সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ধর্মস্থান নয়, কর্মসংস্থান, কারখানা
চন্দন দাস
২০০৭-র জানুয়ারি থেকে ২০১১-র মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাব এসেছিল ২,৬৪,৬৩১ কোটি টাকার। মোট প্রস্তাবিত শিল্পের সংখ্যা ছিল ৯১৫টি। বিনিয়োগ প্রস্তাবের গড় ছিল প্রায় ২৮৯ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। তার জন্য সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ কিংবা রাজসূয় যজ্ঞের মতো শিল্প সম্মেলন করতে হয়নি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রীদের।

আপনি শিবলিঙ্গ চাইছেন? চাইতেই পারেন। নিজে গড়ুন, অনেকে মিলে বানান। আপনার অধিকার আছে। পুজো করুন— মহাকাল, মহামায়া, মহালক্ষ্মী— যার যা খুশি। মসজিদ, গির্জা? তা-ও বানাতে পারেন। সরকারের কিছু বলার নেই।
কিন্তু সরকার মন্দির বানাবে না। মসজিদও নয়। সরকার মন্দির বানানোর, পুজোআচ্চার টাকা দেবে না। সংখ্যাগরিষ্ট আস্তিকের দেশে সরকার তবে কী করবে? নিজেকে ‘ব্রাহ্মণ’, ‘বিজেপি’র থেকে বড়ো হিন্দু’ দাবি করা মুখ্যমন্ত্রীর দেড় দশকের শাসনে-ভাষণে অভ্যস্ত অনেকের মনে এই প্রশ্ন উঠতে পারে।
বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ইশতেহারে তার উত্তর আছে— ‘ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের পরিচয় হবে তাঁর কর্মে।’ ‘কর্ম’ এখানে কারখানা-নির্ভর। কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ভর। ইশতেহার জানাচ্ছে, আস্তিক হোন বা নাস্তিক, সবার উপার্জনের পথ বানানোই সরকারের লক্ষ্য হবে। তার জন্য ‘শিল্পে পুনরুজ্জীবন ঘটানো হবে’, ‘প্রতিটি জেলায় তৈরি করা হবে শিল্প তালুক’। যেমন হলদিয়া শিল্পাঞ্চল হয়েছিল। যেমন পানাগড়, খড়গপুর সহ কিছু জায়গায় শিল্প তালুক বামফ্রন্ট সরকার গড়েছিল।
তৃণমূলের দেড় দশকের শাসনে যেগুলি ধুঁকছে। অনেক কারখানা বন্ধ।
আর কী বলা আছে ‘বিকল্প ইশতেহার’-এ? যে কারখানা বন্ধ হওয়ায় ঈশ্বর কিংবা আল্লাহ-প্রণত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তাঁর পূজার্চনার উপকরণেও টান পড়েছে, সেই কারখানা সরকার খুলবে। যে ভারী শিল্প চলে গেছে, তা ফেরানোর রাস্তা তৈরি করবে। যে মাঝারি, বড়ো কারখানা মৃতপ্রায়, যার জমি, যন্ত্রাংশ, বাউন্ডারি ওয়ালের ইঁট তৃণমূলের ‘দুষ্টু’ ছেলেরা বিক্রি করে সোনার চেন, আংটি বানিয়েছে, রামনবমী কিংবা দুর্গাপূজার ভাসানে উদ্দাম নেচেছে, সিটি দিয়েছে, মহিলাদের কটুক্তি কিংবা শ্লীলতাহানি করেছে— সরকার সেই কারখানা, শিল্পকে যত্নে জাগিয়ে তুলবে। দুষ্কৃতীদের? কারখানা থেকে তোলা, কাটমানি আদায় বন্ধ করতে? চালু হবে—‘সিস্টেম ক্লিন-আপ।’ 
এই ইশতেহার তাই শুধু আজকের নয়, আগামী পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘বিকল্প ইশতেহার।’
শিল্পে জোর কেন? এর একটি মতাদর্শগত ভিত্তি আছে। তার জন্য পৌঁছবো ২০০৭-র ১৬ নভেম্বরে। সিপিআই(এম)-র রাজ্য কেন্দ্রের পার্টি সদস্যদের একটি সভা হয় সেদিন। মুখ্য বক্তা সেখানে বলেন, ‘শিল্প গড়ে তোলার আর একটি দিক হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে পশ্চাৎপদ চেতনার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম শক্তিশালী হয়। আমাদের সমাজে সেই চেতনার প্রবাহ আজও আছে যা পুরোনো আধা-সামন্ততান্ত্রিক, প্রাক-পুঁজিবাদী। সেই ধারণার বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও একটি বস্তুগত ভিত্তি তৈরি করে আধুনিক শিল্প। আধুনিক উৎপাদনের সঙ্গে যখন শ্রমজীবী মানুষ সম্পর্কিত হয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় যখন তার যাতায়াত বাড়ে, যুক্তি যখন আবেগ এবং বিশ্বাসের ওপর স্থান করে নেয়, তার মধ্য দিয়েই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের চেতনা গড়ে ওঠার ভিত্তি শক্তিশালী হয়।’
বক্তার নাম? নিরুপম সেন। ‘বিকল্প’র ভাবনা নিহিত আছে ওই বক্তব্যে, যার স্পষ্ট রূপরেখা আমরা পেয়েছিলাম ১৯৭৭ এবং ১৯৯৪-এ, আর একজনের দুটি বক্তৃতায়। তিনি জ্যোতি বসু।
ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলা কিংবা স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গ, শিল্প নিয়ে যত সংঘাত হয়েছে, তা আসলে প্রতিক্রিয়ার শক্তি আর আরও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার পক্ষে সংগ্রামী শক্তির দ্বন্দ্বের ইতিহাস। গত দেড় দশকের ইতিহাসও তাই। বাম গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ইশতেহারের মোদ্দা কথা— শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বাংলার পুনর্জাগরণ।
বিকল্প ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে সরকারের লক্ষ্য হবে— গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা এবং কর্মসংস্থান। প্রতি পরিবারে অন্তত একজনের স্থায়ী কাজ। তার জন্য শিল্প, কারখানা চাই। আর সেই শিল্প-বান্ধব পরিবেশের জন্য পঞ্চায়েত-পৌরসভা ফেরাতে হবে। কারণ, গণতন্ত্রের বিকাশ শিল্পবিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত।
ফিরে দেখা
এই লক্ষ্যপূরণের প্রধান পথ সেই একটি বাক্যে নিহিত— ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি/ শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।’ অতীতের কথা বলছি? না। কমিউনিস্টরা অতীতের খাঁচায় বন্দি নয়। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে চলাই তাঁদের দর্শন। ১৯৭৭-এ সরকার গড়েই শিল্পে নজর দিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। কারণ তার আগের পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে রাজ্যের শিল্প রুগ্ন হয়েছিল। তাই শিল্পের পরিকাঠামো বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছিল। বক্রেশ্বর তার দৃষ্টান্ত হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১— এই সময়ে রাজ্যে ৫১৭টি প্রকল্পে ৯৫২ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ হয়েছিল। ১৯৮৩-তে রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত নেয় চিরাচরিত শিল্পের বাইরে শিল্প বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলার। তারপর কল্যাণী, হলদিয়া, খড়গপুর, বজবজ, উলুবেড়িয়া, মালদহ, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদের মতো জায়গায় শিল্প বিকাশ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের অসহযোগিতা সত্ত্বেও হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস, সল্টলেকে ইলেকট্রনিক্স শিল্প গড়ে ওঠে। বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়ে ওঠে আন্দোলনের নিশান।
একটি কথা বলার চেষ্টা হয়, এবারও হবে। বামপন্থীরা জিতলে আবার ধর্মঘট হবে। শ্রমদিবস নষ্ট হবে। তথ্য তা বলছে না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭— শ্রমিক আন্দোলনের তুলনায় লকআউটে বেশি শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছিল।
