সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অযুক্তির শাসন
কুমার রাণা
এটি রাষ্ট্রশক্তির প্রকৃতিকে স্পষ্ট করে। এটা ঠিক যে, রাষ্ট্রকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগুলির মধ্যে মধ্যস্থতা করে, জনকল্যাণ করে এবং আইনের শাসনকে বজায় রাখে। গণতান্ত্রিক তত্ত্বে, রাষ্ট্র তার বৈধতা অর্জন করে নাগরিকদের সম্মতি ও যোগদান থেকে। কিন্তু বাস্তবত ক্ষমতা কয়েকজনের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, আর এই মধ্যস্থতামূলক ভূমিকাগুলো আর অবশিষ্ট থাকে না। রাষ্ট্র বস্তুত প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কম, বরং নিয়ন্ত্রণের এক যন্ত্র হিসেবেই মূলত কাজ করে।

মানব ইতিহাস অগ্রসর হয়েছে নানা দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে— সে দ্বন্দ্ব ঘোষিত আদর্শ ও তার বাস্তব প্রয়োগের, কাঙ্ক্ষিত ও বাস্তব ফলাফলের, বলা কথা ও প্রকৃতপক্ষে করা কাজের। কিন্তু এমন কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে, যখন এই বৈপরীত্যগুলো কেবলমাত্র রাজনীতির আনুষঙ্গিক বিষয় হয়ে থেকে যায় না, বরং তার কাঠামোটাকেই গড়ে দেয়। আমরা তেমনই এক পৃথিবীতে বাস করছি। মুখে মানব-স্বাধীনতার জয়গান, আর কাজে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহরণ। মুখে সভ্যতার অগ্রগতির কথা, কাজে চূড়াস্পর্শী অসভ্যতা। মুখে গণতন্ত্রের কথা, কাজে একনায়কতন্ত্রের আগ্রাসন। মুখে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি, কাজে অধিকাধিক মানুষকে বিকশিত হবার সুযোগবৃত্ত থেকে বহিষ্কার। এগুলি কেবল আকস্মিক অসামঞ্জস্য নয়। এগুলি এক গভীরতর অবস্থার ইঙ্গিত। এটা এমন এক দ্বন্দ্ব যেখানে ক্ষমতা টিকে থাকে সেই মূল্যবোধগুলিকেই ব্যবহার করে, যেগুলিকে সে অহরহ খর্ব করে, বিনষ্ট করে ।
বিশ্বপরিসরে এই বৈপরীত্যকে সবচেয়ে তীব্রভাবে যে উদাহরণটি তুলে ধরে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বহু দশক ধরে এই শক্তি গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের স্বঘোষিত রক্ষক। অথচ, এই রাষ্ট্রই নিয়ম করে বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে চলেছে, সেসব দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে হনন করে চলেছে। অতি সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছে। চে গেভারা থেকে নিয়ে শুরু করে চিলে-র নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান সালভাদোর আয়েন্দেকে হত্যা থেকে নিয়ে সাদ্দাম হুসেন, মুয়াম্মার গদ্দাফি, এবং অতি সম্প্রতি ইরানে আয়াতোল্লা আলি খোমেনেই সহ সেদেশের সামরিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশকে মার্কিন সেনা ও গোয়েন্দাবাহিনী শুধু হত্যাই করেনি, সেই হত্যাকে উদযাপন করেছে। যারা নরহত্যাকে উদযাপন করতে পারে তাদের মুখে সভ্যতার কথা ততটাই বৈপরীত্যের যতখানি আগুন ও জলের মৈত্রী। মূলত যুদ্ধবাজ এই রাষ্ট্রের কাছে উন্নয়নের অর্থই হল পরস্বাপহরণ। রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাবতীয় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, শিশু-নারী-বৃদ্ধদের নির্দ্বিধায় হত্যা, হাসপাতাল থেকে নিয়ে সাধারণ নাগরিক আবাসগুলিতে বোমা ফেলার ব্যাপারে প্রভূত দক্ষতা অর্জন করেছে। সামরিক আগ্রাসন এবং আর্থনীতিক নিষেধাজ্ঞা— এসবই প্রায়শই “স্বাধীনতা” বা “নিরাপত্তা”-র নামে “বৈধতা” পেয়েছে, যতই এগুলো ব্যাপক ধ্বংস, অস্থিরতা এবং মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনুক না কেন।
সমসাময়িক সংঘর্ষগুলিতে এই বৈপরীত্য চরমে পৌঁছায়: এখানে মুক্তির ভাষা ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যের সঙ্গে সহাবস্থান করে। গাজা উপত্যকার মতো অঞ্চলগুলির অবিরাম সহিংসতার ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হওয়া এক গভীর বৈপরীত্যকে তুলে ধরে: যারা মানব মর্যাদা রক্ষার দাবি করে, তারাই সেই মর্যাদার পদ্ধতিগত অবক্ষয়ে অংশগ্রহণ করে। শান্তির জন্য অপরিহার্য বলে চিহ্নিত যুদ্ধগুলিতে সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে “পারিপার্শ্বিক ক্ষতির শিকার (কো-ল্যাটারেল ড্যামেজ)”। ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর বোমাবর্ষণ, সেই দেশের মানুষ ও সভ্যতাকে নিমেষে ধ্বংস করে দেওয়ার মুহুর্মুহু হুমকি, লেবাননে শিশু-সহ বহু অসামরিক নাগরিকের ওপর বোমা ফেলার মতো ঘটনা সমস্ত যুক্তিকে লঙ্ঘিত করে চলেছে। অযুক্তি যেখানে প্রবল সেখানে ন্যায্যতার ভাষ্য ক্রমশ দমন-পীড়নের যন্ত্রের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায়। এমন মুহূর্তে বৈপরীত্য আর কেবল দার্শনিক কৌতূহলের বিষয় থাকে না; এটি এক নৈতিক সংকটে পরিণত হয়।
