সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বেহাল সড়কের হাল ফেরাতে চাই নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার
পার্থ প্রতিম বিশ্বাস
ফলে যখন ঘন ঘন তীব্র বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে শহরে তখন শহরের বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পাম্পের জল নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা অবিলম্বে জরুরি। কিন্তু শুধু পাম্পের ক্ষমতা কিংবা স্টেশনের সংখ্যা নয়, প্রয়োজন খালের পলি সংস্কার নিয়মিত উদ্যোগ। কিন্তু এই মুহূর্তে কলকাতা পুরসভার শূন্য পদের সংখ্যা ৫০%-এরও বেশি যে পদ পুরনের কোনও দিশা নেই সরকারি স্তরে। শহর জুড়ে চুক্তি ভিত্তিক কিছু কর্মী দিয়েই এখন চলেছে পুরসভার কাজ। পুরসভার এমন কর্মী ঘাটতির চিত্র কম বেশি রাজ্যের শতাধিক পুরসভার ক্ষেত্রেই।

বর্ষার সময় রাস্তার বেহাল অবস্থার অন্যতম কারণ রাস্তা সংলগ্ন শহরের নিকাশি ব্যবস্থা। পিচের রাস্তার অন্যতম শত্রু হল জল। তাই পিচের রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ জলমগ্ন হয়ে থাকলে সেই রাস্তা ভয়াবহ ভেবে আয়ুক্ষয় ঘটে। ফলে বর্ষার বৃষ্টির জল নিকাশি নালা উপচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলে আখেরে রাস্তার কাঠামোর শক্তি ক্ষয় হতে থাকে দ্রুত। ফলে শহর শহরতলীর যে রাস্তাগুলিতে বর্ষার সময় নিয়মিত জল জমে সেই রাস্তাগুলি দ্রুত ভেঙে চুরমার হয়ে যায় জল নামার অব্যবহিত পর থেকেই। ফলে রাস্তার আটকাতে জরুরি নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার। শহরের নিকাশি বেহাল হলে রাস্তার হাল ফেরানো কার্যত অসম্ভব।
নিকাশি ব্যাবস্থা হল নগর পরিকাঠামোর জরুরি উপাদান। কিন্তু নাগরিক জীবনে পানীয় জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা, বাস ট্রেন কিংবা হাসপাতালের প্রয়োজন যতটা প্রাত্যহিক গুরুত্বের আপাতদৃষ্টিতে সেই গুরুত্বের তালিকায় ঠাই পায় না নিকাশি পরিকাঠামো। বর্ষার জলে হাবু ডুবু খাওয়ার আগে পর্যন্ত ভাবনায় অগ্রাধিকারের তালিকায় সরকার কিংবা নাগরিক উভয়ের কাছেই খানিক ব্রাত্য নিকাশির ভাবনা। দেশজুড়ে যত দ্রুত হচ্ছে নগরায়নের ভাবনা, তার সাথে সঙ্গতি রেখে তৈরি হচ্ছে না নিকাশির উপযুক্ত পরিকাঠামো। ফলে শহর ও শহরতলি জুড়ে বাড়ছে প্লাবনের বিপদ। কলকাতার ক্ষেত্রে এমন বিপদ তুলনায় বেশি এই শহরের ভৌগোলিক আকারের কারণে। এই শহরের ঢাল পশ্চিম থেকে পুবের দিকে। ফলে শহরের বৃষ্টির জল তার স্বাভাবিক গতিতে উচু থেকে নিচে বয়ে যেতে চায় পশ্চিম থেকে পুবের দিকেই। তাই শহরের হাতের কাছেই হুগলি নদী থাকলেও সেটি শহরের নিকাশির ক্ষেত্রে ততোটা কার্যকরী নয়। কিন্তু শহরের পশ্চিম থেকে পুবের এই ঢালের মাঝ বরাবর ঢুকে রয়েছে অনেকটা নিচু জায়গা। শহরের নিচু জায়গাগুলির অবস্থান যেমন সমুদ্রতল থেকে কোথাও মাত্র ১.৫ মিটার ওপরে আবার তুলনায় উচু জায়গার অবস্থান হল সমুদ্রতল থেকে সাত মিটার ওপরে। ফলে ভারী বৃষ্টিতে উঁচু জায়গার জল গড়িয়ে প্রথমেই জমে যায় নিচু জায়গায়। আর সেই সমস্ত নিচু জায়গার অবরুদ্ধ জলকে পাম্প লাগিয়ে টেনে চ্যাংদোলা করার মতো ছুড়ে ফেলতে হয় দুরের নিকাশি নালা কিংবা খালে। শহরের এমন বিশেষ ভৌগোলিক আকৃতির জন্য কলকাতার নিকাশির ৭৯% জলকে পাম্প চালিয়ে বের করতে হয় আর বাকি ২১% জল আপন গতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে সরতে থাকে নালা নর্দমা খাল দিয়ে। শহর জুড়ে থাকা ছোটো-বড়ো এমন সাতাশটি খাল দিয়েই শহরের নিকাশির সিংহ ভাগ জল বেরিয়ে যায় শহরের বাইরে। কলকাতা শহরের এমন নিকাশি খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৪ কিলোমিটার। ফলে যখন ঘন ঘন তীব্র বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ছে শহরে তখন শহরের বিভিন্ন পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পাম্পের জল নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা অবিলম্বে জরুরি। কিন্তু শুধু পাম্পের ক্ষমতা কিংবা স্টেশনের সংখ্যা নয়, প্রয়োজন খালের পলি সংস্কার নিয়মিত উদ্যোগ। কিন্তু এই মুহূর্তে কলকাতা পুরসভার শূন্য পদের সংখ্যা ৫০%-এরও বেশি যে পদ পুরনের কোনও দিশা নেই সরকারি স্তরে। শহর জুড়ে চুক্তি ভিত্তিক কিছু কর্মী দিয়েই এখন চলেছে পুরসভার কাজ। পুরসভার এমন কর্মী ঘাটতির চিত্র কম বেশি রাজ্যের শতাধিক পুরসভার ক্ষেত্রেই।
ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৬ কলকাতা শহরের উত্তরাংশে এবং ১৮৯০ সালে শহরের দক্ষিণাংশে যে নিকাশি পরিকাঠামো গড়া হয়েছিল তার ক্ষমতা ছিল প্রতিদিন যথাক্রমে ১৫০ মিমি এবং ১০০ মিমি বৃষ্টির ধাক্কা সামলানোর মতো করে। অর্থাৎ গড়পড়তা ঘণ্টায় ৬ মিমি বৃষ্টি হলেও শহরে জল জমবে না। কিন্তু সেই শতাব্দী প্রাচীন ইটের তৈরি নিকাশি নালার ক্ষমতা বয়সের ভারে কমেছে বহু গুন তাতে পলি জমার কারণে। এই পলি নিয়মিত পরিষ্কার করার প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ছিল না পুরসভার। এমন নিকাশি নালার ভেতর মান্ধাতার আমলের কায়দায় মানুষ নেমে সেই পলি তোলার কাজ করত। যদিও গত দুই দশকে শহরে প্রযুক্তি নির্ভর পলি নিষ্কাশন ব্যাবস্থা চালু হয়েছে ২০০৫-১০ বাম পুর বোর্ডের আমলে। ভূগর্ভস্থ সেই নালার দেওয়াল ঘেঁষে লাগানো হয়েছে কৃত্রিম আবরণ যাতে জল দ্রুত বয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। শহর জুড়ে থাকা এমন ভূগর্ভস্থ ইটের নালার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮০ কিলোমিটার আর পাইপ দিয়ে তৈরি নিকাশি নালার দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০০ কিলোমিটার। এই তথ্য থেকে অনুমেয় যে নিয়মিত নিকাশি নালা এবং খাল রক্ষণাবেক্ষনের জন্য কি বিপুল পরিমান দক্ষ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, যন্ত্রপাতি এবং অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু দ্বিধাহীন চিত্তে এ-কথা বলাই যায় যে এই বিপুল দীর্ঘ নিকাশি নালার নিয়মিত পরিষ্কার করা কিংবা পলি তোলার কাজ কাঙ্ক্ষিত মানের চেয়ে ঢের কম। ফলে নিকাশি নালা কিংবা খাল, ময়লা কিংবা পলি জমে অবরুদ্ধ হয়ে থাকার কারণে তাদের ধারণ ক্ষমতা কমে। ফলে ভারী বৃষ্টিতে সেই সব নালা আর খাল উপছে জল পৌঁছে যায় রাজপথ থেকে বাড়ির উঠান সর্বত্রই।
কলকাতা শহর গত কয়েক দশকে যে অঞ্চল জুড়ে বেড়ে চলেছে তার সিংহভাগই হচ্ছে তুলনায় নিচু জমি। বহু ক্ষেত্রে চাষের জমি, জলা-জমি ভরাট করেও গড়ে উঠেছে জনবসতি। কলকাতা পুরসভার সংযুক্ত এলাকায় যে পরিমাণ আবাসন গড়ে উঠেছে গত কয়েক দশকে তার ফলে সেখানকার বৃষ্টির জলের পাতাল প্রবেশের পথ অবরুদ্ধ হয়েছে। এমনকি জমির উপর দিয়ে জল যাওয়ার রাস্তাও আটকে গেছে। ফলে জলের স্বাভাবিক নিকাশির পথ একদিকে আটকে গেছে নগরায়নের ধাক্কায় অন্য দিকে গড়ে তোলা যায়নি উপযুক্ত ধারণ ক্ষমতার কৃত্রিম নিকাশি ব্যাবস্থা। ফলে ভারি বৃষ্টিতে উত্তরোত্তর বাড়ছে প্লাবন সম্ভাবনা। এই বিপদ শুধু কলকাতা কিংবা হাওড়ার মতো বড়ো শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শহরতলিতে এই সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। শতাব্দী প্রাচীন এই নিকাশি নালা কিংবা খালগুলোর ওপর চাপ বেড়ে চলেছে শহরের জনঘনত্ব এবং বাড়ির ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথেই। নগরায়নের দ্রুত হারে বৃদ্ধির সাথে সাথে গত তিন দশকে কলকাতার সবুজের পরিমাণ ২৩.৪% থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৩ %। উল্টোদিকে শহরের স্থায়ী নির্মাণের পরিমাণ বেড়েছে ২০০% এরও বেশি। ফলে চল্লিশ বছর আগে ভারী বৃষ্টিতে জলের স্বাভাবিক নিকাশির যে-পথ ছিল সেটা আটকে যাওয়ায় ঐ একই পরিমান বৃষ্টিতে এখন নিকাশি নালায় এসে জড়ো হচ্ছে অনেক বেশি জল। এমন জলের পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়ে চলবে যদি না এখন থেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে রাশ টানা যায়। সাম্প্রতিককালে শহরের ফুটপাথ ঢেকে দেওয়া হয়েছে কংক্রিটের নিরেট পেভার ব্লক দিয়ে। ফলে শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় ইট-কাঠ-সিমেন্ট-বালির ফাঁক গলে যতটুকু জলের মাটিতে ঢোকার উপায় ছিল সেটাও কার্যত বন্ধ। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল ছিদ্র যুক্ত পেভার ব্লক ব্যবহারের যাতে জল মাটিতে চুয়ে ঢুকতে পারে। ফলে গত দু-এক বছর ধরে এমন বহু পাড়ার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে আগে জল না-জমলেও হালে সেখানে জমেছে জল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে শহরের মাটির ওপর কংক্রিট বা পিচের মতো দুর্ভেদ্য আস্তরনের পরিমান ১% বাড়লে শহরে প্লাবন সম্ভাবনা প্রায় ৩.৩% বেড়ে যায়।
শহরে আইনি এবং বেআইনি উভয় গোত্রের নির্মাণের হারিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে বহু জলাভূমি, পুকুর। এক্ষেত্রে যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ‘জল ধরো জল ভরো’ প্রকল্পের ডাক দিচ্ছেন তখন পাড়ায় পাড়ায় তাঁর দলের নেতা কর্মীরা ‘জলা ধরো জলা ভরো’ প্রকল্প রূপায়িত করে চলেছে বেআইনি নির্মাণের উদ্দেশ্যে। নিকাশি খালের আশেপাশে ক্রমশ গড়ে ওঠা গড়ে জনবসতি হয়ে উঠছে নিকাশি খালের বিপদ। অবরুদ্ধ নিকাশির কবলে পড়ে শহরে বাড়ছে জলবাহিত রোগের বিপদ। ঘর গেরস্থালীর বর্জ থেকে শুরু করে প্লাস্টিক এই সমস্ত খালের জল ধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কলকাতার তুলনায় ঢের পরিকল্পিত এবং আধুনিক স্মার্ট শহর বিধাননগর এবং নিউটাউন যেভাবে জলমগ্ন হয়েছে অতীতে কখনও দেখা যায়নি। এই দুটি শহরে যেভাবে বৃষ্টি থামার পরও দীর্ঘক্ষণ জলমগ্ন থাকার ঘটনা ঘটেছে তাতে দুই শহর সংলগ্ন বাগজোলা খালের ধারণ ক্ষমতা হ্রাস মূল কারণ হিসাবে উঠে আসছে। লোকালয়ের থেকে নিকাশির জল সেই খালের বয়ে যাওয়ার পরিবর্তে খালের জল উপচে এসে প্লাবিত করেছে বিধাননগর এবং নিউটাউনের বিস্তীর্ণ এলাকা। জলমগ্ন হয়েছে রাজ্যের গর্বের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের তালুক সেক্টর ফাইভ। এইভাবেই প্রশাসনিক ব্যর্থতার আবর্তে বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন; শহর এবং শহরতলী সর্বত্র।
প্রকাশের তারিখ: ১৮-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