শিল্পায়নের উপরে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে শিল্পে লাইসেন্স প্রথা চালু করেছিল। সেই ব্যবস্থায় কোথায় কী ধরণের শিল্প হবে, কতটা পুঁজি বিনিয়োগ হবে তা কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রণ করেছে। বঞ্চিত হয়েছে পূর্বাঞ্চল। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৮৫-৮৬ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব ক্ষেত্রগুলিতে মহারাষ্ট্রে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮৯৬১ কোটি টাকা। সেই একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৯৯১ কোটি টাকা। আর এই টাকার বড়ো অংশই খরচ করা হয়েছে এই রাজ্যের রুগ্ন বেসরকারি সংস্থাগুলির অধিগ্রহণে— রাষ্ট্রায়ত্ব কিংবা অধিগৃহীত বেসরকারি সংস্থার সম্প্রসারণ, আধুনিকীকরণে টাকা খরচ করা হয়নি। ফলে এই রাজ্যের চালু সংস্থাও রুগ্ন হয়েছে। আবার বেসরকারি সংস্থা যখন এই রাজ্যে শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তখন কেন্দ্রীয় সরকার তাদের লাইসেন্স দেয়নি। উলটে অন্য রাজ্যে শিল্প স্থাপন করলে তাদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে, এই প্রলোভন দেখিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
১৯৯৪-এর শিল্পনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের মারাত্মক মাসুল সমীকরণনীতি প্রত্যাহার পরবর্তী পদক্ষেপ। যা ছিল বাস্তবোচিত। ফলাফল দেখা গেছে পরবর্তী প্রতিটি বছরে। একটি পর্বেরই উদাহরণ দেওয়া যাক।
২০০৭-র জানুয়ারি থেকে ২০১১-র মার্চ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাব এসেছিল ২,৬৪,৬৩১ কোটি টাকার। মোট প্রস্তাবিত শিল্পের সংখ্যা ছিল ৯১৫টি। বিনিয়োগ প্রস্তাবের গড় ছিল প্রায় ২৮৯ কোটি ২২ লক্ষ টাকা। তার জন্য সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ কিংবা রাজসূয় যজ্ঞের মতো শিল্প সম্মেলন করতে হয়নি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রীদের।
শুধু বড়ো শিল্পেই জোর দেওয়া হয়েছিল, তা নয়। বামফ্রন্ট সরকার জোর দিয়েছিল ক্ষুদ্র, ছোটো এবং মাঝারি শিল্পেও। ২০০৬-এ আগস্টে এক সরকারি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে মোট শিল্প বিনিয়োগের ৭০%-ই ১০০ কোটি টাকার মধ্যে। প্রায় ৫৫০ শিল্পসংস্থা গড়ে উঠেছিল যাদের বিনিয়োগ ৫ কোটি টাকার মধ্যে।
এই অতীত বিকল্প ইশতেহারের অন্যতম ভিত্তি।
মমতা-শাসনে ভরাডুবি
বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতেই বিজেপি’র মদতে মমতা ব্যানার্জি দিয়েছিলেন ‘কৃষি বনাম শিল্প’র স্লোগান। সভায় সভায় বলে বেরিয়েছিলেন, ‘বামফ্রন্ট সব জমি কেড়ে নিচ্ছে’, ‘মুসলমানদের জমি বেশি করে কেড়ে নিচ্ছে’ ইত্যাদি। বাস্তব হল, তখন যে শিল্প প্রস্তাব ছিল পশ্চিমবঙ্গের জন্য তা বাস্তবায়িত করতে রাজ্যের মোট জমির ১শতাংশ লাগত।
মমতা ব্যানার্জির মসনদ আরোহনের ফল কী হয়েছে?
‘ডিপার্টমেন্ট ফর প্রমোশন অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড’-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০১১-১২ থেকে ২০২৪-২৫— এই সময়ে রাজ্য ছেড়েছে ৬৬৮৮টি সংস্থা। তার মধ্যে গত দশ বছরে ছেড়েছে ৪৭৫১টি সংস্থা। বেশিরভাগই গেছে বিজেপির সরকার আছে এমন রাজ্যগুলিতে। যেমন গুজরাটে গেছে ৪২৩টি, মহারাষ্ট্রে ১৩০৮টি, উত্তর প্রদেশে ৮৭৯টি, ছত্তিশগড়ে ৫১১টি। রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটকের মতো রাজ্যেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিল্প, কারখানা সরে গেছে এই সময়কালে। এমনকি কাশ্মীর কিংবা আন্দামান, পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেই সব এলাকাতেও শিল্প সংস্থা সরেছে।
তাই শিল্প ফিরিয়ে আনার ঘোষণা রাজ্যের জন্য এত জরুরি, যা আছে বিকল্পের ইশতেহারে।
২০১৫ থেকে রাজ্যে বিনিয়োগের লক্ষ্যে ‘বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলন’ শুরু করেছেন মমতা ব্যানার্জি। ২০১৫ থেকে ২০২৫— রাজ্যে এগারোটি ‘বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলন’ করেছে মমতা ব্যানার্জির সরকার। সরকারের দাবি, এই শিল্প সম্মেলনে মোট ১৮,১৬,৯২৪ কোটি ২ লক্ষ টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব রাজ্যে এসেছে।
কিন্তু বাস্তব কী? একই রাজ্য সরকারের অন্য রিপোর্ট আছে। যা কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ করে। কেন্দ্রীয় সরকারের ডিপার্টমেন্ট ফর প্রমোশন অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড (ডিপিআইআইটি) তার হিসাব রাখে, প্রকাশ করে। সেই রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫—এই সময়কালের বিশ্ববঙ্গ শিল্প সম্মেলনগুলিতে মমতা ব্যানার্জির ঘোষিত মোট প্রস্তাবের মাত্র ৪.৫৪% প্রস্তাব রাজ্যে এসেছে। অনেকবার বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে, সেখানকার পথেঘাটে প্রাতঃভ্রমণের ছবি ছড়িয়েছেও রাজ্যের ঘাটে বিনিয়োগের ডিঙি নৌকাও তিনি ভেড়াতে পারেননি।
২০১১-তে শিল্পের প্রসঙ্গকে অগ্রাহ্য করতে পারেনি তৃণমূল। তাদের ইশতেহারে ছিল ‘গ্রামের আধাবেকার সহ এখন বেকারের সংখ্যা ১ কোটি। এদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। এর জন্য বিশেষ ভূমিকা নেবে এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক।’ সেই ব্যাঙ্ক থেকে কতজন কাজ পেয়েছেন, তার হিসাব তৃণমূল সরকার দেয়নি দেড় বছরে। তবে সেই ব্যাঙ্কে ২৭ লক্ষের বেশি যুবকের নাম নথিভুক্ত আছে, সরকারের সর্বশেষ আর্থিক সমীক্ষা তাই জানাচ্ছে।
বিনিয়োগ আসেনি। শিল্প হয়নি। তাই ব্যাঙ্কে শুধু কর্মপ্রার্থীদের নাম জমা হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি গত বাজেটে ঘোষণা করেছেন, ‘বাংলার যুবসাথী।’ ২১ থেকে ৪০ বছরের মাধ্যমিক উত্তীর্ণ, উপার্জন না-করা যুবদের মাসে দেড় হাজার টাকা দেওয়ার ওই প্রকল্পে কতজন ফর্ম পূরণ করেছেন? ৯০লক্ষ!
সরকারই জানিয়েছে কাজের হাহাকার কোন্ জায়গায় পৌঁছেছে। কাজের অভাব, কারণ শিল্পে মরুভূমি।
মমতা ব্যানার্জি আরও কী বলেছিলেন? ‘প্রকৃত শিল্পায়নে জোর দেওয়া হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি মহকুমায় অন্তত দশটি করে বড়ো, মাঝারি শিল্প গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত তৃণমূলের ইশতেহারে এই প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রতি মহকুমাতে দশটি করে শিল্প হলে, ইতোমধ্যে ৫২০টি শিল্পের মাথা তোলার কথা। কিন্তু মহকুমা তো অনেক দূরের কথা, ২৩টি জেলাতে একটি করেও হয়নি।
শিল্প গেলে চাষের উন্নতি হয় না। প্রমাণ মমতা-শাসনই। খুব উন্নতি হয়েছে, তাও নয়। নাবার্ডের সর্বশেষ রিপোর্ট জানিয়েছে যে, রাজ্যে কৃষিজীবী পরিবারের মাসে আয় গড়ে ৭৭৫৬ টাকা। দেশের আঠাশটি রাজ্যের মধ্যে এই ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ২২ নম্বরে। তাই এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে মমতা ব্যানার্জি কৃষকের আয় কত হল, সেই প্রসঙ্গ রাখেননি।
বিকল্প ইশতেহারে তাই কৃষকের ১৬টি ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেড় গুণ করার ঘোষণা আছে। এ শুধু কৃষকের জন্য নয়। বাজারের সম্প্রসারণের জন্য। কৃষি-ভিত্তিক শিল্পের ভিত্তি তৈরির জন্য। কারখানার জন্য।
বিজেপি কী করল?
‘সোনার বাংলা’ তাদের লক্ষ্য, অমিত শাহ্, মোদী বলছেন। শিল্প ছাড়া সোনার বাংলা হয় না। ২০১৯-এ রাজ্য থেকে লোকসভায় বিজেপির ১৮জন সাংসদ ছিল। এখন ১২জন। রাজ্যে শিল্পের জন্য তাঁদের ভূমিকা কী? তবে সেই প্রশ্নের আগে চলে আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রসঙ্গ।
পৌঁছনো যাক ২০১৪-র এপ্রিলে।
নরেন্দ্র মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। কলকাতার একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোদী জানিয়েছিলেন, ‘এখন, যখন আমি গুজরাটের বাইরে এসে সারা দেশের উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, আমার সিঙ্গুরের জন্যও একটি ভাবনা আছে।’
সেই ‘ভাবনা’-র আশ্বাস পেয়েই চিঠি লিখেছিল সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ ও উন্নয়ন কমিটি। দিনটি ছিল ২০১৪-র ২৮ জুলাই। মোদী ততদিনে প্রধানমন্ত্রী। জবাব তো দূরের কথা। ‘চিঠি মিলা হ্যায় মিত্রো’— এই টুকুও জানাননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সিঙ্গুরের জমি এবং তার ভবিষ্যতের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছিল সেখানকার শিল্প বিকাশ ও উন্নয়ন কমিটি। কমিটির বক্তব্য ছিল, ‘আমরা সিঙ্গুরের ওই জমিতে শিল্প চেয়েছিলাম। জমিটি যেভাবে রয়েছে, তাতে কোনও কিছুই হচ্ছে না। কয়েক হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনও জবাব আসেনি তাঁর থেকে। এমনকি চিঠির প্রাপ্তি স্বীকারটুকুও করা হয়নি।’
সেই সিঙ্গুরে সম্প্রতি সভা করে শিল্প, কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।
গত এগারো বছরে রাজ্য থেকে নির্বাচিত বিজেপির সাংসদরা পশ্চিমবঙ্গের শিল্প বিকাশে কোনও উদ্যোগ নেননি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাততাড়ি ঘোটানো সংস্থাগুলিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি। হলদিয়া বন্দরের উন্নতি করেনি। ব্যারাকপুর, হলদিয়া শিল্পাঞ্চল থেকে জিতেছে বিজেপি, কিন্তু কারখানা আনেনি সেখানে। বন্ধ কারখানা খোলার উদ্যোগও নেয়নি। রাজ্যে বিজেপি প্রধান বিরোধী দল। তাদের কোনও ভূমিকা নেই। দুই ফুলের দল মিলেই রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছেন।
এর একটি কারণ আছে, যা ভূ-রাজনৈতিক। পূর্ব ভারতে শিল্প বিকশিত হলে সুলভ কাঁচামাল, শস্তা শ্রম হারাবে দেশের বহুজাতিক সংস্থাগুলি। বিজেপি-কর্পোরেট চক্রের প্রধান ধান্দার ক্ষেত্র পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চল। সিঙ্গুরের কারখানা যেমন গুজরাটে গেছিল, তেমনই নন্দীগ্রাম প্রস্তাবিত পেট্রো রসায়ন শিল্প তালুক (পিসিপিআইআর) তৈরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এবং গুজরাটের মোদী সরকার। পূর্বাঞ্চলে পিসিপিআইআর চায়নি বিজেপি। গুজরাটে তা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তা তাড়ানোয় তৃণমূলের সহযোগী হয়েছিল বিজেপি।
ভুললে চলবে না। ইতিহাস কথা বলে। বিজেপি বাংলাপ্রেমী নয়। বিজেপি ধান্দা প্রেমী। তার ধান্দা প্রেমে বাংলার জায়গা নেই।
বিকল্প ইশতেহারের বাকি কথা
বাংলা হোক বা দেশ, বামপন্থীরা প্রগতির পক্ষে। তাই কৃষির বিকাশের ভিত্তিতে শিল্পের পক্ষে। এবার তাই এককদম আগে গিয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে ‘প্রতিটি জেলায় শিল্প তালুক তৈরি করা হবে।’
ভারী শিল্প গড়া, ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ইশতেহারে বলা হয়েছে ‘দুর্গাপুরে আন্তর্জাতিক বিমান কার্গো এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা হবে।’ বলা হয়েছে ‘প্রতি ব্লকে স্মার্ট বাজার।’ নতুন প্রজন্মের আশার স্ফূরণ রয়েছে— ‘স্টার্ট আপ ও গবেষণা কেন্দ্রের সুবিধার জন্য গড়ে তোলা হবে বেঙ্গল হাব (বি-হাব)’, ‘আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ফার্মাসিউটিক্যাল ও অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে ওষুধ শিল্পের বিকাশের জন্য’। যদি নতুন উদ্যোগ বা স্টার্ট আপ ধাক্কা খায়? ব্যর্থ হয়? তার ৫০শতাংশ ঋণ মকুব করা হবে। একদিকে যেমন পেটেন্ট নেওয়ার জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র তৈরি করবে সরকার, সঙ্গে সঙ্গে সমবায় মালিকানায় আধুনিক রাইস মিল তৈরির বন্দোবস্তও সরকার করবে।
ধান থেকে সফটওয়্যার— প্রতিটি উপাদান হবে শিল্পের বিকাশের মাধ্যম। কারণ— লক্ষ্য অবিচল, স্পষ্ট—মন্দির নয়, মসজিদ নয়, লক্ষ্য— কাজ। বর্তমানের গর্ভে উজ্বল আগামীর ধারক বামপন্থীরাই।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
