সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নতুন ভারতে ‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্র’
বৃন্দা কারাত
যাঁরা এখন ক্ষমতায় রয়েছেন তাঁদের মনুবাদী পূর্বপুরুষেরা বি আর আম্বেদকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আম্বেদকার ‘হিন্দু মতাদর্শকে ধ্বংস’ করছেন। কারণ হিন্দু রিফর্মস বিলের প্রস্তাবে আম্বেদকার নারীদের ডিভোর্সের অধিকার দিয়েছিলেন এবং বৈধ বিবাহের শর্ত হিসাবে জাতপাতের ব্যবস্থা তুলে দিতে চেয়েছিলেন। সেই সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত মনুবাদী উত্তরপুরুষদের মনোভাব খুব একটা বদলায়নি। আজকের দিনের যে মনুবাদী বাস্তুতন্ত্র, সেই বাস্তুতন্ত্রের মতাদর্শগত মঞ্চের সহজাত সংস্কৃতি হল, স্বামীর সহিংস আচরণ সত্ত্বেও বিবাহে আবদ্ধ থাকতে নারীদের বাধ্য করা, যেহেতু বিয়ে বিষয়টি ‘স্বভাবত ধর্মের বন্ধনে বাঁধা’ তাই মেয়েদের সব কিছু ‘মানিয়ে নিতে’ বলা। যদি নিজের ইচ্ছায় কোনও নারী অন্য জাতের পুরুষকে বিয়ে করেন এবং সেক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মান রক্ষায় যদি কেউ অপরাধ করে তাহলে চুপ করে থেকে নারীদের সবকিছু ক্ষমা করতে বাধ্য করা হয় এই মতাদর্শে।

বর্তমান সরকারের অধীনে যখন ভারতের মানুষ অসংখ্য সামাজিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তখন প্রতিরোধের অ্যাজেন্ডাগুলির মধ্যে ‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্র’-এর বিকাশগুলিকে প্রায়ই পিছনের সারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে যাঁরা ক্ষমতায় আসীন থাকেন তাঁরাই ‘নারী শক্তি’র ধারণাটিকে কব্জা করে নেন এবং তারাই ‘নারীদের নেতৃত্বে উন্নয়ন’ হচ্ছে বলে দাবি করেন। যদিও আসলে তারা ‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্র’-এ নারীদের প্রতি পুরোপুরি একটা দমনমূলক দৃষ্টিভঙ্গী অটুট রেখে দেন। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল ২৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধানের একটি বিবৃতি। সেখানে তিনি বলেছেন ‘সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখা’ নিশ্চিত করার জন্য, প্রতিটি পরিবারের কমপক্ষে তিনটি করে সন্তান থাকতে হবে। একথার মানে হল, মেয়েরা যেন সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, যাঁদের নিজেদের কোনও ইচ্ছা থাকতে পারে না। মোহন ভাগবত যদি বলতেন কীভাবে পরিবারগুলি, বিশেষ করে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে মেয়েরা কীভাবে, টিকে রয়েছেন, তাহলে সেটা বরং কাজের কাজ হত।
যে নৈঃশব্দের ব্যাখ্যা নেই
২০১৭ সাল থেকে ২০২২, প্রতি বছর গড়ে মৃত্যু হয়েছে ৭০০০ নারীর। এগুলো সেইসব ভয়াবহ মৃত্যু যেখানে মেয়েদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে— আইনের ভাষায় যার নাম ‘পণের দাবি আদায়ের জন্য মৃত্যু’। তার মানে ওই পাঁচ বছরে মৃত্যু হয়েছে ৩৫ হাজার জনের — এই মৃত্যুতে কেবল তাঁদের সিঁদুর মুছে দেওয়া হয়নি, এই সব নারীদের জীবনই শেষ হয়ে গেছে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ৫-এ দেখা গেছে, সমীক্ষাভুক্ত ৩০ শতাংশ নারী জানিয়েছেন তাঁদের ওপর অত্যাচার করেছেন পরিবারে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীরা। অথচ এঁদের মাত্র ১৪ শতাংশ পুলিশে অভিযোগ জানিয়েছেন। নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার। এঁদের এক তৃতীয়াংশই গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। বাড়িতে নারীদের ওপর এই যে হিংসার এত ঘটনা, তার বিরুদ্ধে আরএসএস বা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন নেতাকেও, তা সেই নেতা নারী বা পুরষ যেই হোন না কেন, একটা কথাও বলতে শুনেছেন? এই সব লোকেরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পুরুষ ও নারীর মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন — বলেন, এমন সম্পর্ক হল লাভ জিহাদ। অথচ এঁরা গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে কিংবা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে কখনই একটা কথাও বলেন না। কারণ এমন প্রতিবাদ মনুস্মৃতি ভিত্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী মতাদর্শের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না। এবং সেই মতাদর্শই আরএসএস ও বিজেপির নেতানেত্রীরা প্রচার করেন।
যাঁরা এখন ক্ষমতায় রয়েছেন তাঁদের মনুবাদী পূর্বপুরুষেরা বি আর আম্বেদকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, আম্বেদকার ‘হিন্দু মতাদর্শকে ধ্বংস’ করছেন। কারণ হিন্দু রিফর্মস বিলের প্রস্তাবে আম্বেদকার নারীদের ডিভোর্সের অধিকার দিয়েছিলেন এবং বৈধ বিবাহের শর্ত হিসাবে জাতপাতের ব্যবস্থা তুলে দিতে চেয়েছিলেন। সেই সময়কাল থেকে আজ পর্যন্ত মনুবাদী উত্তরপুরুষদের মনোভাব খুব একটা বদলায়নি। আজকের দিনের যে মনুবাদী বাস্তুতন্ত্র, সেই বাস্তুতন্ত্রের মতাদর্শগত মঞ্চের সহজাত সংস্কৃতি হল, স্বামীর সহিংস আচরণ সত্ত্বেও বিবাহে আবদ্ধ থাকতে নারীদের বাধ্য করা, যেহেতু বিয়ে বিষয়টি ‘স্বভাবত ধর্মের বন্ধনে বাঁধা’ তাই মেয়েদের সব কিছু ‘মানিয়ে নিতে’ বলা। যদি নিজের ইচ্ছায় কোনও নারী অন্য জাতের পুরুষকে বিয়ে করেন এবং সেক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মান রক্ষায় যদি কেউ অপরাধ করে তাহলে চুপ করে থেকে নারীদের সবকিছু ক্ষমা করতে বাধ্য করা হয় এই মতাদর্শে। আমরা দেখছি ‘অপব্যবহার করা হচ্ছে’ এই অজুহাতে গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে চালু আইনের গুরুত্ব খর্ব করা হচ্ছে, এবং সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলায় বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ ঘোষণা করার দাবির বিরোধিতা করা হচ্ছে সরকারের তরফে এবং বলা হচ্ছে, এমনটা করা হলে তা হবে ‘বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠান’ এবং ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে পদক্ষেপ।
‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্রের’ আরেকটি দিক হল — মেয়েরা বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে যে কাজ করেন — সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে সাম্প্রতিক টাইম ইউজ সার্ভে (টিইউএস) ২০২৪-এ। বিভিন্ন কাজকর্মে নারী ও পুরুষদের অনুপাতের হিসাব কষা হয়েছে সমীক্ষাভুক্ত সবার গড় বয়সের ভিত্তিতে। যতজন নারীদের (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী) মধ্যে সমীক্ষা করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিলেন ‘আর্থিক এবং সংশ্লিষ্ট কাজকর্মে’ যুক্ত এবং তাঁদের কাজের সময় দিনে গড়ে ৫ ঘণ্টা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, পারিবারিক উদ্যোগে কাজ করেন ২৩ শতাংশ সমীক্ষাভুক্ত নারী। যে সব নারী এঁদের মধ্যে পড়েন তাঁরা দুঘণ্টার কিছুটা কম সময় আর্থিক কাজ করেন। এই দুই অংশের নারীরা যে কাজগুলি করেন সেগুলিকে আর্থিকভাবে উৎপাদনশীল কাজ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সিস্টেম অফ ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টসে (এসএনএ) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই ভাবে (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী) যত পুরুষের মধ্যে সমীক্ষা করা হয়েছে তাঁদের ৭৫ শতাংশ দিনে গড়ে ৮ ঘণ্টা আর্থিক কাজ করেন। পারিবারিক উদ্যোগে ১৪ শতাংশ পুরুষ দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা কাজ করেন। সংখ্যাগিরষ্ঠ পুরুষদের কাজের দিনের মেয়াদ এটাই।
নারীদের কাজের বোঝা
টিইউএস ২০২৪-এ আরও দুটি কাজের ধরনকে বিবেচনা করা হয়েছে — নিজের পরিবারের উপার্জনহীন ঘরের কাজ (রান্না, ঘর সাফাই, কাপড় কাচা) এবং উপার্জনহীন সেবার কাজ (কেয়ার গিভিং)। এখানে (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী) যত নারীর মধ্যে সমীক্ষা করা হয়েছে তাঁদের ৯৩ শতাংশই দিনে গড়ে সাত ঘণ্টা ঘরের কাজ করেন। উপার্জনহীন ঘরের সেবাযত্নের কাজে সমীক্ষাভুক্ত ৪১ শতাংশ নারী দিনে আড়াই ঘণ্টা কাজ করেন। অন্যদিকে, ৭০ শতাংশ পুরুষই কোনও রকম ঘরের কাজ করেন না। যে ৩০ শতাংশ পুরুষ ঘরের কাজ করেন তাঁদের কাজের সময়টা দিনে দেড় ঘণ্টারও কম। বিনা পারিশ্রমিকে সেবাযত্নের যে কাজ, সেখানে ৭৯ শতাংশ পুরুষ ‘উপার্জনহীন সেবাযত্নের’ কাজ করেনই না। যে ২১ শতাংশ পুরুষ এই কাজ করেন তাঁরা দিনে গড়ে এ কাজে সময় দেন ১ ঘণ্টা ১৪ মিনিট। যদি সব পুরুষের গড় ধরা যায় তাহলে পরিসংখ্যান দাঁড়াবে এরকম: ‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্রে’ পুরুষেরা দিনে ঘরের কাজ করেন ২৬ মিনিট এবং উপার্জনহীন সেবাযত্নের কাজ করেন দিনে ১৬ মিনিটের কম।
টিইউএস সমীক্ষায় অন্য ধরনের কাজকেও ধরা হয়েছে। তবে যদি সব কাজকে এক সঙ্গে ধরা যায় তাহলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে যে, মেয়েরা মোট যত ঘণ্টা কাজ করেন পুরুষেরা তার চেয়ে কম কাজ করেন। খাওয়া, ঘুমোনো, এবং বিনোদনে মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে কম সময় ব্যয় করতে পারেন। এগুলি হচ্ছে বুনিয়াদি তথ্য। যদি আরও বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে বিভিন্ন আয়গোষ্ঠীর মধ্যে কাজের বিভাজন। বিশেষত দেখা যাবে তপশিলি জাতি ও তপশিলি উপজাতির পুরুষ ও নারীদের মধ্যে শ্রমের বিভাজনের ছবিটা। এই ধরনের সমীক্ষার মাধ্যমে উঠে আসবে সময়ের ব্যবহারের ক্ষেত্রে শ্রেণি ও বর্ণ বিভাজনের ছবি। এবং দেখা যাবে, পুরুষদের তুলনায় শ্রমজীবী শ্রেণির নারীদের অনেক বেশি কাজের বোঝা বইতে হচ্ছে।
এই সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে পেশ করে তাতেই নরেন্দ্র মোদি সরকারের চরম দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়। এই সমীক্ষার পুরো রিপোর্ট প্রকাশের এক মাস আগে সরকারি এজেন্সি প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো, তাদের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখের প্রেস রিলিজে (সমীক্ষার সংক্ষিপ্ত আলোচনা সহ) শিরোনাম রেখেছিল এই রকম: ‘ভারতীয় পরিবারগুলিতে লিঙ্গ নিরপক্ষেভাবেই সেবাযত্নের কাজ অনেক বেশি স্বীকৃতি পায়।’ পুরুষ ও নারীদের কাজের সময়ের যে বৈষম্য তাকে ঢাকা দিয়ে বরং গৌরবান্বিত করা হয়েছে এইভাবে: ‘পরিবারের মেয়েরাই বাড়ির লোকেদের সেবাযত্নের ভার সবচেয়ে বেশি বহন করেন এবং এটাই ভারতের সামাজিক ধারার সঙ্গে খাপ খায়।’ এ ব্যাপারে বিজেপি সরকারের ঘোষিত দৃষ্টিভঙ্গী হল, যদি বাড়ির পুরুষেরা সেবাযত্নের কাজে আদৌ কোনও সময় দেয়, যদি সেই সময়টা দৈনিক গড়ে ১৫ মিনিটও হয়, তাহলেও সেটাই হল ‘ভারতীয় পরিবারের’ আসল মহত্ত্ব। আর মেয়েরা যে ঘরের কাজ ও সেবাযত্নের কাজে পুরুষদের চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় দেয় তার জন্য গর্ববোধ করতে হবে কারণ এটাই হল ভারতীয় সামাজিক ধারা।
সরকারি নীতির ক্ষেত্রেও এই একই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে লক্ষ লক্ষ নারীদের, যাঁরা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে শিশুদের যত্ন নেন ও তাদের পরিচর্যার দায়িত্ব নেন, মিড ডে মিল দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন এবং যাঁরা অ্যাক্রেডিটেড সোশাল হেলথ অ্যাক্টিভিস্ট (আশা কর্মী) হিসাবে স্বীকৃত, তাঁদের বলা হয় ‘সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী’ এবং তাঁদের শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। সাম্মানিক হিসাবে তাঁদের দেওয়া হয় সামান্য টাকা, দেওয়া হয় না ‘ন্যূনতম মজুরি’-টুকুও। তাঁদের সরকারি কর্মী হিসাবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এর মানে হল, গার্হস্থ্য ক্ষেত্রে যেটাকে নারীদের স্বাভাবিক কাজ বলে ধরে নেওয়া হয় সেটা আসলে হয়ে দাঁড়ায় কম মজুরির কাজ যা করতে হয় পরিচর্যাকারী হিসাবে।
জঘন্য অবমূল্যায়ণ
এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পুঁজিপতিদের দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। ২০২৩ সালে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার একটি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছিল যে, নারীরা যে কাজের বিনিময়ে কোনও টাকা পান না, টাকার অঙ্কে তার হিসাব কষা হলে পরিমাণ দাঁড়াবে দেশের জিডিপির ৭ শতাংশ কিংবা বছরে ২২.৫ লক্ষ কোটি টাকা।
শ্রমের সামাজিক পুনরুৎপাদনে নারীদের গার্হস্থ্য কাজের বেতন না দেওয়া অংশ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেটার তাৎপর্য কত খাটো করে দেখানো হয়, ওপরের তথ্য থেকে সেটাও স্পষ্ট। যখন ন্যূনতম মজুরি ধার্য করা হয় তখন এই সব নারীদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। এই ধরনের মজুরি শ্রমিক ও তাঁর পরিবারকে কোনওক্রমে টিকে থাকার রসদ দেয়, তাঁকে সেই স্তরে সুস্থ রাখে যাতে পরদিনও তিনি কাজ করতে যেতে পারেন। এই ‘কোনওক্রমে টিকে থাকার’ স্তরটিতে আসলে একটা অদৃশ্য ভরতুকি রয়েছে। সেই ভরতুকি আসে নারীদের হিসাববহির্ভূত এবং অদৃশ্য ঘরের কাজ এবং সেবাযত্নের কাজ থেকে। নারীদের ঘরের কাজের যে অংশটি অদৃশ্য থাকে সেটাই কোনওক্রমে টিকে থাকার খরচ এবং মজুরিকে নীচু স্তরে বেঁধে রাখে। সুতরাং, ন্যায্য, ন্যূনতম মজুরির জন্য লড়াইয়ের সঙ্গে নারীদের করা অদৃশ্য কাজের স্বীকৃতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সরকারের গৃহীত নীতি সমূহের সরাসরি প্রভাব রয়েছে ‘গার্হস্থ্য ক্ষেত্রে’ এবং এই বিষয়টিকে জোরালোভাবে সামনে আনা দরকার। এখানে বিকল্প হল: প্রথমত, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নীতিগত হস্তক্ষেপ করা যাতে পরিবারে নারীদের ওপর হিংসাকে আটকানো ও নির্মূল করা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক স্তরের শ্রমিক হিসাবে পুরুষ ও নারীর কাজের অধিকার হবে সমান এবং মজুরিও হবে সমান। তৃতীয়ত, থাকতে হবে শিশু এবং বয়স্কদের জন্য রাষ্ট্রপ্রদত্ত সহজলভ্য, সর্বজনীন সুযোগসুবিধা। চতুর্থত, থাকতে হবে উন্নত গুণমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিক্ষার সুযোগ। পঞ্চমত, এমন সংস্কৃতিকে উৎসাহ দিতে হবে যা ঘরের কাজের দায়িত্ব পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে নিতে উদ্যোগী করবে। এক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলির ‘সামাজিক ধারা’র যুক্তি খারিজ করে দিতে হবে। এবং শেষত, শিশুর যত্ন এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত সব প্রকল্পে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, চালু করতে হবে ন্যূনতম মজুরি এবং তাঁদের সরকারি কর্মীদের মতো সব সুবিধা দিতে হবে।
সূত্র: দ্য হিন্দু, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay









