সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
২৪তম কংগ্রেস এবং পার্টির অগ্রাধিকার
এম এ বেবি
সকল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে একজোট করতে হবে, যাতে এই যে সরকারের মধ্যে নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলি দেখা যাচ্ছে, তাকে ক্ষমতা থেকে হটানো যায়। এবং তা সুনিশ্চিত করতে হবে। সেকারণে মুখ্য রাজনৈতিক কর্তব্য হলো– এই কাজটি সুচারুভাবে করতে হলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব বাড়াতে হবে। আমরা কমিউনিস্টরা সত্য কথা বলি, সত্যনিষ্ঠ। বাস্তবতা মেনে নিই। তাই পার্টিকে পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে কেবল কেরালাতেই বাম সরকার আছে– বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ)। এক বছরের মধ্যেই কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাডুতে নির্বাচন আছে। আর এইসব নির্বাচনগুলিতে আমাদের রাজনৈতিক কৌশলগত লাইন হল– জনগণের আরও সমর্থন অর্জন করা।
[চলতি মাসের গোড়াতেই মাদুরাইয়ে শেষ হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র ২৪তম কংগ্রেস। এই কংগ্রেস থেকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন মারিয়াম আলেকজান্ডার বেবি। সম্প্রতি তিনি কলকাতায় এলে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শিঞ্জিনী সরকার। সদ্য সমাপ্ত পার্টি কংগ্রেসের পর পার্টির অগ্রাধিকার থেকে পার্টি, পার্টিকর্মীদের কাছে প্রধান কাজ-সহ পার্টি ও বামপন্থীদের স্বাধীন শক্তির বিকাশ নিয়ে যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনই আলোচনা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরার পরিস্থিতি নিয়ে। এখানে সেই অকপট কথোপকথনেরই পরিমার্জিত রূপ। ভাষান্তর ও অনুলিখনে স্বাতী শীল।]
নমস্কার! ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক কমরেড এম এ বেবি, আপনাকে স্বাগত। আজ, আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। চলতি মাসের গোড়াতেই মাদুরাইয়ে শেষ হয়েছে পার্টির ২৪তম কংগ্রেস। শুরুতেই যেটা জানতে চাইব, এই কংগ্রেসের পরে পার্টির অগ্রাধিকারগুলি কী? পার্টি, পার্টিকর্মীদের কাছে প্রধান কাজগুলিই বা কী হবে?
এম এ বেবি: সিপিআই(এম)-এর ২৪তম কংগ্রেস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নির্ধারণ করেছে। এই তিনটি মূল কাজের অধীনে আরও কিছু সংশ্লিষ্ট কাজ আছে। প্রথমত, দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের নেতৃত্বে যেভাবে সরকার কাজ করছে, তাতে একধরনের নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন রূপে হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হল ওয়াকফ সংশোধনী বিল, যা এখন আইন হয়ে গিয়েছে। তারপর বিজেপি নেতারা দাবি করছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় দেশে গৃহযুদ্ধ ডেকে আনছে। আদতে সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ের মাধ্যমে সংবিধানিক মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। যেমন, ওয়াকফ বিলের কিছু ধারা সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়– বিশেষ করে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে কিছু ধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছে। এবং বিষয়টি বিচারাধীন রেখেছে।
কিন্তু বিজেপি, আরএসএস-নিয়ন্ত্রিত বিজেপি সরকার সংবিধানিক মূল্যবোধকে কোনও সম্মান দেখায় না। বিজেপি সাংসদরা আক্রমণ করে চলেছেন বিচারব্যবস্থা, সুপ্রিম কোর্টকে। এমনকি ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়– যিনি আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলেন– প্রকাশ্যে বিচারবিভাগের সমালোচনা করছেন। সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি রায় ছিল তামিলনাডু সরকারের পাশ করা দশটি বিল নিয়ে, যা রাজ্যপাল আটকে রেখেছিলেন। একইরকম অবস্থা কেরালাতেও দেখা যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণ রেখেছে। এটি একটি অগণতান্ত্রিক পদ্ধতি।
এইভাবে বিজেপি সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এক অতি কর্তৃত্ববাদী ও অগণতান্ত্রিক আচরণ, কারণ এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ফ্যাসিস্ত আরএসএসের হাতে, যা দেশকে এক বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। তাই সিপিআই(এম)-এর কংগ্রেস সঠিকভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, প্রাথমিক কর্তব্য হলো– সকল ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে একজোট করতে হবে, যাতে এই যে সরকারের মধ্যে নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতাগুলি দেখা যাচ্ছে, তাকে ক্ষমতা থেকে হটানো যায়। এবং তা সুনিশ্চিত করতে হবে। সেকারণে মুখ্য রাজনৈতিক কর্তব্য হলো– এই কাজটি সুচারুভাবে করতে হলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব বাড়াতে হবে। আমরা কমিউনিস্টরা সত্য কথা বলি, সত্যনিষ্ঠ। বাস্তবতা মেনে নিই। তাই পার্টিকে পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে কেবল কেরালাতেই বাম সরকার আছে– বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এলডিএফ)। এক বছরের মধ্যেই কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাডুতে নির্বাচন আছে। আর এইসব নির্বাচনগুলিতে আমাদের রাজনৈতিক কৌশলগত লাইন হল– জনগণের আরও সমর্থন অর্জন করা। কেন্দ্র থেকে বিজেপি-কে হটাতে হবে, যাদের মধ্যে নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাই ভারতের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হুমকি স্বরূপ বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর তা করতে হলে সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বাম গণতান্ত্রিক শক্তির স্বাধীন শক্তিকে আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
তৃতীয় বিষয় হল– এই সরকারকে শুধু ক্ষমতা থেকে সরানোই যথেষ্ট নয়, কারণ সাম্প্রদায়িক বিষকে সমাজের প্রতিটি স্তরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ভারতীয় সমাজের থেকে এই বিষ ঝাড়ার কাজ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। এবং সিপিআই(এম) এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অনেক বিরোধী দল এই বিষয়টিকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। তারা বিজেপিকে আরেকটি রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখে, যারা কেবল তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু বিজেপি একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়। তাদের রয়েছে আধা-ফ্যাসিবাদী, আধা-সামরিক চরিত্রের আরএসএস থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবকরা, যারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত আছে। এরা যেন দেশের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। এটা একেবারেই অন্যরকম রাজনৈতিক সংগঠন, যাদের একটি অসাংবিধানিক আধা-সামরিক বাহিনীর মতো কাঠামো রয়েছে। তারা দেশের সশস্ত্র বাহিনীতেও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। তারা বহুস্তরে কাজ করছে। তাই বিজেপিকে নিছক একটি সাধারণ রাজনৈতিক দলের মতো দেখা ভুল হবে।
তাই ভারতীয় সমাজ থেকে বিষ ঝাড়তে হলে, আরএসএস-এর প্রভাব থেকে ভারতীয় সমাজকে মুক্ত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর পাশাপাশি আর একটি জটিল বিষয় হল– আরএসএস সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করছে, তার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সম্প্রদায়গুলির মধ্যে চরমপন্থী মনোভাব জন্ম নিচ্ছে। আরএসএস এতে খুশি হয়। কেন? কারণ সংখ্যালঘুদের মধ্যে যদি উগ্র মনোভাব দেখা দেয়, তাহলে আরএসএস তাদের নিজস্ব কার্যকলাপকে যুক্তিযুক্ত করে তুলতে পারে। ফলে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ আসলে আরএসএস-কেই সাহায্য করছে।
এই হল আমাদের দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাই এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো যেমন জরুরি, তেমনি সমাজকে আরএসএস-এর প্রভাব থেকে মুক্ত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। সিপিআই(এম)-এর ২৪তম পার্টি কংগ্রেসে আলোচনার ভিত্তিতে এই বিষয়গুলোকে মূল কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এবং গ্রহণ করেছে।
আপনারা বারবার বলছেন যে পার্টির নিজস্ব শক্তি এবং বামপন্থী আন্দোলনের স্বাধীন ভিত্তি গড়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আপনারা এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
এম এ বেবি: দেখুন, বিজেপি ও আরএসএস থেকে যে হুমকি আসছে, তার মোকাবিলা করতে হলে আমাদের রাজনৈতিকভাবে, আদর্শগতভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে তাদের মুখোশকে খুলে দিতে হবে। তারা একটি বিশ্বাসঘাতকতার কৌশল অনুসরণ করছে– ধর্ম ও রাজনীতিকে মিশিয়ে দিচ্ছে।
