Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

লুলার জয় আসলে ফ্যাসিবাদ ও ট্রাম্পের পরাজয়

আন্দ্রে সিনট্রা, সিজার জাভিয়ের
ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা চতুর্থবারের জন্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। রবিবার পিছিয়ে থেকে উঠে এসে তিনি হারিয়েছেন উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বোলসোনারোকে। তিনি ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেইর বোলসোনারের বড় ছেলে। এই নির্বাচন ছিল দেশের মধ্যে সবচেয়ে তিক্ত ভোটের লড়াই। স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৯ মিনিটে ভোটের ফল পরিষ্কার হয়ে যায়। লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৫ শতাংশ ভোট এবং বোলসোনারো পেয়েছেন  ৪৮.২৫ শতাংশ ভোট। লুলা ৪৫ লক্ষেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। 
Lula’s victory is actually a defeat of fascism and Trump.

৮০ বছরের লুলা হলেন সেই প্রথম ব্যক্তি যিনি চার বার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। গত সাতটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়ে এটা হল বামেদের ষষ্ঠ জয় এবং এই লড়াই ছিল সবচেয়ে কঠিন। 

যদি প্রথম দফার নির্বাচনে কোনও প্রার্থী গরিষ্ঠতা না পান তখন দ্বিতীয়বার ভোট নেওয়া হয়। তিন সপ্তাহ আগে ভোটে প্রথম হয়েছিলেন বোলসোনারো। তখন তিনি পেয়েছিলেন ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট এবং লুলা পেয়েছিলেন ৪৫.১৬ শতাংশ ভোট। তবে এই কঠিন পরিস্থিতি পরে বদলে যায়। দুই রাউন্ডের মধ্যে লুলার ভোট বাড়ে ১ কোটি ১০ লক্ষ। ভোটদানের হার বাড়ার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। রবিবার রাতে লুলা সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই দেশের ইতিহাসে এবারই ভোটদানে অনুপস্থিতির হার সবচেয়ে কম।’

ট্রাম্পেরও পরাজয়

এই জয়ের তাৎপর্য ব্রাজিলেই সীমাবদ্ধ না থেকে অনেকদূর পর্যন্ত অনুভূত হবে। বোলসোনারের ছেলের পক্ষে খোলাখুলি দাঁড়িয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ফ্লাভিওর ভাই কংগ্রেস সদস্য এদুয়ার্দো আমেরিকাতেই থাকেন। তিনি ভোটের আগে বলেছিলেন, ফ্লাভিওকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং ভোটে হারলে তাঁর উচিত আমেরিকায় পালিয়ে আসা। 

রবিবার রাতের সম্পাদকীয়তে, ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিডিওবি)-র মুখপত্র ভারমেলহো-র সম্পাদকেরা, লিখেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিও ফ্যাসিস্ট সরকার, যারা নির্লজ্জভাবে ফ্লাভিও বোলসোনারোকে মদত দিয়েছিল, তারাও কঠিন পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে।’

তাঁরা লিখেছিলেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটা উগ্র দক্ষিণপন্থী ঢেউ ক্যারিবিয়ান থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাদের পরবর্তী জয় হবে ব্রাজিলে, এই মর্মে উদযাপন শুরুও করে দিয়েছিল হোয়াইট হাউজ।

লুলা তাঁর প্রচারে কেন্দ্রীয় বিষয় করেছিলেন জাতীয় সার্বভৌমত্বকে। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকতের এক বিশাল জনসভায় লুলা বলেছিলেন,  ব্রাজিলের সামনে দুটো রাস্তা খোলা রয়েছে— ‘একজন ব্রাজিলের পতাকাকে চুম্বন করেন, অন্যজন চুম্বন করে আমেরিকার পতাকাকে। ভোটদাতাদের এই দুয়ের মধ্যে একজনকে বেছে নিেত হবে।’ 

ভোটের ফলাফলে দেখা গেল সংগঠিত শ্রমিক এবং যুবদের একটা ব্যাপক জোট ট্রাম্পের মদতপুষ্ট উগ্র দক্ষিণপন্থী প্রার্থীকে পরাজিত করতে পারে। এবং যখন মনে হচ্ছে পরিস্থিতি সবচেয়ে গম্ভীর ও জটিল, তখনও এটা পারা যায়। 

ছাত্ররাই স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল

নিষ্প্রভ প্রথম রাউন্ডের পর অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঘটনার রাশ হাতে নেয় ছাত্ররা। ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ স্টুডেন্টস সারা দেশব্যাপী একটি কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের ব্যানারে লেখা হয় ‘লুলার পাশে ছাত্ররা আছে রাস্তাতেও, পাশে আছে অনলাইনেও।’ ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ইউনিয়ন অফ সোশালিস্ট ইয়ুুথ তারাও এই লড়াইয়ের মেরুদণ্ড হিসাবে কাজ করতে নেমে পড়ে। 

শ্রমিক ফেডারেশন, সামাজিক আন্দোলন, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীরাও এই লড়াইয়ে যোগ দেন। দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে লুলার সমর্থনে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে যোগ দেন দেড় কোটিরও বেশি মানুষ। সাও পাওলোর প্রধান রাস্তায় লুলার শেষ জমায়েতে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ২০ লক্ষ সমর্থক। 

অনলাইনে লড়াইটাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোস একটা হোয়াটস অ্যাপ চ্যানেল গড়ে তুলে তার নাম দেন ‘লুলার সেনাদল’। এতে ফলোয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০.৮ মিলিয়ন। এটা হয়ে ওঠে ভিডিও, অডিও ক্লিপ এবং সাংগঠনিক নির্দেশ পাওয়ার একটা হাব। এই প্রচারকে লড়তে হয়েছে মেটার সঙ্গেও। মেটাই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটস অ্যাপের মালিক। তারা লুলার প্রচারের অ্যাকাউন্টগুলিকে আটকে দিয়েছিল, আটকে দিয়েছিল লুলার পক্ষে তৈরি হওয়া কনটেন্ট। উল্টে এ সব বিষয়ে তারা আনুকূল্য দেখিয়েছিল লুলার প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে।

এমনকী ভোটের দিনেও যারা শ্রমিক শ্রেণির ভোটার তাদের ভালরকম বাধা দেওয়া হয়েছিল যাতে লুলার পক্ষে ভোটদানের হার কমে। 

ব্রাজিলে ভোট কেন্দ্রে পৌঁছতে অনেক লোকই নির্ভর করে সরকারি বাসের ওপর। আদালত সব শহরকে নির্দেশ দিয়েছিল তাদের সব বাস চালাতে যাতে লোকে ভোটকেন্দ্রে রৌঁছতে পারে। কিন্তু সাও পাওলো এবং সালভাদোর শহরের (দেশের উত্তরপূর্বের একটি বড় শহর)  দক্ষিণপন্থী মেয়রেরা সেদিন এই নির্দেশ মানেননি।

সালভাদোর শহরে ৯০০-র বেশি বাস ডিপোয় বসিয়ে রাখা হয়েছিল। আঞ্চলিক ইলেকশন কোর্ট শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার ডিরেক্টরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত ভোটদানের সময় বাড়িয়ে করে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত। তবে তার মধ্যে বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। 

তবে এসব কোনও কিছু করেই লুলাকে আটকানো যায়নি।

মেহনতী জনগণের কর্মসূচি

সাও পাওলোর বিজয় ভাষণে লুলা তাঁর ও তাঁর সঙ্গী ভাই প্রেসিডেন্ট জেরালডো অ্যাকমিনের জয়ের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন ভোটারদের। তিনি বলেছেন, ‘এই ভোটে আমি কিংবা অ্যাকমিন জিতিনি, জিতেছে শালীনতা, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র এবং সেই ভবিষ্যৎ যা আপনারা চান আপনাদের সন্তানদের জন্য।’ 

লুলা যে অ্যাজেন্ডা সামনে এনেছেন তার সম্পূর্ণ লক্ষ্য ছিল মেহনতী পরিবারগুলি: হাই স্কুল পর্যন্ত প্রতিটি শিশুর গোটা দিন সরকারি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ, কম আয়সম্পন্ন পরিবারের কিশোর কিশোরীরা যাতে স্কুেলর পড়া চালিয়ে যেতে পারে সেই লক্ষ্যে নগদ সহায়তা দেওয়ার চালু কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কলেজের ছাত্রদের জন্য একই ধরনের কর্মসূচিতে নতুন ব্যবস্থা, ব্রাজিলের সর্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন, আরো বেশি করে ক্যানসার চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং বয়স্ক ও মহিলাদের জন্য আরও জোরদার নীতি। 

