সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অন্যরকম ইতিহাস (প্রথম পর্ব)
শ্রীমন্তী রায়
দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছিল। ফলে ন্যায্য কারণেই তার স্মৃতি প্রধানত গড়ে উঠেছিল হিংসা, বিভাজন, রক্তপাতকে কেন্দ্র করে। আবার এটাও সত্যিই যে, সংখ্যায় অল্প হলেও ওই চরম দুঃসময়ে মানুষ মানুষকে সাহায্য করেছিল। এই সাহায্যকারী মানুষগুলো যারা নিজেরা হিংসার আশ্রয় না নিয়ে অন্য মানুষদের বাঁচিয়েছিলেন শুধু সাহসের উপর ভর করে, তাদের কথা বারে বারে মনে করিয়ে দিতে হবে। সেই ইতিহাসকে ভুলে যেতে দেওয়া যাবে না।

কিছুদিন আগে কলকাতার কুখ্যাত ‘৪৬ সালের দাঙ্গার উপর একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর ফলে ও তৎসম্মন্ধীয় বিভিন্ন বিষয়ের জন্য পুনরায় ‘৪৬ সালটি ইতিহাস চর্চায় ফিরে এসেছে। শুরু হয়ে গেছে প্রকৃত ইতিহাস এবং বিকৃত ইতিহাসের বিতর্ক।
‘৪৬ র দাঙ্গা একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা, যে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরি তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন “কলকাতার রাস্তায় যা ঘটেছিল তার ভিতর মনুষ্যোচিত কোনো ব্যবহারের লক্ষণ দেখা যায়নি… বিবেকবর্জিত কিছু দ্বিপদ সম্পূর্ণ অসহায় কিছু নারী-পুরুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হিন্দু পাড়ায় মুসলমান, মুসলমান পাড়ায় হিন্দু নর-নারী-শিশু কোতলে-আম নীতির শিকার হয়। প্রতিরোধের প্রশ্ন প্রায় কোথাওই ওঠেনি।” যে নারকীয়তার সাক্ষী কলকাতা সেই ক’দিন থেকেছে তা তার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের গভীর ক্ষত হয়ে চিরকাল রয়ে যাবে। তাকে অস্বীকার করার অর্থ ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
‘৪৬ এর দাঙ্গার পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল? মুসলিম লিগ একা দায়ী ছিল কি না? কংগ্রেস বা হিন্দু মহাসভা, কম্যুনিস্ট পার্টির ভূমিকা কী ছিল? দাঙ্গার রাজনীতি কীভাবে তৎকালীন জনমানসে প্রভাব বিস্তার করেছিল, দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারী জনতার চরিত্র কী রকম ছিল? সর্বোপরি ব্রিটিশদের ভূমিকা কী ছিল — সেই নিয়ে অনেক ঐতিহাসিকই বিশ্লেষণমূলক বই লিখেছেন। তাঁরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দাঙ্গার কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে এঁরা প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ‘৪৬ এর দাঙ্গার ভয়াবহতা ও নৃশংসতা আগের সমস্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এই দাঙ্গার ফলে দেশভাগ যেমন নিশ্চিত হয়ে যায়, তেমনি অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটা অন্যতম জলবিভাজিকা।– ফলে যে অপপ্রচার দক্ষিণপন্থীরা করছেন যে প্রকৃত ইতিহাস এই সিনেমার আগে কেউ বলেননি, সেটি একেবারেই ঠিক নয়। যদি কিছু ভুলে যাওয়ার ইতিহাসের কথাই ওঠে, তাহলে এই দাঙ্গার ইতিহাসের সাথে জড়িত অথচ দাঙ্গার নৃশংসতার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে যে ‘ইতিহাস’ সেই ‘ইতিহাস’ই বরং মানুষের বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে।
দাঙ্গার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে দাঙ্গা প্রতিরোধের ইতিহাস। ‘৪৬ এর দাঙ্গাও তার কোনও ব্যতিক্রম নয়। ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গেজেট থেকে জানা যায় যে, দাঙ্গা থেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন সংবাদপত্রে সাধারণ মানুষেরা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন কীভাবে তথাকথিত বিরোধী সম্প্রদায়ের মানুষেরা একে অপরকে সাহায্য করেছিল। ফলে মেনে নেওয়া যেতে পারে যে সেই পর্বেও কিছু মানুষ এগিয়ে এসেছিলেন যারা ওই উন্মত্ত সময়েও মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেননি, নিজের ধর্ম পরিচয়কে সরিয়ে রেখে, এমনকী প্রাণের তোয়াক্কা না করে তারা “মানুষ”কে বাঁচিয়েছিলেন। বেশ কিছু অঞ্চলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে তৈরি করেছিলেন ‘প্রতিরোধ কমিটি’। যুবকরা সারা রাত পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইট, লাঠি, পাথর মজুত রাখা হয়েছিল গুণ্ডাদের মোকাবিলা করার জন্য।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
