Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পার্টি-সমাজ, রাজনৈতিক-সমাজ এবং ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি

অশোক ভট্টাচার্য
২০১১-তে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে পার্টি-সমাজের নামে একটি প্রতীকী কাঠামো বজায় থাকলেও, তার মূল ভিত্তি হলো দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জীর ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি ও তার ব্র্যান্ড। গ্রামাঞ্চলে যে কোনও সিদ্ধান্তে থাকে তাঁর অবাধ কর্তৃত্ব। এমনকি ধর্মীয় সম্প্রদায়, জাত বা বর্ণ, সমাজ বা অ-সরকারি সামাজিক সংস্থার ওপরও। পঞ্চায়েত নির্বাচনে কর্তৃত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রেও থাকে মুখ্যমন্ত্রীর এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতির মুখ্য ভূমিকা। আজ সরকার, প্রশাসন, পঞ্চায়েত ইত্যাদির সহায়তায় যে চরমতম দুর্নীতির সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে যে নন্-কর্পোরেট ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ মমতা ব্যানার্জির এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি।
Party-Society, Political-Society and Franchise Politics

একথা কোনওভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৭৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের একটানা তিনদশকের বেশি সময় (৩৪ বছর) নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকা শুধু সারা ভারতেই নয়, তামাম বিশ্বের কাছে অবশ্যই একটি নজীরবিহীন ঘটনা। কোনও রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র বা ধর্মীয় অনুশাসনকে ব্যবহার করে নয়। এই দীর্ঘকাল বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতায় থাকার দু’টি সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ভূমি সংস্কার ও ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ। ভূমি সংস্কার মানে সিলিং উর্ধের জমি, তা, চাষযোগ্য হতে পারে, আবার বাসযোগ্যও হতে পারে, গরিব ও ভূমিহীন বা বাস্তুহীন মানুষদের মধ্যে বিলি বণ্টন করা। গরিব গ্রামবাসীদের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিন স্তরেই প্রশাসন পরিচালনার অধিকার দেওয়া। গ্রামীণ স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসনের এই ব্যবস্থায় নিয়মিতভাবে প্রতি ৫ বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা, ১৯৭৮ সাল থেকে যা শুরু হয়েছিল, ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের আগে তা চালু করা হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গে সেইসময় ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছিলেন গ্রামের গরিব ও ভূমিহীন কৃষকরা। ভূমিহীন কৃষকদের শুধু সিলিং বহির্ভূত জমি বণ্টন করাই নয়, বহু গরিব ভূমিহীন চাষীরা উপকৃত হয়েছিলেন জোতদার বা বড় কৃষকদের জমিতে স্থায়ী বর্গা চাষের ব্যবস্থার মাধ্যমে। বামফ্রন্টের সময় লক্ষ লক্ষ বর্গাদারদের অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিয়ে, সেই অধিকার সরকারি ভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এই ভাবে বামফ্রন্টের সময় পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম এলাকায় কিছু ধনী বা উচ্চবর্ণের কৃষকদের হাতে জমির কেন্দ্রীভবনকে ভেঙে দিয়ে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও গরিব কৃষকদের কাছে সেই জমি পৌঁছে দিয়ে তাদের মধ্যে চাষের আগ্রহ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছিল। এইভাবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলিতে কৃষকদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক অসঙ্গতি অনেকটা রোধ করা সম্ভব হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামের গরিব কৃষকদের এক সময়ে ধনী জমির মালিক বা গ্রামীণ এলিট ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হতো। বামফ্রন্ট সরকারের সময় কৃষকদের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীন প্রশাসনে তাদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিয়ে তাদের সক্ষমতা, আত্মসম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এমনকি রাজনীতিতেও তৈরি হয়েছিল এক নতুন সমীকরণ। বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার আগে গ্রামের গরিব ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা কৃষকদের পুলিশ, প্রশাসন ও বড় বড় জমিদার জোতদারদের দ্বারা নানা ভাবে হয়রানি ও অত্যাচারিত হতে হতো। বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর এইগুলি বন্ধ হয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়ে গ্রামের গরিব মানুষদের মধ্যে বামফ্রন্ট সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বামফ্রন্টের প্রতি সমর্থন, শহরের মানুষদের থেকে গ্রামের মানুষদের মধ্যে ছিল অনেক বেশি। মূলত গ্রামের মানুষের সমর্থনকে ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট একটার পর একটা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল।

।২।

২০১১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ছিল বামফ্রন্ট সরকার। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালকে, বিশেষ করে গ্রামীন জীবন যাত্রাকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করে দেখিয়ে ছিলেন। প্রথম পর্যায়, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এই সময়ে সিলিং বহির্ভূত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল, বর্গাদারদের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছিল, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, নিয়মিত ভাবে যার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল, ১৯৮০-র মধ্য ভাগ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত, যখন কৃষি পণ্যের অত্যাধিক উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশেষ করে নিবিড়ভাবে চাষবাসের ফলে কৃষি মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছিল, এমনকি অ-কৃষি কর্মীদেরও। কৃষকদের উন্নত বীজ, ক্ষুদ্র সেচ ইত্যাদির সুবিধা প্রদান শুরু করা হয়েছিল। তৃতীয় পর্যায়ে (১৯৯০-২০০৬), যখন সারা ভারতে তথা সারা বিশ্বে কৃষির এক অচলাবস্থা দেখা দেয়। সারা দেশে চালু হয় নব্য উদারীকরণ আর্থিক নীতি। পশ্চিমবঙ্গেও জমির খণ্ডীকরণ হওয়া শুরু হয়। কৃষি সামগ্রীর উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল বাজার, জমির উৎপাদনশীলতাও হ্রাস পায়, কৃষি পরিকাঠামো দূর্বল হয়ে পড়ে। চতুর্থ পর্যায়, ২০০৬ সালের পর। এই সময়কে বলা যেতে পারে গ্রামের বা কৃষি জমির বিছিন্নতা বৃদ্ধি পাওয়া। বিশেষ করে কলকাতা মহানগর, বড় বড় শহরকেন্দ্রিক, হাইওয়ে সংলগ্ন এলাকায় জমিগুলি রিয়াল এস্টেট বা নির্মাণ শিল্প এবং শিল্পায়নের পরিকাঠামো নির্মানের স্বার্থে খুবই লোভনীয় হয়ে ওঠে। এই সময় থেকে সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও জমির সাথে কৃষকদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দিতে শুরু হয়।

।৩।

বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে পশ্চিমবঙ্গেও বহু জমি, কৃষি থেকে অ-কৃষি ক্ষেত্রের কাজে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই সময়ে কিছু কিছু করে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির সাথে নন কর্পোরেট অর্থনীতির সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে। ফলে গ্রামেও ক্ষুদ্র পুঁজির ওপর আধিপত্য এবং পুঁজির সঞ্চয়ন বা কেন্দ্রীভবন দেখা দিতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গেও বহু এলাকায় গ্রামীণ পরিবারে আয়ের ক্ষেত্রে কৃষির অংশ কমে যেতে থাকে, কৃষি জমি ক্রয়-বিক্রয়ের আগ্রহ কমতে থাকে, কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকে, কৃষি আর আগের মতো লাভজনক না থাকায়, বহু কৃষক বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কৃষকরা কৃষি কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। গ্রামে শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্নত নেটওয়ার্ক, খাদ্য সরববাহ, পুষ্টিকর খাদ্য, উন্নত পরিকাঠামো, কৃষি ও অ-কৃষি কাজে মজুরি বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহন ও পুনর্বাসনের জন্যে ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতিকরণ, উন্নত প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ইত্যাদি দাবিগুলি প্রাধান্য পেতে থাকে ও সমাজের উপরিতলে উঠে আসে। একটি সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে অনেক গ্রামের মানুষের কাছে উন্নত মানের শিক্ষাই ছিল প্রধান দাবি। এই ভাবে এক সময়ের বামফ্রন্ট সরকারের বড় সাফল্য ভূমি সংস্কারের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। শিল্প ও শিল্প পরিকাঠামো বা নগরায়ন ও আবাসনের জন্যে জমির চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে, ফলে বহু গ্রাম, শহরতলি, শহর সংলগ্ন গ্রাম এলাকায় গরিব কৃষক বা গরিব মানুষরা তাদের জমির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে বাধ্য হয়। এই সমস্ত ছোট জমির মালিকরা বড় বড় জোতদার, জমির মাফিয়া বা প্রমোটারদের আগ্রাসনের মুখে পড়ে। গ্রামের একটি অংশের মানুষদের মধ্যে এতদিন পর্যন্ত জমিকেন্দ্রিক যে সমীকরণ ছিল, সেই সমীকরণের কিছু কিছু পরিবর্তন হওয়া শুরু করে। এর ফলে গ্রামে যে নতুন রাজনৈতিক পরিসর বা শূন্যতার সৃষ্টি হলো, সেই পরিসর বা শূন্যতার ক্রমেই দখল নিতে শুরু করলো কিছু দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল। ২০০৮ সাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে জীবিকা পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যার শেষ পরিণতি ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সহায়তায় তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা। ড. দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের সময়েও গ্রামাঞ্চলে কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ ও চাহিদা দেখা দিতে শুরু করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময় বামফ্রন্টের প্রতি গ্রামের মানুষের যে সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছিল, তাতে জাতি, ধর্ম, বর্ণভিত্তিক ভূমিকা থেকে বড় ভূমিকা ছিল সিপিআই(এম)-এর দলীয় সংগঠন, গণসংগঠন, মতাদর্শ ও রাজনীতির। কয়েকজন বিশিষ্ট রাষ্ট্র ও সমাজ বিজ্ঞানী (ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ড. দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য প্রমুখ) মতামত দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির বামফ্রন্টের সময়ে গ্রামীণ এলাকায় একরকম প্রাধান্য ছিল, যার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছিল পার্টি সোসাইটি বা পার্টি-সমাজ ও পলিটিকাল সোসাইটি বা রাজনৈতিক সমাজ। এর ফলে বিভিন্ন গ্রামে ধর্মীয়, জাতি, বর্ণ, সামাজিক সংস্থাগুলি থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পার্টি বা পার্টি-সমাজের ভূমিকা। আগেই উল্লেখ করেছি, এই সময়ে কৃষি ও গ্রামে বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। ফলে বহু কৃষক পরিবারে মাথা পিছু আয় সৃষ্টিতে কৃষির অংশ কমতে শুরু করে। বৃদ্ধি পেতে শুরু করে অ-কৃষি ক্ষেত্রের আয়। বহু গ্রামে, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা জমিকেন্দ্রিক শ্রেণিসম্পর্কের পরিবর্তে নতুন এক শ্রেণিসম্পর্ক সৃষ্টি হতে থাকে। নব্য উদারনৈতিক আর্থিক নীতির ফলস্বরূপ কৃষিতে রাষ্ট্রীয় পুঁজির বিনিয়োগ ও কৃষির উপকরণে সরকারি ভরতুকি কমতে শুরু করে। বহু ক্ষুদ্র কৃষকরা তাঁদের জমি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে থাকে। গ্রামের সাথে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যাওয়া-আসা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে, গ্রামে শিক্ষা ও শহুরে সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পেতে শুরু হয়। হ্রাস পায় গ্রামীণ ও লোকসংস্কৃতির চর্চা। বহু মানুষ যেমন শিক্ষিত হয়, তেমনি বহু গ্রামীণ পরিবারের তরুণ প্রজন্মের মানুষদের অ-কৃষি ক্ষেত্রে বিশেষ করে ছোট ছোট কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণশিল্পে দৈনিক হাজিরা বা অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। গ্রামেরও বহু মানুষ উচ্চ শিক্ষা, রোজগারের জন্যে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে ভিন্ন রাজ্যে যাবার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তারা এক নতুন জগতের সাথে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে। এর ফলে গ্রামের মানুষের মধ্যে নতুন নতুন চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কৃষি থেকে কৃষকরা যতই বিযুক্ত হওয়া শুরু করে, সেই সমস্ত ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পুঁজি, বিশেষ করে পুঁজির সঞ্চয়ন ও লুট, উচ্ছেদ ও বল প্রয়োগের মাধ্যমে পুঁজির সঞ্চয়ন সারা দেশেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। গ্রামে ও এক শ্রেণির নব্য ধনীর সৃষ্টি হতে থাকে। গ্রামে দেখা দিতে শুরু করে বহু শিক্ষিত বেকারের। ড. দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের পার্টি-সমাজের ভাবনা এ প্রসঙ্গেই এসেছে। যা ভারতের অন্য রাজ্যে দেখা যায়নি। এই সময় একটি নতুন ধরনের সামাজিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, যার সাথে পরিচিতি সত্তার রাজনীতির কোনও সম্পর্ক ছিল না। পার্টি-সমাজ গ্রামের সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত সমস্যার নিরসনেও পালন করতো এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এমন কি পঞ্চায়েত পরিচালনার ক্ষেত্রেও। আজ পশ্চিমঙ্গে গ্রামে গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের যে লুম্পেনাইজেশন ও দুর্নীতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে, সেরকম কোনও প্রভাব বামফ্রন্ট সরকারের সময় ছিল না। শহরে সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। গ্রামে ছিল পার্টি-সমাজের ভূমিকা। আবার শহরে বা গ্রামে বসবাস করে প্রচুর সংখ্যক গরিব মানুষ, যারা বস্তি বা সরকারি জমিতে বা জবর দখল কলোনিতে বসবাস করে, যাদের থাকে না কোনও সরকারি স্বীকৃতি বা বাস্তু জমির অধিকার। এদের, যারা কাজ করে অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে, যারা থাকে সরকারি সামাজিক সহায়তার বাইরে, যাদের অনেকে পরিযায়ী শ্রমিক, অনেকে ফুটপাতে বসবাস করে, অনেকে স্ট্রিট হকার, যাদের দৈনন্দিন বসবাস ও রুজি রোজগারের ক্ষেত্রে রয়েছে নিরাপত্তার অভাব। সেই সমস্ত ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রাম বা শহরে রাজনৈতিক সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এদের বসবাস ও জীবিকা আইনসঙ্গত না হলেও এদের প্রতি রাজনৈতিক সমাজের থাকে এক সংহতিবোধ।

