সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার: ১৭৫ বছর
নন্দন রায়
অন্য সব কিছু বিচার ও ব্যাখ্যা করার মাপকাঠি হিসেবে মার্কস ও এঙ্গেলস ব্যবহার করেছিলেন ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা। ইতিহাসের এইরূপ ধারণা, যা ইশতেহারের মেরুদন্ড স্বরূপ, তার চারটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, ইতিহাস যে স্থাণু নয় বরং চলমান, মার্কস ও এঙ্গেলস ইশতেহারে প্রথম এই ধারণাকে স্বীকৃতি দিলেন এবং এই চলমানতার মূলে রয়েছে সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি ও সামাজিক উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক গতিপ্রকৃতি এবং সম্পত্তি-সম্পর্কই হল এই দ্বন্দ্বের নিয়ামক।

১৮৪৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পরে আজ কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার ১৭৫ বছরে পদার্পণ করলো। এই ইশতেহার অথবা রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রটি জনসাধারণের মধ্যে মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী প্রচার করার প্রথম সচেতন ও বিধিবদ্ধ প্রয়াস। বলা বাহুল্য, এই ইশতেহার হঠাৎ করে লেখা হয়নি। তখনকার দিনে শ্রমিকদের সঙ্ঘবদ্ধ করার প্রথম সফল প্রয়াস কমিউনিস্ট লীগের প্রথম কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য প্রচার করার জন্য এই ঘোষণাপত্র রচিত হয়েছিল। ইশতেহার রচনা করার পূর্বে কয়েক বছর ধরে মার্কস ও এঙ্গেলস উভয়ই নিজেদের বিভিন্ন রচনার মধ্য দিয়ে দুনিয়াকে দেখার, ব্যাখ্যা করার এবং সর্বোপরি পরিবর্তন করার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় ব্রতী ছিলেন। এটা যদি ইশতেহার রচনার শর্ত হিশেবে কাজ করে থাকে, তবে পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে দেশে দেশে ক্রমশ উদ্বেল হয়ে ওঠা শ্রমিকদের আন্দোলন কাজ করেছিল এর কারণ হিসেবে। যেহেতু এটি ছিল একটি ঘোষণাপত্র, কোন নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বিতর্কমূলক সন্দর্ভ (polemical) রচনা নয়, তাই একে হতে হয়েছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু সহজ, এর ভাষা ছিল সরল কিন্তু উদ্দীপক এবং সর্বোপরি তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করার উপযোগী অনুশীলনের নির্দেশিকা সমন্বিত। এর ফলে ইশতেহারের অভিঘাত ছিল অভূতপূর্ব উৎসাহসঞ্চারকারী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্য সব কিছু বিচার ও ব্যাখ্যা করার মাপকাঠি হিসেবে মার্কস ও এঙ্গেলস ব্যবহার করেছিলেন ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা। ইতিহাসের এইরূপ ধারণা, যা ইশতেহারের মেরুদন্ড স্বরূপ, তার চারটি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, ইতিহাস যে স্থাণু নয় বরং চলমান, মার্কস ও এঙ্গেলস ইশতেহারে প্রথম এই ধারণাকে স্বীকৃতি দিলেন এবং এই চলমানতার মূলে রয়েছে সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি ও সামাজিক উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক গতিপ্রকৃতি এবং সম্পত্তি-সম্পর্কই হলো এই দ্বন্দ্বের নিয়ামক। দ্বিতীয়ত, ইশতেহারে মার্কস-এঙ্গেলস দেখিয়েছেন কিভাবে এই দ্বন্দ্ব সামাজিক শ্রেণি সমূহের কার্যকলাপ এবং তাদের মধ্যেকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির ঐতিহাসিক উদ্ভবের কারণ হিশেবে কিভাবে এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তার নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল, এক সংক্ষিপ্ত অথচ সুসংহত বিশ্লেষণের মাধ্যমে মার্কস-এঙ্গেলস তার ব্যাখ্যা উপস্থিত করেছেন এবং চতুর্থত, তারা এটাও ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে মানব ইতিহাসে পুঁজিবাদই কেন শেষ বৈরি (antagonistic) উৎপাদন পদ্ধতি, কিভাবে এই পদ্ধতি এক নতুন ঐতিহাসিক শ্রেণি সর্বহারার জন্ম দিল যাদের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে তারা নিজেদেরই শুধু মুক্তই করবে না, উপরন্তু যাবতীয় শোষণমূলক ব্যবস্থা থেকে অন্যান্য শোষিত শ্রেণিগুলিকেও মুক্ত করবে এবং সমগ্র মানব জাতিকে ‘প্রাক-ইতিহাস’ থেকে ‘ইতিহাসের’ পথে যাত্রায় নেতৃত্বদান করবে।
।দুই।
একথা মনে করার কোন কারণ নেই যে কমিউনিস্ট ইশতেহারে যে তত্ত্ব ও অনুশীলনের দিশা প্রস্তাবিত হয়েছে, তার কোন পূর্ব ইতিহাস নেই। ‘মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ’ রচনায় লেনিন অতি সংক্ষেপে দেখিয়েছেন যে জার্মানির দার্শনিক চিন্তাধারার নির্যাস, ইংলন্ডের বিকশিত পুঁজিবাদের ইতিহাস এবং ফ্রান্সের শ্রেণিসংগ্রামের ও সমাজ বদলের প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতা মার্কস ও এঙ্গেলসের বিপ্লবী চিন্তাধারাকে পরিণত হতে সাহায্য করেছিল। এইসব উৎসের যে সীমাবদ্ধতা ছিল, নিজেদের গভীর অন্তদৃষ্টির বলে সেসব সীমাবদ্ধতা ও খামতিগুলিকে দূরীভূত করে মার্কস-এঙ্গেলস তাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। বস্তুত, ১৮৪৮ সালে ইশতেহার প্রকাশিত হওয়ার আগে থেকেই ইওরোপ ‘কমিউনিজমের ভূত’ দেখতে শুরু করেছিল। মার্কস-এঙ্গেলস নিজেরাই বলেছিলেন তারা নিজেরা এককভাবে এই তত্ত্বের উদ্গাতা নন। তাদের কৃতিত্ব এটাই যে পূর্বের সমস্ত মানব জাতির সঞ্চিত জ্ঞানের নির্যাস নিয়ে ধ্রুপদী পুঁজিবাদী ন্যারেটিভের বিপরীতে একটি গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ আবিষ্কার করেছেন যা এক অর্থে পূর্ব জ্ঞানতত্ত্বের সাথে এই নতুন চিন্তা-পদ্ধতির বিচ্ছেদ ঘোষণা করেছে।
।তিন।
মোটামুটি তিনটি কারণে কমিউনিস্ট ইশতেহার অনন্য: প্রথমত, ইশতেহারের দুই তরুণ রচয়িতা তাদের এই গভীর অন্তর্দৃষ্টিকে সুসংহত রূপে এমন একটি চোখ ধাঁধানো তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন যা কেবল এই গভীর অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নিখুঁত ও কঠোর শুধু নয়, গোটা কাঠামোকে তা বিপুল শক্তি জুগিয়েছে। বিশেষত ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার প্রস্তাবনা ইতিহাসকে শুধু কিছু ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের ধারাবাহিক বিবরণ হিসেবে দেখায় না, বিশ্লেষণের দাবি জানায়। দ্বিতীয়ত, তারা অনুমান করেছিলেন যে ঐতিহাসিক বিকাশের পথ ধরে শ্রেণিসংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে এক সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে সর্বহারা অবশেষে নিজেকে শাসক শ্রেণি রূপে প্রতিষ্ঠা করে সব রকমের শ্রেণি শাসনের অবসান ঘটাবে। পরবর্তীকালে এই পর্যায়কে ‘সর্বহারার একনায়কত্ব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে যুক্তি তাঁরা হাজির করেছিলেন তা হচ্ছে এই যে, শ্রেণিসংগ্রামের চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার বস্তুগত পরিস্থিতি বুর্জোয়া সমাজ তার অন্তর্নিহিত প্রবণতার কারণে নিজেই সৃষ্টি করে। বুর্জোয়া শ্রেণি পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যখন কেবল বুনিয়াদী নিপীড়িত শ্রেণিটি, যারা সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে বিপ্লবী, সবচেয়ে বেশি উদ্যমী ও যাদের নিজেদের নির্দিষ্ট কোন শ্রেণিস্বার্থ নেই, তাদের তো বটেই, এমনকি অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণিগুলিকেও ব্যরিকেডের একই দিকে ঠেলে দেয়। নিপীড়ক বনাম নিপীড়িত শ্রেণিগুলির মধ্যে পূর্বেকার সমস্ত শ্রেণিসংগ্রামগুলির ক্ষেত্রে যুদ্ধ শেষে নতুন যে শ্রেণিগুলি রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়, তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব ব্যত্যয়হীন ভাবে বৈরিতা মূলক হয়। কিন্তু বুর্জোয়া ও সর্বহারার মধ্যেকার শেষ সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আগামী দিনে সমস্ত শ্রেণি বৈরিতার অবসানের শুভারম্ভ।
বুর্জোয়া ব্যবস্থার দুটি নির্দিষ্ট প্রবণতার দরুণ এটা ঘটে থাকে— প্রথমটি হলো অন্য সবরকম উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংসসাধন বিশ্বময় বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে অন্য সব শ্রেণিগুলি, এমনকি বুর্জোয়া শ্রেণির একটা অংশও অবশেষে সর্বহারা শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয় এবং দ্বিতীয় প্রবণতাটি হলো আধুনিক শিল্পের ক্রমাগত উন্নয়ণের দরুণ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র শহরগুলিতে সর্বহারা শ্রেণি ক্রমশ বেশি বেশি করে এক জায়গায় জড়ো হতে থাকে এবং সর্বহারার সচেতন সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের বাস্তুব পরিস্থিতি প্রস্তুত হতে থাকে। বুর্জোয়া ব্যবস্থা একবার সুস্থিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে ইতিহাসের অগ্রগতির জন্য একমাত্র যে বিকল্পটি উন্মুক্ত থাকে তা হলো সর্বহারার ক্রমশ আত্মসচেতন শ্রেণিশক্তিতে পরিণত হওয়া। একবার সর্বহারার এই রূপান্তরপর্ব ঘটে গেলে ইতিহাসকে যে রূপে আমরা এতকাল চিনে এসেছি তার সমাপ্তি ঘটে।
এই দূরদৃষ্টি ইশতেহারকে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা প্রদান করলো। পূর্বেকার নানাবিধ তত্ত্ব স্বপ্ন দেখেছিল শোষণহীন এক নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার। এই স্বপ্ন দেখার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইশতেহার দেখিয়ে দিল এরূপ নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বস্তুগত পরিস্থিতি ইতিমধ্যে বিদ্যমান। অন্যকথায়, ইশতেহার বিপ্লবকে আশু কর্মসূচীতে (actualize) পরিণত করলো।
।চার।
ইতিহাসের যে যুগসন্ধিক্ষণে ইশতেহার লেখা হয়েছিল, সেই সন্ধিক্ষণের বিদ্যমান বাস্তবতা, অর্থাৎ ইওরোপের বিপ্লবী পরিস্থিতি, ইশতেহারের পাতায় পাতায় তার চিহ্ন রেখে গিয়েছে। যে জনসমষ্টিকে ইশতেহার সম্বোধন করেছিল তারা ছিল পশ্চিম ইউরোপের খেটে খাওয়া মানুষজন, আরও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, পশ্চিম ইউরোপের তিনটি বৃহৎ দেশ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির সর্বহারা শ্রেণি। যে বিপ্লবের অঞ্জন ইশতেহারের চোখে আঁকা ছিল, তা হলো বিশুদ্ধ এক সর্বহারা বিপ্লব। যে উৎপাদন পদ্ধতির বিশ্লেষণে ইশতেহারের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল এক আবদ্ধ (closed) পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি, যেখানে উপনিবেশ ও ‘সাম্রাজ্যের’ কোন উল্লেখ ছিল না। তখনকার ইউরোপের একাধিক শ্রমিক অভ্যুত্থান ইশতেহার প্রত্যক্ষ করেছিল যাকে ভাবা হয়েছিল ইউরোপে বিপ্লব প্রত্যাসন্ন। ইশতেহার ছিল সেই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইশতেহার যা অর্জন করেছিল তা হলো এক মহান তত্ত্ব ও তার বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট কর্মকান্ডের মধ্যেকার উজ্জ্বল ঐক্য। এটাই ছিল ইশতেহারের আবেদনের শক্তি এবং এটাই ছিল তার দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা।
।পাঁচ।
ইশতেহারের এই সীমাবদ্ধতা দুটি বিষয়কে প্রতিফলিত করে— প্রথমত, পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে মার্কসের অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ তখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে পুঁজিবাদের সঙ্গে ভারতের মত উপনিবেশে বিদ্যমান প্রাক-পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির অথবা রাশিয়ার মত দেশের পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির মিথস্ক্রিয়ার ফলাফলকে তাত্ত্বিক বনিয়াদের ওপরে স্থাপন করা যায় (মার্কসের মহান গ্রন্থ দাস ক্যাপিটালের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অধ্যয়ন ও পান্ডুলিপি প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছিল তার প্রায় এক দশক আগেই)। দ্বিতীয়ত, সম্ভবত এই কারণেই ইশতেহারের ধারণায় যে বিপ্লবের কথা বলা হয়েছে তা ছিল পরিণত পুঁজিবাদের উৎখাতের জন্য বিশুদ্ধ সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। অন্য কথায় বললে, মার্কসবাদ তখনও তার প্রসারতা এবং গভীরতা অর্জন করেনি।
