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আসার প্রেক্ষাপটে। দিন যত এগিয়েছে, মব-কালচার যত বিচ্ছুরিত হয়েছে, ততই হতাশাচ্ছন্নতা বেড়েছে এবং আন্দোলনে অংশ নেয়া প্রগতিশীল শক্তির হতাশাচ্ছন্নতা মূর্ত হয়ে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ইউনূস সরকার ইনক্লুসিভ সমাজের কথা বলেছেন, কিন্তু কার্যত বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাজার ভাঙার কদাকার উৎসবকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বাউল-আক্রমণকে যেভাবে উপেক্ষা করেছেন, নারীদের ওপর হামলা ও অবমাননার ঘটনাকে যেভাবে উপেক্ষা ও সহনশীল করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন, তাতে জনগণ ক্রমাগত ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়েছে। ভয়ের সংস্কৃতি দূর করার জন্যে অভ্যুত্থানের ডাক দেয়া হয়েছিল, কিন্তু কার্যত মৌলবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কায় সেই সংস্কৃতি আরও চেপে বসেছে। অর্থনৈতিক অবস্থার কথা আর নাই বা তুললাম। এখন কাউকে কাউকে আমরা বলতে শুনছি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অধীনতার চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছেন; বলতে শুনছি অনেক দেশবিরোধী, দুর্নীতিময় চুক্তি ও প্রকল্প করা হয়েছে; কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনে তাদের উৎসাহও কম ছিল না। আর বাস্তবতা হলো, রাজনীতিকরা যতদিন না নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে না শিখবেন, যতদিন তাদের তত্ত্বাবধায়ক লাগবে, ততদিন রাজনৈতিক সংকটও থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধ ও এই জনপদের মানুষের সংগ্রাম-সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের ইতিহাস সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামী ও মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি অপপ্রচার চালিয়েছে অপ্রতিহত গতিতে, এমনকি বামপন্থীদের অনেককেও দেখা গেছে স্রোতে গা ভাসাতে; অন্যদিকে সরকার ব্যস্ত ছিল কর্পোরেট হরিরলুট সম্পন্ন করে, সংবিধানকে আরও বিপন্ন করে নিজেদের সেফ-এক্সিট তৈরির কাজে।
স্বস্তির ব্যাপার, শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। একটি কথা আছে, উৎকৃষ্ট স্বৈরতন্ত্র ও অনির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী শাসনের চেয়ে নিকৃষ্ট গণতন্ত্রও ভালো —সেই নিরিখে বলা যায়, বাংলাদেশ এবারের ফেব্রুয়ারিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেলো। তবে সুশাসনের জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে আরও বহু—বহুদিন।
ঢাকা, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২
প্রকাশের তারিখ: ২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay







