Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

এ রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্র: দেড় দশকের চালচিত্র (প্রথম পর্ব)

বিষাণ বসু
গ্রামের একটি মেয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে। বছর পনেরো-ষোলোর মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামে, সেখানে থাকতে না-পেরে মেয়েটি বাপের বাড়ি ফিরে এসেছিল। বাপের বাড়িতেও ওই কারণে গঞ্জনা শুনতে হত। মেয়েটি উত্তরোত্তর বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিল। তারপর আত্মহত্যা। কিন্তু এই আত্মহত্যায় বিপদে পড়লেন কে জানেন? মেয়েটির বাপ-মা বা তার স্বামী কিংবা তার ছেড়ে আসা শ্বশুরবাড়ির লোকজন? না। বিপদে পড়লেন স্থানীয় বিডিও। কেন-না, তিনি গত কয়েক বছর ধরে ওই অঞ্চলে কিশোরী-বিবাহের হার শূন্যে নেমে এসেছে এমন রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন— এখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও পুলিশ রিপোর্টে এই বিয়ের কথা লিপিবদ্ধ থাকায় তাঁর এতদিন যাবত চালিয়ে আসা রিপোর্ট যে মিথ্যে তা প্রমাণ হয়ে গেল।
A Decade and a Half Overview of Healthcare in the State Part I

গত দেড় দশকে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হাল ঠিক কীরকম তা নিয়ে লিখতে বসে বেজায় ধন্দে পড়েছি। কী লিখব? কীসের ভিত্তিতে লিখব? দশ বছর অন্তর যে-সেনসাস হয়, ২০২১ সালে তা হওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার সেদিকে যাননি— সেনসাস হয়নি। এবছর সেনসাস হওয়ার কথা— তথ্যাদি সামনে আসতে আসতে আরও বছরতিনেক— ততদিন অবদি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য (অন্তত আপাত দৃষ্টিতে) তথ্য পাওয়া মুশকিল। মাঝে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে হয়েছে বটে, কিন্তু স্যাম্পলিং-নির্ভর তথ্যের সঙ্গে সেনসাস-এর সামগ্রিক তথ্যভাণ্ডারের গুণগত মানের প্রভেদ রয়েছে, তদুপরি সর্বশেষ ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য সংগ্রহের ধরন নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে, অ্যাকাডেমিক পত্রপত্রিকায় সেসব খামতি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। তবু, অন্তত কিছু তথ্য ছাড়া এ-ধরনের লেখা নামিয়ে দেওয়াটা অনুচিত। কিন্তু যে-রাজ্যে উত্তরোত্তর স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ে, কিশোরী-বিবাহের সংখ্যা বাড়ে, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী মায়েদের সংখ্যা বাড়ে— অথচ তথ্য চয়নে অত্যন্ত দক্ষ আমলাদের হাতের অতিদক্ষ কারিকুরির চোটে কিশোরী-কল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য জাতীয় স্তর ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পায়, সেখানে শুধুমাত্র জনসমক্ষে প্রকাশিত তথ্যের উপর ভরসা করা মুশকিল। সুতরাং, পরিস্থিতির সামগ্রিক বিচারে তথ্যের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও কাণ্ডজ্ঞানের ব্যবহারও জরুরি। এ-লেখা, অতএব, সেভাবেই লিখছি।

একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল খাঁচা তৈরি হয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে; বড়োসড়ো বিল্ডিং, সে নীল-সাদাই হোক বা অন্য কোনো রঙের, সেসব, জরুরি হলেও, পরবর্তী ধাপ। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক পাওয়া যেত না, এই আক্ষেপ রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মুখে কৈশোরাবধি শুনে এসেছি। কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার একটা কারণ হতে পারে, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যোগদানের ব্যাপারে চিকিৎসকদের অনীহা। আরেকটা কারণ হতে পারে, দেশে যতজন চিকিৎসক থাকা উচিত, তার চাইতে কম রয়েছেন, অর্থাৎ মোট সংখ্যাগত অপ্রতুলতা। কিন্তু চিকিৎসকের সংখ্যা অনেকখানি বাড়িয়ে ফেলা গেলে দুটি দিক থেকেই সমস্যা মেটে কেন-না সংখ্যায় প্রচুর চিকিৎসক তৈরি করা গেলে, শতাংশের হিসেবে তার বড়ো অংশ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগদানে অনাগ্রহী হলেও, যোগদানে আগ্রহী চিকিৎসকের সংখ্যায় কমতি হয় না। সেদিক থেকে গত পনেরো বছরে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই অত্যন্ত সফল। দেশে বছর বছর লক্ষাধিক ডাক্তার তৈরি হচ্ছে— রাজ্যে কয়েক হাজার (নির্দিষ্ট করে সংখ্যা বলা গেল না, কেন-না সংখ্যাটা প্রতি বছরই বাড়ছে, তবে রাজ্যে এমবিবিএস আসনের সংখ্যা, এই মুহূর্তে, সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি তো বটেই)। স্বাধীনতার পরের পঁয়ষট্টি বছরে এই রাজ্যে যতগুলো মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়েছিল, গত এক দশকে তৈরি হয়েছে তার কয়েকগুণ, আপাতত সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে এই রাজ্যে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা চল্লিশটিরও বেশি। সুতরাং, রাজ্যে চিকিৎসকের আকাল, এমন বলার সুযোগ আর নেই। যদিও নেতা-মন্ত্রীরা এখনও, প্রায়শই, সম্ভবত অভ্যাসবশত, বলে থাকেন যে ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চান না— অন্তত এই সময়ে দাঁড়িয়ে, কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছাড়াই একের পর এক মেডিকেল কলেজ তৈরি করে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা সে-সব মেডিকেল কলেজের সীমিত ও অনুপযুক্ত পরিকাঠামোয় বছর বছর ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি করে, পরীক্ষাব্যবস্থায় ঢালাও দুর্নীতির অবকাশ রেখে (এই দুর্নীতি নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি, কিন্তু অভয়া কাণ্ডের সময় রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতির ছবিটা প্রকাশ্যে এসেছে) খাপছাড়া ও অসম্পূর্ণ ট্রেনিং দিয়ে বছর বছর অজস্র চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে, যারা যেকোনো মূল্যে যেকোনো জায়গায় চাকরি করতে যেতে তৈরি, বা তৈরি থাকতে বাধ্য। 

এমন বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে এবং তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও। গত কয়েক বছরে এমডি আসনের বৃদ্ধির সংখ্যাটি আরও চমকপ্রদ— ইদানীং এমডি আসন এতই বেশি যে সব আসন ভর্তি অবদি হচ্ছে না, আসন ভর্তি না-হওয়ায় পোস্ট-গ্রাজুয়েট মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষার কাট-অফ মার্কস শূন্যের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। কেন্দ্রের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পরীক্ষায় যারা মাইনাস চল্লিশ পেয়েছে, এবারে তারাও এমডি পড়তে পারবে। আরেকদিকে রাজ্যের আমজনতার আর্থিক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ডাক্তারি ডিগ্রি ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করে সংসার চালানো উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যাতে এমনকি যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসকরাও চাকরির নিরাপত্তা খুঁজছেন, আর যারা এই বর্তমান ‘ব্যবস্থা’-র সুযোগে তালেগোলে ডাক্তার হয়ে পড়ল তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য। অতএব, সরকারি চাকরিতে ঢোকার জন্য অত্যাবশ্যক যে হাউসস্টাফশিপ, সেখানে কুড়িটা আসনের জন্য চারশো-পাঁচশো আবেদন জমা হচ্ছে। একেবারেই গ্রামেগঞ্জে ডাক্তারির জন্য যে মেডিকেল অফিসারের চাকরি— বেশ কয়েক বছর বাদে বাদে সে-চাকরিতে নিয়োগের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে বারোশো আসনের জন্য সাড়ে আট হাজার চিকিৎসক আবেদন করেন, যাঁদের বড়ো অংশই ‘স্পেশালিস্ট’। সুতরাং গ্রামে যাবার ব্যাপারে চিকিৎসকদের অনাগ্রহের পরিবর্তে একেবারে উদগ্র ব্যাকুলতা প্রকাশের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে; অথচ এরপরেও সরকার তথা নেতারা বলে চলবেন যে ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চায় না!

স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অবস্থাও তথৈবচ। বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ থাকলেও স্থায়ী পদে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ উত্তরোত্তর বিরল হয়ে উঠেছে। মোটামুটি চুক্তিভিত্তিক কর্মী দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে কাজ চলছে। এছাড়া নতুন নতুন মেডিকেল কলেজে নিত্যনতুন টেকনিশিয়ান কোর্স খুলে সেখানে যাঁরা ট্রেনিং নিতে আসছেন, তাঁদের দিয়েই স্থায়ী কর্মীদের কাজ করানো হচ্ছে। ঠিক যেমন করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ না-করে সদ্য পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন পাস করা চিকিৎসকদের বন্ডের মাধ্যমে বাড়তি রেসিডেন্সি/ট্রেনিং-এর মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব পূরণ হচ্ছে, এ-ও প্রায় তেমনই।

এক কথায় বলতে গেলে, নিত্যনতুন বিল্ডিং তৈরি করা বা নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি কেনার ব্যাপারে সরকারবাহাদুর যতখানি আগ্রহী (আর কেনাকাটা বা নির্মাণের কন্ট্র‍্যাক্ট দেবার ব্যাপারে সরকারের অত্যুৎসাহ তথা বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহের পেছনে রহস্য যে ঠিক কী, তা বর্তমান সরকারের কার্যপদ্ধতি বিষয়ে যাঁরা তিলমাত্র অবগত, তাঁরা অবশ্যই জানেন, ফলে বিশদ ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না), সেই বিল্ডিং-এ চিকিৎসার কাজটা যাঁরা করবেন বা সেই যন্ত্র যাঁরা রোগী-পরিষেবার কাজে ব্যবহার করবেন, অর্থাৎ চিকিৎসক টেকনিশিয়ান স্বাস্থ্যকর্মী, এক কথায় ম্যানপাওয়ার বা হিউম্যান রিসোর্স, অর্থাৎ এমন নিয়োগ যাঁদের মাসে মাসে বেতন দিতে হয়, তেমন ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত আগ্রহাতিশয্যের ভগ্নাংশও দেখা যায় না।

এমতাবস্থায়, প্রতি ধাপে উপযুক্ত সংখ্যক যোগ্য চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী না-থাকার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে, স্বাস্থ্য-পরিষেবাই বলুন বা জনস্বাস্থ্য, কোনোটিই ঠিকভাবে চলতে পারে না, চলছেও না। এটুকু অনস্বীকার্য যে ইঁট-কাঠ-বালি-সিমেন্টের যে-কাঠামো অথবা হাসপাতালে যন্ত্রপাতির উপস্থিতি— দুই দিক থেকেই বর্তমান সরকারের আমলে খুব বিশেষ কমতি নেই। তারপরও, হিউম্যান রিসোর্স নিয়োগের অভাবে রাজ্যের স্বাস্থ্য পেছনপানে এগিয়ে চলেছে। মুশকিল হল, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচক এমনই যে, ভালো কিংবা খারাপ কোনো বদলই তাতে রাতারাতি প্রতিফলিত হয় না। দশক ব্যাপী লাগাতার প্রয়াস (বা লাগাতার অবহেলা) ভিন্ন সূচকে উন্নতির (বা অবনতি) প্রতিফলন ঘটে না। আবারও মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে সেনসাস না-হওয়ায় সাম্প্রতিককালের নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ২০২৬-এর সেনসাসের পর তথ্য সাজিয়ে-গুছিয়ে সামনে আসতে আসতে হয়তো ২০২৮-২৯ হয়ে যাবে, আশঙ্কা হয় যে তখন আমরা রাজ্যের স্বাস্থ্যের বেহাল দশা একেবারে স্পষ্ট করে দেখতে পাব। কেন-না, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সূত্রে যে-সব তথ্য ভেসে আসে, তাতে খারাপ ছাড়া ভালো কিছু আশা করার সুযোগ বিশেষ নেই।

যেমন ধরুন, গত বছরে দেশের রেজিস্ট্রার জেনারেল যে-তালিকা প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রসূতি-মৃত্যুর হারে আমাদের রাজ্যের অবস্থান জাতীয় গড়ের চাইতে ঢের খারাপ। প্রতি এক লক্ষ শিশু-জন্মে মাতৃ-মৃত্যুর হার, এই রাজ্যে ১০৪, যেখানে জাতীয় গড় ৮৮। ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, সবাই আমাদের আগে; আপাতত আমরা বিহারের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় আছি। এই তথ্য জানাজানি হওয়ার পর স্বাস্থ্য ভবনের বড়ো কর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন, মাতৃ-মৃত্যুর হার কমানোর জন্য বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নিচ্ছেন, হাসপাতালে হাসপাতালে দেখভাল কঠোরতর হয়েছে কিন্তু গাছের গোড়ার দিকে নজর না-দিয়ে শুধু আগায় জলের ছিটে দিলে কাজ হবে কী?

বেশ কয়েক বছর ধরেই এই রাজ্যে কিশোরী-বিবাহ বাড়ছে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে, প্রত্যাশিতভাবেই, বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্কা মায়েদের সংখ্যা। অপুষ্ট ও অপরিণত দেহে সন্তানের জন্ম দিতে হলে মাতৃ-মৃত্যু এবং সদ্যোজাত-মৃত্যু, দুইই যে বাড়বে, এ-নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে কি? এবং বছর বছর স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়তে থাকলে, একের পর এক সরকারি ইশকুল বন্ধ হতে থাকলে, অপ্রাপ্তবয়স্ক-বিবাহের সংখ্যা যে বাড়বে, তাতেও অবাক হওয়ার কারণ আছে কি? এবং শিক্ষার শেষে কর্মসংস্থান তো দূর, কর্মসংস্থানের অতিদূর সম্ভাবনাটুকুও না-থাকলে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যে ইশকুলে যেতে বা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী হবে না এটুকু আন্দাজ করতে পারার জন্য নিশ্চয়ই রকেট সায়েন্স বোঝার প্রয়োজন পড়ে না? স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, দুটো বিষয় এতখানিই পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে একটি যখন ভগ্নস্তূপ, তখন অপরটি হর্ম্যসম হতে পারে না। আর রাজ্যের সরকারি শিক্ষা-ব্যবস্থার হাল যে ঠিক কীরকম, সে-নিয়ে আদ্যন্ত সরকারপন্থীরাও ঢোঁক না-গিলে উত্তর দিতে পারবেন না।

কিন্তু পূর্বোক্ত সত্যের পাশাপাশি আরও একটি অপ্রিয় সত্যি হল— অন্যান্য অনেক তথ্যের মতোই, এই রাজ্যে কিশোরী-বিবাহ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কা-প্রসূতির সংখ্যা ঠিক কত, সে-বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সঠিক পরিসংখ্যান, অনুমান করা যায়, স্বাস্থ্য ভবনের বড়োকর্তাদের কাছে নেই। নেই কেন-না, সরকারবাহাদুর এমন চমৎকার প্রশাসনিক বন্দোবস্ত নির্মাণ করেছেন যা জলের মতো— সর্বদাই নিম্নগামী। মুখ্যমন্ত্রী শীর্ষ আমলাদের ধমকান, শীর্ষ আমলা মেজ আমলাদের, মেজ আমলা সেজ-দের - এমনি করে নামতে নামতে স্বাস্থ্যভবনের হর্তাকর্তারা হাসপাতালের স্থানীয় প্রশাসকদের এমন চমকে রাখেন যে সকলেই উপরমহলকে তুষ্ট করতে শশব্যস্ত হয়ে থাকেন, ধমকানি খাওয়ার ভয়ে কেউই উপরতলায় সমস্যার কথা জানান না।

একটা অদ্ভুত ঘটনা বলি। গ্রামের একটি মেয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে। বছর পনেরো-ষোলোর মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামে, সেখানে থাকতে না-পেরে মেয়েটি বাপের বাড়ি ফিরে এসেছিল। বাপের বাড়িতেও ওই কারণে গঞ্জনা শুনতে হত। মেয়েটি উত্তরোত্তর বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিল। তারপর আত্মহত্যা। কিন্তু এই আত্মহত্যায় বিপদে পড়লেন কে জানেন? মেয়েটির বাপ-মা বা তার স্বামী কিংবা তার ছেড়ে আসা শ্বশুরবাড়ির লোকজন? না। বিপদে পড়লেন স্থানীয় বিডিও। কেন-না, তিনি গত কয়েক বছর ধরে ওই অঞ্চলে কিশোরী-বিবাহের হার শূন্যে নেমে এসেছে এমন রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন— এখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও পুলিশ রিপোর্টে এই বিয়ের কথা লিপিবদ্ধ থাকায় তাঁর এতদিন যাবত চালিয়ে আসা রিপোর্ট যে মিথ্যে তা প্রমাণ হয়ে গেল।

তো ওই বিডিও-র মতো করেই, উপরমহলকে তুষ্ট রাখার অদম্য তাড়নায়, হাসপাতালের প্রশাসকরা সচরাচর কিশোরী-মায়েদের ব্যাপারে উপরমহলে রিপোর্ট করেন না, যদিও এ-বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠানোর কথা। এই প্রসঙ্গ নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলে ফেললাম, কেন-না এই কিশোরী-বিবাহ এবং কিশোরী-মাতৃত্বের সংখ্যা চেপে যাওয়াটা একটি উদাহরণ মাত্র; স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার প্রতি ক্ষেত্রেই পাছে উপরমহল চটে যান এই ভয়ে, হাসপাতালে কাজ করার সুবাদে নিত্যদিন দেখতে পাওয়া এবং হাসপাতালের একান্ত নিজস্ব বাস্তব সমস্যাগুলো হাসপাতালের চিকিৎসক বা স্থানীয় চিকিৎসক-প্রশাসকরা রিপোর্ট করেন না, ঠিক যেমন করে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বা মৃত্যুর সংখ্যা চেপে যাওয়া হয়, তেমনই। কদাচিত কোনো চরম পরিস্থিতিতে সত্যিটা সামনে এসে পড়লে হইচই পড়ে এবং তখন ধামাচাপা দেবার দায়িত্বটা ন্যস্ত হয় উচ্চস্তরের আমলাদের উপর। সুতরাং, লেখার একেবারে শুরুতে যে-কথা বললাম, যেহেতু তথ্য ও সত্যের বিকৃতি প্রতিটি ধাপেই ঘটে চলেছে, সংকটের সঠিক রূপ স্রেফ তথ্য ঘেঁটে বুঝতে পারা মুশকিল।

একদিকে উপরমহলের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য নেই এবং সমস্যা না-জানা থাকলে সমাধানের জন্য নড়েচড়ে বসার চাপও নেই; আরেকদিকে তথ্য যেটুকু রয়েছে, সেটুকু তথ্য সর্বসমক্ষে আনার চেষ্টাটুকুও নেই। ২০১৮ সাল থেকেই রাজ্য সরকার স্বাস্থ্য বিষয়ক সামগ্রিক তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে, আর এই একই ধরনের কাজ করেছে দেশের সরকারও। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য-পরিস্থিতির নিরিখে রাজ্যের অবস্থানটি বুঝতে চাইলে ভরসা বলতে সেই ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, অর্থাৎ এনএসএইচএস, আর যে-কথা আগেও বলেছি, সেই সার্ভে-র তথ্যসংগ্রহের পদ্ধতি এবং সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বারবারই প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া তথ্য বলতে আইন-আদালতে বিবিধ মামলা-মোকদ্দমায় দাখিল করা তথ্য; যা মোটামুটি নির্ভরযোগ্য হলেও সামগ্রিক ছবি তুলে ধরার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সুতরাং বিস্তর কথাবার্তার পর আমরা সেই একই জায়গায় ফিরে আসছি স্রেফ তথ্য দিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্য-পরিস্থিতির কোনো পূর্ণাঙ্গ ছবি তুলে ধরা সম্ভব নয়।

তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের প্রয়াসের একটি কদর্য রূপ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম কোভিডের দিনগুলোতে। কিন্তু তার জন্য আমাদের রাজ্যকে আলাদা করে দোষী ঠাউরানোর মানে হয় না, কেন-না বিরল ব্যতিক্রম দু-একটি রাজ্য বাদে দেশের বাকি সব রাজ্যের সরকার তো বটেই, এমনকি দেশের কেন্দ্রীয় সরকারও যথাসাধ্য তথ্য গোপন করে গেছে কোভিড-পরিস্থিতি বিষয়ে, মোট আক্রান্তের সংখ্যা থেকে কোভিডে মৃত্যু বিষয়ে সঠিক তথ্য কখনোই জানা যায়নি, এখনও না। তবে বিশ্বজোড়া অতিমারী হল বিরলের মধ্যেও বিরলতম ঘটনা সেই মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও নিতে পারেন তাই ওই দিনগুলোকে হিসেবে ধরছি না। কিন্তু আরেকটা রোগ? ডেঙ্গু? ২০০৮ সালে রাজ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১০২০ জন, ২০১০ সালে ৮০৫ জন, কিন্তু তার পর থেকেই সংখ্যাটা বাড়তে শুরু করে। ২০১২ সালে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৬৪৫৬-য়। ২০১৫ সালে ২২৮৬৫ জন, ২০১৯ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় পঁয়তাল্লিশ হাজারে, ২০২২ সালে ৬৭২৭১-এ। মাথায় রাখুন, এসব তথ্য সরকার জনগণের সামনে আনার প্রয়োজনবোধ করেননি। তথ্যগুলো পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন আদালতে দাখিল হওয়া মামলার সুবাদে।

ছোটোবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্প বলতে গল্পই। কোনো এক ডিক্টেটরের রাজ্যে কোনো এক বোকা নাগরিক একান্তে, বন্ধুমহলেই, কোনো একটি বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে দেশের মহামান্য ডিক্টেটরকে অপদার্থ বলেছিলেন। ডিক্টেটরের শাসন, সেখানে দেওয়ালেরও কান থাকে। বন্ধুদের মধ্যেই কোনো একজন ছিল সরকারের চর, তো উপরমহলে খবর চলে গেল। খবর যেতে-না-যেতেই সেই বোকা মানুষটিকে রাজপেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল। অভিযোগ, তিনি স্বয়ং ডিক্টেটরকে অপমান করেছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে বোকা মানুষটি কাতর হয়ে জানালেন যে তিনি তো ভুল কিছু বলেননি, ওই বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে একেবারে সত্যি কথাটাই বলেছেন। শুনে শাসক বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই; আর সেটাই তোমার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ। গুরুতর অভিযোগ। তুমি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করার চেষ্টা করেছ। 

রাজ্যের ডেঙ্গু-পরিস্থিতি নিয়ে মেডিসিন-বিশেষজ্ঞ ডা. অরুণাচল দত্তচৌধুরীর একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে সরকারের পদক্ষেপ ছিল— সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দীর্ঘদিন সাসপেন্ড করে রাখা এবং বিস্তর আন্দোলন, ডেপুটেশনের পর সাসপেনশন তুলতে বাধ্য হলেও অবসরের মাসকয়েক আগে তাঁকে কালিম্পং-এ বদলি করে দেওয়া হয় এবং ডেঙ্গু-প্রতিরোধে যতখানি, তার কয়েকগুণ বাড়তি উদ্যোগ রোগের খবর গোপন করার জন্য নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে উপরের গল্পটির চাইতে প্রাসঙ্গিক কিছু মনে পড়ছে না। তারপরও বলি, তথ্যাভাব এবং তথ্যের অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও যেটুকু তথ্য এদিক-ওদিক ফাঁকফোকড় গলে বেরিয়ে আসছে, তা খুবই আশঙ্কাজনক। 

যেমন ধরুন, এনএফএইচএস-৫-এর তথ্য (২০১৯-২০২১ সালে সংগৃহীত তথ্য) ধরলে দেখা যাচ্ছে, কিশোরী-বিবাহ এবং কিশোরী-মাতৃত্বের হারে আমাদের রাজ্য দেশের মধ্যে প্রায় শীর্ষে (একটু আগেই কিশোরী-বিবাহের সংখ্যা গোপন করার ব্যাপারে প্রশাসনিক উদ্যোগের গল্প শুনিয়েছি)। বলা বাহুল্য, রাজ্যের স্বাস্থ্য-দফতর এ-বিষয়ে বিশেষ তথ্য প্রকাশ করেনি। ইদানীং অধিকাংশ প্রসবই হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে এবং যেহেতু এমন কিশোরী-মাতৃত্ব সাধারণভাবে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বেশি ঘটে এবং স্বাভাবিক কারণেই তাঁরা সরকারি হাসপাতালে আসেন সুতরাং কিশোরী-প্রসবের হার যখন বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে তখন স্রেফ সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার নিজস্ব রিপোর্টিং সিস্টেম যদি তথ্য সংগ্রহ ও যথাস্থানে সেই তথ্য জানানোর ব্যাপারে স্বচ্ছ থাকত, তাহলে শুধু তার মাধ্যমেই সে-বিষয়ে যথেষ্ট সাবধানবার্তা উপরমহলের কাছে পৌঁছাতে পারত কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। কিশোরী-প্রসবের হার বিষয়ে সরকারের তরফে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার ভাবনা দেখা যায়নি। আবারও বলি, কিশোরী-মাতৃত্ব বিষয়ে যথাযথ তথ্য রাজ্যের প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এমনকি প্রান্তিক মেডিকেল কলেজগুলোর প্রশাসনের তরফেও স্বাস্থ্যভবনে জানানো হয় না (কারণটা আগে বলেছি)। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, একেবারে তৃণমূল স্তরেই তথ্য চেপে যাওয়া হয়েছে।

যেমন ধরুন, পর পর এনএফএইচএস-এর তথ্য যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে রাজ্যে বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের মধ্যে রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এনএফএইচএস-৩ (২০০৫-০৬ সালে সংগৃহীত তথ্য) অনুসারে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ। এনএফএইচএস-৪-এ (২০১৫-১৬ সালে সংগৃহীত তথ্য) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২.২ শতাংশ। আর সাম্প্রতিক এনএফএইচএস-৫ এই হার একেবারে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালীন রক্তাল্পতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একদিকে তা যেমন আগামী দিনের নারীদের স্বাস্থ্য কেমন দাঁড়াবে তা চিহ্নিত করে, আরেকদিকে তা আগামী দিনের শিশু তথা ভবিষ্যতের নাগরিকদের স্বাস্থ্যও নির্ধারণ করে। এই সূচকে প্রতিফলিত হয় মেয়েদের অপুষ্টি, আবার প্রতিফলিত হয় প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধী ব্যবস্থা (যেমন আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট সাপ্লাই, বা উপযুক্ত ক্ষেত্রে কৃমির ওষুধ সাপ্লাই) যথাযথভাবে নেওয়া হচ্ছে কিনা, অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঠিকঠাক কিনা তাও যাচাই যায়।