গোলাম ওস্তাগর লেনে প্রায় তিরিশটি মুসলমান পরিবারকে বাঁচিয়েছিলেন একজন হিন্দু ব্যবসায়ী। বুলিয়ন অ্যাসোসিয়েসনের তৎকালীন সভাপতি দুর্গাদাস খান্না মধ্য কলকাতায় শান্তি স্থাপনের সময় গুলিতে আহত হয়েছিলেন। তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট মানিক মল্লিক হিন্দুদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তার গ্রে স্ট্রিট অঞ্চলের বাড়িতে ছয়জন মুসলিমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি আলিপুর কোর্টের অতিরিক্ত জেলা জজ মনীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় গুণ্ডাদের হাত থেকে একটি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে ছুরিকাহত হন এবং ২৫ আগস্ট মেডিক্যাল কলেজে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তিনি বলেন যে তার জীবনের বিনিময়ে দেশবাসীর কাছে তিনি প্রার্থনা করছেন, এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাই যেন শেষ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। মর্ডান রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, হিন্দু পাড়ায় আশ্রিত কয়েকটি মুসলমান পরিবারকে সেনাবাহিনী নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে এবং সম্পাদক লিখেছিলেন মুসলমান পাড়ায় হিন্দুদের আশ্রয়দানের কাহিনিও আছে যার ছবি পাওয়া যায়নি বলে ছাপা যায়নি। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে হায়দার আলির পরিবারকে বাঁচিয়েছিলেন প্রতিবেশী হিন্দুরা। লিন্টন স্ট্রিটে মুসলমানরা হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমির আলি অ্যাভিনিউয়ে কংগ্রেস নেতা জে সি গুপ্তর বাড়ির উপর আক্রমণ হলে বাধা দিয়েছিলেন স্থানীয় মুসলমানরা। জনৈক আব্দুল খালেক চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন আমহার্স্ট স্ট্রিট অঞ্চলে হিন্দুরা মুসলমানদের বাঁচিয়েছে এবং মসজিদের উপর আক্রমণ হতে দেয়নি। একজন গুজরাতি মুসলিম চর্ম ব্যবসায়ী পার্টি সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাড়িতে হিন্দু সিপিআই কর্মী অজিত রায়, গীতা মুখার্জি প্রমুখদের তিনদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। দীনবন্ধু লেন নিবাসী একজন হিন্দু ভদ্রলোক তাঁর বাড়িতে ২০ জন মুসলিম কর্মচারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। পরে পুলিশের সাহায্য নিয়ে তাদের জাকারিয়া স্ট্রিটে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে লিন্টন স্ট্রিট এলাকায় মুসলিম দাঙ্গাকারীরা যখন একটি শিবমন্দির আক্রমণ করেছিল, তখন সেই অঞ্চলের মুসলিমরাই এগিয়ে এসে মন্দিরটিকে লুঠ হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন। বৈঠকখানা অঞ্চলে প্রায় তিনশ জন মুসলিম মুচি একদল হিন্দু ট্রামকর্মীকে মুসলিম দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারক দাস তার মুসলিম সহকর্মী ডঃ আহমেদের বাড়ি লুট করতে আসা দাঙ্গাকারী হিন্দুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। অধ্যাপক নীরেন রায় প্রবল বীরত্বের সাথে কয়েকজন মুসলিম শ্রমিককে আশ্রয় দিয়েছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বালিগঞ্জে বসবাসকারী অধ্যাপক নির্মল ভট্টাচার্য হিন্দু জনতার হাত থেকে একজন আহত মুসলিমকে