মানুষ সাধারণত ধর্ম বিশ্বাস করে পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে– আমার মা-বাবা যদি মুসলমান হন, তাহলে আমিও মুসলমান, যদি হিন্দু বা ব্রাহ্মণ হন, আমি তা-ই হব। যেমন এখানে চ্যাটার্জি, ব্যানার্জিদের দেখা যায়– চ্যাটার্জির ছেলে চ্যাটার্জি-ই হয়। ধর্ম এইভাবেই বহমান।
কিন্তু সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এই ধার্মিকতাকে সাম্প্রদায়িকতায় রূপান্তরিত করে। ধার্মিক হওয়া এক বিষয়, সাম্প্রদায়িক হওয়া আরেক বিষয়। আরএসএস এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দিয়ে সংখ্যালঘুদের ‘অপর’ হিসেবে তুলে ধরে।
আরএসএস এই ব্যাপারে খুবই স্পষ্ট। তাদের মতাদর্শগত গুরু মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর তাঁর লেখায় বলেছেন– ভারতের তিনটি অভ্যন্তরীণ শত্রু হল: মুসলমান, খ্রিস্টান ও কমিউনিস্ট।
আমি ওদের (আরএসএসের) উপর কিছুটা বেশ ক্রুদ্ধ, কারণ ওরা কমিউনিস্টদের তৃতীয় শত্রু হিসেবে দেখিয়েছে। বাস্তবতা হলো, কমিউনিস্টরাই ওদের প্রধান শত্রু। কিন্তু ‘অপর’ বা ‘শত্রু’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার জন্য ওরা মুসলমানদের প্রথম শত্রু হিসেবে দেখাতে চেয়েছে। এভাবেই ওরা কাজ করছে।
তাহলে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা কীভাবে করা যাবে? সেটাই প্রশ্ন। প্রথমত, ওদের যুক্তিগুলো কতটা ক্ষতিকর, অজ্ঞানতাপূর্ণ এবং অযৌক্তিক তা জনগণের সামনে উদঘাটন করতে হবে। ওদের মূল যুক্তি হল– ভারতকে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ধর্ম-ভিত্তিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।
আমাদের মানুষকে বোঝাতে হবে– ধর্ম কি কোনও আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তি হতে পারে? আমাদের চোখের সামনেই একটি ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা হয়েছিল, সেটা পাকিস্তান। সেই পাকিস্তানের দু’টি অংশ ছিল– পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। এখন কোথায় পূর্ব পাকিস্তান? এখন তো সেখানে শুধুই বাংলাদেশ।
যদি ধর্মই একটি জাতি গঠনের ভিত্তি হতে পারত, তাহলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মই হত না। পূর্ব পাকিস্তান আজও টিকে থাকত। আপনি নিশ্চয়ই এটা জানেন। তাই ধর্ম কখনোই জাতি গঠনের ভিত্তি হতে পারে না।
সুতরাং, আরএসএস-এর হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাটি একেবারেই ইতিহাস-বিরোধী এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। এই কথাগুলো আমাদের জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। কিন্তু আরএসএস ধর্মকে– এবং ধর্মের নিজেদের ইচ্ছামতো বিকৃত ব্যাখ্যাকে– ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায়।
আমরা এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি– কমিউনিজমকে রক্ষা করতে, আধা-ফ্যাসিবাদী আরএসএস এবং তাদের প্রকল্পের বিরুদ্ধে লড়তে, সেইসব মানুষ যারা, নিরীহভাবে তাদের ধর্মীয় অনুশীলন মেনে চলছেন অথচ সাম্প্রদায়িক নন, তাদেরকেও আমাদের সঙ্গে একত্রিত করতে হবে– সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে। এই বিষয়টি আমরা জোর দিয়ে বলেছি। আমাদের একটি সাংস্কৃতিক সংগ্রাম চালাতে হবে, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে।
এর পাশাপাশি আমরা এখন পরিষ্কার ভাষায় বলছি যে, ধর্মের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নেওয়া মানুষদের সঙ্গে– যারা প্রত্যেক ধর্মেই সংখ্যালঘু– আমাদের পার্থক্য করতে হবে। ধর্ম পালনকারী অধিকাংশ মানুষই সাম্প্রদায়িক নন। তাঁরা হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলিম বা বৌদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু তাঁরা সাম্প্রদায়িক নন। তাই সিপিআই(এম)-এর ২৪তম পার্টি কংগ্রেস এই দৃষ্টিকোণকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছে এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ধার্মিক মানুষদের মধ্যে থেকেই একটি ধর্মনিরপেক্ষ সংগ্রামের প্ল্যাটফর্মে তাঁদেরকে পাশে আনার জন্য একটি সুসংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, যা পার্টি কংগ্রেস পুনরায় নিশ্চিত করেছে।
বিজেপি ও আরএসএসের প্রভাব ও নয়া-ফ্যাসিবাদী প্রবণতা মোকাবিলায় বাম গণতান্ত্রিক শক্তি ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য কীভাবে গড়ে উঠতে পারে?