📌 বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত অন্যান্য লেখাগুলি পড়তে ক্লিক করুন
তবে এই অবস্থার জন্য কেবল একটি বৈশ্বিক শক্তিকে দায়ী করা বিভ্রান্তিকর হবে। ক্ষমতার এই বৈপরীত্য কোনো বিশেষ ভূগোলে আটকে নেই। নানান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন দেখা যায়। ভারত একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এদেশের শাসকরা একে প্রায়ই বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে বুক বাজিয়ে থাকে। অথচ, এই “গণতন্ত্র”-ই দেশের লোকেদের গলা টিপে ধরার দিকে দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দক্ষতার নিদর্শন হয়ে ওঠে।
ভারতীয় গণতন্ত্রের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাংবিধানিক অঙ্গীকার: সামাজিক বা আর্থনীতিক পটভূমি নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার, মর্যাদা এবং সামাজিক গতিময়তায় যোগদানের অধিকারী। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দেখায় কীভাবে এই অঙ্গীকার ও তার বাস্তবায়ন পরপস্পরের থেকে শুধু বিচ্ছিন্নই নয়, বরং যেন এক বৈরসম্পর্কে লিপ্ত। নাগরিকত্বকে প্রকৃতপক্ষে অর্থবহ ও সুফলা করে তোলার জন্য সর্বাগ্রে যেটা দরকার তা হল সাক্ষরতার মতো একটি মৌলিক সক্ষমতা। অথচ, সরকারি ঘোষণা অনুসারেই, দেশের এক চতুর্থাংশ (বস্তুত অনেক বেশি) মানুষকে এই সক্ষমতা থেকে বিযুক্ত রাখা হয়েছে। বহু দশকের নীতিগত ঘোষণা সত্ত্বেও, দেশবাসীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও পড়া, লেখা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পথ খুঁজে নিতে হিমশিম খায়।
ঠিক এই ব্যবধানটিকেই এখন বর্জনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরক্ষরতার কাঠামোগত কারণগুলিকে সমাধান করার পরিবর্তে রাষ্ট্র ক্রমশ নাগরিকত্বের শর্ত হিসেবে নিখুঁত নথিপত্র দাবি করছে। পরিচয়পত্রে কোনো ত্রুটি থাকা চলবে না; বিভিন্ন নথিতে নামের বানান একেবারে অভিন্ন হতে হবে; ঠিকানাও হুবহু মিলে যেতে হবে। সামান্যতম অমিলও একজন ব্যক্তিকে সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসতে পারে। কার্যত, প্রশাসনিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে অক্ষমতা— যা প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার প্রত্যক্ষ ফল— তাকে অবৈধতার প্রমাণে রূপান্তরিত করা হচ্ছে।
এটাই শাসনের বৈপরীত্য: রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সামাজিক যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, অথচ সেই সক্ষমতার অভাবের জন্যই তাদের শাস্তি দেয়। একটি গ্রামীণ এলাকার নিরক্ষর নারী, যিনি কখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি, তাঁর কাছ থেকে দাবি করা হয়, তিনি জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলি সেইরকম দক্ষতায় সম্পন্ন করবেন, যেভাবে প্রযুক্তিতে সড়গড় একজন শিক্ষিত শহুরে নাগরিক করে থাকেন। আর সেই নারী যখন ব্যর্থ হন, তখন প্রমাণের ভার তাঁর ওপরই বর্তায়— রাষ্ট্রের ওপর নয়। অথচ রাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ— নাগরিকদের অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর যে দায়িত্ব তার ওপর ছিল, সেই দায়িত্ব পালনে সে দায়বদ্ধ থাকেনি। অথচ, শাস্তি পেতে হচ্ছে নাগরিকদের, রাষ্ট্রপরিচালকরা ক্ষমতার সোপানের পর সোপান অতিক্রম করে যান। 