রক্ষা করেছিলেন। এমনকি তাঁর বাড়ি উন্মত্ত জনতা অবরুদ্ধ করে ফেললেও তিনি আহতকে হাসপাতালে পাঠাবার বন্দোবস্ত করেছিলেন। পার্ক সার্কাস অঞ্চলে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক শ্রীযুক্ত রহমান উন্মত্ত মুসলিম জনতার থেকে একটি ৩৯ জনের হিন্দু পরিবারের ৩৬ জনকে বাঁচাতে ও নিরাপদে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। দেশবন্ধু পার্কে নিকাশিপাড়া বস্তি ছিল একটি হিন্দু অঞ্চল সেখানের তিরিশটি মুসলমান পরিবারের জীবন রক্ষা করেছিলেন সেখানকার হিন্দু নেতারা। সেখানে প্রাক্তন মেয়র শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মুখার্জি বারবার উন্মত্ত জনতাকে প্রতিহত করতে সফল হন এবং ২১শে অগাস্ট এখানে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। শোভাবাজারে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত দুই শিশু সন্তানসহ আশ্রয় দিয়েছিলেন একজন মুসলিম নারীকে। অন্যদিকে গরাণহাটা এলাকায় একজন মহিলা চারজন মুসলিমকে আশ্রয় দিয়ে উন্মত্ত গুন্ডাদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। কলকাতার এক বিখ্যাত আশ্রমের স্বামীজি যিনি নিজের নাম প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন না, তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে উন্মত্ত জনতার হাত থেকে ১২ জন মুসলিমকে রক্ষা করেছিলেন। পার্ক সার্কাসের উদারচেতা জনপ্রিয় চিকিৎসক ডঃ গনি পাড়ায় আটকে পড়া বহু হিন্দু পরিবারকে নিঃশব্দে বালিগঞ্জে পৌঁছে দিতেন। তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আরো কয়েকজন মুসলিম হিন্দুদেরকে সাহায্য করা শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে বালিগঞ্জ এলাকারও কয়েকজন হিন্দু কিছু মুসলিম পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন পার্ক সার্কাস পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে। এরকম বহু “ ঘটনা” ঘটেছিল সেইসময়ে। ৯৩ বছর বয়স্ক বর্ণাকুমারী দেবীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন কলকাতা কর্পোরেশন কাউন্সিলর হাজী মহম্মদ ইউসুফ। পাঁচ দিন বাদে একজন মুসলিম চালকের সহায়তায় তিনি হিন্দু এলাকায় পৌঁছান। সেই সময়ের চিত্রাভিনেত্রী সন্ধ্যারানি বউবাজার অঞ্চলে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেশী এক মুসলমান পরিবারকে বাঁচিয়েছিলেন। কমলা গার্লস স্কুলে পার্ক সার্কাসের দাঙ্গায় আক্রান্তু বিধ্বস্ত পরিবারগুলির জন্য যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিল সেখানেই একটি মুসলিম পরিবারকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল রাত্রিবেলা পার্ক সার্কাসে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। আক্রান্ত হিন্দু পরিবারের অনেকেই জানতেন এই খবর। তা সত্ত্বেও তাঁরা কোনরকম বাধার সৃষ্টি করেননি। হয়ত আক্রান্ত হয়েছিলেন বলেই বুঝতে পেরেছিলেন এর নির্মমতা, নৃশসংতা। বালিগঞ্জের গরচা রোড অঞ্চলে হিন্দু, মুসলিম, শিখরা একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে তারা প্রত্যেকে নিজেদের গোষ্ঠীর আক্রমণকে প্রতিহত করার চেষ্টা করবেন।
সাম্প্রদায়িক দলগুলির মধ্যেকার কয়েকজন ব্যক্তিও দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। যেমন পার্ক সার্কাসে লীগ নেতা লাল মিঞা কয়েকটি হিন্দু পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেন। শ্যামবাজারে হিন্দু মহাসভা নেতা দেবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় তার বাড়িতে কয়েকজন মুসলিমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এছাড়াও সেই সময়ের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা যেমন অতুলচন্দ্র গুপ্ত , আবু সয়ীদ আইয়ুব, স্নেহাংশু আচার্য নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেশীদের রক্ষা করেছিলেন। একটি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন কবি বিষ্ণু দে। গুপ্ত প্রেসের মালিক অজয় বসু কয়েকটি মুসলমান পরিবারকে বাঁচান। কলাবাগানের দুজন ফল বিক্রেতা ইয়াকুব এবং নিসার ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বীরেন রায়কে রক্ষা করেন। চেতলায় কয়েকজন মুসলমান মাঝিকে বাঁচান কম্যুনিস্ট নেতা মনি সান্যাল। শ্যামবাজারে চিন্মোহন সেহানবীশ একজন মুসলিমকে বাঁচান।
