সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মজুত অস্ত্রের ভাণ্ডার খুইয়ে সঙ্কটে আমেরিকা
সুচিক্কণ দাস
জানা যাচ্ছে, এই চাপের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বেশ কিছু মিসাইলকে তাদের প্রতিরক্ষার ঢাল ভেদ করে আছড়ে পড়তে দিচ্ছে। কারণ সেগুলোর আটকানোর মতো অস্ত্র তাদের হাতে নেই। যুদ্ধ যখন মাঝপথে— তখন বিরোধীপক্ষের ইচ্ছাশক্তির মনের জোর মোটেই ভেঙে পড়ছে না— বরং আমেরিকার নিজের গোলাবারুদের ভাণ্ডার কমে এসেছে।

কোন্ ইস্যুতে কথা বলবেন, সেটা রাতারাতি বদলে ফেলতে পারেন রাজনীতিকরা। কিন্তু মিসাইলের মজুত ভাণ্ডারের তথ্যে তেমন চালাকি চলে না। যে বাস্তবতা এখন অস্বীকার করা একেবারেই অসম্ভব তা হল, ইরানের ওপর হামলা চালাতে যে সব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে আমেরিকা সেগুলির মজুত ভাণ্ডার বিপজ্জনক ভাবে কমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি একেবারে নতুন ভাষায় কথা বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প: ইরানের সঙ্গে আমরা এখন ‘অত চড়া মেজাজে’ নেই। বলছি না ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহত্তম আক্রমণ’, বলছি না চুক্তি করার জন্য এটাই তেহরানের ‘শেষ সুযোগ’। বরং বলছি, আমরা একটু হাল্কা দিচ্ছি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন নরম সুরে কথা বলল।
সংযত হওয়ার গুণটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ আবিষ্কার করেনি। পেন্টাগনের মজুত ভাণ্ডারই হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত ঠিক করে দিচ্ছে। এই যে স্ট্র্যাটেজিক পিছুটান সেটা আগাম হিসাবনিকাশের পরিণতি নয়। আসলে যখন গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসতে থাকে, তখন নীতি আপনা থেকেই নরম হয়ে আসে।
রবিবার সিএনএন জানিয়েছে যে, ‘পেন্টাগন মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পকে বলেছে উৎপাদনের গতি বাড়াতে, কারণ ইরান যুদ্ধের ফলে মিসাইলের মজুত তলানিতে ঠেকেছে।’ গত কয়েকদিন ধরে আরও নিখুঁত তথ্য জানা যাচ্ছে। সারা বিশ্বে আমেরিকার প্যাট্রিয়ট মিসাইলের মজুত ভাণ্ডার ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় ২২০০। এখন সেই সংখ্যা ৮২৭-এরও কম। থাড মিসাইলের মজুত ৪৫২ থেকে নেমে এসেছে ২৭৮-তে। রয়টার্স জানাচ্ছে, দীর্ঘ পাল্লার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার মিসাইল ‘প্রায় সবকটিই’ খরচ হয়ে গিয়েছে।
জানা যাচ্ছে, এই চাপের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বেশ কিছু মিসাইলকে তাদের প্রতিরক্ষার ঢাল ভেদ করে আছড়ে পড়তে দিচ্ছে। কারণ সেগুলোর আটকানোর মতো অস্ত্র তাদের হাতে নেই। যুদ্ধ যখন মাঝপথে— তখন বিরোধীপক্ষের ইচ্ছাশক্তির মনের জোর মোটেই ভেঙে পড়ছে না— বরং আমেরিকার নিজের গোলাবারুদের ভাণ্ডার কমে এসেছে।
মিসাইলের উৎপাদন বাড়ানো কথাটা শুনতে খুবই ভাল। বিষয়টা শুনতে যত সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। প্যাট্রিয়ট মিসাইলের বরাত দেওয়া থেকে ডেলিভারি— পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে ২৪ মাস। টোমাহকের ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় ৩ বছর। এগুলো এমন প্রোডাক্ট যেগুলোর উৎপাদন, অসামরিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হঠাৎ করে বাড়িয়ে তোলা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, ইঞ্জিন, ইলেকট্রনিকস, সব শেষে শংসাপত্র পাওয়া— এগুলোতে অনেক সময় লাগে।
আসলে মিসাইলের মজুত কমে আসার পিছনে রয়েছে আরও একটা গভীরতর সমস্যা— সংশ্লিষ্ট দেশটার শিল্প ভিত্তি স্পষ্টতই চাপের মধ্যে পড়েছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি একটি ভিডিও খুব ছড়িয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছে মার্কিন নৌবহরের আর্লেই বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার তাদের মূল বন্দুক থেকে গোলা ছুড়ছে। দেখা গেল ফায়ারিংয়ের পরেই ওই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যারেলটা ফেটে চৌচির হয়ে যায় এবং সোজা গিয়ে সমুদ্রের জলে আছড়ে পড়ে। আমেরিকার সামরিক বাহিনীতে একটা রেওয়াজ রয়েছে। তাকে বলা হয় ‘ক্যানিবালাইজেসন’। এটা সাধারণত করা হয় বিমানের রক্ষণাবেক্ষণে। সমস্যা রয়েছে এমন বিমান থেকে কোনও যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে সেটা দিয়ে আরেকটা খারাপ বিমান চালু করা হয়। এ ধরনের জিনিস সাধারণত পরিবারেও করা হয়ে থাকে। যদি একটা পরিবারে হাতে গোনা প্যান্ট থাকে, তাহলে যারা সেদিন বাইরে বেরোবে তারাই প্যান্টগুলো পরতে পারবে। বাকিরা কী পরবে সেটা বাকিদের মাথাব্যথা। তার মানে ওই ডেস্ট্রয়ারের আগ্নেয়াস্ত্রে অন্য কোনও অস্ত্রের ব্যারেল জুড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তাতেই সেটা ফেটে যায়।
এই ছবি থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বেহাল দশাই স্পষ্ট হচ্ছে। অথচ একদা এই বাহিনীর গর্ব ছিল যে তারা সমরাস্ত্র উৎপাদনে এমন শিল্প পরিকাঠামো কাজে লাগাতে পারে যার ধারেকাছে পৌঁছতে পারবে না অন্যরা। আর এখন এই বাহিনীর সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়েছে, সমরাস্ত্র পুরনো হয়ে গিয়েছে এবং স্পেয়ার পার্টস অমিল হচ্ছে।
এরপর আরও আছে। সেগুলো হল গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। প্রতিটি উন্নত অস্ত্র তৈরি করতে আবশ্যিক হল রেয়ার আর্থ ও টাংস্টেন। এখন শিল্পের বর্জ্য ও ভাঙাচোরা মালপত্র থেকে টাংস্টেন উদ্ধার করার চেষ্টা করছে আমেরিকা। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে জাপানের কথা, যখন তারা ফেলে দেওয়া এয়ার কন্ডিশনার থেকে রেয়ার আর্থ উদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা করত। যখন কোনও সুপারপাওয়ার তাদের বর্জ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ধাতু পাওয়ার চেষ্টা করে, তখন সরবরাহ–শৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগটা আর বিমূর্ত বিষয় থাকে না— হয়ে ওঠে এমন বাস্তবতা যা সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রভাব ফেলে।
গোলাবরুদের স্বল্পতা স্রেফ ওপরের ব্যাপার। আসলে যা কম পড়েছে তা হল, এই আমেরিকা তার সামরিক শক্তিকে সংহত করার ক্ষমতা ক্রমশ হারাচ্ছে।
অনেক দিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে বহু অঞ্চলে তাদের সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে আসছে। সেকারণেই এখন তারা চড়া দাম দিয়ে শিখছে যে অস্ত্রের স্ট্র্যাটেজিক ভাণ্ডার যত্ন করে রক্ষা করতে হয় এবং তা বাড়িয়ে তুলতে হয়। এটা এমন একটা ভাণ্ডার যেখান থেকে ইচ্ছেমতো অস্ত্র খরচ করা যায় না।
এখন বহু হিসাবনিকাশে সম্ভাব্য আরেকটা ঝুঁকির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে শক্তি ক্ষয়কারী দুটো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে— একটা ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে। এবং দুটোতেই জয়ের কোনও লক্ষণ নেই। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে মনে রাখা হতে পারে, সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি শক্তিক্ষয়কারী স্ট্র্যাটেজিক ঘটনা হিসাবে। এবং এর পরিণাম ইরাক যুদ্ধের নেতিবাচক পরিণামকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।
অতএব শিক্ষাটা স্পষ্ট। আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বেশি বিপদ হয়ে উঠতে পারে প্রতিযোগী শক্তি নয়। যদি খেয়ালখুশি মতো নিজের শক্তিক্ষয় করাটা আপনার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত তা তলানিতে এসে ঠেকে, তাহলে সেটাই আধিপত্যবাদী শক্তির বিপদ ঘনিয়ে তুলতে পারে।
ঋণ: দ্য গ্লোবাল টাইমস
প্রকাশের তারিখ: ২৩-আগস্ট-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