অপরাধ দমনে ফেডারাল সরকারের আরও বড় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিযেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যাঁরা খেটে খান তাঁদের আমরা নিরাপত্তা দেব। যারা অপরাধী তাদের ঠাঁই হবে জেলে।‘ 

দৈত্যাকার প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে নিয়ন্ত্রণের কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘দৈত্যাকার যে কোম্পানিগুলি কোটি কোটি ডলার আয় করবে অথচ এই দেশকে কোনও কর দেবে না, যে কোম্পানিগুলি আমাদের নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, তাদের আমরা ছেড়ে রাখতে পারি না।’ প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিিন বলেন, ‘চীন বা আমেরিকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর আমরা নির্ভর করে থাকতে চাই না। আমরা ব্রাজিলীয় প্রযুক্তি তৈরি করতে চাই।’

সবশেষে তিনি ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, ‘যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন কারোর দরকার নেই তাঁকে তোয়াজ করার। তবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন সকলকে শাসন করার জন্য।’ 

প্রাক্তন মধ্য-দক্ষিণপন্থী গভর্নর অ্যাকমিন লুলার জোটে নিয়ে এসেছিলেন মডারেটপন্থী ও বিজেনসে লিডারদের। তিনি প্রেসিডেন্টের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আপনি ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে রক্ষা করলেন।’ 


সামনের সারিতে কমিউনিস্টরাই

ভারমেলহো-র সম্পাদকেরা এই ফলাফলকে বলেছেন ‘ব্রাজিলের জনগণের জয়’। এই জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন যুবরা। তাঁরা হারিয়েছেন উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তিকে যারা চেয়েছিল এই দেশকে ‘লোভী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে’ বিক্রি করে দিতে। ভারমেলহো-র সম্পাদকেরা জানিয়েছেন, লুলাই তাঁদের আসল নেতা কারণ তিনি ট্রাম্পের কাছে মাথা নোয়াননি। 

এই সম্পাদকেরা লিখেছেন, কর্মী ও নেতৃত্বের বাহিনী সহ পিসিডিওবি ছিল ‘সঙ্ঘাতের একেবারে সামনের সারিতে’ কারণ ব্রাজিলের বর্তমান ও আগামী ভবিষ্যতের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নির্ধারক পদক্ষেপ। 

এই সম্পাদকেরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, সামনে অনেক কঠিন কাজ পড়ে রয়েছে। নতুন কংগ্রেসে দক্ষিণপন্থী ও উগ্র দক্ষিণপন্থীরা শক্তি সঞ্চয় করেছে। কয়েকটি বড় রাজ্যের গভর্নরের পদ তারা দখল করেছে। তাঁদের বক্তব্য, নতুন করে শিল্পায়ন, ভাল চাকরি, সম্প্রসারিত অধিকার,— এই সব কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে লুলাকে আরও বৃহত্তর শাসক জোট গড়তে হবে এবং অনলাইনে ও রাস্তায় ক্রমাগত গণ জমায়েত করে যেতে হবে। 

তবে রবিবার দিনটা ছিল সেই জনতার যারা ‘না’ বলে দিয়েছে। এই সম্পাদকদের কথায়, ব্রাজিলের জনগণ, যাদের চালিকা শক্তি যুবরা, তারা সজোরে স্পষ্ট চিৎকার করে জানিয়ে দিয়েছে, ‘এখানে ওসব হবে না।’

এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল পর্তুগিজ ভাষায় ভারমেলহো পত্রিকায়। 
আন্দ্রে সিনট্রা ভারমেলহো-র সম্পাদক। ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিডিওবি)-র মুখপত্র। 
সিজার জাভিয়ের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নিবন্ধ লেখক। ভারমেলহো ছাড়াও তিনি লেখেন ব্রাজিলের একাধিক প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে। 


প্রকাশের তারিখ: ২৯-অক্টোবর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আন্তর্জাতিক বিভাগে প্রকাশিত ৭৯ টি নিবন্ধ
২৯-অক্টোবর-২০২৬

২৬-অক্টোবর-২০২৬

২৩-অক্টোবর-২০২৬

০৫-অক্টোবর-২০২৬

২৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২০-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০১-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২৯-আগস্ট-২০২৬

২৩-আগস্ট-২০২৬

২৯-জুলাই-২০২৬