উপরিউক্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি যাদের কথা আলাদা ভাবে বলতে হয় তারা হলেন সেই সময়ের কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য এবং সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণির একটি বড় অংশ। শত প্ররোচনা থাকা সত্ত্বেও তাদের একটা বিশাল অংশ দাঙ্গায় যোগ দেননি। বরং দাঙ্গা প্রতিরোধে সাহায্য করেছিলেন। কম্যুনিস্ট পার্টি শিল্পাঞ্চলগুলিতে ব্যাপক দাঙ্গা বিরোধী প্রচার চালিয়েছিল, এবং কোনরকম প্ররোচনায় পা না দিতে বারবার করে আবেদন করেছিল । মেটিয়াবুরুজ ছাড়া কলকাতা এবং শহরতলি অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখেছিলেন। শ্রমিকদের এই কৃতিত্ব প্রসঙ্গে স্বাধীনতা পত্রিকার বাইশে অগাস্টের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, “কলিকাতা এবং শহরতলীর লাখ লাখ মজুর যদি এই কয়দিন অপর সবার মত গৃহযুদ্ধে উন্মত্ত হইয়া উঠিতেন, তাহা হইলে যে কি হইত তাহা ভাবনার অতীত।” বলা বাহুল্য তা হয়নি। উল্টে টিটাগড়ে হিন্দু-মুসলিম শ্রমিকরা একসাথে শান্তি মিছিল বের করেছিলেন। বজবজ এলাকার হিন্দু-মুসলিম শ্রমিকেরা প্রকাশ্যে মিটিং করে তাঁদের দাঙ্গার বিপক্ষে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। খিদিরপুর অঞ্চলে নাবিকদের সংগঠন শুধু নিজেদের দাঙ্গা থেকে দূরে রাখতে সফলই হয়নি, তারা ট্রাম কোম্পানি, এবং ব্রুকবন্ড কোম্পানির শ্রমিকদের সাথে একত্রিত হয়ে স্থানীয় একটি শান্তি মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন যেটি আবার দাঙ্গাবাজদের দ্বারা আক্রান্তও হয়েছিল। স্ট্যান্ডার্ড ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানির শ্রমিকরাও নিজেদেরকে দাঙ্গা থেকে দূরে রাখতে সফল হয়েছিলেন এবং একইসাথে তাঁরা পিপলস রিলিফ কমিটির গৃহহীন, অসহায় মানুষদের কেন্দ্রগুলিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া দাঙ্গা বিরোধিতায় অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল বামপন্থী ট্রাম শ্রমিকদের সংগঠনগুলি। পার্ক সার্কাস এলাকায় মুসলিম ট্রাম শ্রমিকরা ৪০ জন হিন্দু ট্রাম শ্রমিক সহকর্মীকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে তিনদিন রক্ষা করার পর নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। বালিগঞ্জে কম্যুনিস্ট শ্রমিক নেতা বিজয় চক্রবর্তী ও রাজেন পাহাড়ির নেতৃত্বে হিন্দু দাঙ্গাবাজদের প্রতিরোধ করা হয়। একইভাবে রাজাবাজারে কম্যুনিস্ট শ্রমিক নেতা রেজ্জাক ও চতুর আলি শুধু ট্রাম শ্রমিকদেরই নয়, ওই অঞ্চলের বহু হিন্দু পরিবারকেও রক্ষা করেছিলেন। একইসাথে এই শ্রমিক ইউনিয়ন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে কিছু মুসলিম ছাত্রের সহযোগিতায় ভিক্টোরিয়া কলেজের হস্টেলটিকে লুট হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। বেলগাছিয়ায় ট্রাম শ্রমিকরা মুসলমান বস্তির উপর আক্রমণ প্রতিহত করেন। ১৯ আগস্ট তারিখে তখনও দাঙ্গা থামেনি। সেই পরিস্থিতিতে ট্রাম শ্রমিকরা ট্রাম লাইন থেকে মৃতদেহ সরিয়ে ট্রাম চালিয়ে শহরের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এমনকি এর জন্য ওভারটাইমের মজুরি নিতে পর্যন্ত তাঁরা অস্বীকার করেছিলেন।
প্রকাশের তারিখ: ০৪-ডিসেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
