সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গিগ অর্থনীতি: জেমস বন্ডের গাড়ি আর খেপের খেলোয়াড়
সাগ্নিক সেনগুপ্ত
শ্রমিকদের লড়ে পাওয়া আইন রক্ষা করতে আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে, ৯ জুলাই সারা দেশে ধর্মঘট হবে, গিগ শ্রমিকেরা এমন একটি ক্রমবর্ধমান অংশ যাদের স্বার্থে সারা দেশে কোনও শ্রম আইন নেই। একটিও না। তাঁরা ৮ ঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় শ্রম দিতে বাধ্য হন, ন্যূনতম মজুরি তাঁদের নেই, নেই গ্রাচুইটি, পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড, ওয়ার্কমেন কম্পেনসেশন-এর আওতায় তাঁরা পড়েন না, নিয়োগকারী কোনও ধরনের অ্যাকসিডেন্টাল বেনিফিট দিতে তাঁদের বাধ্য নন। তাঁদের বাইক বা সাইকেল নিজস্ব, স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, ইউনিফর্ম নিজেকে কিনতে হয়, প্রতিদিন বাইকের তেল তাঁকে নিজেকেই ভরতে হয়, সারাদিনের খাবারও নিজের পয়সায়।

পুঁজিবাদ যে কতটা সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হওয়া সামরিক অস্থিরতার পরিবেশ থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে। তার অভ্যন্তরীণ অসুখ এখন সারা দুনিয়া জুড়ে এমন এক অভূতপূর্ব বৈষম্যের পরিস্থিতি তৈরি করেছে যার দরুণ পূর্বতন সমস্ত মুনাফা এবং তার একচেটিয়াকরণের পদ্ধতি আর ধোপে টেকাতে পারছে না নয়া উদারবাদ।
আমরা জানি যে পুঁজিবাদ এমন এক রোগী, যে নিজের রোগেরই নেশাগ্রস্ত। এই নেশা ছাড়বার কোনও সম্ভাবনা তো দূরের কথা, কোনও ইচ্ছাও তার নেই, তাতে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা অনিশ্চয়তাই তৈরি হোক না কেন। মুনাফা তার একমাত্র সত্য, একমাত্র চাহিদা এবং তাঁকে মেটাতে সে পৃথিবীকে নষ্ট করে ফেলতেও পিছপা হবে না, হচ্ছেও না।
শ্রমিক শ্রেণির ওপর চলা অপরিসীম শোষণের মূল বহিঃপ্রকাশ হয় তাঁকে তার শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করতে না দেওয়ার মাধ্যমে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে যেখানে শ্রমিকেরা তাঁদের মজুরি এবং উদ্বৃত্তের উপর সামাজিক মালিকানা পাবে, ততক্ষণ তাঁরা তাঁদের অন্তত বেঁচে বর্তে থাকাটা সুনিশ্চিত করবার স্বার্থে ছোট ছোট দাবি নিয়ে মালিকের এবং মালিকের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্রের সাথে লড়াই করে। স্থায়ী কাজের অধিকার, ৮ ঘণ্টার শ্রমের অধিকার, ন্যূনতম মজুরির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষার অধিকার এ সবই এই ধরনের লড়াইয়ের ফসল। মালিকেরা সাময়িকভাবে এই লড়াইগুলিতে হেরেছে ও উদ্বৃত্তের পরিমাণ থেকে শ্রমিকদের এই সুবিধাগুলি দিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে সংকট যত বাড়ছে, পুঁজিবাদ তত তার এই পুরনো অবস্থান থেকে সরে আসছে, কখনও আইন ভেঙে, কখনও আরও বিপদজনক ভাবে নতুন আইন তৈরি করে – যার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রাপ্য সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
গিগ অর্থনীতি শোষণের এবং মুনাফার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। একজন পুঁজির মালিকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই ধরনের অর্থনীতির সম্ভাবনা অপরিসীম। প্রথমত, মালিককে কোনও কিছু তৈরি করতে হয় না, সে ক্রেতা, ভোক্তা ও উৎপাদনকারী ও পরিষেবাপ্রদানকারীর মধ্যে একজন মধ্যসত্ত্বভোগী দোকানদারের ভূমিকা পালন করে। এই পুরো অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থায় তার মালিকানা কেবলমাত্র একটি অ্যাপ-এর ওপর, যার মাধ্যমে সে এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অ্যাপ ঠিক করছে একজন কী কিনবে, কত টাকায় কিনবে, কবে কিনবে, যে বেচবে সে কত টাকায় বেচবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারা এই ব্যবস্থায় মানব-শ্রম নিযুক্ত করবে। এই অর্থনীতির শোষণের পদ্ধতি অন্তর্নিহিত আছে এই শেষ অংশে। গিগ ব্যবস্থা পুরনো কোনও ব্যবস্থাকে ঘষে মেজে চালানোর চেষ্টা করা নয়, এটি একেবারে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যার নিজস্ব প্রেক্ষিত আছে এবং সেই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা মাফিক তৈরি করা হয়েছে। কারা হবেন গিগ শ্রমিক এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হতে পারে এবং তা হচ্ছে যাদের আর অন্য কোনও কাজের সুযোগ নেই। গিগ অর্থনীতির বিকাশের পূর্বশর্ত হল— কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকে সঙ্কুচিত করতে হবে। স্থায়ী, এমন কি কনট্র্যাকচুয়াল, ক্যাজুয়াল, অ্যাপ্রেন্টিস-এর কাজ সমস্ত কিছুকেই অপ্রতুল করে দিতে হবে যাতে বেকারদের এক বিপুল মজুত বাহিনী তৈরি করা যায়। ফলে আমাদের দেশে বেকারত্বের সমস্যা বৃদ্ধি পাবার সাথে গিগ অর্থনীতির বিকাশের সরাসরি যোগাযোগ আছে। মানুষের অপারগতা, অনিশ্চয়তাঁকে মুনাফায় পরিবর্তিত করতেই এই গিগ অর্থনীতি তৈরি করা হয়েছে। 'যে কোনও' কাজের চাহিদা সমাজে এমন ভাবে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে, যাতে যে কোনও শর্তেই তাতে নিযুক্ত করা যায়। শ্রমিকদের লড়ে পাওয়া আইন রক্ষা করতে আন্দোলন সংগ্রাম হচ্ছে, ৯ জুলাই সারা দেশে ধর্মঘট হবে, গিগ শ্রমিকেরা এমন একটি ক্রমবর্ধমান অংশ যাদের স্বার্থে সারা দেশে কোনও শ্রম আইন নেই। একটিও না। তাঁরা ৮ ঘণ্টার চেয়ে অনেক বেশি সময় শ্রম দিতে বাধ্য হন, ন্যূনতম মজুরি তাঁদের নেই, নেই গ্রাচুইটি, পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড, ওয়ার্কমেন কম্পেনসেশন-এর আওতায় তাঁরা পড়েন না, নিয়োগকারী কোনও ধরনের অ্যাকসিডেন্টাল বেনিফিট দিতে তাঁদের বাধ্য নন। তাঁদের বাইক বা সাইকেল নিজস্ব, স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, ইউনিফর্ম নিজেকে কিনতে হয়, প্রতিদিন বাইকের তেল তাঁকে নিজেকেই ভরতে হয়, সারাদিনের খাবারও নিজের পয়সায়। পয়সা মানে দিনের রোজগার থেকে কিন্তু উপরে উল্লিখিত সব দিয়ে-থুয়ে কাকের হাতে পেন্সিলও থাকে না। এই শ্রমিকেরা কোনও চুক্তি-ভুক্ত নন, এঁরা অ্যাপের একটি কাগজে ডিজিটাল সই করেন বটে, কিন্তু তাতে এঁদের প্রাপ্য কিছু লেখা থাকে না, যা লেখা থাকে তা হচ্ছে কোম্পানির গুণগান, এবং তাঁদের পে আউট হবে ‘ডায়নামিক’ এবং ‘ফ্লেক্সিবল’, যে দুটি শব্দের মানে হল – যখন ইচ্ছে তাঁদের ডেলিভারি প্রতি প্রাপ্য কমে যেতে পারে। এবং তাই যায়। এ ছাড়াও লেখা থাকে যে, এই কাজ খেপের কাজ, খেপ খাটা হয়ে গেলে চলে যেতে পারো, সেটাই কাজের ধরন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে শব্দটি লেখা থাকে, তা হচ্ছে ‘পার্টনার’। এই একটি শব্দের ব্যবহারে এই বিপুল ব্যবস্থাকে যে কোনও ধরনের আইনের ঘেরাটোপের বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে নয়া উদারবাদ। শ্রমিকের পরিচয় না দিয়ে শ্রমিকের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। নতুন যে শ্রমকোড লাগু করার চক্রান্ত চালাচ্ছে কেন্দ্রের সরকার, তাতে প্রথাগত মালিক শ্রমিক সম্পর্কের বাইরে গিগ শ্রমিকদের অবস্থানকে বৈধতাও দেওয়া হচ্ছে। উদারবাদ মুনাফার ওপর লাগাম কমায়, তার গণ্ডি বড় করে। সে আইনকে শিথিল করে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নেবার চক্রান্ত করে। তাই আইন বহির্ভূত এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সে যে অতি মাত্রায় সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।
অ্যাপের ওপর মালিকানার থেকেই এই অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সমস্ত ধরনের শোষণ, নিপীড়ন এবং চুরি এই অ্যাপের ওপর নিয়ন্ত্রণকে ব্যবহার করে করা হয়। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে হয়তো সুবিধা হবে: একজন ডেলিভারি শ্রমিককে দিনে ধরুন ন্যূনতম ২০টি ডেলিভারি করতে হবে ১০০ টাকা ইনসেনটিভ আয় করার জন্য। এটা করতে তাঁর ধরুন ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। তাঁর ডেলিভারি করার ক্ষেত্র ১ থেকে ৩ কিলোমিটার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রতিটি ডেলিভারি-তে মালিক তাঁকে যা দূরত্ব ডেলিভারির জন্য দেখাচ্ছে অ্যাপের মাধ্যমে আদতে দূরত্ব তার চেয়ে ১০০ মিটার বেশি। দিনের শেষে সেই শ্রমিক আসলে ২০ টি নয় ২২ টি ডেলিভারি এবং ২ কিলোমিটারের বাড়তি শ্রম ও পেট্রলের টাকা দিচ্ছেন, যার পয়সা তিনি দাবিও করতে পারবেন না । এটা প্রতিদিন প্রত্যেকজন গিগ শ্রমিকের সাথে হচ্ছে আমাদের দেশে।
গিগ শ্রমিকেরা একেবারে নিঃসহায় অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ২০২৫ সালে ভারতে মোট গিগ শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি তিরিশ লক্ষ। ২০৩০ সালে আরও এক কোটি বাড়বে। এদের মধ্যে একজন গিগ শ্রমিকও হয়তো নেই যিনি অন্য যে কোনও কাজ পেলে এই কাজ করবেন। এই নিঃসহায়, অনিশ্চিত অবস্থার দায় সম্পূর্ণভাবে সরকারগুলির। সরকারগুলিকে দিয়ে এই শ্রমিকদের স্বার্থে আইন তৈরি না করাতে পারলে এই ভয়ঙ্কর শোষণকে রোখা মুশকিল। দেশে এবং রাজ্যে গিগ শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদ গড়ে তুলে, ত্রিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এই অংশের শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা থেকে শ্রম দিবস, মজুরি, সামাজিক সুযোগ সুবিধে সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা অবশ্য দরকার।
দরকার এই শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া এবং অধিকারের লড়াই লড়তে নামা।পৃথিবীর সবচেয়ে লোভনীয় ব্যবসাগুলি এখন গিগ অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। মোদী সরকারের স্টার্ট আপ বুম আসলে গিগ অর্থনীতি তৈরি করার ব্যবস্থা ছিল। সুইগি, জোমাটো, ব্লিংকিট, ফ্লিপকার্ট, মিন্ত্রা, ওলা, উবের, রাপিডো ইত্যাদি সমস্ত কোম্পানি এখন পরিষেবামূলক অর্থনীতির পাণ্ডা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। বেলাগাম মুনাফা ও নির্মম শোষণের মাধ্যমে একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, এই ব্যবস্থার অশ্বমেধের ঘোড়াকে যদি আটকানো না যায়, এই অশ্লীল লোভ গোটা অর্থনীতিকে গ্রাস করবে, বেকারত্ব এবং বৈষম্য আরও তীব্র হবে। আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে শ্রমিকের জীবন।
জোমাটো এবং ব্লিংকিটের মালিক দীপিন্দর গোয়েলের অনেক গাড়ির মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় গাড়ি একটি আস্টন মার্টিন ডি বি ১২, যার দাম পাঁচ কোটি টাকা। এই গাড়িটি তাঁর প্রিয়, কারণ জেমস বন্ড এই কোম্পানির গাড়ি চালান। বন্ড এই গাড়ি চালিয়ে যে সাম্রাজ্যবাদের দালালি করেন সেই ব্যবস্থার নকশা অনুযায়ী গোয়েলবাবু একবছরে ৬৭% সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। আমাজনের মালিক জেফ বেজোস ঘণ্টায় আট মিলিয়ন ডলার রোজগার করেন। আর এই দেশে একজন গিগ শ্রমিক গড়ে দিনে ২০০ টাকাও ঘরে নিয়ে যেতে পারেন না। ৯ জুলাই সিটু সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের ডাকে দেশ জুড়ে মেহনতিরা যে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে তার প্রয়োজন আমাদের দেশে গিগ শ্রমিকদের থেকে বেশি খুব কম অংশেরই আছে।
এক ক্লিকেই যুক্ত হন মার্কসবাদী পথের সঙ্গে
প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুলাই-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