ইশতেহার রচনার পাঁচ বছর পরে ১৮৫৩ সালে নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে মার্কসের প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হওয়ার পরেই কেবলমাত্র ভারত সম্পর্কে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে আমরা জানতে পারি। একইভাবে দাস ক্যাপিটাল জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পরে ১৮৭০ সালে রুশ ভাষায় প্রকাশিত হওয়ার পরে প্লেখানভ, জাসুলিচ-এর মতো মার্কসের অনুগামীদের চিঠিপত্রের মাধ্যমে রাশিয়ার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরে মার্কস ও এঙ্গেলস রাশিয়া সম্পর্কে উৎসাহিত হয়ে পড়েন।
রাশিয়ায় বিলম্বে আগত পুঁজিবাদ ছিল পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদ। সেদেশের শ্রমজীবি জনতার মধ্যে সর্বহারা জনতার উপস্থিতি ছিল কৃষক জনতার তুলনায় অনেক কম। ফলে রাশিয়ায় সমাজ পরিবর্তনের যে কোন উদ্যোগ সর্বহারার পাশাপাশি কৃষকদের সক্রিয় যোগদান ভিন্ন সম্ভব ছিল না। লেনিনের মত প্রতিভার প্রয়োজন ছিল বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ করে ইশতেহারের বিশুদ্ধ সর্বহারা বিপ্লবের থেকে একধাপ পিছিয়ে এসে শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রীর নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লব সম্পন্ন করা।
ইশতেহার যেখানে দুনিয়ার মজদুরকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবেদন জানিয়ে শেষ হয়েছিল সেই মজদুররা বাস্তবে সীমাবদ্ধ ছিল ইউরোপের গণ্ডিতে। কিন্তু রাশিয়ার বিপ্লবের সাফল্য দুনিয়া জুড়ে উপনিবেশগুলির জনতা মুক্তির জন্য উদ্বেল হয়ে উঠলো। এইভাবে গোটা দুনিয়া বিশ্ববিপ্লবের যুগে প্রবেশ করলো শুধু নয়, ইশতেহারে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানটি সর্বার্থে সার্থক হয়ে উঠলো। কমিউনিস্ট ইশতেহার থেকে শুরু করে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং উপনিবেশিক ও আধা-উপনিবেশিক দেশগুলিতে মুক্তি সংগ্রামের সাফল্য পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলন যে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করেছে, তার জন্য ইশতেহারকেই অভিবাদন জানাতে হবে, কারণ ইশতেহারই প্রথম একটি সম্পূর্ণ নতুন বিপ্লবী তত্ত্ব ও তদুপযোগী অনুশীলন প্রস্তাব করেছিল।
।ছয়।
একথা ভাবা ভুল হবে যে ইশতেহারে মার্কসবাদী তত্ত্বের অনুসরণ করে পরবর্তীকালে মার্কসবাদী তত্ত্বের যে বিকাশ সাধিত হয়েছে, তা আসলে মার্কসবাদের (peripheral) বহিরঙ্গের বিকাশসাধন— ইশতেহারের মার্কসবাদের সারবস্তু (core) অটুট থেকে গিয়েছে। মার্কসবাদ কেবলমাত্র এককালীন আলোকপ্রাপ্তি নয়— পরিবর্তনশীল বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরন্তর অনুধাবন ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে উন্নততর জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার এ এক অনিঃশেষ প্রক্রিয়া। এটাই জ্ঞানতত্ত্বের দ্বান্দ্বিকতা। এমন নয় যে মার্কসীয় তত্ত্বের সারবস্তুটি সবার অধিগত হয়ে গেলে পরবর্তী জ্ঞানের বিকাশ কেবল সেই সারবস্তুটির বহিরঙ্গ সম্পর্কে জ্ঞানের বিকাশ মাত্র। আসলে লেনিন, মাও জে দঙ প্রভৃতি মনীষীরা যে অবদান রেখেছেন তাতে ইশতেহারের সময়কার মার্কসবাদী চিন্তাধারা বারে বারে পুনর্গঠিত হয়েছে, মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বে নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে এবং পুরনো ধারণাগুলি উন্নততর হয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন কারণে সমাজতান্ত্রিক প্রকল্প যেভাবে পিছু হঠেছে, আমাদের স্থির বিশ্বাস মার্কসবাদের আরও একবার পুনর্গঠন সেই প্রকল্পের নবজাগরণ ঘটাবে। কমিউনিস্ট ইশতেহারের শিক্ষা সুনিশ্চিতভাবে নতুন তত্ত্বের ও অনুশীলনের ঐক্যসাধন করতে বর্তমান প্রজন্মের মার্কসবাদীদের সহায়তা করবে।
—মতামত লেখকের নিজস্ব
প্রকাশের তারিখ: ২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay










