সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষার বেহাল দশা
নন্দিনী মুখার্জী
সেই অর্থ ব্যয়ের অনীহা দেখা দিচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অর্থের যোগানেও। সমস্ত ক্ষেত্রেই যা বাজেট তার অর্ধেকও রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে টান ধরছে উচ্চশক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোষাগারে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আগে ইউজিসি মারফত পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে টাকা দেওয়া হত। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে তাও বন্ধ। গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে টাকা জোগাড় করতে গেলে এমন এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যেগুলি কোনও রাজ্য সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই এই ‘নেই’-এর রাজ্যে এখন পরিকাঠামো নেই, ল্যাবরেটরিতে নেই নতুন যন্ত্রপাতি, নেই গবেষণার অর্থ। বর্তমান কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার সেই পথেই হাঁটতে চান– “এরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে, তত কম মানে, ঠিক কিনা!”

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ভারতবর্ষে দ্বিতীয়– উত্তরপ্রদেশের ঠিক পরেই। যদিও উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা পশ্চিমবঙ্গের দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ ২৩-২৪ কোটি, যেখানে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১০ কোটি। আয়তনের দিক দিয়েও উত্তরপ্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় তিনগুণ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রায়ই জোর গলায় দাবি করে থাকেন যে এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে রাজ্য সরকার অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে। বর্তমানে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এই রাজ্যে ৫৪টি এবং এর মধ্যে রাজ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৮টি। অন্য একটি সূত্র বলছে যে রাজ্যে কলেজের সংখ্যা ২৬৮৯– যদিও এর মধ্যে সব ধরনেরই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শুধু এই পর্যন্ত দেখলে মনে হয় যে রাজ্যে উচ্চ শিক্ষা এক লাফে বিগত পনেরো বছরে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। যদি শুধুমাত্র সংখ্যার নিরিখে উচ্চাশিক্ষার হাল বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে এইরকম মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলে।
উপাচার্য বিহীন দুটি বছর
বিশ্ববিদ্যালয় মূলত পরিচালিত হয় উপাচার্য, অন্যান্য পদাধিকারী এবং কার্যকরী পরিচালন সমিতির দ্বারা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী দৈনন্দিন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মূল দায়িত্ব ন্যস্ত করা রয়েছে উপাচার্যের উপরে। এমনকি পরিচালন সমিতির মিটিং ডাকতে গেলেও প্রয়োজন উপাচার্যের। উপাচার্য নিয়োগ কীভাবে হবে, উপাচার্য মনোনয়নের কমিটিতে কে কে থাকবেন সেই বিষয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীশ ধনখড়ের বিরোধ শুরু হয় ২০২৩ সালের গোড়া থেকেই। সেই বিরোধ ক্রমশ হাইকোর্ট পেরিয়ে যায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজ্যের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ হলেও, বাকিগুলিতে হতে লেগে যায় ২০২৫ সালের প্রায় শেষাশেষি সময় পর্যন্ত। এই দুই বছরের উপর সময় ধরে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে হয় কোনও অস্থায়ী উপাচার্য কাজ করেছে, অথবা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় বেশ খানিকটা সময় কাটিয়েছে উপাচার্য শূন্য অবস্থায়। উপাচার্য না-থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি প্রায় অচল অবস্থায় দিন কাটিয়েছে; না-নিতে পেরেছে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, না-করতে পেরেছে অধ্যাপক নিয়োগ বা ফ্যাকাল্টির ডিন পদে মনোনয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মাথাহীন অবস্থায় দীর্ঘসময় রেখে দিয়ে কীভাবে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া যায় এই রাজ্যে তার উদাহরণ রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকার।
পরিচালন ব্যবস্থায় দখলদারি
পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলি দেশের প্রথম সারিতে দীর্ঘ সময় ধরে থাকার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল এইসমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পরিচালন সমিতিগুলি অতীতে তৈরি হত ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের বিভিন্ন অংশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে। ২০১২ সালে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধন এবং ২০১৭ সালে নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই গণতান্ত্রিক পরিচালন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার প্রত্যেক কলেজের গভার্নিং বডিতে সরকার মনোনীত প্রতিনিধিদের পাঠালেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতিতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা অনেক কমিয়ে দেওয়া হল। তাছাড়া আইন প্রণয়নের পরে তার প্রয়োগের জন্য যে স্ট্যাটিউট তৈরি প্রয়োজন সেই প্রক্রিয়াও সরকার সম্পূর্ণ করলেন না। ফলে অতীতে যে স্বচ্ছ প্রশাসনিক বন্দোবস্ত ছিল তা সরিয়ে, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতিতে দখলদারি বাড়ল স্থানীয় বিধায়ক, পৌর প্রতিনিধি বা শাসক দলের নেতানেত্রীদের। এই সমস্ত নেতানেত্রীদের খবরদারিতেই চলতে লাগল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচালন ব্যবস্থা। ছাত্র ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ– সমস্ত ক্ষেত্রেই শাসক দলের মদতপুষ্ট দুর্বৃত্তরা দাপাদাপি করে বেড়াতে লাগল। বাম আমলে এই সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার মান যে-উচ্চতায় পৌঁছেছিল, দেখা গেল ক্রমশ শিক্ষার মান সেখান থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।
নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির কাছে আত্মসমর্পণ
২০২০ সালে পৃথিবী ব্যাপী অতিমারির ছায়ায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় পাস হয়ে গেল নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি। দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীন এই শিক্ষানীতি যে আগামীদিনে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়ে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে দিতে চাইছে একথা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা আগেই বলেছিলেন। বাস্তবে গত পাঁচ-ছয় বছরে এই আশঙ্কাই সত্যি হয়ে উঠতে দেখা গেল। রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী প্রথমদিকে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে অনেক বিরোধিতার কথা বললেও, ২০২৩ সালে রাজ্য যে শিক্ষানীতি রচনা করল তা একেবারে কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির প্রতিচ্ছবি। রাজ্যে চালু হল চার বছরের স্নাতক পাঠক্রম। কোনোরকম উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়াই ছাত্রদের উপর বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হল মেজর এবং মাইনর বিষয়ে ভাগ করা পাঠক্রম, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম ইত্যাদি। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ালো মৌলিক গবেষণায় গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া এবং অনেক বেশি গুরুত্ব আরোপ করা ‘দক্ষতা অর্জন’ বা ‘skill development’-এর উপর। একই পাঠক্রমে মেজর এবং মাইনর বিষয়ের অন্তর্ভূক্তির জন্য প্রয়োজন হয় পরিকাঠামোর উন্নতি এবং যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষক। দুই ক্ষেত্রেই এই রাজ্যের হাঁড়ির হাল। ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের জন্যও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির পরস্পরের মধ্যে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঠক্রমের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্যবসায়িক কোম্পানিগুলির মধ্যে সহযোগিতা তৈরি হওয়া প্রয়োজন, যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের দক্ষতাকে বর্তমান বাজারী অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়িয়ে তুলতে পারে। কিন্তু এই রাজ্যে সরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সেইরকম কোনও ব্যবস্থাপনা তৈরি করার প্রচেষ্টাই দেখা গেল না। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদেরকেই নিতে হল নিজেদের পাঠক্রমের প্রয়োজন মেটানোর উদ্যোগ। কখনও অনলাইন কোর্স (যার জন্য দিতে হচ্ছে এনরোলমেন্ট বা রেজিস্ট্রেশন ফি), কখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আত্মীয়-পরিজনদের সূত্র ধরে ইন্টার্নশিপের সুযোগ সন্ধান। একটা সুসম্বদ্ধ পাঠক্রমের পরিবর্তে গড়ে উঠল একটা অ্যাডহক ব্যবস্থা– যার মধ্যে পড়ে রাজ্যের ছাত্র সমাজের নাভিশ্বাস উঠে গেছে।
উচ্চশিক্ষায় খরচের খতিয়ান
সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দেওয়ার ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকসময় বাধ্য হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে। তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফি এবং অন্যান্য খরচের বহর ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। আগে বাম আমলে এই টিউশন ফি যাতে অতিরক্ত মাত্রায় না-বেড়ে যায় তার জন্য সরকারের নজরদারি ছিল। নজরদারি ছিল শিক্ষার মান যাতে রক্ষিত হয় তার জন্যও। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে সেই সমস্ত কিছুই বন্ধ। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পেয়ে গেছে যথেচ্ছ ফি বৃদ্ধির ছাড়পত্র। শিক্ষার মান নিয়েও সরকারের নেই মাথাব্যাথা। কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তো ইতোমধ্যেই টিউশন ফি অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উচ্চ শিক্ষা শুধু গরিব পরিবারের নয়, ক্রমশ চলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে।
হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির কবলে দেশের শিক্ষা
ভারতীয় জনতা পার্টি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার শুধুমাত্র শিক্ষার বেসরকারিকরণ নয়, একই সঙ্গে সিলেবাসে ‘Indian Knowledge System’-এর নাম করে কিছু বিষয় রেখে হিন্দুত্ববাদী তত্ত্ব প্রয়োগ করে মগজ ধোলাই করার চেষ্টা করছে ভারতীয় যুব সমাজের। দেশের শিক্ষামন্ত্রকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— “The Indian Knowledge System (IKS) is the continuous, comprehensive body of traditional knowledge, philosophies, and practices originating from the Indian subcontinent over thousands of years.”। কিন্তু continuous, comprehensive ইত্যাদি শব্দগুলি থাকলেও পাঁচ হাজার বছরের সংস্কৃতির মধ্যে থেকে তুলে আনা হচ্ছে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মের অনুসারী শাস্ত্র, দর্শন ইত্যাদির কথা। এই দেশ জৈন বা বৌদ্ধ ধর্মকে জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই দেশের সংস্কৃতি এবং শিক্ষাকে প্রভাবিত করেছে ইসলামীয় সংস্কৃতি বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা দর্শন এবং বিজ্ঞান। এমনকি ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও আছে অনেক বৈচিত্র্য, বিভিন্ন সংস্কৃতির সম্মেলন। অথচ বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতিতে নির্ধারিত করা হয়েছে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু গ্রন্থ বা হিন্দু শাস্ত্র যেগুলি পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সেখানে বৌদ্ধ দর্শন, ইসলামীয় সংস্কৃতি, অথবা ভারতের আদিবাসী বা দাক্ষিণাত্যের সংস্কৃতির কোনও স্থান নেই। এইভাবে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের অনুসৃত ধর্মাচরণ বা বিশেষ একটি গোষ্ঠীর দর্শনকে পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভারতের যুবসমাজের উপর। আমাদের রাজ্যও এর থেকে পিছিয়ে নেই। নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির নামে আমাদের রাজ্যেও বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে হিন্দুত্ববাদী দর্শন, যা আসলে এক পিছিয়ে পড়া এবং বিভেদকামী সংস্কৃতিকে মদত দেয়।
উচ্চশিক্ষায় ‘নেই’-এর রাজত্ব
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উচ্চশিক্ষায় এখন ‘নেই’-এর রাজত্ব। উপাচার্য বিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির কথা আগেই বলেছি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে স্থায়ী নিয়োগ না-করে অস্থায়ীভাবে কোনও ব্যক্তির উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করা। বছরের পর বছর তাই বহু কলেজে অধ্যক্ষের পদ শূন্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নেই স্থায়ী ফ্যাকাল্টি ডিন, অস্থায়ীভাবে অধ্যাপকরা ছয়মাস করে কাজ চালাচ্ছেন। বহু গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকের পদ শূন্য। এই ‘নেই’ রাজ্যে তাই গতানুগতিকভাবে ছাত্রদের পড়াশোনা চালানো গেলেও নেওয়া যাচ্ছে না কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বাধা পড়ছে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার পথে। ফলে শিক্ষার মান এই রাজ্যে অধোগতি।
গতানুগতিকভাবে পড়াশোনা কতদিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, তাও বোঝা যাচ্ছে না। কারণ এই ‘নেই’ রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ হয় না নিয়মিতভাবে। দীর্ঘসময় ধরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে থেকেছে। এই শূন্য পড়ে থাকার কারণগুলির মধ্যে যেমন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পরিচালন ব্যবস্থার ত্রুটি বা গাফিলতি আছে, আছে উপাচার্য না-থাকার মতো পদ্ধতিগত সমস্যা, তেমনি আছে শিক্ষক নিয়োগে রাজ্য সরকারের প্রবল অনীহা। রাজ্যের কোষাগার থেকে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ হলেও, বাস্তবে সেই অর্থ ব্যয় করতে রাজ্য সরকার কোনোভাবেই রাজি নন।
সেই অর্থ ব্যয়ের অনীহা দেখা দিচ্ছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অর্থের যোগানেও। সমস্ত ক্ষেত্রেই যা বাজেট তার অর্ধেকও রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে টান ধরছে উচ্চশক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোষাগারে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আগে ইউজিসি মারফত পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে টাকা দেওয়া হত। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে তাও বন্ধ। গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে টাকা জোগাড় করতে গেলে এমন এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে যেগুলি কোনও রাজ্য সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই এই ‘নেই’-এর রাজ্যে এখন পরিকাঠামো নেই, ল্যাবরেটরিতে নেই নতুন যন্ত্রপাতি, নেই গবেষণার অর্থ। বর্তমান কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার সেই পথেই হাঁটতে চান– “এরা যত বেশি পড়ে তত বেশি জানে, তত কম মানে, ঠিক কিনা!”
আগামীদিন এই রাজ্যের যুবসমাজের জন্য ভয়ংকর এক অন্ধকারময় সময় নিয়ে আসতে চলেছে। কোনও দেশ শিক্ষায় পিছিয়ে পড়লে সেই দেশ অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবেও পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। আগামী নির্বাচনে যদি তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পরিবর্তন না-হয়, তাহলে সেটাই হবে এই রাজ্যের পরিণতি। আর তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প বিজেপি নয়, কারণ বিজেপিও চায় শিক্ষার অন্তর্জলি যাত্রা ঘটাতে। এই রাজ্যে চাই বাম সরকার যাতে আবার প্রগতিশীল জনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
প্রকাশের তারিখ: ২১-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
