সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বহির্ভূতকরণের কৌশল
এম এ বেবি
সিএএ, এনআরসি-র পর এখন এসআইআর– স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন, বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন– ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাইয়ের একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি নকশা। ১৯৩৫ সালে বৈষম্যমূলক ন্যুরেমবার্গে আইন প্রণয়ণের পরই নাৎসি জার্মানিতে সমস্ত ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকারের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়। সিএএ, এনআরসি ও বিহারের ভোটার তালিকায় এসআইআর বাস্তবায়ন– একত্রে করলে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে ইদানীংয়ের ভারতের এক বিপজ্জনক ছবি।

নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জী (এনআরসি)-র পর বিহারের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) উদ্দেশ্য স্পষ্ট। নাগরিকদের ভোটাধিকার-বঞ্চিত করার মধ্য দিয়ে দেশের নাগরিকত্বের চেহারাকে আমূল বদলে দেওয়া। এদের মিলিত কণ্ঠস্বরে বিশ শতকের সবচেয়ে জঘন্যতম পর্বটি ধ্বনিত হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে বহির্ভূতকরণের বিপদসংকেত। এটি এমন একটি ভয়ঙ্কর পন্থা, যা সচেতনভাবেই বর্জন করেছিল স্বাধীনতা-উত্তর ভারত।
নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে দু’টি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে: জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (ইয়ুস সোলি) এবং জাতিপরিচয় বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নাগরিকত্ব (ইয়ুস সাঙ্গুইলি)। ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাস জুড়ে সংবিধান গণপরিষদে (কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) এ-নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার পর ভারতীয় সংবিধানে এই দু’টি পদ্ধতির মধ্যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের আধুনিক ধারণাটি গৃহীত হয়। ওই বিতর্কে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের পক্ষে-ও বক্তব্য উঠে এসেছিল। কিন্তু সংবিধান গণপরিষদ সেই বক্তব্য প্রত্যাখান করে। নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে বেমানান– এই অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলেই সংবিধানে ৫ থেকে ১১ ধারা যুক্ত করা হয়। যা নাগরিকত্বের বিষয়টি সংজ্ঞায়িত করে। সংবিধানের ৫(ক) ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়, ভারতের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটি সন্তান ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে।
সিএএ-তে, ভারতের নাগরিকত্বে ধর্ম একটি নির্ধারক বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সঙ্ঘ পরিবারের দাবি, সিএএ-তে কোনও বিদ্যমান ভারতীয় নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। কিন্তু সংসদের ভিতরে ও বাইরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, ‘ক্রোনোলজি সমঝিয়ে’, মানে ঘটনাক্রমটি বুঝুন। কী সেই ঘটনাক্রম? প্রথমে সিএএ, তারপর এনআরসি। এটাই ঘটনাক্রম। যাঁরা যথাযথ নথিপত্র দেখাতে অক্ষম হবেন, তাঁদেরকে এনআরসি-তে অন্তর্ভুক্তির জন্যে সিএএ-তে বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী যাচাইপর্বের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাই যদি হয়, তবে এটা কীভাবে নিশ্চিত করে বলা যাবে যে সিএএ-তে কারো নাগরিকত্ব বাতিল হবে না? এনআরসি প্রস্তুতির সময়ে যারাই জন্মস্থান-সহ অন্য বিষয়ের বিশদ তথ্য দিতে অসমর্থ হবেন, তাঁদের সকলেই চলে আসবেন সন্দেহের তালিকায়।
আসামে এনআরসি বাস্তবায়নের সময়ে পরিষ্কারভাবে এই ছবিটাই দেখেছি আমরা। প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে, যার দুই তৃতীয়াংশই নারী। সঙ্ঘ পরিবারে মূল নিশানা ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেও, আদিবাসী, দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত, তৃতীয় লিঙ্গের জনগণেরও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নাও থাকতে পারে। তাঁদের নাগরিকত্বও তখন সন্দেহের আওতায় চলে আসবে।
দেখা গিয়েছে ভারতে ৪২ শতাংশ মানুষের কোনও জন্মের শংসাপত্র নেই। আমাদের কোটি কোটি ভাই বোনেদের নাগরিকত্ব প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে বাতিল হয়ে যেতে পারে। হয় তাঁদের কয়েদ করা হবে বন্দিশালায়। অথবা তাঁরা পরিণত হবেন সমস্ত ধরনের নাগরিক অধিকারহীন জনতায়। এই অন্ধকার বাস্তবতায় এখন প্রতীক্ষা করছে আমাদের সামনে।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) আড়ালে প্রকৃতপক্ষে পিছনের দরজা দিয়ে এনআরসি-র প্রস্তুতিই সারতে চাইছে। এই এসআইআর প্রক্রিয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভোটাধিকার হারানোর উৎকন্ঠার জন্ম দিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক পথে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীগুলির বহির্ভূতকরণের বৃহত্তর ছকের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখতে হবে।
এই ঘটনাক্রমের প্রেক্ষাপটে আমাদের স্মরণ করতে হবে, আরএসএস ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে তাদের প্রতিষ্ঠার সময়ে নাৎসি জার্মানি ও ফ্যাসিস্ট ইতালি থেকেই অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছিল। হিন্দু মহাসভার সভাপতি ও আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ারের মন্ত্রণাদাতা বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জের ১৯৩১ সালে ইতালির প্রধানমন্ত্রী বেনিতো মুসোলিনির সাথে সাক্ষাৎ ইতালির সঙ্গে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী মহলের মতাদর্শগত পরাগ-সংযোগের একটি নির্ণায়ক মুহূর্ত। নিজের দিনলিপিতে মুঞ্জে মুসোলিনির ‘ইতালির সামরিক পুনরুজ্জীবন’ ঘটানোর ভূয়সী প্রশংসা করে খোলাখুলিই বলেছেন ‘ভারত, বিশেষ করে হিন্দু ভারতের সামরিক পুনরুজ্জীবনের জন্যেও এমন ধরনের সংগঠন প্রয়োজন’।
যা তিনি দেখে এসেছিলেন, তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ‘হিন্দু ভারতের’ সামরিকীকরণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুঞ্জে ১৯৩৫ সালে সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটি এবং ১৯৩৭ সালে নাসিকে ভোঁসলা মিলিটারি স্কুল-এর প্রতিষ্ঠা করেন। আরএসএসও পরবর্তীকালে এই নকশাকেই গ্রহণ করে যেখানে সদস্যভুক্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোর ধরনে ইতালির ফ্যাসিস্ট যুব সংগঠন অপেরা ন্যাজিওনালে বালিল্লা-র যথেষ্ট সাদৃশ্য রাখা হয়। মুঞ্জের কর্মতৎপরতা ও মুসোলিনির কর্মধারা সম্পর্কে মুগ্ধতা আরএসএস-এর সাংগঠনিক কর্মধারায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।
আরএসএস-এর দ্বিতীয় প্রধান এমএস গোলওয়ালকার ও তাঁদের ভাবাদর্শী বিনায়ক দামোদর সাভারকার-সহ গোড়ার যুগের নেতারা সকলেই ছিলেন হিটলার ও মুসোলিনির শাসনের গুণমুগ্ধ। তাঁরা বিশেষ করে প্রভাবিত ছিলেন ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ এবং মুখ্য জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সত্তার ফ্যাসিস্ট আদলে সমাজকে সংগঠিত করার নকশার দ্বারা। গোলওয়ালকারের ‘উই অর আওয়ার ন্যাশনহুড ডিফাইনড’ (১৯৩৯) বইয়ে হিটলারের নীতির খোলাখুলি প্রশংসা করে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা ও সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ইহুদিদের প্রতি নাৎসিদের মতো আচরণের পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। এই বইটি আরএসএস-এর মতাদর্শ গঠন এবং সংগঠনকে ফ্যাসিস্ট ভাবনায় চালিত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। গোলওয়ালকারের ‘বাঞ্চ অব থট’ বইয়ে মুসলিম, খ্রিস্টান ও কমিউনিস্টদের ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বিদেশি ধারণা বলে বিলাপ করেন, তাঁরাই প্রকৃতপক্ষে প্রতিক্রিয়াশীল বিদেশি ধারণা ও পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিভাজনের ছক এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।
১৯৩৫ সালে বৈষম্যমূলক ন্যুরেমবার্গে আইন (যার মাধ্যমে ইহুদিরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়– অনুবাদক) প্রণয়ণের পরই নাৎসি জার্মানিতে সমস্ত ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকারের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়। সিএএ, এনআরসি ও বিহারের ভোটার তালিকায় এসআইআর বাস্তবায়ন– একত্রে করলে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে ইদানীংয়ের ভারতের এক বিপজ্জনক ছবি।
ঋণ: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ১২-জুলাই-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