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ডিজিটাল সাক্ষরতা একটি অন্তর্নিহিত শর্ত হিসেবে সামনে আসে। ক্রমশ যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি বা আপিলের পথগুলি এমন হয়ে উঠছে, যেখানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ইলেকট্রনিক নথিপত্র এবং ডিজিটাল প্রমাণীকরণের সঙ্গে পরিচিতি অপরিহার্য হয়ে উঠছে। জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশের জন্য, বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, এগুলি কেবল নতুন দক্ষতা নয়, বরং সম্পূর্ণ অপরিচিত ক্ষেত্র। ফলে ডিজিটাল বিভাজন প্রশাসনিক বিভাজনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং বহুস্তরীয় বর্জনের সৃষ্টি করে, যা অতিক্রম করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তি নয়, রাষ্ট্র পরিচালিত হয় অযুক্তির বলে। এমনকি যে সুপ্রিম কোর্টকে ন্যায়ের পীঠস্থান ভেবে আসা হয়েছে, সেখানে যুক্তি বিপন্ন, অযুক্তি হয়ে ওঠে শিরোমণি। নোটবন্দী হল, তার ফলে কোটি কোটি মানুষকে ভয়ানক দুর্দশার শিকার হতে হল। কিন্তু, যারা দেশবাসীর ওপর এই ভ্রান্ত নীতি চাপিয়ে দিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হল না। এর চেয়ে ভয়ংকর অবস্থা তৈরি হল কোভিড অতিমারিতে। স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানী, রোগ-বিশেষজ্ঞ ও জীবানুবিদদের কথায় কান না দিয়ে সরকার অতিমারি নিয়ন্ত্রণের যে পথ নিল, কোটি কোটি মানুষের জন্য সেই পথ হয়ে উঠল নরক যন্ত্রণার পরাকাষ্ঠা। অথচ, যারা এই অবস্থা তৈরি করল, তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনী পদক্ষেপের প্রসঙ্গই উঠল না। তেমনি আজ দেশের মানুষের এক ঘোর দুর্দিনে, তার নাগরিক অধিকার অপহৃত হবার অবস্থাতেও সুপ্রিম কোর্ট বলে দিল, “ভোটদানের অধিকার মৌলিক অধিকার নয়”।
ভোটার তালিকার Special Intensive Revision (SIR)-এর মতো প্রক্রিয়ার প্রবর্তন আসলে এই বৈপরীত্যের একটি চরমতম প্রকাশ। উপরিতলে, এই ধরনের উদ্যোগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য বলে ব্যাখ্যা করা হয়। পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা, সঠিক পরিচয় নির্ধারণ এবং পুনরাবৃত্তি দূরীকরণ— এসবই যথাযথ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়াগুলি যেভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। 
প্রথমত, এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া একান্তই অবাস্তব একটা প্রকল্প। কয়েক মাসের মধ্যে লক্ষ লক্ষ নাগরিক তাদের নথিপত্র যাচাই, সংশোধন ও প্রমাণীকরণ করতে পারবেন— এই প্রত্যাশা বাস্তবের প্রবেশাধিকার, সচেতনতা এবং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে। অনেকের ক্ষেত্রেই একটি মাত্র নথি সংগ্রহ করতে বহু দপ্তরে ঘুরতে হয়, প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়, তার জন্য দেনা পর্যন্ত করতে হয় এবং প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি, বস্তুত, সেই সব মানুষদের সামাজিক বৃত্তের বাইরে ব্যের করে দেয়, যারা ইতিমধ্যেই বঞ্চিত।
দ্বিতীয়ত, নথিপত্রের ওপর এই অতিরিক্ত জোর আরও মৌলিক তথ্যব্যবস্থার প্রতি অবহেলার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে। ঐতিহাসিকভাবে জনমিতিক তথ্য সংগ্রহের অন্যতম বিস্তৃত প্রক্রিয়া, ভারতের জনগণনা (Census of India), যথাযথ ব্যাখ্যা ছাড়াই বিলম্বিত হয়েছে। জনগণনা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত অনুশীলন নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সম্পদ বণ্টন এবং নীতিনির্ধারণের ভিত্তি গড়ে তোলে। এটা না হওয়া মানে তথ্যের এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হওয়া। আর সেই অভাবের ফাঁক দিয়ে মানুসের কাছে মিথ্যা হিসেব দাখিল করা। উদাহরণ, মুসলমান লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বা দেশে অনুপ্রবেশকারী ভরে যাওয়ার মতো অকারণ ভীতি সঞ্চার। দেড় দশক আগে হওয়া লোকগণনা দেখিয়েছিল, মুসলমান সহ সব গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নগামী। ঠিক সময়ে, অর্থাৎ, ২০২১ সালে এই গণনা হলে, লোকে বুঝতে পারতে পারত সেই প্রবণতা জারি আছে, না কি তাতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে। প্রশ্ন ওঠা উচিৎ ছিল, দেশের গর্বের এক প্রতিষ্ঠান ও তা থেকে গড়ে ওঠা ঐতিহ্য, ভারতের জনগণনাকে, খর্ব ও ক্ষুণ্ণ করা হল, রাষ্ট্র এর কোনো রকম জবাবদিহির প্রয়োজন মনে করল না, অথচ ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজটি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় করতে চাইছে কেন?
এখানে বৈপরীত্যটি স্পষ্ট: দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আর্থনীতিক পরিকল্পনার জন্য অপরিহার্য একটি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হচ্ছে, অথচ নির্বাচনী যাচাইকে কেন্দ্র করে একটি সীমিত পরিসরের প্রক্রিয়া তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। রাষ্ট্র যেন মানুষের বাস্তব অবস্থা বোঝার চেয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের যোগদান আটকাতেই অধিক আগ্রহী। নাগরিকত্ব এখন নথিপত্রে সীমাবদ্ধ, সামাজিক ন্যায়ের বিচারের বিস্তৃত পরিসরটি ক্রমশ বিলীন।
এটি রাষ্ট্রশক্তির প্রকৃতিকে স্পষ্ট করে। এটা ঠিক যে, রাষ্ট্রকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগুলির মধ্যে মধ্যস্থতা করে, জনকল্যাণ করে এবং আইনের শাসনকে বজায় রাখে। গণতান্ত্রিক তত্ত্বে, রাষ্ট্র তার বৈধতা অর্জন করে নাগরিকদের সম্মতি ও যোগদান থেকে। কিন্তু বাস্তবত ক্ষমতা কয়েকজনের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, আর এই মধ্যস্থতামূলক ভূমিকাগুলো আর অবশিষ্ট থাকে না। রাষ্ট্র বস্তুত প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কম, বরং নিয়ন্ত্রণের এক যন্ত্র হিসেবেই মূলত কাজ করে।
এখানে বৈপরীত্যটি আর দ্বন্দ্বমাত্র থাকে না; তা একটি কৌশলে পরিণত হয়। গণতন্ত্রের ভাষা বজায় রাখা হয়, কারণ এটি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই বৈধতা প্রদান করে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, প্রতিষ্ঠানগুলি বজায় রাখা হয়, এবং প্রক্রিয়াগত নিয়মগুলি অনুসরণ করা হয়। কিন্তু গণতন্ত্রের সারবত্তা—যোগদান, জবাবদিহি, সমতা—ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। নাগরিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে বর্জিত হয়।
ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভবন রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সম্পর্ককেও পুনর্গঠিত করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে ধারণা করা হয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠই শাসন করে, বাস্তবে সেখানে প্রায়শই একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়: একটি ক্ষুদ্র উচ্চবর্গ রাজনৈতিক, আর্থনীতিক এবং তথ্যগত সম্পদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। সংখ্যায় অধিক হওয়া সত্ত্বেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী খণ্ডিত এবং ক্ষমতাহীন থেকে যায়। এই অসমতা রাষ্ট্রকে এমন এক ক্ষমতা দেয়, যা গোড়া থেকেই গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে বাধা দেয়, তার সম্ভাবনাকে নষ্ট করে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তার দ্বৈত প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত। একদিকে এটি নিজেকে সামূহিক ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপিত করে; অন্যদিকে এটি নির্বাচিত নিয়ন্ত্রণের এক যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। এটি ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়, অথচ নির্ভরশীলতা তৈরি করে; অধিকারের কথা বলে, অথচ আনুগত্য আরোপ করে। সামাজিক যোগদানে সক্ষম করার জন্য যে উপকরণগুলি ব্যবহৃত হওয়ার কথা— নথিপত্র, পরিচয় নির্ধারণ, যাচাই— সেগুলিই বর্জনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
গুরুত্বপূর্ণভাবে, এই পরিস্থিতি কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না। এটি এমন সব বয়ানের মাধ্যমেও বজায় থাকে, যা এই দ্বন্দ্বকে স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত করে তোলে। নিরাপত্তা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো যুক্তিগুলি ব্যবহার করে স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করার পদক্ষেপগুলিকে বৈধতা দেওয়া হয়। নাগরিকদের উৎসাহিত করা হয় স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলার মধ্যে আপস মেনে নিতে— প্রায়শই এই প্রশ্ন না করেই যে এই ধারণাগুলির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করছে এবং তা কার স্বার্থে কাজ করছে।
একই সঙ্গে বিশ্ব রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এই শাসকীয় অযুক্তিগুলোকে বলবান করে তোলে। আমরা এক আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাস করি এখানে শাসন প্রভাবিত হয় আন্তর্জাতিক ধারণা, প্রযুক্তি এবং ক্ষমতার সম্পর্কের দ্বারা। নজরদারি, তথ্যভিত্তিক পরিকাঠামো এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধানগুলো নানা সীমান্ত পেরিয়ে, বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করে। ফলে, একটি জায়গায় যে দ্বন্দ্বগুলো দেখা যায়, অন্য জায়গাতেও তার প্রতিফলন ঘটে। একটি বৈশ্বিক ধারা গড়ে ওঠে, যা জাতীয় সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়।
তবুও, দ্বন্দ্বের মধ্যেই নিহিত থাকে সমালোচনার বীজ । আদর্শ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধানকে তুলে ধরে তারা যুক্তির আবাহন ও যুক্তিভিত্তিক প্রতিরোধের দিকে মনোযোগ দিতে বলে। বলে প্রশ্ন করতে: গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ কী? স্বাধীনতা কী? যখন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে স্বাধীনতার চেয়ে নিয়ন্ত্রণই অধিক প্রাধান্য পায়, তখন যুক্তিভিত্তিক চিন্তা স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্যকে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেয়।
আজকের ভারতের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে বলতেই হবে যে, সক্ষমতার প্রশ্নে নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করা ছাড়া গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার অন্য কোন পথ নেই। নাগরিকত্বকে কেবল নথিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা চলে না; এটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে মানুষের সামাজিক, আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক জীবনে অর্থবহ যোগদানের ক্ষমতার ওপর। এর মধ্যে কেবল সাক্ষরতা বা ডিজিটাল প্রবেশাধিকারই নয়, নিজের সামর্থ্যে মানুষের পূর্ণ বিকাশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দাবি ব্যতিরেকে নাগরিকত্বের ধারণাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সুতরাং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নীতিকে প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতার ভিত্তিতে নয়, বরং সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের ওপর তার প্রভাবের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করতে হবে।
একইভাবে, বৈশ্বিক স্তরেও ক্ষমতার বৈধতা তার দাবির ওপর নয়, বরং তার পরিণামের ওপর বিচার করতে হবে। ন্যায্যতা ও স্বাধীনতার নামে পরিচালিত হস্তক্ষেপগুলিকে মানুষের জীবনের ওপর তাদের প্রভাবের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে । প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে আনতে হবে, যাতে তা রাষ্ট্রীয় মিথ্যাভাষণের তলায় চাপা না পড়ে যায়। প্রয়োজনীয়তা বা অনিবার্যতার বয়ানে আড়াল না হয়ে যায়।
আমাদের সময়ের দ্বন্দ্বটি কেবল এই নয় যে ক্ষমতা নিজেই নিজের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করছে। বরং আরও গভীর বিষয় হলো, এই বিরোধগুলো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে— শাসনব্যবস্থার দৈনন্দিন অনুশীলন এবং নাগরিকদের প্রত্যাশার মধ্যেই সেগুলি গেঁথে গেছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে কেবল সমালোচনাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক কল্পনার পুনর্নিমাণ: গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলিতে ফিরে যাওয়া, যে নীতি মানুষে মানুষে বিভেদকে দূরীভূত করে, প্রত্যেকের বিকাশের সমান সুযোগের কথা বলে।
চ্যালেঞ্জটি কেবল দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের অনিবার্যতা অস্বীকার করার মধ্যেই এর আসল তাৎপর্য নিহিত। অযুক্তি ও স্ববিরোধিতা সেই ভাষা, যার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা নিজেকে টিকিয়ে রাখে। বিপরীতে, যুক্তি ও স্পষ্টতাই হচ্ছে সেই কণ্ঠস্বর, যা এই অযৌক্তিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
প্রকাশের তারিখ: ১৭-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
