সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মাইক্রোফিনান্স, বাংলার বুকে এক চলমান মৃত্যু ফাঁদ
মধুসূদন চ্যাটার্জি
২০২৫ সালের এপ্রিলে রাজ্যস্তরের ব্যাঙ্কারস কমিটির একটি সভায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বেআব্রু হয়েছে বাংলার ভয়াবহ চিত্র। এই সভায় রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ একাধিক আধিকারিক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি, এবং নার্বাডের বরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা হাজির ছিলেন। সেই সভা থেকে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর বাংলার গ্রামীন জনগণ ব্যাংকগুলিতে আমানত করে করেছিল ১৭,৫৭৬,২১ কোটি টাকা। মানে গড়ে মাসে মাথাপিছু ২৭৯ টাকা জমা। অথচ, এই সময়ে ব্যাংকগুলি ঋণ দিয়েছে মাত্র ১৩,৩৪৬ কোটি টাকা। মানে মাথাপিছু গড়ে ১৯ টাকা!

স্যার আসছে, কোথায় যাব? যাবার জায়গা নেই
দিনটা ছিল ২০২৫-এর ১২ ডিসেম্বর। ঘড়িতে তখন ঠিক সকাল ১০টা। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে বাংলার জঙ্গলমহল এলাকায়। তাপমাত্রা তখন ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রোদ উঠলেও তেমন গায়ে লাগছে না। এধার ওধারে ধান কাটা চলছে। বেশিরভাগই মেশিনে কাটা হচ্ছে। খেতমজুরদের হাতে কাজ নেই। খেতমজুরদের একটা বড়ো অংশই মহিলা। এদিকে চন্দ্রবোড়া সাপের ভয়ানক উপদ্রব। ফলে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাস্তে হাতে কাজ করতে অনেকেই আসতে চাইছেন না। বেশিরভাগ কৃষকই তাই তাঁর জমিতে মেশিন নামিয়ে ধানটা কাটিয়ে নিতে চাইছেন। মেশিনের খরচ একটু বেশি পড়লেও কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আর বাড়তি সুবিধা হল মেশিনের মালিককে ধান বিক্রির পর টাকা দিলেও চলবে। খেতমজুরদের দিয়ে কাটালে একে সময় লাগবে, আবার টাকাটাও সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে। কৃষকরা টাকা পাবেন কোথায়? তাই মেশিনের দিকেই ঝুঁকছেন বেশিরভাগ কৃষক। ফলে খেতমজুরের কাস্তে ঘরেই থেকে যাচ্ছে। খেতমজুররা যে অন্য কোনোও কাজ করবেন তারও উপায় নেই। কারণ গ্রাম এলাকায় একমাত্র কাজই তো ছিল রেগার কাজ। সেটাও তো চারবছর ধরে বাংলায় বন্ধ।
বাঁচতে হবে তো গ্রামের গরিব খেতমজুরদের! কীভাবে বাঁচবেন তাঁরা? বাঁচার তাগিদে বাংলার খেতমজুরদের একটা বড়ো অংশ যে ফাঁদে জড়িয়ে গিয়েছেন, সেই ফাঁদ থেকে তাঁদের মুক্তি কোথায়? সেই দৃশ্যই ধরা পড়ল ওই দিন বাঁকুড়ার রানীবাঁধের রাওতোড়া অঞ্চলের কাওয়াডাঙ্গা গ্রামে। সকাল ১০টাতেই একটি মোটরসাইকেল এসে দাঁড়াল গ্রামের মাঝে তেঁতুলতলায়। মোটর সাইকেল থেকে নামলেন বছর-তিরিশের এক যুবক। পিঠে ব্যাগ। মুখ থমথম করছে। কোনো কথা না-বলে মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড করে গটগট করে সে এগিয়ে গেল একটি বাড়ির দিকে। বাড়ির ভেতরে থেকে বেরিয়ে এলেন এক গৃহবধূ। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। রক্তশূন্য মুখ। দুয়ারে বসে বৃদ্ধা। গৃহবধূর সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে একটি শিশু। ওই যুবক ঘরের মধ্যে সেধিয়ে ঢুকেই সরাসরি হুমকি, ‘গত তিন সপ্তাহ তুমি কিস্তির টাকা দাওনি। আজ টাকা না-নিয়ে উঠব না, ঘটি, বাটি, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, শুয়োর বাড়িতে যা আছে তা বিক্রি করে আমাকে টাকা দাও’। বাচ্চাকে দেখিয়ে লক্ষ্মী সরেন (নাম পরিবর্তীত) নামে ওই গৃহবধূ জানান, ওর বাবা এবারও টাকা পাঠায়নি। আর বাড়িতে আমার শাশুড়ির জ্বর। ঝিলিমিলি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, ডাক্তাররা যা ওষুধ লিখে দিয়েছে তা কিনতে পারিনি। বাড়িতে ছাগল, মুরগি, শুয়োর কিছুই নেই। বচনের বাবা টাকা পাঠালেই আপনাকে কিস্তির টাকা দিয়ে দেব।’ শুনে আশ্বস্ত হওয়ার কোনো অভিব্যক্তি ফুটে উঠল না যুবকটির মুখে। তার একটাই কথা, ‘আজ টাকা চাই, না-হলে আমি উঠব না।’ কেউ মুখে কোনো কথা বলছে না। চরম অপমান, লাঞ্ছনায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন ওই গৃহবধূ। তাঁর শাশুড়ি বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। সাঁওতালি ভাষায় বৌমাকে বললেন, আর কটা দিন সময় চাও। বৌমা নীরব। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর যুবকটি চোখ রাঙিয়ে বলে, ‘টাকা নিয়ে এসো যেখান থেকে পার। আর শোন, টাকা জোগাড় করতে না-পারলে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়। মরে গেলে তোমার টাকা মুকুব হয়ে যাবে, আমিও নিস্তার পাব।’ এই কথা শোনার পরই কেঁপে উঠলেন লক্ষ্মী সরেন। ছেলেকে বুকে তুলে নিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আমি মরে গেলে এর কী হবে স্যার! কে দেখবে, এমন কথা বলবেন না। টাকা আমি যখন নিয়েছি, ঠিক মিটিয়ে দেব। এভাবে আর কতদিন বাঁচব?’
কে এই স্যার?
সকালের দিকেই পেশাগত কারণে গ্রামে গিয়েই দেখা হয়েছিল লক্ষ্মী সরেনের সঙ্গে। এক সময় রানীবাঁধ বেথোয়ালা গ্রামে পড়াশোনা করতেন। খেলাধূলায় বেশ ভালো ছিলেন। হাই জাম্পে বরাবরই প্রথম হতেন। জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যেও গিয়েছিলেন। কম বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। একটি ছেলে তার। স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক। বেঙ্গালুরুতে কাজ করতে গিয়েছেন। সেখান থেকে টাকা পাঠান পরিবারে। খবর এসেছে যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সেখানে। কয়েকদিন কাজ করতে পারবে না। রাজমিস্ত্রির জোগানদারের কাজ করেন তিনি। মালিক অগ্রিম কোনো টাকা দিতে রাজি নয়, তাই কয়েক সপ্তাহ বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেননি তাঁর স্বামী।
বারে বারে পঞ্চায়েতকে আর্জি জানানোর পরেও লক্ষ্মী সরেনদের সরকারি আবাসনের কোনো বাড়ি হয়নি। জরাজীর্ণ বাড়িতেই থাকেন সবাই। গত বর্ষায় বাড়ির চালা ভেঙে পড়েছে। শাশুড়ি, ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাবেন? তাই তাঁকে ঋণ করতে হয়েছিল। সেই ঋণ হল মাইক্রোফিনান্স কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। তিনি ওই টাকায় বাড়ির চালা করেছিলেন অ্যাসবেসটাস দিয়ে। লক্ষ্মীর নামে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া আছে। তিনি হাতে পেয়েছেন ২৩ হাজার টাকা। বাকি দু’হাজার টাকা নাকি তাঁর নামে বীমা করা আছে। বীমার কাগজ তিনি কোনোদিন দেখেননি। তাঁকে খালি বলা হয়েছিল মাঝপথে মরে গেলে তোমাকে কোথায় পাব? তাই এই টাকাটা কেটে রাখা হচ্ছে। তাঁকে এই ২৩ হাজার টাকার জন্য প্রতি সপ্তাহে ৪০০ টাকা কিস্তি দিতে হচ্ছে। ৯৬ সপ্তাহ দিতে হবে। দুবছরে ৩৮,৪০০ টাকা দিতে হবে।
বন্ধন ফাইন্যানসিয়াল সার্ভিসের লিমিটেড থেকে তিনি ঋণ নিয়েছেন। কোনোদিন ব্যাংকে যাননি। টাকা লেনদেন এই ‘স্যার’-ই করেন। নীলমাধব পাণ্ডে পরিচালিত কাডভি হাওয়া (২০১৭) সিনেমায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল আদায় আদায়কারী এক যুবকের চরিত্র। যাকে গ্রামের মানুষ ‘যমদূত’ বলে ডাকত। কারণ তাঁর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই। বর্তমানে বাংলার বুকে কাডভি হাওয়া-র ওই যমদূত স্যার নামে পরিচিত। স্যারের নাম, বাড়ি, ঠিকানা কোনো ঋণগ্রহীতাই জানেন না। কিন্তু তাঁরা জানেন ঘড়ির কাঁটা, আর ক্যালেন্ডারের তারিখ বদলাতে পারে, ওলট-পালট হলেও হতে পারে, কিন্তু গ্রামে স্যারের আসার দিন, সময় একেবারে নির্দিষ্ট সময় মিলিয়ে। লক্ষ্মী আগেই জানিয়েছিলেন দেখে নেবেন, ঠিক সকাল ১০ টায় স্যার আসবেন। তিন সপ্তাহ তিনি টাকা না-পেয়ে ঘুরে গিয়েছেন, আজ টাকা দিতেই হবে, না-হলে নিস্তার নেই। কোথাও লুকোবার জায়গাও নেই। দেখা গেল ঠিক ওই নিদিষ্ট সময়েই ওই স্যার এসে হাজির।
সেই ‘স্যার’-এর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। জিজ্ঞাসা করলাম, কেন এত চাপ দিচ্ছেন? তাঁর চোখ মুখে কেমন পরিবর্তন দেখা গেল। গলা নরম করে জানান, কী করব বলুন, আমাদের চাকরিটাও তো বাঁচাতে হবে। সে ছাতনার আইটিআই কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছে। বহু জায়গায় চাকরির চেষ্টা করেছে। চাকরি মেলেনি। বাবার একটা কামারশাল ছিল। সেটাও উঠে গিয়েছে। বাড়িতে জমি নেই। এক বিধবা পিসিমা আছেন। বাড়িতে দুই বোন আছে। ৬জনের সংসার চলে তার আয়ের উপর। যুবকটি জানায়, অভাব কী, আমি জানি। আমি জানি ওই মহিলা মিথ্যা কথা বলছে না। আমাদের এলাকা থেকেই আমার বহু বন্ধু পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে বাইরে গিয়েছে। কী অবস্থায় ওখানে দিন কাটায় জানি। আর গেলেই কাজ এখন মেলে না। কারণ পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। এই বাংলা থেকেই এখন শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। তাই তাঁদের মজুরিও এখন কম দেওয়া হয়। এসব জানি, কিন্তু আমি কিস্তির টাকা জমা না-করাতে পারলে, আমার বেতনও যে আটকে যাবে। আমার মা, বাবা, পরিবারের লোকজনের অস্তিত্বের সংকট দেখা দেবে। তাই বাধ্য হয়েই আমাকে করতে হয়। আবার আমি যদি না-করি তাহলে ভাড়া করা লোক দিয়ে যাদের ‘বাউন্সার’ বলা হয়, তাদের নিয়োগ করবে। তারা তো আরও ভয়ানক। এভাবেই তো চলছে কোটি কোটি টাকার কারবার। মানুষ মরল কি বাঁচল তাতে কার কী এসে যায় বলুন?
দৃশ্য ২
বাঁকুড়া শহরের একটি সংখ্যালঘু-প্রধান এলাকায়। এক বুধবার সকালে দেখা গেল মহিলারা সব উৎকণ্ঠা নিয়ে রাস্তার কলে জল নিচ্ছেন। কেন এত উৎকণ্ঠা জানতে চাওয়া হলে সামিন বিবি (নাম পরিবর্তীত) জানান, আজ সকাল সাড়ে দশটায় স্যার আসবেন। তাই কলে এত লাইন। কিস্তির টাকা মেটাতে হবে। না-হলে রেহাই নেই। কিন্তু সাড়ে দশটার পরেও স্যারকে দেখা গেল না। কেন? এক মহিলা জানান, আপনি চলে যান এখান থেকে, কোনো সাংবাদিক থাকলে স্যার আসবে না। এরকম তো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এটাই ঘটনা। মাইক্রোফিনান্সের আদায়কারীরা সামনে আসতে চায় না। সামিন বিবি, মমতাজ বেগম (নাম পরিবর্তীত) জানান, স্যার এসেছেন ঠিক সময়ই। রাস্তার ধারে অপেক্ষা করছেন, কারণ কোনো সাংবাদিকের মুখোমুখি হতে চান এরা। কিছুক্ষণ পর সেই স্যার এলেন। কোথায় তাঁর বাড়ি জানাতে প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে জানান, তাঁর বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামে। বন্ধন ব্যাংকের সঙ্গে তিনি যুক্ত। তাঁর বক্তব্য, এখানে আদায় ভালো হয়। মহিলারা ঋণ নিয়ে উপকৃত হয়েছেন। কিন্তু ঋণের সুদ কত? তিনি সরাসরিই জানান, কোনো কিছু বন্ধক না-রেখে যখন ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তখন তো সুদ একটু বেশি হবেই। ২৫ শতাংশ সুদ লাগে।
কিন্তু ঘটনা হল বাস্তবে আরও বেশি। যেমন সামিন বিবি জানান, তাঁর স্বামী ইলেকট্রিক সরঞ্জাম বিক্রি করে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ইলেকট্রিকের বিভিন্ন কাজ করেন। তাঁর জিনিসপত্র কেনার জন্য তিনি ১ লক্ষ টাকা বন্ধন মাইক্রোফিন্সাস থেকে ঋণ নিয়েছেন। হাতে পেয়েছেন ৯৫ হাজার, ৫হাজার টাকা বীমা কেটেছে। প্রতি সপ্তাহে ১,৫০০ করে ৯৬ সপ্তাহ তাকে মেটাতে হবে। দিতে হবে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা। কত সুদ তিনি জানেন না। এই এলাকারই আর একজন মহিলা জানান, তিনি কাঁচের চুড়ির ব্যবসা করেন। কোনো ব্যাংক তাঁকে ঋণ দেবে না, তাই অত্যাধিক চড়া সুদে এখান থেকে টাকা নিতে হয়েছে। ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে। অন্যের কাছ থেকে টোটো নিয়ে চালায়। এভাবে কিস্তির টাকা শোধ করছি। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান, বাঁকুড়ার লালবাজারের বাসিন্দা দুলালী বাউরি। তিনি ইন্ডাসল্যান্ড মাইক্রেফিনান্স থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। তাঁকে প্রতি সপ্তাহে ১,৪৭০ টাকা করে কিস্তি মেটাতে হয়। তাঁকে ৮০ হাজার টাকার জন্য ১,৪১,১২০ টাকা দিতে হবে দুমাসে। তাঁর ছেলে মুটিয়া শ্রমিকের কাজ করেন। বৃদ্ধা বয়সেও দুলালীকে তিনটি পরিবারে পরিচারিকার কাজ করতে হয়। কারণ সপ্তাহের শেষে তো কিস্তির টাকা গুনতে হবে। তিনি এই টাকায় ঘর ঠিক করেছিলেন এবং সংসারের জন্য কিছু জিনিস কিনেছেন। এই এলাকাতেই ঋণ নিয়ে শোধ করতে না-পেরে মাইক্রোফিনান্স কোম্পানির বাউন্সারদের অত্যাচারে এলাকা ছাড়তে হয়েছে বহু মহিলাকে।
এই ঘটনাগুলি খালি বাঁকুড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ সারা বাংলা জুড়ে এই মাইক্রোফিনান্স থাবা বসিয়েছে। এর ফাঁদে পড়ে ছটফট করছেন কয়েক লাখ গরিব, হতদরিদ্র প্রান্তিক মহিলা। কারণ এরা মহিলাদের ছাড়া ঋণ দেয় না। কিন্তু ঘটনা হল মাইক্রোফিনান্সের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখন তা কোনো জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে?
মাইক্রোফিনান্স কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি হয়েছিল
মাইক্রোফিনান্স হল একটি আইনগত আর্থিক সংস্থা। এটি বাংলায় তৈরি হয়েছিল গত শতকের নয়ের দশকের শেষে। এর প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল গ্রাম, শহর এলাকার গরিব, প্রান্তিক মানুষজনকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দেওয়া, তার থেকেই তাঁদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ানো। সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নানা রকমের আইনি জটিলতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষজন ব্যাংক থেকে ঋণ পান না। তাঁদের একটা বড়ো অংশই ব্যাংকের দরজায় গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পান না। তাই মাইক্রোফিনান্স ব্যবস্থা এই সব প্রান্তিক মানুষজনের সঙ্গে ব্যাংকের একটা সেতু বন্ধন ঘটিয়েছিল। ঘটনা হল এই সময় বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে বাংলার প্রতিটি প্রান্তে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। পুরুষ ও মহিলাদের উভয় গোষ্ঠীই ছিল। সমবায় ব্যাংক, সরকার তাঁদের বিভিন্ন প্রকল্প দিত। সেই প্রকল্প কী করে বাস্তববায়িত হতে পারে তার জন্য হাতে কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হত। বলা দরকার, যে রেগা প্রকল্প চালু হওয়ার পর মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী দেশের মধ্যে প্রথম ২০০৭ সালে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহল এলাকায় রানীবাঁধের রাজাকাটা অঞ্চলের দেউলি গ্রামে জলাধার তৈরি করে। যা দেশের মধ্যে একটা দৃষ্টান্ত হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছিল হিড়বাঁধের আম-বাগানকে নিয়ে। সেখানে মহিলা গোষ্ঠীর তৈরি হিড়বাঁধের ঝরিয়াকোচা গ্রামের আম-বাগান পর্যবেক্ষণ করে দেশের গ্রামোন্নয় দপ্তর প্রথম পুরস্কার দেয় এই মহিলা গোষ্ঠীকে। তখন মাইক্রোফিনান্স সেভাবে গ্রামবাংলায় ঢোকেনি। মহিলারা আক্ষরিক অর্থেই স্বনির্ভর হতে শুরু করেন। মাত্র ৩ শতাংশ সুদে তাঁরা ঋণ পেতেন। সেই ঋণের টাকা অন্যভাবে খরচ না-করে, যাতে নির্দিষ্ট প্রকল্পে সেই টাকা বিনিযোগ করে সেখান থেকে রোজগার করতে পারেন, সে-বিষয়ে সরকারের নজর ছিল। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তৈরি করা জিনিসপত্র যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হতে তার ব্যবস্থাও সরকার করত। যাঁরা কোনোদিন গ্রামের বাইরে পা রাখেননি, সেই সব মহিলারাও দিল্লি, পন্ডিচেরি, চন্ডিগঢ়, কলকাতার মেলায় তাঁদের তৈরি জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছেন। পাশে থেকেছে সেই সময়ের বাম সরকার।
তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ২০০০ সালের প্রথম দিকে ভিলেজ ফাইনানসিয়াল সার্ভিস (ভিএফএস) প্রথম মাইক্রোফিনান্সের কাজ শুরু করে। এর পরে আসে বন্ধন। পরে বন্ধন ব্যাংকে রুপান্তরিত হয়। এই বন্ধন-ই হল বাংলার বাজারে মাইক্রোফিনান্সের সবচেয়ে বড়ো ক্ষেত্র।
সরকারি উদ্যোগে যে সমস্ত স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি তৈরি হয়েছিল ২০১১ সালে, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই সেগুলি কার্যত থমকে যায়। আগে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে সপ্তাহে একদিন করে এলাকার এসএইচজি-দের (সেলফ হেলফ গ্রুপ) কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা হত। ২০১১ সালের পর সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কাগজে কলমে এসএইচজি গ্রুপ থাকলেও, বাস্তবে তার অস্তিত্ব ক্ষীন। সরকার থেকে ঋণ হিসাবে তাঁদের টাকাও দেওয়া হয়। কিন্তু সেই টাকায় মহিলারা কী জিনিস বানিয়ে বাজারে ছাড়ছেন তা দেখার লোকজন নেই। আবার চলতি সময়ে এই সরকারি এসএইচজি-র টাকা নিয়ে রাজ্যে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর সহ বিভিন্ন জেলায় দুর্নীতির ঘটনাও ঘটেছে। শাসকদলের লোকজন এগুলি চালায় বলে অভিযোগ। গ্রেপ্তারও হয়েছে বেশ কয়েকজন।
এরকম একটা পরিবেশের মাঝেই বাড়তে শুরু করেছে মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলি।
বর্তমান চিত্র
২০২৫ সালের মার্চ মাসে রাজ্যে মাইক্রোফিনান্স-এর উপর সমীক্ষায় ওঠে আসা তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ২৩ লক্ষ ৮০ হাজার মহিলা মাইক্রোফিনান্স থেকে ঋণ নিয়েছেন। ঋণ বিলি করা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। সব চেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদে ৩,৯৯১ কোটি, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩,০৯০ কোটি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২,০৯৬ কোটি টাকা। কম ঋণ দেওয়া হয়েছে কালিম্পংয়ে ৬৩ কোটি, ঝাড়গ্রামে ২৮৭ কোটি ও পুরুলিয়াতে ৪৩৫ কোটি টাকা। ওই তথ্য অনুয়ায়ি রাজ্যব্যাপী ১.৪৭ শতাংশ মানুষ মাইক্রোফিনান্স থেকে ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে শতাংশের হারে বেশি হল ঝাড়গ্রামে ৮.২২ শতাংশ, পুরুলিয়ায় ২.৭০ শতাংশ ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ২.৪৪ শতাংশ। শতাংশের হিসাবে কম মানুষ মাইক্রোফিনান্স থেকে ঋণ নিয়েছেন কালিম্পংয়ে ০.৫৫ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুরে ০.৫৬ শতাংশ, ও কোচবিহার জেলায় ০.৮০ শতাংশ। মাইক্রেফিনান্সের ঋণ খেলাপি সবচেয়ে বেশি বীরভূমে ২৩.৭১ কোটি, তার পর বাঁকুড়ায় ১৫.৮১ কোটি ও দক্ষিণ দিনাজপুরে ১৫.৬৯ কোটি টাকা।
বর্তমানে বাংলায় ২৬টি মাইক্রোফিনান্স কোম্পানি কাজ করছে। এগুলি হল: বন্ধন ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (বৃহত্তম ঋণদাতা), ভিএফএস ক্যাপিটাল লিমিটেড, সত্য মাইক্রো ক্যাপিটাল লিমিটেড, আশীর্বাদ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্ডাসল্যান্ড ব্যাংক মাইক্রোফিনান্স, মুথুট মাইক্রোফিনান্স, ভারত ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন লিমিটেড, আশা মাইক্রোফাইন্যান্স, গ্রামীণ শক্তি মাইক্রোফিনান্স সার্ভিসেস লিমিটেড।
গ্রামবাংলার অর্থনৈতিক চিত্র
২০২৫ সালের এপ্রিলে রাজ্যস্তরের ব্যাঙ্কারস কমিটির একটি সভায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বেআব্রু হয়েছে বাংলার ভয়াবহ চিত্র। এই সভায় রাজ্য সরকারের উচ্চপদস্থ একাধিক আধিকারিক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি, এবং নার্বাডের বরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা হাজির ছিলেন। সেই সভা থেকে জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর বাংলার গ্রামীন জনগণ ব্যাংকগুলিতে আমানত করে করেছিল ১৭,৫৭৬,২১ কোটি টাকা। মানে গড়ে মাসে মাথাপিছু ২৭৯ টাকা জমা। অথচ, এই সময়ে ব্যাংকগুলি ঋণ দিয়েছে মাত্র ১৩,৩৪৬ কোটি টাকা। মানে মাথাপিছু গড়ে ১৯ টাকা!
কলকাতায় কর্মরত স্টেট ব্যাংকের এক আধিকারিক নাম না-প্রকাশ করার শর্তে জানান, ব্যাংকগুলি ছোটো ব্যবসায়ী, নতুন উদ্যোগীকে মোটেই ঋণ দিতে চায় না। কারণ তাঁদের কাছ থেকে ঋণ শোধের গ্যারিন্টি থাকে না। যদিও বাস্তবে এই তথ্য মেলে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা টাকা লোপাট করে দিয়েছেন, তাঁরা সবাই কোটি-কোটি টাকার মালিক। সরকারের টাকা লোপাট করে দিব্যি একটা স্ট্যাটাস তৈরি করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। সেই ব্যাংক অফিসার জানান, ব্যাংক ঋণ দেয় তাঁদেরকেই যাঁরা মাস মাইনে পান, সরকারি স্তর থেকে এবং যাঁদের ইনকাম ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট থাকে। গ্রাম, শহরের গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ এসব পাবেন কোথায়? তাই তাঁরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দরজায় আসতে পারেন না। এখন আবার সমস্ত ব্যাংকই রিয়েল এস্টেটের দিকে ঝুঁকেছে। যেখানেই ফ্ল্যাট বাড়ি হচ্ছে, সেখানে প্রায় সমস্ত ব্যাংকেরই পোষ্টার ঝুলতে দেখা যায়। কে কত সুবিধা দেবে, ঋণের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতাও চলছে। বাংলার বেকার যুবক, যুবতি এই পোষ্টার দেখে। কিন্তু তাঁদের সাহস নেই ব্যাংকে গিয়ে কোনো উদ্যোগের প্রস্তাব জমা দিয়ে ঋণ চাওয়া। কারণ তাঁদের না-আছে কোনো সম্পত্তি, স্থায়ী আমানত, না-আছে গ্যারেন্টার।
গ্রামীন এলাকার মানুষজনের আর্থিক সহযোগিতার জন্যই তৈরি হয়েছিল গ্রামীন ব্যাংকগুলি ১৯৭৫-এ। কিন্তু নয়ের দশকে এম. নরসিংহম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আমাদের দেশে গ্রামীন ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হল নির্বিচারে। এই সুপারিশ কার্যকর হওয়ার আগে সারা দেশে গ্রামীন ব্যাংক ছিল ১৯৬টি। এখন তার সংখ্যা মাত্র ৪৩। বাংলায় ছিল ৯টি, এখন ৩টি। গ্রামীন ব্যাংকগুলিও এখন কর্পোরেটের মতো আচরণ করছে। কৃষকদের ঋণ দেওয়া তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। কৃষক বা এলাকার প্রান্তিক ব্যবসায়ী যত টাকা ঋণ চান, সেই পরিমাণ টাকা তাঁকে স্থায়ী আমানত হিসাবে তাঁকে রাখতে হবে। জানিয়েছেন, সদ্য অবসর প্রাপ্ত বঙ্গীয় গ্রামীন ব্যাংকের এক আধিকারিক।
কার্যত এই অবস্থার জন্যই মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলির বাড়বাড়ন্ত ব্যাপক হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যাংকের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা। আর বর্তমান এনডিএ সরকারও ঢালাও ভাবে মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলিকে লাইসেন্স দিয়েছে। আশঙ্কা যে এই কোম্পানিগুলির কাজ কি কেন্দ্রীয় সংশ্লিষ্ট স্তর থেকে নজর রাখা হয়?
অন্য একটি ঘটনা হল, রাজ্যে যখন রেগার কাজ ছিল তখন মহিলাদের একটা অংশ এই কাজ করে কিছুটা রোজগার করতেন। গত চারবছর ধরে বাংলায় রেগার কাজ বন্ধ। ২০২১-২২ সালে, যখন বন্ধ হয় এই কাজ তখন বাংলায় ৫১,১৩,৩৩৬ জন মহিলা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই মহিলারা আনুমানিক ১৫ হাজার টাকা বছরে আয় করতেন এই রেগার কাজ থেকে। সংসার চালাতে তা অনেকটাই সহায়ক ছিল। এই এক নিদারুন টালমাটাল আর্থিক অবস্থায় মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলির কাছে একে বারে ফাঁকা মাঠ। যে যেমন খুশি খেলতে পারে। সেটাই হচ্ছে বাংলায়।
কীভাবে ব্যবসা চালাচ্ছে মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলি?
মূলত গরিব, প্রান্তিক মহিলাদের নিয়েই এদের কারবার। বিবাহিত মহিলা ছাড়া মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলি কোনো ঋণ দেয় না। দালাল মারফত প্রথমে নির্দিষ্ট একটি এলাকায় এরা প্রবেশ করে। সেই জায়গাগুলিতে, যেখানে মূলত গরিব, প্রান্তিক মানুষের বাস। যাঁদের রোজগার বলতে দিন-আনি দিন-খাই। আগে মহিলারা সরকারি বা সমবায় ব্যাংকের মাধ্যমে যে গোষ্ঠীগুলি করেছিল, সেগুলির অস্তিত্ব কার্যত ঢাকা পড়ে যাওয়ায় এই আর্থিকভাবে দুর্বল মহিলারা সহজেই দালালের খপ্পরে পড়েন। তৈরি করা হয় ১০জনকে নিয়ে একটি গ্রুপ। আধারকার্ড নিয়ে সদস্যদের পাশ বই খোলা হয়। প্রথমেই তাঁকে ২০হাজার টাকা দেওয়া হয়। ঋণ ২০হাজার টাকা উল্লেখ থাকলেও হাতে পান ১৮হাজার টাকা। সেই মহিলাকে বলা হয় বীমার জন্য ২হাজার টাকা কাটা হচ্ছে। বেশিরভাগ মহিলাই বীমা কী জানেন না। হাতে একসঙ্গে নগদ এতটা টাকা পাচ্ছেন, সেটা দেখে আর কোনো প্রশ্ন করেন না। কিন্তু সেই টাকা কোনো অফিসে গিয়ে তাঁকে নিতে হয় না। মাইক্রোফিনান্সে কাজ করা এজেন্ট এসে গ্রুপের বাকি মহিলাদের সাক্ষী রেখে টাকা দেন।
টাকা দেওয়ার সময় পরিষ্কারভাবে বলা হয়, সপ্তাহে একটা নির্দিষ্ট দিনে কিস্তির টাকা মেটাতে হবে। প্রথম থেকে ৯৬ সপ্তাহ ধরে সমান কিস্তির টাকা দিয়ে যেতে হবে। মূল এবং সুদ কত এসব কোথায় উল্লেখ থাকে না। আশা, বন্ধন মাইক্রোফিনান্সের একাধিক এজেন্ট জানান, মহিলাদের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা। কারণ তাঁরা কোথাও পালিয়ে যান না। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে টাকা চাইলে আত্মসম্মান বাঁচানের তাগিদে তাঁরা যেখান থেকে হোক টাকা জোগাড় করে কিস্তি মেটাবেনই। পুরুষ হলে সেটা হবে না।
মাইক্রোফিনান্স যে টাকা দেয় সেই টাকা দিয়ে কোনো প্রকল্প চালিয়ে মহিলাদের রোজগারের বাড়ানোর কোনো ক্ষেত্র কি কোম্পানিগুলি তৈরি করে দেয়? না। কোনো প্রকল্প কি তাঁরা তৈরি করে? না। এই টাকা নিয়ে মহিলারা কী করছে তা দেখতে যায় না ‘স্যার’রা। সপ্তাহান্তে কিস্তির টাকা পেলেই চলবে। আর কিস্তির টাকা দু-সপ্তাহ না-দিলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেই সদস্যার বাড়িতে এসে বসে থাকেন এজেন্ট। চলে গালিগালাজ। আনা হয় বাউন্সার। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল যদি কেউ এক-দু সপ্তাহ কিস্তির টাকা না-দিতে পারেন, তাহলে সেই গ্রুপের অন্যান্য মহিলাদের ডেকে এনে টাকা-না-মেটাতে-পারা মহিলার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চাপ দেওয়া হয়। বাকি মহিলাদের বলা হয় ‘যদি এই মহিলার কিস্তির টাকা তোমরা আদায় করে না-দাও, তাহলে তোমাদের টাকা দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হবে’। এই অবস্থায় বাকি মহিলারাও সেই মহিলাকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে।
নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার পারস্পরিক সম্পর্কগুলো। একাধিক মহিলা জানান, মাইক্রোফিন্সাসের কিস্তি মেটাতে আরও চড়া সুদে স্থানীয় মহাজনদেরদের কাছ থেকে টাকা নিতে হয়। যে টাকা মহিলারা পান, তার একটা বড়ো অংশই খরচ হয় সংসার চালাতে। তার মধ্যে আছে মেয়ের বিয়ে, মেয়ে সন্তান সম্ভাবনা হওয়ার পর তার শ্বশুরবাড়িতে সামাজিক রীতি পালন করার জন্য বাপের বাড়ি থেকে খরচ, এমনকি স্বামীর নিত্যদিনের নেশার টাকা জোগাড় করতেও মহিলারা মাইক্রোফিনান্সের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন।
ঘটনা হল পুরুষদের ঋণ না-দেওয়ার কারণে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা তাঁদের নামে ঋণ নিয়ে পুরুষদের হাতে তুলে দেন। যেমন আগে সমবায় সমিতিগুলি কৃষকদের যে ঋণ দিত, এখন প্রায় বন্ধ সেই ঋণ। তাই বাড়ির মহিলারা সেই ঋণ নিয়ে চাষের জন্য স্বামী, শ্বশুরের হাতে তুলে দিচ্ছেন। কৃষকের ফসল নষ্ট হলে বা বিক্রি করে লাভবান না-হলে তার প্রভাব পড়ে সেই মহিলার উপর। তিনি কিস্তির টাকা মেটাতে পারেন না। যা পূর্ব বর্ধমান, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া জেলায় ঘটেছে। অপমানজনক কথা সহ্য করতে না-পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বহু মহিলা। সরকার এসব জেনেও নিশ্চুপ।
বাঁকুড়া শহরের পশ্চিম প্রান্তের এক বস্তিতে বাস করা একজন মহিলা জানান, ‘আমি ২০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম, একবছর পর মাইক্রোফিনান্স কোম্পানি জানায়, তোমার অনেকটা টাকা শোধ হয়েছে, তুমি আবার ৩০ হাজার টাকা ঋণ পাবে। তোমাকে নিতে হবে। নিতে হল, হাতে পেলাম ২৬ হাজার। বীমায় কাটলো ৪ হাজার। আমার ঋণ গিয়ে দাঁড়াল আগের ১০ আর এখনকার ৩০, মোট ৪০ হাজার। এবার এই ৪০ হাজারের উপর কিস্তি লাগু করা হল, কিস্তির টাকা বেড়ে গেল’। একবার ফাঁদে পড়লে না-চাইলেও আপনাকে টাকা নিতে হবেই। এইভাবেই মহিলাদের ঋণের জালে জড়িয়ে দেওয়া হয় সুকৌশলে। এই মাইক্রোফিনান্সের টাকা দেওয়ার কারণে পরিবারগুলির মহিলাদের উপর ছেলে মেয়েদেরও লোভ লালসা বেড়ে যাচ্ছে। জানান মাইক্রোফিনান্সের একাধিক এজেন্ট। মায়ের হাতে টাকা আসার পরই ছেলে মেয়ের দাবি ওই টাকায় স্মার্ট ফোন কিনে দিতে হবে। আবার মোটর সাইকেলও কিনছে অনেকে। অসহায় মা দু ঘর ছেড়ে ৬-৭ ঘরে পরিচারিকার কাজ করে সেই কিস্তির টাকা মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এটাই আজ বাস্তব চিত্র বাংলার বুকে।
ঘটনা হল ২০২২ সালে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলিকে স্বাধীনতা দিয়েছিল যে তাদের ঋণের সুদ নির্ধারণ করতে পারে। এর স্বাধীনতা দেওয়ার মাঝেই সতর্ক করা হয়েছিল যে এমন সুদ করা চলবে না, যেখানে মানুষ শোষিত হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বহু মাইক্রোফিনান্স কোম্পানি এগুলি মানেনি, কত তারা সুদ নিচ্ছে তা গ্রাহককে জানানো হয় না। জানানো হয় না এজেন্টের নাম, বাড়ির ঠিকানা। কারণ স্থানীয় ব্লক এলাকার কোনো মানুষকে মাইক্রোফিনান্স কোম্পানিগুলি সেই জায়গায় এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ করে না। সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যাঁরা টাকা নিচ্ছে তাঁরা জানেন না, কোথায় তাঁদের ব্যাংক।
এই অমোঘ মৃত্যুফাঁদ থেকে কি বাংলার গরিব, খেটে খাওয়া মা-বোনদের মুক্তি নেই?
প্রকাশের তারিখ: ০৩-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