এম এ বেবি: এই দায়িত্ব পালনের জন্য বাম ও প্রগতিশীল শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পার্টি কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনেই আমরা সিপিআই, সিপিআই(এম-এল) লিবারেশন, ফরোয়ার্ড ব্লক এবং আরএসপি-র নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, তাঁরা উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণও দিয়েছেন। তাই বাম শক্তিগুলোর একত্রিত হওয়া এই দায়িত্ব পালনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি আগেই বলেছি, এই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকভাবে মুখোশ উন্মোচনের প্রয়োজন আছে। সেই সঙ্গে যখন এই বামপন্থী শক্তিগুলো একত্রিত হয়, তখন আমাদের অন্য গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তি এবং এমনকি সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এই বৃহত্তর মঞ্চে নিয়ে আসতে হবে। তারপর আমাদের স্বাধীনভাবে এবং একত্রে জনগণের জীবিকা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোকেও তুলে ধরতে হবে।
কৃষি শ্রমিক ও গ্রামীণ দরিদ্রদের পক্ষে এবং গ্রামীণ ধনীদের বিরুদ্ধে, শহুরে গরিবদের পক্ষে শহুরে ধনীদের বিরুদ্ধে– এই ধরনের শ্রেণিসংগ্রাম আমাদের শুরু করতে হবে। বিশেষত, এলাকাভিত্তিক সংগ্রামগুলো জরুরি। সর্বভারতীয় সংগ্রাম আমাদের করতেই হবে। যেমন ২০ মে একটি সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট হচ্ছে শ্রম আইনের বিরুদ্ধে। এই ধরনের সংগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই একই সময়ে স্থানীয় স্তরের জীবিকা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর প্রতিও নজর দিতে হবে। এমন সংগ্রাম হওয়া উচিত যা কিছু-না-কিছু দাবি আদায় না-হওয়া পর্যন্ত চলবে।
এই শ্রেণিসংগ্রামই পারে শ্রমিক, কৃষক ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করতে, ধর্ম ও জাতপাতের গণ্ডি পেরিয়ে। জাতপাতবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো মানুষকে বিভক্ত করতে চায় ধর্ম ও জাতের ভিত্তিতে। কিন্তু আমরা তাঁদের জীবিকার প্রশ্নে একত্রিত করতে চাই, জাতি ও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে। এটা পার্টির কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি প্রায়ই বলতেন, বাংলায় বামপন্থার শক্তি বাড়ানো সারা দেশে বামপন্থার পুনরুত্থানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা একদিকে বিজেপি এবং অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ ও ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার মুখোমুখি। এই বাইনারি রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কীভাবে বেরিয়ে এসে একটি শক্তিশালী বাম বিকল্প প্রতিষ্ঠা করা যায়?
এম এ বেবি: দেখুন, কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি যা বলেছেন, তা একেবারেই সঠিক। ভারতের সর্বত্র বামপন্থার পুনরুত্থানের জন্য, বিশেষ করে সিপিআই(এম)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাম রাজনৈতিক শক্তিকে যদি আমরা আবারও একটি শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ এক সময় সিপিআই(এম) এবং বাম শক্তির সবচেয়ে অগ্রগামী ঘাঁটি ছিল। আমি মনে করতে পারি কমরেড বি টি রণদিভের কথা, যিনি ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক মহান নেতা। তিনি ‘কলকাতা থিসিস’-এর প্রস্তাবক হিসেবেই পরিচিত। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় এই নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। পার্টি কংগ্রেসে ও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আমি কমরেড বিটিআর-কে বলতে শুনেছি, যখন ইএমএস পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তিনি রাজনৈতিক প্রস্তাব উত্থাপন করতেন বিশ্লেষণ-সহ।
সেই সময় কমরেড রণদিভে বলতেন, পশ্চিমবঙ্গ আমাদের নেতৃত্বে রয়েছে এবং এটি দেশের শ্রমিকশ্রেণি ও কমিউনিস্ট শক্তির সবচেয়ে অগ্রসর ঘাঁটি। যদি আমাদের সর্বভারতীয় স্তরে আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে হয়, তাহলে প্রথমেই পশ্চিমবঙ্গের এই ঘাঁটিকে রক্ষা করতে হবে, এবং এটি রক্ষা করতে গেলে ভারতের অন্যান্য অংশেও আমাদের শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
এখন, পশ্চিমবঙ্গে আমাদের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে। তাই যদি দেশে আবারও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসতে হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে হবে। এই উদ্দেশ্যেই পার্টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে– শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন, কৃষি শ্রমিক, যুব, ছাত্র, মহিলা এবং বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংগঠন– এই সমস্ত ক্ষেত্রেই লাল পতাকার নেতৃত্বে সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে।
আজ ২১ এপ্রিল, আমরা এখন আলোচনা করছি, আর গতকাল অর্থাৎ ২০ এপ্রিল, আমরা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি বিশাল সমাবেশ করেছি যেখানে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা অংশ নিয়েছেন– এই সমাবেশ লাল পতাকার শক্তি প্রদর্শন করেছে। আমরা এখন সবচেয়ে গরিব জনগণের মাঝে নিয়মিত কাজ করছি। এবং পশ্চিমবঙ্গে আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি।
আমি নিজে পশ্চিমবঙ্গ সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলাম, যা হুগলির কাছে ডানকুনিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে রাজ্য সম্মেলনে বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়েছে কীভাবে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই(এম) যে-সমস্যার মুখে পড়েছে, কীভাবে তা মোকাবিলা করা যায় এবং কীভাবে সংগঠনকে আরও বিস্তৃত করা যায়।
যদি আমরা এই সাম্প্রতিক রাজ্য সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি এবং মাদুরাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের বোঝাপড়া ও সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে পারি, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থার দ্রুত জোরালো অগ্রগতি ও পুনরুত্থান ঘটবে।
সত্তরের দশকের শুরুর দিকে আমরা দেখেছি আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস। সেই সময় হাজার হাজার কমরেডকে হত্যা করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তার পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই পার্টি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল।
এখন এটা একটু বেশি সময় নিচ্ছে, কারণ যেমন আপনি সঠিকভাবে বলেছেন, এখন এখানে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা আছে। এটা আর কেবল কংগ্রেসের মতো আধা-ফ্যাসিস্ত সন্ত্রাস নয়। এখন কংগ্রেস অনেকটাই তৃণমূল কংগ্রেসে রূপান্তরিত হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হয়েছে আরএসএস ও বিজেপির সহায়তায়। পাশাপাশি আরএসএস-নিয়ন্ত্রিত বিজেপি-ও পশ্চিমবঙ্গে শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।
এটা একটি অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি। তবে আমরা যদি ধৈর্য ধরে মানুষের মাঝে কাজ চালিয়ে যাই, যেমন আমরা এখন করছি এবং রাজ্য সম্মেলন ও ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করতে পারি, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আমূল বদলে যাবে।
আগামী বছর কেরালায় বিধানসভা নির্বাচন। এই মুহূর্তে পার্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা দেখছি, লোকসভা নির্বাচনে আমাদের সমর্থনের হার কমে ৩৩.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে এবং গত এক দশকে তা ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে এনডিএ ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধি করছে এবং তাদের ভোট শতাংশ ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে কেরালায় বামেরা কীভাবে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করবে?
এম এ বেবি: আপনি ঠিকই বলেছেন। লোকসভা নির্বাচনের ভোট শতাংশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিপিআই(এম) ও বামপন্থী শক্তির প্রভাব কিছুটা কমেছে। দেখুন, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এলডিএফ কেবল একটি আসন জিততে পেরেছিল এবং ভোট শতাংশও হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু তার পরপরই বিধানসভা নির্বাচন হয়। এবং আমরা ফিরে আসি। এলডিএফ ৭ বা ৮টি আরও বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় আসে। কেরালার ইতিহাসে এটা প্রথমবার ঘটেছে। এর আগে বামপন্থীরা কখনোই টানা দু-বার জনমত পায়নি। এটা এবারই প্রথম।
লোকসভা নির্বাচনে কেরালার ভোটাররা একটি আলাদা ধরনের আচরণ করেন। লোকসভা নির্বাচনে কেরালার ভোটারদের আচরণ একটু ভিন্ন গোত্রের। তারা (মানুষ) মনে করেন, আপনারা দিল্লিতে বড় কোনও ভূমিকা পালন করতে যান না। বাড়ি বাড়ি প্রচারের সময় তো অনেকে এমন কথাও বলেন, ‘না না, আপনাদের পার্টি প্রধানমন্ত্রী হতে পারত’, কিন্তু আপনারা নিজের আদর্শগত ও তাত্ত্বিক অবস্থানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন– যে, সীমিত সাংসদ সংখ্যা ও প্রভাব নিয়ে যদি আপনারা প্রধানমন্ত্রী হন, তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন না। এই কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কেরালায় কিছু মানুষ রাজনৈতিকভাবে খুবই সচেতন, তাঁরা এসব প্রশ্ন করেন। আমি তখন তাঁদের বোঝাই কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, কংগ্রেস ও ইউডিএফ-এর বেশি আসন থাকা দরকার লোকসভায়, যাতে বিজেপি-র বিরুদ্ধে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পায় কংগ্রেস নেতৃত্ব। তাঁরা বলেন, ‘যেহেতু আপনিও শেষমেশ কোনও ধর্মনিরপেক্ষ দলকে সমর্থন করবেন, তাহলে কংগ্রেসকে পাঠানোই ভালো।’ এইভাবে তাঁরা অনেক জটিল যুক্তি তুলে ধরেন।
ফলে এলডিএফ-এর লোকসভা নির্বাচনে ফলাফলে ইউডিএফ-এর তুলনায় পিছিয়ে পড়া স্বাভাবিক। তবে সমস্যা হচ্ছে, বিজেপি ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করছে এবং তাদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এবার লোকসভা নির্বাচনে তারা একটি আসন জিততেও পেরেছে– ত্রিশূর থেকে। এটি আগে ইউডিএফ-এর আসন ছিল। সেখানে কংগ্রেস প্রার্থীর ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সেই ভোটহ্রাসই বিজেপিকে জয়ের পথে নিয়ে যায়। অথচ ত্রিশূর লোকসভা আসনে এলডিএফ-এর ভোট কিন্তু ১৬,০০০-এরও বেশি বেড়েছে। আমি শুধু প্রসঙ্গত এটি উল্লেখ করলাম।
তবে বিধানসভা নির্বাচনে সাধারণভাবে মানুষ বামপন্থাকেই সমর্থন করে, কারণ সেখানে বামফ্রন্ট সরকারের সামগ্রিক কাজের খতিয়ানকে বিবেচনা করা হয়। এই নভেম্বরের মধ্যেই কেরালা সম্ভবত দেশের একমাত্র রাজ্য হিসেবে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করেছে বলে ঘোষণা হবে। এলডিএফ সরকার সেই দিকেই এগোচ্ছে।
এছাড়াও গৃহনির্মাণ, পরিকাঠামো উন্নয়ন– এগুলিতে বিরাট অগ্রগতি হয়েছে। কেরালা ছোটো একটি রাজ্য, কিন্তু এই এলডিএফ সরকারের সময়ে, সরকার এখন নবম বছরে প্রবেশ করছে (যদি শুধু দ্বিতীয় এলডিএফ সরকার বিবেচনা করি, তবে এটি চতুর্থ বছর)। আগের ও বর্তমান এলডিএফ সরকারের মেয়াদ মিলিয়ে কেরালায় ৮০,০০০ কোটি টাকারও বেশি পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়ন ছাড়াও নানা রকম কল্যাণমূলক প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে রাজ্য সরকার। সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হিসাবে আপনি আগ্রহী হবেন যদি আমি আপনার সময় বেশি না-নিয়ে বলি যে কেরালা হল ভারতের একমাত্র রাজ্য, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবেও অনেক কাজ করা হচ্ছে। কেরালার ২০ লাখ গরিব পরিবার, যেখানে মোট পরিবারই ২০ লাখের কম, তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ খুবই দরিদ্র। এই পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।
অনেকে বলবেন, এই গরিব মানুষদের যদি ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়, তাঁদের তো হার্ডওয়্যার থাকতে হবে। রাজ্য সরকার সেটাও নিশ্চিত করছে কুডুম্বশ্রী সেল্ফ হেল্প গ্রুপ-এর মাধ্যমে। কারণ এই দরিদ্র পরিবারগুলোতে একশো শতাংশ স্কুলে ভর্তি হয়, অর্থাৎ প্রতিটি পরিবারেই কোনও-না-কোনও শিক্ষার্থী আছে। সেই শিক্ষার্থীদের জন্য আইপ্যাড, কম্পিউটার বা স্মার্টফোন দেওয়া হবে, যার জন্য এই সেল্ফ হেল্প গ্রুপ অগ্রিম অর্থ দেবে। এভাবে তাঁরা কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হবেন। এটি একটি খুবই আকর্ষণীয় প্রকল্প যা কেরালায় ‘কেফোন’ প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সময় বাঁচানোর জন্য আমি বিস্তারিত বলছি না।
আপনারা খুবই উদ্বিগ্ন যে, বিধানসভা নির্বাচন যখন পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে একসঙ্গে হবে, তখন কী হবে। কিন্তু এখন কেরালার মানুষ বলছে যে, এলডিএফ সরকার তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসুক। এমনকি ইউডিএফ বা বিজেপি সমর্থকরাও ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছেন যে আমাদের সম্ভাবনা খুব ভালো। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে, এবং আমরা সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।
ত্রিপুরার সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পার্টি ২৪.৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে ১১টি আসন জিতেছে, যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই হয়েছিল। রাজ্যে পার্টি কীভাবে তার স্বাধীন শক্তি বৃদ্ধি করবে ও ভিত্তি প্রসারিত করবে?
এম এ বেবি: দেখুন, ত্রিপুরায় বাস্তবিক অর্থেই বিজেপি সরকার আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস চালাচ্ছে বিরোধীদের বিরুদ্ধে। শুধু বামেদের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেস বা যারা বিজেপি-র সহযোগী নয়, তাদেরও উপরও। এমনকি আগের বিরোধী নেতা এবং দীর্ঘ সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকা কমরেড মানিক সরকারও যখন বিরোধী নেতা ছিলেন, তখন তিনি নিজের এলাকায় পর্যন্ত যেতে পারেননি। এমন সন্ত্রাস সেখানে চলেছে।
এখনও অবস্থা একইরকম। ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের আগে অনেক জায়গায় বৈধভাবে পার্টি সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। সম্মেলন অন্যত্র করতে হয়েছে, প্রতিনিধিদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। আপনারা যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে আছেন, তাই অনেকে নিশ্চয়ই জানেন ত্রিপুরায় মাটির পরিস্থিতি কেমন।
তবে রাজ্য সম্মেলনে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কমরেডরা আত্মবিশ্বাসী যে এই অবস্থা চিরকাল থাকবে না। প্রয়োজনীয় কৌশল নেওয়া হচ্ছে। ত্রিপুরার উপজাতি সমাজের একটি অংশকে বিজেপি ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে ইত্যাদি। অথচ সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারই ত্রিপুরায় উপজাতিদের জন্য স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদ গঠন করেছিল।
ত্রিপুরার দুই-তৃতীয়াংশ জমি, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে উপজাতিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা উপজাতি হলেও, দুই-তৃতীয়াংশ জমি তাদের হাতে– এটা একমাত্র বাম সরকারই দিতে পেরেছে। কিন্তু উপজাতিরা বলেন, ‘ঠিক আছে, আমাদের অধিকার পাওয়া গেছে’, তবে তারা আরও কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন যা বাম সরকার চেষ্টা করছিলেন। তখন বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের ভুল বুঝিয়ে ভোট নিয়েছে। এখন সেই বিভ্রান্তি কেটে যাচ্ছে। উপজাতি জনগণ বুঝতে পারছেন যে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন।
তবে তাঁদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করে আবার বামপন্থার পক্ষে দাঁড় করাতে কিছুটা সময় লাগবে। সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কত সময় লাগবে ত্রিপুরায় সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াতে, সেটা এখনই বলা যাবে না। তবে আমরা নিশ্চিত, কমরেডরা ধীরে ধীরে আবার সিপিআই(এম) ও বামপন্থার প্রভাব পুনরুদ্ধারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
প্রকাশের তারিখ: ২৬-এপ্রিল-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