।৪।

অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক এবং শহুরে দরিদ্ররা নানা ভাবে নির্ভরশীল থাকে রাজনৈতিক সমাজের সহৃদয় দৃষ্টি ও সহানুভূতির ওপর। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামাঞ্চলে বামফ্রন্ট সরকারের সময় এই সমস্ত মানুষদের প্রতি, যাদের থাকত না কোনও আইন সম্মত স্বীকৃতি, তাদের পাশে থাকত এই রাজনৈতিক সমাজ। শহরে সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজে থাকে আইনজীবি, বুদ্ধিজীবি, চিকিৎসক, শিক্ষিত মানুষ, অ-সরকারি সংস্থা, মানবিক ও জনকল্যাণকামী সংস্থা, সামাজিক সংস্থাগুলির বড় ভূমিকা। গ্রামে তা থাকে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমাজ পালন করে বড় ভূমিকা। বামফ্রন্টের সময় এই রাজনৈতিক সমাজ গ্রামের বহু মানুষের স্বার্থে সরকারের ওপর একটি চাপ সৃষ্টি করত এবং আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের স্বার্থে একটি সদর্থক ভূমিকা পালন করতো। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের মতে পশ্চিমবঙ্গে পার্টি-সমাজ ও রাজনৈতিক সমাজের সমন্বয়ে একটি নতুন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও সামাজিকতা গড়ে উঠেছিল, সারা দেশের অন্য কোনও রাজ্যে তা দেখা যায়নি। পশ্চিমবঙ্গে এই রাজনৈতিক সমাজ থেকে সেই সময় গ্রামের বহু মানুষ নানাভাবে উপকৃত হতো। সমাজ বিজ্ঞানী ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিস্তৃতভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমাজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যদিও অনেক সমাজ বিজ্ঞানী মনে করেন গ্রামাঞ্চলের পলিটিকাল সোসাইটির অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আবার গ্রামাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক-জনবিন্যাসগত পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে তথাকথিত রাজনৈতিক সমাজ ও পার্টি-সমাজের কিছু ভূমিকা থাকলেও তা কখনও শ্রেণি সংগ্রাম, কৃষক আন্দোলন, পঞ্চায়েত ও গণ আন্দোলনের বিকল্প ছিল না। আবার বাংলার সমাজে বর্ণ, জনগোষ্ঠী, ধর্ম ও সমাজ, অ-সরকারি ক্ষেত্রের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের লিখিত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি-সমাজ ও ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি বিষয়ে লিখিত নিবন্ধটি পড়লে বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পার্টি-সমাজের প্রতীকী কাঠামো ও ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছু বুঝতে পারা যায়। যেখানে তিনি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পার্টি-সমাজের নামে বড় বড় প্রমোটার, জমির দালাল, মাফিয়া, ঠিকাদার, নির্মাণ-সামগ্রী সরবরাহকারী, লুম্পেন, সিন্ডিকেট, কাটমানি ও হঠাৎ করে কোনও সম্পদ সৃষ্টি না করে তৈরি হওয়া নব্য ধনীদের কথা বলেছেন, যার পেছনে রয়েছে দুর্নীতি ও অসৎ পথের ভূমিকা। ড. দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য মমতা ব্যানার্জী এবং পশ্চিমবঙ্গে ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি নির্মাণ সম্পর্কে নিবন্ধটি লিখেছিলেন ২০২৩ সালে। পার্টি-সমাজ সম্পর্কে দু’টি লেখা তিনি লিখেছেন ২০০৯ ও ২০১০ সালে।

দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ও পরে বামপন্থীদের নেতৃত্বে কৃষকদের জমি, খাদ্য, ন্যায়সঙ্গত ফসলের ভাগ আদায়ে, বর্গা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে, মহাজনদের সুদের হার বৃদ্ধির বিরুদ্ধে, জমির নিরাপদ সত্তার দাবিতে, অতিরিক্ত খাজনা থেকে মুক্তি, সেচের সুবিধা প্রদান, ইত্যাদি আদায়ে, জোতদারদের বা ধনী কৃষকদের গ্রামের গরিব কৃষকদের ওপর অত্যাচার ও কর্তৃত্ব ইত্যাদির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে মানুষের সামাজিক ন্যায় ও আত্মসম্মান ও মর্যাদার দাবিতেও বহু আন্দোলনের উদাহরণ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৬০ এর দশক থেকে গড়ে উঠেছিল একটি বাম পরিসর ও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

।৫।

বামফ্রন্টের সময় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এই প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠেছিল পার্টি-সমাজ। আগেই বলা হয়েছে তা ছিল প্রতীকী। তবে তা ছিল, অনেক শৃঙ্খলাবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক। সেই সময়ের পার্টি-সমাজগুলির কাঠামো ছিল অতীতের ধারাবাহিক কৃষক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত।

ড. ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গেই দেখিয়েছেন, ২০১১-তে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে পার্টি-সমাজের নামে একটি প্রতীকী কাঠামো বজায় থাকলেও, তার মূল ভিত্তি হলো দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জীর ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি ও তার ব্র্যান্ড। গ্রামাঞ্চলে যে কোনও সিদ্ধান্তে থাকে তাঁর অবাধ কর্তৃত্ব। এমনকি ধর্মীয় সম্প্রদায়, জাত বা বর্ণ, সমাজ বা অ-সরকারি সামাজিক সংস্থার ওপরও। পঞ্চায়েত নির্বাচনে কর্তৃত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রেও থাকে মুখ্যমন্ত্রীর এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি-র মুখ্য ভূমিকা। আজ সরকার, প্রশাসন, পঞ্চায়েত ইত্যাদির সহায়তায় যে চরমতম দুর্নীতির সৃষ্টি হচ্ছে তার মধ্য দিয়ে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে যে নন্-কর্পোরেট ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের বাড়বাড়ন্ত দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণ মমতা ব্যানার্জির এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি। তার মধ্য দিয়ে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে এক শ্রেণির নব্য ধনীদের। এই ফ্রাঞ্চাইজি এদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সম্পদশালী করে থাকে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা থাকে সরকারি অর্থের আত্মসাৎ, বেআইনীভাবে সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদারি অর্জন, সরকারি প্রকল্পের অর্থের কাটমানি খাওয়া, সিন্ডিকেট, সরকারি চাকুরি বা কোনও সুবিধা দেবার বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ অর্থ উপার্জন ইত্যাদির। তৃণমূল কংগ্রেস জমানায় পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে কৃষি কাজে রোজগার থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের দুর্নীতি, পঞ্চায়েতের ঠিকাদারি, ছোট বা মাঝারি প্রমোটারি, জমির দালালি, অর্থ ঋণদানকারি, সারের কারবারি, রেশন দোকানের মালিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী ও কৃষি সামগ্রী বিক্রেতা, কাঠ, বালি, পাথর, কয়লা পাচার ও সরবরাহকারী, গাড়ি, ট্র্যাক্টার ভাড়া দেবার কারবারী, ধান কলের মালিক, বড় বড় মুদির দোকানের মালিক বেআইনী পথে নিয়োগ মধ্যস্থতাকারী ইত্যাদির বড় ভূমিকা। বলা বাহুল্য এরাই শাসক তৃণমূল কংগ্রেস দলের গ্রামাঞ্চলের মূল নেতৃত্ব বা বাহুবলী। দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জী এদেরই তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার ফ্রাঞ্চাইজি দিয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে থেকেই পঞ্চায়েত, বিধানসভা, লোকসভা ইত্যাদি নির্বাচনে দলীয় প্রতিনিধি মনোনীত করার অধিকার থাকে তাদের হাতেই। তারাই গ্রামাঞ্চলে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ম্যানেজার। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা হয়ে যাচ্ছে বহু অর্থ ও সম্পদের মালিক। মমতা ব্যানার্জী ও তৃণমূল কংগ্রেস দল বিশ্বাস করে অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতিতে। তার বিনিময়ে এদের দেওয়া হয় সমস্ত ধরনের মাতব্বরি করার অধিকার। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার নিযুক্ত করেছে আইপ্যাক নামে একটি এজেন্সি। দলীয় ও সরকারের অনেক কাজ কর্ম করা হয় এই এজেন্সির মাধ্যমেও।

।৬।

দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে গ্রামাঞ্চলে পার্টি-সমাজের কাঠামো সম্পর্কে অনেক কথা লিখেছেন যে বিষয়ে আমি বেশ কিছু কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তৃণমূল কংগ্রেসের সময়কালে যে পার্টি-সমাজের কাঠামো দেখা যাচ্ছে, তার পিছনে আছে ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি-র মমতা ব্যানার্জির ব্র্যান্ড যাতে থাকে স্থানীয়স্তরের ব্যবসায়ীদের বড় ভূমিকা। যাদেরই বলা হয় নন-কর্পোরেট ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট। তৃণমূল কংগ্রেস নেতারাই এই নন কর্পোরেট-জাত ধান্দার ধনতন্ত্র সৃষ্টি করে থাকে স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পৌরসভাস্তরে। এর মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির লেনদেন। কিন্তু এর জন্যে প্রয়োজন স্থানীয়স্তরের জনগণের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। এই সম্পর্ক গড়ে তুলবার জন্যেই স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের চাই এমন কিছু ক্ষমতা ও সম্পদ, যার মাধ্যমে স্থানীয়স্তরের সাথে লেনদেন হতে পারে। বর্তমান সময়ে গ্রামাঞ্চলে পার্টি-সমাজের কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এরাই। এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি-র একটি শর্ত এদের রাখতে হবে মমতা ব্যানার্জী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। তাদের যে কোনও নির্বাচনে বুথ দখল বা বাহুবল দেখিয়ে তাদের দলের পক্ষে ভোট পাইয়ে দিতে হবে, প্রতিদানে তাদের যে কোনও জমি বেআইনীভাবে জবর দখল, টেন্ডারের প্রতিযোগিতামূলক বিধি এড়িয়ে যে কোনও প্রকল্পের ঠিকা পাইয়ে দেওয়া, সরকারি প্রকল্পের অর্থ থেকে কাটমানি আদায় করা, গণ্ডগোলে জমির দখল নিতে পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করা। যেমন শিলিগুড়ির রামকৃষ্ণ মিশনের জমি জবর দখল করতে গিয়ে জমির মাফিয়ারা যা করল। এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যারা ধনী হয় তারা কিন্তু সবাইকে বঞ্চিত করে ধনী হয় না। আবার মমতা ব্যানার্জী দলীয় নেত্রী হিসেবে মাঝে মাঝে তাঁর ফ্রাঞ্চাইজি হিসেবে তাদের পদাধিকার দেন বা ক্ষমতায়িত করে থাকেন। কখনও কখনও তাদের পদ কেড়েও নেওয়া হয়। দেখাতে চান তিনি কোন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে রেওয়াত করেন না। এইভাবে তিনি জনমানসে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে একটি ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে থাকেন। সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায় কর্পোরেট ও নন কর্পোরেট, দু’টি ক্ষেত্রকে পার্থক্য করে দেখিয়েছেন। আগেই বলা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস দল অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের নন কর্পোরেট ক্রোনিনিজমের পক্ষে থাকে, কারন এর সাথে জড়িত থাকে বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত ক্ষেত্রের মানুষ। যাদের এই দলের পক্ষে নির্বাচনের জন্যে প্রয়োজন। তা সত্বেও নন্ কর্পোরেট ক্রোনিনিজমের বিরাট দৃশ্যমানতা থাকে। দু’জন মানুষ পাশাপাশি বসবাস করলেও, একজনের ব্যবহারে জন্যে দীর্ঘকাল থাকে একটি সাইকেলই, অন্যজনের অল্প সময়ের মধ্যে সাইকেল থেকে মোটর সাইকেলও অনেক মূল্যবান ব্যক্তিগত গাড়ী হয়ে যাচ্ছে। এগুলি মানুষের কাছে দৃশ্যমান। তৃণমূল কংগ্রেসের বহু নির্বাচনী প্রার্থীরাই ইদানিং তাদের হলফনামায় দেখায় তাদের আয়ের উৎস ব্যবসা।

।৭।

অন্যদিকে কার্পোরেট ক্রোনিনিজমের সাথে যুক্ত থাকে একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। যার সাথে যুক্ত রাজনৈতিকভাবে বিজেপির মত দল। যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিমানবন্দর, ডক, খনি, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্প প্রতিষ্ঠান, পরিবহন পরিকাঠামো ইত্যাদির বেসরকারীকরণে প্রাথমিক বিডিং-এ এমন সমস্ত কর্পোরেট বা একচেটিয়া পুঁজিপতিরা সুযোগ পায়, যাদের সাথে বিজেপি দলের থাকে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এই সমস্ত দুর্নীতির অর্থ যায় বিজেপি দলের রাজনৈতিক বা নির্বাচনী তহবিলে। অথচ যা দৃশ্যমান নয় ও সাধারণ মানুষ মনে করে এতে তাদের কোনও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতি হচ্ছে না। সাম্প্রতিক বিজেপির নির্বাচনী বন্ড তার একটি উদাহরণ।

সেই জন্যে বলা হয় নন কর্পোরেট ক্রোনিনিজম সংঘটিত হয় অসংগঠিত বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে এবং পঞ্চায়েত বা পৌর সভা স্তরে, যা দৃশ্যমান। কর্পোরেট ক্রোনিনিসম সংঘটিত হয় একচেটিয়া পুঁজি স্তরে। যা সংঘটিত হয় কেন্দ্রীয় স্তরে, যা দৃশ্যমান নয়। বিজেপি দল কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন একচেটিয়া পুঁজিপতিদের দিয়ে বিভিন্ন মূলধারার মিডিয়ার কর্তৃত্ব ক্রয় করিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে। বিজেপি এভাবে মূল ধারার মিডিয়ার ওপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, রাজবংশী, মতুয়া, নমশুদ্র, আদিবাসী, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাদের সমাজে রয়েছে বেশি প্রভাব, যাদের দ্বারা এই দল উপকৃত হতে পারে, তাদেরকে নানা ধরনের সুবিধা দেবার বিনিময়ে তাদের নির্বাচনে ব্যবহার করে থাকে। একইভাবে তারা চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বদেরও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে থাকে। এমনকি নির্বাচনেও সেই ব্যক্তিদের ব্যবহার করে ও প্রার্থী মনোনীত করে। অথচ পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও শিল্প-সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশে এই দলের বা সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনও নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গী নেই। অন্যদিকে বিজেপি বিভিন্ন নিম্নবর্ণ হিন্দু বা কোন ধর্মীয় সংস্থার প্রধানদের এক ছাতার নিচে এনে হিন্দুত্বের তাদের স্বীকৃতি প্রদানের কথা বলে নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা নিয়ে থাকে।

অন্যদিকে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয়েই কর্পোরেট বা নন্-কর্পোরেট পূজিপতিদের কাছ থেকে আদায় করে তাদের দলীয় তহবিলে কোটি কোটি টাকা। তৃণমূল কংগ্রেসের অডিট রিপোট থেকে জানা যায় ২০২০-২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মোট আয় ছিল ৭৪.৪১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ৫৪৫.৭৫ কোটি টাকা। এক বছরে বৃদ্ধির হার ছিল ৬০০ শতাংশ। সারা দেশে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর জানা যায় তৃণমূল কংগ্রেসের আয় বৃদ্ধি পেয়ে হয়ে ছিল বিজেপির পর দ্বিতীয় স্থানে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা যে অর্থ বা সম্পদ তৈরি করেন তা হলো একটি নন-কর্পোরেটজাত ক্রোনি ক্যাপিটালিসম। যদিও বিজেপি নেতারা যে অর্থ ও সম্পদ তৈরি করেন, তা কর্পোরেটজাত ক্রোনি ক্যাপিটালিসম। ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি-র, বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের দু’টি স্তর আছে, একটি জনগনকে একত্রিত করার ক্ষমতা এবং অন্যটি পঞ্চায়েত ও পৌরসভার স্তরে ক্ষমতা। যা একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা। যে ক্ষমতার দৌলতে রাজনৈতিক ফ্রাঞ্চাইজিদের স্বার্থে আদায় করিয়ে দেওয়া হয় জমি, অবাধভাবে দেওয়া হয়, বালি, পাথর, কয়লা, কাঠ, ঠিকাদারি, সরকারি চাকুরী দেবার ক্ষমতা ও লাইসেন্স। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে এই ফ্রাঞ্চাইজি রাজনীতি পালন করেছে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

বিজেপি ক্রোনি ক্যাপিটালিসমের স্বার্থে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি এজেন্সিগুলিকে ব্যবহার করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে বিজেপি এই সময় বিভিন্ন সরকারি এজেন্সিগুলিকে ব্যবহার করেছে।


প্রকাশের তারিখ: ২১-জুন-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ভালো লাগলো।' মার্কসবাদী পথ ' এর এই লেখাগুলো মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করা দরকার। পাক্ষিক বুলেটিন আকারে করুন।
- সুশান্ত নিয়োগী , ২১-জুন-২০২৪


বহুল তথ্য সমৃদ্ধ সুন্দর লেখাটি পড়ে উপকৃত হলাম। গবেষক, ছাত্র ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ এই প্রবন্ধের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক মিসিং লিংক খুঁজে পাবেন ।
- ফজলুর রহমান , ২১-জুন-২০২৪


নিবিড় পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর এই প্রবন্ধটি।।জনস্বার্থেই এই প্রবন্ধটি আরও ছড়িয়ে দেওয়া কাম্য।বর্তমানে সুকৌশলে দীর্ঘ ৩৪ বছরের ঐতিহ্যকে যে ভুলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এই ধরনের আরও প্রবন্ধের প্রকাশ আরও কাম্য
- শেষাদ্রী বসু, ২১-জুন-২০২৪


মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি/মনসবদারি ভাবনা তুলনামূলক নতুন ও যুক্তিযুক্ত। ছোট করা যেত। এরকম নিবন্ধ প্রয়োজন।
- ইন্দ্র ঘোষ দস্তিদার , ৩০-জুলাই-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