সরকারি স্বাস্থ্য-পরিষেবা বিষয়ক কিছু তথ্যও রীতিমতো উদ্বেগজনক। যেমন, গর্ভনিরোধক অপারেশন ল্যাপারোস্কোপিক টিউবেকটমি। সরকারি হাসপাতালে সংখ্যাটা প্রতি বছরই কমছে। ২০১০-১১ সালে সরকারি হাসপাতালে সংখ্যাটা ছিল ৩৭৯১০, ২০১১-১২ সালে তা নেমে দাঁড়াল ৩০৩৬৯-তে। ২০১২-১৩ সালে তা অনেকটা কমে নামল ২৩৯০৩, ২০১৩-১৪ সালে ১৮৪০২ জন মহিলা সরকারি হাসপাতালে ল্যাপারোস্কোপিক টিউবেকটমি করাতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবেই ক্রমশ কমতে কমতে ২০১৭-১৮ সালে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৮৪৪৬। এই পর্যন্তই জানা গিয়েছে, কেন-না এরপর সরকার আর তথ্য প্রকাশ করেননি।

যেমন, রাজ্যে সরকারি পরিকাঠামোয় ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে ২০১১-১২ সালের পর থেকেই। অন্ধত্ব নিবারণের জন্য একটি ন্যাশনাল প্রোগ্রাম রয়েছে প্রতি রাজ্যে ছানি-কাটানোর অপারেশনের জন্য নির্দিষ্ট টাকা কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করে থাকে। একটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থাকে, রাজ্যের কাজ অধিক সংখ্যক ছানি-কাটানোর অপারেশন করে কেন্দ্রের সরকারের কাছ থেকে টাকাটা আদায় করা। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশ বছরে আমাদের রাজ্য লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছিই ছিল। সর্বনিম্ন পারফরম্যান্স যে-বছর, সে-বছর লক্ষ্যমাত্রার চুরাশি শতাংশ পূরণ হয়েছিল। সেরা পারফরম্যান্সের বছরে তা লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে পৌঁছে ছিল ১৩০ শতাংশে (এক্ষেত্রেও, লক্ষ্যমাত্রার বেশি অপারেশনের খরচ, কেন্দ্রীয় সরকারই দেয়)। কিন্তু ২০১১-১২ সাল থেকে কমতে কমতে ২০১৬-১৭ সালে রাজ্যে ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা গিয়ে নেমেছে লক্ষ্যমাত্রার ৪৭ শতাংশে। তারপর থেকেই সরকারি হাসপাতালে ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকার ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। হাসপাতাল-পিছু টার্গেট বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, রীতিমতো হুলিয়া জারি হচ্ছে কিন্তু, এসব করে পরিস্থিতির খানিক উন্নতি ঘটলেও পুরোপুরি সুরাহা হবে না। ছানি-কাটানোর অপারেশন হয়ে চলেছে অবশ্যই কিন্তু হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্য-পরিকাঠামোর বাইরে এনজিও-আয়োজিত ক্যাম্পে, প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে।

কেন? আসলে, রাজ্যের মানুষ সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাকে দ্বিতীয় শ্রেণি হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছেন। মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্ত সরকারি হাসপাতাল থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন অনেক আগেই সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার মুখ্য উপভোক্তা বলতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরাই। এই পরিস্থিতি শুধুই গত দেড় দশকে নির্মিত, এমন বললে সত্যের অপলাপ হবে। বলা যেতে পারে যে এই পরিস্থিতির পেছনে জটিল আর্থ-সামাজিক ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রাইভেট হেলথকেয়ারকে প্রথম শ্রেণির বন্দোবস্ত হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে যেভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে, ভূভারতে তার তুলনা মেলা ভার। এজন্যই বারবার বলছি, শুধুমাত্র তথ্য দিয়ে রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার অধঃপতনের পরিমাপ করতে চাইলে বড়ো খামতি রয়ে যাবে। আপাত তথ্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সত্যিটা বুঝতে চাইলে রীতিমতো বিশ্লেষণী চোখ নিয়ে সরকার ও সরকারে আসীন দলের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে।

শেষ পর্ব আগামীকাল


প্রকাশের তারিখ: ২৭-মার্চ-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